১.
ইস্টার সানডেতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছুটি ঘোষিত হলেও দুয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সরকারের ছুটি তালিকাকে অগ্রাহ্য করে প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত ক্লাস, পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ঢাকার নর্থ-সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় এগুলোর অন্যতম। এ বছর ২০২৩ খ্রি. বিগত দিনের পুনরাবৃত্তি করে ইস্টার সানডে’তে পরীক্ষার দিন ধার্য করে খ্রিষ্ট বিশ্বাসী ধর্মীয় অধিকার ক্ষুন্ন করেছে। আমরা গভীরভাবে অবলোকন করেছি, প্রাচ্যের অক্সফোর্ডখ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ইস্টার সানডেতে ছুটি ঘোষণা করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ৬ এপ্রিল প্রবীর কুমার সরকার, রেজিষ্ট্রার এবং সৈয়দা মাসুদা আক্তার, ডেপুটি রেজিস্ট্রার (প্রশাসন-৩) স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে (নং রেজি/ প্রশা-৩/৭২৫৭৬-সি) জানিয়েছে, ‘আদিষ্ট হয়ে এতদ্বারা সংশ্লিষ্ট সকলের অবগতির জন্য জানাচ্ছি যে, ইস্টার সানডে উদযাপন উপলক্ষে আগামী ০৯ এপ্রিল ২০২৩ তারিখ রবিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল ক্লাস ছুটি থাকবে। অফিসসমূহ যথারীতি খোলা থাকবে।’ ছাত্রছাত্রীদের প্রতিবাদের মুখেও বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় ইস্টার সানডে অর্থাৎ ৯ এপ্রিল, ২০২৩ খ্রিষ্টাব্দের পরীক্ষা স্থগিত করেছে। জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৮-১৯ ভর্তি শিক্ষাবর্ষের রসায়ন বিভাগ, ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের লোক প্রশাসন বিভাগ ও অর্থনীতি বিভাগ, ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের গণিত বিভাগ, ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের মার্কেটিং বিভাগ, ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের মাষ্টার্সের ফিন্যান্স এন্ড ব্যাংকিং বিভাগের ও সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের পরীক্ষা রুটিন অনুযায়ী ৯ এপ্রিল হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের পক্ষে স্বাক্ষরিত এক নোটিশে ৯ এপ্রিলের সকল ধরনের পরীক্ষা স্থগিত করায় ক্ষুব্ধ সাধারণ শিক্ষার্থীরা। অপরদিকে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ইস্টার সানডের ছুটি ১০ এপ্রিল (সোমবার) করে একাডেমিক ক্যালেন্ডার প্রস্তুত করেছিলে কর্তৃপক্ষ। পরবর্তীকালে ৯ এপ্রিল খ্রিষ্টিয়ান ধর্মাবলম্বীদের ইস্টার সানডে হওয়ায় পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দপ্তর ছুটি ঘোষণার সিদ্ধান্ত নেয়।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়Ñ মাধ্যমকি ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ সরকারি কলেজ-৪ শাখা, নম্বর: ৩৭.০০.০০০০.০৬৯.০৮.০০১.১৯.১২৮২ স্মারকপত্রের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, সরকারি ও বেসরকারি কলেজসমূহের (সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা ও টিটি কলেজসহ ) ২০২৩ সালের (১৪২৯-১৪৩০ বঙ্গাব্দ) বাৎসরিক ছুটির তালিকায় মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন জ্ঞাপন করা হলো: সিরিয়াল ০৮ নং-এ ২৬ দিন ছুটির তালিকায় রয়েছে, পবিত্র রমজান, স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস (২৬ মার্চ), পুণ্য শুক্রবার (০৭ এপ্রিল), ইস্টার সানডে (০৯ এপ্রিল)… ঈদ-উল ফিতর (২২ এপ্রিল) ও গ্রীস্মকালীন অবকাশ।’ স্মারক নং-০৫.০০.০০০০.১৭৩.০৮.০০৩.১৮-২৩৭, তারিখ ০১নভেম্বর ২০২২ প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ‘সরকার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে যে, ২০২৩ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশের সকল সরকারি ও আধা-সরকারি অফিস এবং সংবিধিবদ্ধ স্বায়ত্তশাসিত ও আধা স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাসমূহে নিম্নবর্ণিত ছুটি করা করা হবে- ক. সাধারণ ছুটিতে যিশু খ্রিষ্টের জন্মদিন (বড়দিন) এবং ঙ. ঐচ্ছিক ছুটি (খ্রিষ্টান পর্ব) তে ৭টি দিনের উল্লেখ রয়েছে। পর্বগুলো হচ্ছেÑ ইংরেজি নববর্ষ, ভস্ম বুধবার, পুণ্য বৃহস্পতিবার, পুণ্য শুক্রবার, পুণ্য শনিবার, ইস্টার সানডে, যিশু খ্রিষ্টের জন্মোৎসব (বড়দিনের পূর্বের ও পরের দিন)।’ অতীতে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে পিএসসি, জেএসসি, এসএসসি, এইচএসসি পরীক্ষাগুলোতে খ্রিষ্টিয়ান ধর্মের একটি গ্রুপ সেভেন্থ ডে এ্যাডভেনটিস্ট’ যারা সাব্বাথ (শনিবার) ধর্মীয় অনুশাসন হিসেবে মেনে এসেছেন, শনিবার পরীক্ষা ধার্য হলে সন্ধ্যা ৬ ঘটিকার পর পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছে। দিনব্যাপী একটি রুদ্ধ ঘরে আঁটকে থেকে সন্ধ্যায় পরীক্ষা দিয়েছে। সরকার খ্রিষ্টিয়ান ধর্মের উপাসনা দিন, উৎসবাদি পালনে অত্যন্ত যতœশীল ও সক্রিয়। প্রতিটি নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার রক্ষায় সর্বোচ্চ প্রচেষ্টার উদাহরণ রয়েছে।
আমরা স্থম্ভিত হয়েছি, নর্থ-সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতি বছরই ইস্টার সানডেতে ক্লাস ও পরীক্ষা ধার্য করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ঘোষণাকে অবজ্ঞা এবং খ্রিষ্টিয়ান ধর্ম বিশ্বাসী ছাত্রছাত্রীদের প্রতি অন্যায্য আচরণ করেছে। সংবিধানের একই দেশে দুয়েকটি নিয়ম চলতে পারে না, এটি ধর্মীয় অধিকারকে চরমভাবে লঙ্ঘনের শামিল। অসাম্প্রদায়িক চেতনার বাংলাদেশের অগ্রযাত্রাকে তরান্বিত করতে মাননীয় শিক্ষা মন্ত্রীকে বিষয়টি খতিয়ে দেখার সর্নিবদ্ধ অনুরোধ জানাই।
২.
ঢাকায় অনুষ্ঠিত খ্রিষ্টিয়ান ধর্ম শিক্ষকদের প্রশিক্ষণে দেখা হয় চট্টগ্রামের বার্ণবা গমেজ। তিনি জানালেন চট্টগ্রামের একটি স্বনামধন্য বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণীতে তার সন্তান পড়াশোনা করেন কিন্তু পাঠ্যপুস্তক হিসেবে ‘খ্রিষ্ট ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা এখনো হস্তগত হননি। এ নিয়ে শ্রেণী শিক্ষক ও প্রধান শিক্ষকের সাথে কয়েকবার দেখা ও অনুরোধ করার পরও পাঠ্যপুস্তক ব্যবস্থা করার তাগিদ রয়েছে বলে মনে করেননি। একইভাবে গাজীপুর, নওগাঁ ও রাজশাহীর কয়েকটি এলাকা থেকে শ্রেণীভিত্তিক ‘খ্রিষ্ট ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা’ খ্রিষ্টিয়ান শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। আমরা অবগত হয়েছি, নতুন বছর পর্দাপনের পূর্বেই প্রত্যেকটি বিদ্যালয় থেকে শিক্ষার্থীর ধরণ অনুযায়ী তালিকা প্রস্তুত করে স্থানীয় শিক্ষা অফিসে জমা দেওয়া হয়। যদি জমা দেওয়া হয়ে থাকে, সেক্ষেত্রে শ্রেণীভিত্তিক পাঠ্যপুস্তক না পাওয়া কোনো কারণ নেই কিন্তু প্রধান শিক্ষক যদি অবহেলা করেন, তাহলে না পাওয়ার সম্ভাবনায় সবচেয়ে বেশি; এক্ষেত্রে প্রধান শিক্ষককে সর্বাধিক সক্রিয় হতে হয়। খোঁজ নিয়ে জেনেছি, একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক শিক্ষার্থী না থাকলে খ্রিষ্টান ধর্ম শিক্ষক চাহিদা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক প্রদান করেন না। আবার দেশের অনেক জায়গায় দেখেছি, খ্রিষ্টিয়ান শিক্ষার্থী শতাধিক থাকলেও প্রধান শিক্ষক খ্রিষ্টান ধর্মের শিক্ষকের চাহিদা আবেদন জানাননি। এক্ষেত্রে গজালিয়া উচ্চ বিদ্যালয়, লামা, বান্দরবান; কবিরাজহাট উচ্চ বিদ্যালয়, বীরগঞ্জ, দিনাজপুর উল্লেখযোগ্য।
