আজ ঠিক করেছি রাত্তিরেই বেরিয়ে পড়বো—আমি, আমার সহকর্মী অরুণবাবু, বুধন, মঙ্গল, কানু, সিধু আর গিরিধারী, স্কুলের এই ক’জন ছাত্র। চৈতি পূর্ণিমা আজ, অপরূপ সাজবে প্রকৃতি। বেশ কয়েক মাস হয়ে গেল স্কুলটাতে জয়েন করেছি। একেবারে নির্জন, নিরিবিলি জায়গায় আমার স্কুল। বাস রাস্তা থেকে অনেকটা দূরে, জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে মাইল খানেক হেঁটে এসে একটা ছোটো টিলার ওপরে আদিবাসী গ্রামের উপান্তে আমার স্কুল।
মাধ্যমিক স্কুল, স্কুলের সাথেই রয়েছে ছেলেদের হোস্টেল।
চারিদিক গাছপালায় ঘেরা। শিক্ষকতার সাথে সাথে হোস্টেলের মেট্রনের দায়িত্বটাও সামলাতে হয় আমাকে। ভারি সুন্দর জায়গাটা। এখানকার বেশিরভাগ ছাত্রই আদিবাসী। দেখতে দেখতে ছ’মাস কেটে গেল এখানে। খুব ভোরে ঘুম ভাঙে আমার। গ্রামের পাশের লালমাটি রাস্তাটা বেয়ে অনেকটা পথ হেঁটে আসি। চারিদিক গাছে ঘেরা ছোট্ট এই আদিবাসী গ্রামটা বড়ো সুন্দর।
আমাদের স্কুল কম্পাউন্ডের চারপাশেও প্রচুর গাছ। গ্রামটা ছাড়িয়ে গেলেই ছোটোখাটো ঝোপের জঙ্গল আর কাছেই পাহাড়। গ্রামে ঢোকার আগে ছোট্ট একটা ঝর্ণা পড়ে। সকালের জোলো হাওয়ায় বেশ শীত শীত লাগে। সকালের রোদ ঝর্ণাটার ওপরে পড়ে খুব ভালো লাগে। গ্রামের ছোটো ছোটো মাটির ঘরগুলোর মধ্যেকার লালমাটি রাস্তাটা ধ’রে হোস্টেলে ফিরি।
স্নান সেরে, রাঁধুনির রাঁধা ভাত, ডাল, পোস্ত আর স্কুল সংলগ্ন পুকুরের চারা পোনার ঝোল ভাত খেয়ে ক্লাসরুমে চলে যাই। নিরুপদ্রব জীবন এখানকার। বিদ্যালয়ের বেশিরভাগ ছাত্রই আদিবাসী।
ওদের সহজ সরল হাসিমাখা মুখগুলো বড়ো ভালো লাগে। অল্প ক’দিনেই ওদের ভালবেসে ফেলেছি। এই নিরিবিলি প্রকৃতির অঙ্গনে শিক্ষার প্রকৃত স্বরূপ যেন ফুটে ওঠে। অফিসরুমের পেছনেই ছোটো ছোটো বুনোঝোপের জঙ্গল আছে। আছে পুটুস ফুল, ঘেঁটু ফুল, কত ছোটো ছোটো গাঁদা ফুলের গাছ। ক্লাসরুমের জানালা থেকে দেখা যায়। এই বসন্তে গাছগুলো থেকে অদ্ভুত সুন্দর গন্ধ ভেসে আসে। বিকেলে ছুটির ঘণ্টা পড়ার সাথে সাথে ছেলেরা দৌড়োয় ফুটবল গ্রাউন্ডে। আমরা কয়েকজন শিক্ষক মাঝেমাঝে যোগ দিই ওদের সাথে।
কিন্তু আজ রাতে আমাদের অন্য প্ল্যান। ভরা পূর্ণিমা আজ। এ সুযোগ হাতছাড়া করা যাবে না। খাওয়া-দাওয়া সেরে রাত আটটার পর, হাতে লাঠি, দা আর মাছ ধরার সরঞ্জাম নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম, দূরের পাহাড়টার গায়ে হ্রদটার উদ্দেশ্যে। বিশাল হ্রদ ওটা। পাহাড়ের কোলে, চারিদিকে নিবিড় বনানী। চাঁদনী রাতে, বন্য প্রকৃতির এই সৌন্দর্য দেখার লোভ সামলাতে পারলাম না। আর