বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে চলমান আন্দোলনের মধ্যেই আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কর্মপরিকল্পনা প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন। রোডম্যাপ অনুযায়ী ২০২৩ সালের নভেম্বরে জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হবে এবং ডিসেম্বরের শেষে কিংবা জানুয়ারির শুরুতে ভোট-গ্রহণ হবে।
তবে এই কর্মপরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করেছে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো। তারা বর্তমান নির্বাচন কমিশনের ওপরেই কোন আস্থা রাখতে পারছেন না। শুধুমাত্র তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনে যেতে অনড় অবস্থানে আছেন তারা।
এই অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে একাধিক নির্বাচন কমিশনার, বিরোধী দল, সরকারি দলের নেতৃবৃন্দ ও সুধী সমাজের প্রতিনিধিদের মতামাতের ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে এবারের সংখ্যার প্রচ্ছদ প্রতিবেদন। আলোকপাত করা হয়েছে নির্বাচন কমিশনের সংসদ নির্বাচনের ‘রোডম্যাপ’ সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের কতটা সহায় হতে পারে কিংবা অবাধ-নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য বর্তমান নির্বাচন কমিশনের আন্তরিক ইচ্ছে-সক্ষমতা কতটা—এইসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে বিশ্লেষণ।
সংসদ নির্বাচনের ‘রোডম্যাপ’ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য
মো. আহসান হাবিব খান, নির্বাচন কমিশনার
আমরা অনেক প্রশ্নের সম্মুখীন। আমরা অনেক আস্থাশীলতার ঘাটতির মধ্যে আছি। আমি মনে করি, আমাদের কর্মকা- দিয়ে প্রমাণ দিয়েছি, আমরা কিছুটা হলেও আগে থেকে আস্থা অর্জনে এগিয়ে গিয়েছি।
ইসি শুরু থেকেই অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের কথা বলে আসছে। কিন্তু অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি বলছে, ইসির প্রতি তাদের আস্থা নেই।
মো. আলমগীর, নির্বাচন কমিশনার
নির্বাচনের আরও এক বছর চার মাস বাকি। আমরা যে কর্মপরিকল্পনা তৈরি করেছি, তা বাস্তবায়ন করতে পারলে অনাস্থা কেটে যাবে। রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে অনেক সময় অনেক দল নির্বাচনে অংশ নেয় না। কোনো দল না এলে কমিশন কী করতে পারে?
নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ছাড়া কারও পক্ষেই সুষ্ঠু নির্বাচন করা সম্ভব না
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বিএনপি মহাসচিব।
এই নির্বাচন কমিশন কমিশন যেহেতু ক্ষমতাসীন সরকার নিয়োগ দিয়েছে, তাদের পছন্দ মতো লোকজন বসিয়েছে। তাই যতই রোডম্যাপ দিক, বর্তমানের সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়া সম্ভব না। প্রায় সব রাজনৈতিক দলগুলো ইভিএম বাদ দিতে বলেছে। কিন্তু তারা বলল ইভিএমে ভোট নেবে। তাদের কোনো কথা বা কাজে অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচনের আভাস নেই। তাই এই রোডম্যাপ নিয়ে আমাদের আগ্রহও নেই। নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ছাড়া কারও পক্ষেই সুষ্ঠু নির্বাচন করা সম্ভব না।
এখন থেকেই বিরোধী দলের ওপর যেভাবে দমন-পীড়ন হচ্ছে, তাতে তারা নির্বাচনেই যেতে পারবে না
বদিউল আলম মজুমদার
সম্পাদক, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)।
ইসি কীভাবে আস্থার সংকট কাটাবে, তার জন্য একটি রোডম্যাপ (পথনকশা) দরকার। তারা জনমত উপেক্ষা করে বলছে, ইভিএমে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব। তাদের উচিত এখনই ইভিএম পরিহার করা। নির্বাচনকালীন সরকার কেমন হবে, তার ওপর নির্ভর করে পুলিশ প্রশাসনের ভূমিকা কেমন হবে। দলীয় সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি। এখন থেকেই বিরোধী দলের ওপর যেভাবে দমন-পীড়ন হচ্ছে, তাতে তারা নির্বাচনেই যেতে পারবে না। মৌলিক সমস্যা সমাধান না করে ইসি যে কর্মপরিকল্পনা প্রকাশ করেছে, তা একটি ব্যর্থ নির্বাচনের দিকে নিয়ে যাবে দেশকে।
সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত না হলে নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে না
জিএম কাদের, চেয়ারম্যান, জাতীয় পার্টি।
নির্বাচন কমিশন ক্ষমতাসীনদের ভাষায় কথা বলছে। দায় এড়াতেই নির্বাচন কমিশন আগাম অনেক কথা বলছে। নির্বাচন কমিশনের সদস্যরা বলছেন, নির্বাচনে সকল দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা তাদের কাজ নয়। তাদের বোঝা উচিত, সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত না হলে নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে না। বেশির ভাগ রাজনৈতিক দলের মতামত উপেক্ষা করে, নির্বাচন কমিশন হঠাৎ করেই ইভিএমে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নির্বাচন কমিশন বলেছে, সকল দল চাইলে ব্যালটে নির্বাচন হবে। আসলে নির্বাচন কমিশনের বলা উচিত ছিল, সবাই চাইলে ইভিএমে নির্বাচন করা হবে। কারণ, ব্যালট পেপারে নির্বাচন বিদ্যমান এবং সবার কাছে গ্রহণযোগ্য। দেশের মানুষ ব্যালটেই ভোট দিতে চায়। তাছাড়া উন্নত বিশ্বসহ প্রতিবেশী অনেক দেশ এখন ইভিএম বর্জন করছে।
নির্বাচন কমিশনের উচিত একটি স্বচ্ছ নির্বাচন আয়োজনের চেষ্টা করা। সুষ্ঠু নির্বাচন করতে সক্ষম হবেন না বুঝতে পারলে আগেভাগেই নির্বাচন কমিশন দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াতে পারেন। কারণ, নির্বাচন সুষ্ঠু না হলে আগামী প্রজন্ম কাউকেই ক্ষমা করবে না।
ব্যর্থ নির্বাচনের ইঙ্গিত?
দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত করার কারণে ২০১৪ সালের সাধারণ নির্বাচন বয়কট করেছিল বিএনপিসহ অধিকাংশ দল। আবার ২০১৮ সালের নির্বাচনে রাতের আধারে ভোট-চুরির অভিযোগ ওঠে। চট্টগ্রামের একটি কেন্দ্রে ভোট শুরুর আগেই ব্যালট ভর্তি বাক্সের ছবি গণমাধ্যমের ক্যামেরায় ধরা পড়েছিল। এসব কারণে ২০১৪ সালের পর সাধারণ নির্বাচন থেকে শুরু করে সব স্থানীয় নির্বাচনগুলোয় ভোটারদের অংশগ্রহণ লক্ষ্যজনকভাবে কমে যায়। বিদেশি মহলেও নির্বাচনের স্বচ্ছতা এবং নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা প্রশ্নের মুখে পড়ে।
নির্বাচন কমিশনের নতুন এই রোডম্যাপ আরেকটি ব্যর্থ নির্বাচনেরই ইঙ্গিত মাত্র
মাহমুদুর রহমান মান্না, আহ্বায়ক, নাগরিক ঐক্য।
বিগত নির্বাচনগুলোয় অস্বচ্ছতা, ভোট-চুরি ও জালিয়াতি পর নির্বাচন কমিশনের নতুন এই রোডম্যাপ আরেকটি ব্যর্থ নির্বাচনেরই ইঙ্গিত মাত্র। আগের সব নির্বাচনে সরকারের নির্দেশে ভোট ডাকাতি হয়েছে। ওই নির্বাচন কমিশনও ভালো ভালো কথা বলেছিল কিন্তু কিছুই করতে পারেনি। নির্বাচন কমিশন কখনই নিজেদের নিরপেক্ষ প্রমাণ করতে পারেনি। সমস্যা সরকারের মধ্যে। এই সরকারের অধীনে নির্বাচনে যেতে আমাদের আপত্তি। কারণ সেটা সুষ্ঠু হবে না।
সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন
নির্বাচন কমিশন বারবার বলছে তাদের কাজ নির্বাচন আয়োজন করা। কোন দল নির্বাচনে যোগ দেবে কি দেবে না কিংবা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা হবে কী হবে না, এগুলো তাদের দেখার বিষয় নয়।
সংবিধান অনুযায়ী গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হওয়ার সুযোগ নেই
ড. আব্দুর রাজ্জাক, আওয়ামী লীগ নেতা।
সংবিধান অনুযায়ী গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হওয়ার সুযোগ নেই। আস্থার জায়গাটা নিয়ে তো সমস্যা আছেই। নির্বাচন কমিশন চেষ্টা করবে তাদের আস্থা ফিরিয়ে নির্বাচনে ফেরানোর জন্য। তবে যত আলোচনাই হোক, সংবিধান অনুযায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে বাংলাদেশে আর নির্বাচন হবে না। তবে নির্বাচন কমিশনকে সর্বোচ্চ ক্ষমতা দেয়া হবে।
নির্বাচনী ‘রোডম্যাপ’ আদৌ ভোটারদের আস্থা ফেরাবে?
অনেক রাজনীতি বিশ্লেষক ও নির্বাচন পর্যবেক্ষক মনে করেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় থাকলে নির্বাচন কমিশন স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে। তাহলে কি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বাইরে বাংলাদেশে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব না?