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড, বাংলাদেশ কর্তৃক প্রতিটি শ্রেণীর পাঠ্যপুস্তক প্রণীত হয়েছে এবং সরকার প্রত্যেকটি শ্রেণীর পাঠ্যপুস্তক সম্পূর্ণ বিনামূল্যে বিতরণ করে চলেছে। খ্রিষ্ট ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা’ তৃতীয় থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত বিদ্যালয় থেকে প্রেরিত তথ্যানুযায়ী পাঠ্যপুস্তক প্রিণ্টিং হয়ে থাকলে বিদ্যালয়ে পৌঁছাছে না কেন? একটি ধর্মের প্রতি উদাসীনতা, অবহেলা কিংবা গুরুত্বহীনতা অবশ্যই নীতি নৈতিকতা পরিপন্থী। কোনো কোনো জায়গা থেকে বলা হয়ে থাকে, পাঠ্যপুস্তক অনলাইনে ওয়েবসাইটে রয়েছে, ডাউনলোড করে প্রিণ্টিং করে নিলেই সমস্যা চুকে যায়। হিসেব করে দেখুন, অষ্টম শ্রেণীর ‘খ্রিষ্ট ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা’র পাঠ্যপুস্তকটি কাভার পেজ, প্রসঙ্গ কথা, সূচিপত্র ও সম্পাদনা পরিষদ ইত্যাদিসহ মোট পৃষ্ঠা সংখ্যা হচ্ছে ১০০। একশ’ত পৃষ্ঠার পাঠ্যপুস্তক প্রিণ্টিং করতে প্রতিটি পৃষ্ঠার জন্য ১০ হারে খরচ হলে ১০০ পৃষ্ঠায় ১০০০ টাকা খরচ পড়বে, এটি যদি বই আকারে বাইন্ডিং হয়; তাহলে খরচ আরো বাড়বে। গ্রাম-গঞ্জের খেটে খাওয়া মানুষের পক্ষে এরূপ একটি পাঠ্যপুস্তক প্রিণ্টিং করে নেয়া দুরূহ-ই নয়, অকল্পনীয়। মোদ্দাকথা হচ্ছে, যে পাঠ্যবই সরকার সম্পূর্ণ বিনামূল্যে সরবরাহ করছে, সেটি দেরীতে হলেও কেন শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছাচ্ছে না। অভিযোগ এসেছে, ‘খ্রিষ্ট ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা’ পাঠ্যপুস্তক ও শিক্ষকের অভাবে খ্রিষ্টিয়ান শিক্ষার্থীরা ‘হিন্দু ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা, ইসলাম ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা’ কিংবা বৌদ্ধ ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা’ গ্রহণ করে শিক্ষা জীবন চালিয়ে যাচ্ছে।
চতুর্থ শ্রেণীর পাঠ্যপুস্তকের ‘প্রসঙ্গ কথা’তে বর্ণিত রয়েছে, ‘ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা দিন দিন ব্যাপক হয়ে উঠেছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এর প্রয়োজনীয়তা সবচেয়ে বেশি। কারণ এই বয়সেই একজন মানুষের ধর্মীয় ও নৈতিক ভিত্তি দৃঢ়ভাবে গঠিত হয়। …পাঠ্যপুস্তকটি এমনভাবে প্রণীত হয়েছে যেন ধর্মশিক্ষা শুধু তত্ত্বগত দিকেই সীমিত না থাকে, বরং তা যেন জীবনের সার্বিক দিকগুলোকে অর্থাৎ শিক্ষার্থীদের আবেগীয়, আধ্যাত্মিক, নৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, স্বাস্থ্যগত এবং মোনপেশিজ দিকগুলোকেও প্রভাবিত করে।…ঈশ্বরকে, অতঃপর ঈশ্বরের সৃষ্টি সকল প্রাণী ও প্রকৃতিকে তাদের নিজ নিজ প্রকৃতি অনুযায়ী চিনতে এবং ভালোবাসতে পারে।’ মাননীয় শিক্ষা মন্ত্রীর কাছে বিনীত নিবেদন, ‘খ্রিষ্ট ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা’ গুরুত্বতা বিবেচনাপূর্বক ও সময়োপযোগীভাবে উদ্যোগ গ্রহণ করে খ্রিষ্টানুসারী শিক্ষার্থীদের নিজ নিজ ধর্ম শিক্ষা ও সুনাগরিকের গুণাবলীতে গুণান্বিত হতে ভূমিকার প্রত্যাশা করি।
মিথুশিলাক মুরমু : গবেষক ও লেখক।





Users Today : 67
Views Today : 68
Total views : 177471
