ধর্ম মানেই ধারণ করা। আমরা আসলে কি ধারণ করছি, কাকে ধারণ করছি, কাকে লালন করছি, সেটাই আমার ধর্ম। কারো না কারো আদর্শ আমরা আমাদের জীবনে ধারণ করেই সামনের দিকে এগিয়ে যাই। হতে পারে প্রকৃতি, মনিষী, নবী, স্বর্গদূত, ঈশ্বরের প্রেরিত বা অন্য কিছু। তবে যাকেই ধারণ করি না কেন, তার প্রত্যাহিক জীবন, তার সামাজিক জীবন, তার কর্ম, তার গ্রহণযোগ্যতা, তার জ্ঞান, তার উপাসনা সংক্রান্ত বিধি ব্যবস্থা, এই সকল বিষয়েই জেনে শুনে বুঝে তারপরে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ‘‘কোথায় স্বর্গ কোথায় নরক, কে বলে তাহা বহুদূর, মানুষের মাঝেই স্বর্গ নরক, মানুষেতেই সুরাসুর’’। মানুষের মধ্যে থেকে যখন দেবতুল্য গুণ বের হতে থাকে, তখন সেটা সুর। আর অন্যগুলো অসুর। আবার লালন ফকির বলেছেন যে, ‘‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’’।

আসলে ধর্ম শুধুমাত্র বাহ্যিক কোনো নীতি বা নির্দেশ সমষ্টির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত নয় বলে আমার মনে হয়। এটা পরিবার সমাজ থেকে একটা সুশিক্ষা, যেটা প্রতিদিনের অনুশীলনে নিজেকে সোনার মতো খাঁটি হতে সাহায্য করে। একটা সুন্দর জীবন পথের নির্দেশ করে। আমরা যে যে ভাবেই বলি না কেন, বিজ্ঞানের আবিষ্কার তো সেদিনের কথা। বিজ্ঞানের জ্ঞান মানুষকে দৃশ্যমান অন্ধকার থেকে আলোর পথে আনলেও, অন্তরের অন্ধকার দূর করতে পারেনি। বরং তা ক্রমান্বয়েই বেড়েছে। আজ আইন দিয়ে অনেক কিছুই বেঁধে ফেলা হয়েছে। আগেও হয়েছিল, যখন মানুষের উপরে দশ আজ্ঞা এসেছিল। পৃথিবীতে সকল আইন কানুন, চলার ধরন, উপাসনা বা আরাধনা, কিছুই এক রকম নয়। এক হতো যদি দশ আজ্ঞার উপরেই সবাই পরিপূর্ণ পালনে সক্রিয় থাকতে পারতাম। আজ বিশ্বাসের পরিবর্তন হতে হতে আমরা আমাদের নিজেদের মতো করে বিশ্বাসকে বাঁচিয়ে রাখতে চেষ্টা করেছি মাত্র। প্রভু যীশু এই সকল নিয়মকে আরো সহজ করে দিলেন যেন মানুষ অনেক আইনের প্যাঁচে পড়ে সত্যিই অদৃশ্য ঈশ্বরকে ভুলে না যায়। তিনি বললেন, তুমি তোমার সমস্ত অন্তঃকরণ, তোমার সমস্ত প্রাণ, তোমার সমস্ত শক্তি ও তোমার সমস্ত চিত্ত দিয়ে তোমর ঈশ্বর প্রভুকে প্রেম করিবে। এটা তো চাপিয়ে দেওয়া বিশ্বাস নয়। এখানে এটাই করতে হবে, সেটাও বলা হয়নি। এখানে নির্দিষ্ট করে কাউকে দেখিয়ে দেননি যে, নির্দিষ্ট কারো প্রতি আমাকে আস্থা আনতেই হবে। আর তার পরেই তিনি বলেছেন যে, তোমার প্রতিবেশীকে আপনার মতো প্রেম করিবে।। তার মানে এটাই কি মনে হয় না যে, ঈশ্বর সব সময় আমার পাশেই আমার প্রতিবেশীর মতো হয়ে রয়েছে। ধর্মের নিগূঢ় তত্ত্ব তো প্রতিবেশীর সাথে নিজের সম্পর্কের মধ্যে বিরাজিত অথচ আজ আমরা স্বর্গের আশায় দেশ-দেশান্তরে ছুটে বেড়াই। নিয়মের মধ্যে নিজেকে রেখে নিজেকে একজন প্রকৃত ধার্মিক বলে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করতে চাই। না চিনি আমার প্রকৃত ঈশ্বর, না চিনি আমার প্রতিবেশী।
