সারা বিশ্বের আদিবাসীদের সাথে তাল মিলিয়ে বরেন্দ্রভূমির আদিবাসীরা ৯ আগস্ট আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উদযাপন করে থাকে। সরকারিভাবে স্বীকৃতিহীন দিবসে উত্তরবঙ্গের সাঁওতাল, উরাঁও, মাহালি, মুণ্ডা, কোল, কোডা, মালপাহাড়ি জাতিগোষ্ঠীর তরুণ-তরুণীরা ঢাক-ঢোল, মাদল-করতাল, বাঁশিসমেত এবং ঐতিহ্যবাহী রঙিন সাজে সজ্জ্বিত হয়ে অনুষ্ঠানমঞ্চকে মুখরিত করে তোলে। ইতিপূর্বে রাজপথে অত্যন্ত শৃঙ্খলাবদ্ধভাবে ফেস্টুন, ব্যানার, লিপলেট নিয়ে কোনো নির্দিষ্ট এলাকা প্রদক্ষিণ করে থাকে। স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের দৈনিকগুলোতে আদিবাসীদের সচিত্র প্রতিবেদনগুলোতে যে অমোঘ সত্য বারবার সামনে আসে; এই উৎসবের সাময়িক আনন্দ উৎসবের আড়ালে ঢাকা পড়ে আছে এক শতাব্দীর দীর্ঘশ্বাস, বঞ্চনা আর অধিকারবিহীনতার করুণ দুঃখগাঁথা। স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে গেলেও দেশের এই প্রাচীন বাসিন্দারা আজও তাদের আদিবাসী পরিচয়ের আইনি ও সাংবিধানিক স্বীকৃতি পায়নি। ২০১১ সালে সংবিধানে তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’র মতো কিছু প্রশাসনিক শব্দ। পরিচয়হীনতার এই মনস্তাত্ত্বিক আঘাতের চেয়েও বর্তমানে সমতলের আদিবাসীদের জন্য সবচেয়ে বড়ো সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে তাদের চিরায়ত ভূমিহীনতা এবং বরেন্দ্র অঞ্চলের চরম পরিবেশগত বিপর্যয়।
ঐতিহাসিকভাবে বরেন্দ্র অঞ্চলের জঙ্গল কেটে, পাথুরে মাটিকে নিজের গায়ের রক্ত পানি করে যারা ফসলি জমিতে রূপান্তরিত করেছিল, তারা এই আদিবাসীরাই। অথচ আজ দুঃখজনক বাস্তবতা হলো—সরলমনা এই জাতিগোষ্ঠীর হাজার হাজার একর পৈত্রিক জমি জাল-জালিয়াতি, ভূয়া দলিল, জোরপূর্বক উচ্ছেদ এবং স্থানীয় প্রভাবশালী ভূমিদস্যুদের রাজনৈতিক আশ্রয়ে বেদখল হয়ে যাচ্ছে। ফসল কাটার মৌসুমে নিজের বাপ দাদার জমিতেই তারা আজ দিনমজুর। ২০১৬ সালে গাইবান্ধার বাগদা ফার্মে সাঁওতালদের হত্যা, বর্বরোচিত হামলা, ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা দেশের মানুষ আজো ভুলেনি। পাহাড়ে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য একটি কমিশন থাকলেও উত্তরবঙ্গসহ সমতলের আদিবাসীদের জন্য কোনো বিশেষ আইনি কাঠামো বা পৃথক ভূমি কমিশন আজও গড়ে ওঠেনি। ফলশ্রুতিতে বছরান্তে আদিবাসী দিবসের প্রধান দাবি থাকে একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী সমতল ভূমি কমিশন গঠন করা।
বর্তমানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার নানামুখী সংস্কার এবং বৈষম্য দূরীকরণের আলোচনা চলছে কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো—দেশের বিভিন্ন সংস্কার কমিশনের পরিকল্পনা বা নীতি নির্ধারণী প্রক্রিয়ায় আদিবাসী জনগণের সরাসরি কোনো প্রতিনিধিত্ব রাখা হয়নি। এই প্রান্তিক ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে বাইরে রেখে কীভাবে একটি বৈষম্যহীন এবং অন্তর্ভূক্তিমূলক বাংলাদেশ বিনির্মাণ সম্ভব? চাকরি ও উচ্চশিক্ষায় আদিবাসীদের সুরক্ষাকবচ বা কোটা প্রথার কার্যকর বাস্তবায়নও আজ সুদুর পরাহত।
আদিবাসী দিবসের মাদলের সুর আসলে কোনো উৎসবের আনন্দধ্বনি নয়, এটি মূলত এক শতাব্দী ধরে জমে থাকা কান্নার প্রতিধ্বনি। রাষ্ট্রকে তার দীর্ঘদিনের বধিরতা ও উদাসীনতা পরিহার করে এই আদিবাসীদের অধিকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে হবে। বরেন্দ্রভূমির মাটি ও মানুষের এই কান্না যদি রাষ্ট্র শুনতে না পায়, তবে বৈষম্যহীন বাংলাদেশের স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে।





Users Today : 31
Views Today : 51
Total views : 184650