বুধন মঙ্গলরা মাছ ধরবে। আমরা ছ-সাতজনের দল স্কুলের টিলাটা থেকে নেমে আসলাম। নীচেই সেই ছোটো ঝরনাটা তিরতির করে বয়ে যাচ্ছে। সাদা মোম গলা আলো পড়েছে তাতে। মাঠের আলপথ দিয়ে চলেছি আমরা সাতজন। রাত বেশি হয়নি, তবু চারিদিক নিস্তব্ধ। উন্মুক্ত প্রকৃতি যেন মোহিনী মায়া বিস্তার করেছে। বেশ কিছুটা আলপথ দিয়ে এসে একটা শুকনো ডাঙ্গা মতো জায়গায় পড়লাম। তারপরেই পড়ল ছোটো জঙ্গলটা। দিনের আলোর মতো পরিষ্কার চারিদিক। লাঠি আর দা নিয়ে সন্তর্পণে এগোচ্ছি। হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়লাম আমরা। একটা ছোটো জন্তু—শেয়াল টাইপের, ঝোপের এপাশ থেকে ওপাশে ছুটে গেল। থমকে দাঁড়ালাম আমরা।
চাঁদের আলো যেন গলে পড়ছে। রহস্যময় এক অনুভূতি জাগছে মনে। রাত দশটা হবে, মনে হচ্ছে নিশুতি রাত। ছোটো জঙ্গলটা পার হয়েই পাহাড়টা পড়ল, পাহাড়ের নীচে বিশাল হ্রদ বা জলাশয়। হ্রদটার উল্টো পাড়ে বড়ো বড়ো অনেক গাছ। গাছের ছায়া পড়েছে হ্রদটার জলে। হাওয়ায় কেঁপে উঠছে মাঝেমাঝে। আমরা একটু পরিষ্কার জায়গা দেখে বসলাম জলের ধারে। মাছ ধরার সরঞ্জাম আছে সাথে। মাছ ধরার চেয়েও এই চাঁদনী রাতে পাহাড় জঙ্গলের রূপ দেখার আকর্ষণ আমার কাছে অনেক বেশি। আশেপাশে কার্বলিক অ্যাসিড ছড়িয়ে দেয়া হলো। মঙ্গল আর গিরিধারী ছোটো, নীচুমতো একটা মাচা তৈরি করল। তাতেই উঠে বসলাম আমরা। টাঙ্গি আছে সাথে। যদিও এই ছোটো জঙ্গলে বাঘের ভয় নেই, ছোটোখাটো লেপার্ড জাতীয় জন্তু থাকতে পারে। হ্রদের জলটা তিরতির করে কাঁপছে। উল্টোদিকের জঙ্গল থেকে নানা ফুলের মিশ্রিত গন্ধ ভেসে আসছে নাকে। আমরা গুছিয়ে মাছ ধরতে বসলাম। রাত যত বাড়তে লাগল, জোলো হাওয়ায় ঠান্ডাও তত বাড়তে লাগলো। তিনটে বড়ো বড়ো মাছ ধরা পড়েছে। মোট সাতজন আছি আমরা। ফ্লাস্ক থেকে চা ঢেলে খেলাম, সাথে বিস্কুট। উল্টোপাড়ের জঙ্গল থেকে কত রকমের জন্তুর মিশ্রিত আওয়াজ ভেসে আসছে। ভয় ভয় লাগছে একটু।
সাথে বন্ধুক নেই, টাঙ্গি, দা আর লাঠিই ভরসা। দূরের গাছগুলোর মাথায় মাথায় চাঁদের আলো পড়ে পড়ে চকচক করছে। কোনো কোনো জায়গায় ঘন ঝোপের জন্য আলো আঁধারির মায়াজাল সৃষ্টি করেছে। রাত একটা বাজে। গভীর রাতে পাহাড় জঙ্গলের এই সৌন্দর্য, আমরা না এলে হয়ত অধরাই থেকে যেত। রাত তখন গভীর, হঠাৎ আমার সহ শিক্ষক অরুণ বাবু বলে উঠলেন—দূরে তাকিয়ে দেখুন, জলের অপর পারে, কয়েকটি হরিণ—বাঁকা শিং নিয়ে তালে তালে নাচ করছে। ধবধবে চাঁদের আলোয় উন্মুক্ত আকাশের নীচে একদল হরিণ নেচে চলেছে, এই স্বর্গীয় দৃশ্য দেখার সুযোগ আর কোনোদিন পাবো কিনা কে জানে!