নির্বাচন কমিশন যে রোডম্যাপ দিয়েছে সেটা অসম্পূর্ণ
দিলারা চৌধুরী, রাজনীতি বিশ্লেষক।
দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন কমিশনকে যতই ক্ষমতা দেয়া হোক না কেন, তার অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। প্রশাসন নিরপেক্ষ না থাকলে কখনোই সুষ্ঠু ভোট হতে পারে না। যখন আমাদের সবকিছুতেই রাজনীতির ছত্রচ্ছায়া থাকে। পুলিশ থেকে শুরু করে রিটার্নিং অফিসার। সেখানে কীভাবে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হয়, আমার বোধগম্য নয়। এছাড়া নির্বাচন কমিশন যে রোডম্যাপ দিয়েছে সেটা অসম্পূর্ণ। এই কর্মপরিকল্পনা রাজনৈতিক দল ও ভোটারদের আস্থা ফেরাতে পারেনি। কমিশনের কর্মপরিকল্পনায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সুনির্দিষ্টভাবে তুলে ধরা হয়নি। বিশেষ করে নির্বাচনের আগে ভোটারদের আস্থা অর্জনে এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে নির্বাচনে ফেরাতে কমিশনের করণীয় কী হবে, সে বিষয়ে কিছু বলা হয়নি।
তাছাড়া, ইভিএমে কীভাবে আস্থা ফেরাবে, পুলিশ-প্রশাসন আর কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষতা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, তফসিল ঘোষণার পর দলীয় নেতাকর্মী এবং এজেন্টদের হয়রানি বন্ধ করা হবে কিনা, এই বিষয়গুলো কর্মপরিকল্পনায় সুনির্দিষ্টভাবে তুলে ধরা হয়নি।
‘রোডম্যাপে নতুন কিছু নেই’
নির্বাচন পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, কমিশনের কর্মপরিকল্পনায় গলদ রয়েছে, কারণ তাদের রোড ম্যাপে সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য নতুন বা মৌলিক কোনো বিষয় যুক্ত করা হয়নি ।
যেখানে চেষ্টা করলে ব্যালটেই সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব, সেখানে এত টাকা দিয়ে কেন ইভিএম আনতে হবে?
মুনিরা খান, নির্বাচন পর্যবেক্ষক।
এবারের নির্বাচন কমিশন শুধুমাত্র ইভিএম এ ভোট-গ্রহণের ওপরেই জোর দিয়েছে যা নিয়ে আগে থেকেই বিতর্ক রয়েছে। সেক্ষেত্রে স্বচ্ছতার অন্য দিকগুলো অনেকটাই উপেক্ষিত। নির্বাচন কমিশন যেসব কর্মপরিকল্পনার কথা বলেছে, সব তো রুটিন কাজ। নতুন কোনো চ্যালেঞ্জের কথা তারা বলেনি যে আগে এমনটা হয়নি, এবার হবে, এতে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে। তাহলে তাদের প্রতি হয়ত আস্থা কিছুটা ফিরত।
‘নির্বাচন কমিশন মনে করে ইভিএম বসালেই নির্বাচন সুষ্ঠু হয়ে যাবে। অথচ এই ইভিএম এর প্রতি মানুষের আস্থা আগে থেকেই নেই। যেখানে চেষ্টা করলে ব্যালটেই সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব, সেখানে এত টাকা দিয়ে কেন ইভিএম আনতে হবে?
বিশেষজ্ঞ ও রাজনীতিবিদদের আশা নির্বাচনের আরও প্রায় দেড় বছর বাকি। এরমধ্যে নির্বাচন কমিশন কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারলে অনাস্থা কাটার সম্ভাবনা আছে।
যদিও পর পর দুটো সাধারণ নির্বাচন এবং স্থানীয় নির্বাচনগুলোর স্বচ্ছতা প্রশ্নবিদ্ধ, এমন বাস্তবতায় নির্বাচনের কমিশনের এই রোডম্যাপের আদৌ কোনো গ্রহণযোগ্যতা থাকবে কিনা, তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠার অনিবার্য সম্ভাবনা রয়েছে। নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইসি কীভাবে আস্থার সংকট কাটাবে, ইভিএমে আস্থা আনবে, পুলিশ-প্রশাসনকে নিয়ন্ত্রণে রাখবে, নির্বাচনের সময় হয়রানিমূলক মামলা বন্ধ করবে, এজেন্টদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবেÑইসির কর্মপরিকল্পনায় এসব প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট কোনো উত্তর নেই। ইসির কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী, বড়ো প্রতিবন্ধকতাগুলো উত্তরণে অনেক ক্ষেত্রে সরকারের দিকেই তাদের তাকিয়ে থাকতে হবে। সাধারণ জনগণ ও রাজনীতি সংশ্লিষ্টরা আশা করছে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সরকার এইসব প্রতিবন্ধকতা অপসারণে আন্তরিক হবে ও কার্যকরী পদক্ষেপ নিবে।
নাজিম উদদীন, বিশেষ প্রতিবেদক।
[প্রতিবেদনটি সাপ্তাহিক সময়ের বিবর্তনের বর্ষ ৬ সংখ্যা ২৯, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২২ প্রিন্ট ভার্সনে প্রকাশিত]





Users Today : 40
Views Today : 46
Total views : 186212