ধর্মের মূল উদ্দেশ্য হলো—সত্যে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা। পুরাতন ইতিহাস থেকে দেখা যায় যে, সত্যকে দুটি দৃষ্টিকোণ থেকে ধারণা করা হয়। সত্য হলো সগুণ, যেটা নিজেই নিজের গুণে সমৃদ্ধ হয়। যে গুণ সৃষ্টি বা ধ্বংস করা যায় না। আর অন্যটা হলো নিগুণ, যেটার প্রক্রিয়ায় সগুণকে লাভ করার প্রচেষ্টায় মানুষ বিভিন্ন পথে এগিয়ে যায়। আমাদের জীবনের প্রতিটা সময়ে ভালো চিন্তা থাকতে হবে। এই ভালো চিন্তা অগ্রসর হতে হতে অদৃশ্য সত্য জ্ঞান যখন নিজেকে আলোকিত করে, তখন তার মধ্যে দেখা যায় অদৃশ্য ঈশ্বরের অনেক গুণাবলী। যেগুলো বৈজ্ঞানিক যুগের আগে মানুষের মুখে মুখে, পাথরে, পাতায়, মাটিতে, চিহ্ন আকারে রেখে দিতেন। বিজ্ঞান ক্রমান্বয়ে সেগুলো সংগ্রহ করে মানব কল্যাণের জন্য আদর্শ বিষয়গুলো আজ সময়ের পরিক্রমায় আমাদের কাছে ধর্মগ্রন্থ হিসেবে সামনে রয়েছে। তবে মানব জীবনে একটাই অপূর্ণতা থেকে যায়, সেটা হলো অজ্ঞান বা আগন্তক। এই অজ্ঞানকে দূরীভূত করতে পারলেই প্রকৃতভাবে ধার্মিক হওয়া সম্ভব। আমাদের এই অনন্ত জীবনের আত্মস্বরূপের উপলব্ধির পথে যেখানে জীবাত্মা ও পরমাত্মার মিলন, সেই বৈচিত্র্যবাদী দর্শনের সাথে ব্যবহারিক জীবনের চিত্তকে মুক্তির পথে অগ্রসর করাই হলো প্রকৃত ধার্মিকের কাজ। তাই তো আমাদের উচিত বাহ্যিক সকল অপূর্ণতাকে মুছে ফেলে, নিজের অন্তরে সেই দেবত্বকে প্রতিষ্ঠা করা, যাকে আমি প্রকৃতই ধারণ করছি। আজ কর্ম দিয়ে ধর্মকে বিভেদ করা হয়েছে। আর এটা না বুঝলে আমি এখনো আঁধারেই রয়ে গেছি। চিত্ত শুদ্ধি ছাড়া ঈশ্বর দর্শন হয় না। ঐ যে বলি না যে, দয়া ও মায়া। দয়াতে হয় চিত্ত শুদ্ধ। আর মায়াতে করে অজ্ঞান। যেটা প্রভু যীশুখ্রীষ্ট ক্রুশের উপরে মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে থেকে অমর তৃতীয় বাণীতে তার মা মরিয়মকে বলেছিলেন, হে নারী, ঐ দেখ তোমার পুত্র। আর যোহনকে বলেছিলেন, ঐ দেখ তোমার মাতা। তিনি যেমন প্রতিবেশীকে নিজের মতো করে ভালোবাসতে শিক্ষা দিয়ে গেলেন, তেমনই পৃথিবীর মায়ার বন্ধন যে প্রত্যেকেই প্রত্যেকের সম্পূরক, সেটাও বুঝিয়ে দিয়ে গেলেন। তিনি ক্রুশের উপর থেকে ক্ষমার বাণী,পরিত্রাণের বাণী, মমতার বাণী, যন্ত্রণার বাণী, দুঃখভোগের বাণী, বিজয়ের বাণী ও সন্তুষ্টির বাণী আমাদের জন্য রেখে গেলেন। তিনি মৃত্যুর পরাজয় সুনিশ্চিত করে, তিন দিন পরে কবর থেকে উঠলেন। সকলের সাথে চল্লিশ দিন থাকলেন। তার পরে সবার সামনে আকাশে উঠে গেলেন। ভাববাদী গ্রন্থে দেখা যায় যে, তিনি আমাদের নিতে আসবেন। আমরা কি প্রস্তুত। আমরা কি তার সাথে যাওয়ার জন্য নিজের মধ্যে তাকে ধারণ করতে পেরেছি।





Users Today : 97
Views Today : 105
Total views : 179850