: প্রাণভরে এ দৃশ্য দেখে নিলাম। হঠাৎ দূরে একটা জন্তুর আওয়াজে হরিণগুলো ছত্রভঙ্গ হয়ে পালালো। এভাবে বহুক্ষণ ছিপ নিয়ে আমরা বসে রইলাম। এই হ্রদটার চারপাশে ছোটো ছোটো পাহাড় আর একদিকে জঙ্গল। জলের মাঝখানে প্রচুর শালুক ফুটে আছে। বুধন হঠাৎ বলে উঠল, লাল শালুক! কী আশ্চর্য, আমিও যেন শালুকের গাঢ় লাল রং দেখতে পেলাম। নিশুতি রাত, চাঁদটা জলাশয়ের মাথার ওপরে উঠে এসেছে। অপার্থিব আলো। উঁচু একটা বনস্পতির মাথায় একটা রাতজাগা পাখি মাঝেমাঝে ডেকে উঠছে। ঘুম পাচ্ছে একটু একটু।
অনেকগুলো মাছ ধরা পড়েছে। রাত দুটো হবে। ফ্লাস্ক থেকে চা ঢেলে খেলাম সবাই। একটা অদ্ভুত টাইপের জন্তু ‘বাক বাক’ শব্দে ডাকছে মাঝে মাঝে। এই জনহীন জঙ্গলের মাঝে ক’টি প্রাণী আমরা। ভয় ভয় লাগছে। হঠাৎ মঙ্গল বলে উঠলো, এখানে আর থাকাটা ঠিক হবে না, দূরে তাকিয়ে দেখুন।
আমাদের সবার চোখ গেল হ্রদের উল্টো পাড়ে। সার সার গাছ ডালপালা নিয়ে জলের ওপর ঝুঁকে আছে। সেই ডালপালাগুলো ওপর নীচে আন্দোলিত হচ্ছে, ঠিক যেন আমাদের হাত বাড়িয়ে ডাকছে। অথচ, আমরা যে দিকটায় দাঁড়িয়ে আছি, সেদিকে হাওয়া নেই, গাছগুলো স্থির। মঙ্গল, বুধন আর গিরিধারী সাংঘাতিক ভয় পেয়ে গেছে—‘‘শিগগিরই চলুন এখান থেকে, ওগুলো জীনপরী, গাছের রূপ ধরে ডাকছে। চাঁদনী রাতে ওরা জেগে ওঠে। পরে ওরা সুন্দরী নারীর রূপ নেয়, এই অবস্থায় দেখে ফেললে, বদ্ধ উন্মাদ হয়ে যায় সে।
তার আগে আমরা পালাবো এখান থেকে। কোনরকমে মাছ ধরার সরঞ্জাম তুলে নিয়ে আমরা উঠে পড়লাম। একটা রাতজাগা পাখি কর্কশ স্বরে ডেকে উঠল, যেন অশুভ সংকেতে। আমরা দ্রুতপায়ে পাহাড়ের পেছন দিকটা দিয়ে আলপথ বেয়ে হাঁটতে লাগলাম। ছেলেগুলোর মুখে কোনো কথা নেই। অরুণবাবুর মতো সাহসী লোকও চুপ করে গেছে একেবারে। আমরা হ্রদটার পাড় বরাবর ছোটো ঝোপের জঙ্গলটা খুব দ্রুত পার হয়ে এলাম। মোহিনী চাঁদ যেন হাসছে আমাদের দেখে। আল পথ বেয়ে দ্রুত হাঁটতে লাগলাম আমরা। চাঁদ পশ্চিমাকাশে ঢলে পড়েছে। রাত প্রায় তিনটে বাজে। ঠান্ডা ঠান্ডা হাওয়া বইছে। ছোটো জঙ্গলটা পার হয়ে আমরা ছোটো ঝরনাটায় পড়লাম। এতক্ষণে সিধু মুখ খুলল—খুব জোর বেঁচে গেছি স্যার। ও জায়গাটার বদনাম আছে। অনেকেই বেঘোরে মারা পড়েছে ওখানে। গাছের ডালপালাগুলো হাত নেড়ে যেন ডাকে, জলে ডুবে অনেকেই মারা গেছে ওখানে, যারা ফিরে এসেছে তারা বদ্ধ উন্মাদ হয়ে গেছে। যাইহোক স্কুলের চত্ত্বরে যখন ঢুকলাম তখন ভোর হয়ে গেছে। কয়েক ঘণ্টা ঘুমিয়ে নিলাম আমরা। পরের দিন রবিবার, ছুটির দিন, তবু সকলেই জেনে গেল আমাদের নৈশ অভিযানের কথা। সকলেই বলতে লাগলো খুব জোর বেঁচে গেছি আমরা। চাঁদনী রাতে আরো বহুবার আমরা নৈশ অভিযানে গেছি আমরা, কিন্তু হ্রদের ঐ দিকটায় আর কখনও যাইনি।
বহু বছর হয়ে গেছে, ঐ স্কুল ছেড়ে চলে এসেছি, কিন্তু আজও আমার যুক্তিবাদী মন ঐ ঘটনাটার বাখ্যা খুঁজে পায়নি।





Users Today : 67
Views Today : 68
Total views : 177471
