চাল, ডাল, আটা, মাছ, ডিম, তেলের মতো নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম লাগামহীন বৃদ্ধিতে মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত ও দরিদ্র মানুষ এমনিতেই নাভিশ্বাস উঠা অবস্থায় রয়েছে প্রাত্যহিক জীবনযাপনের ব্যয় মেটাতে। এরমধ্যেই সম্প্রতি দেশে অতি প্রয়োজনীয় ওষুধের দাম ক্ষেত্র বিশেষে শতকরা প্রায় ১০০ ভাগেরও বেশি বেড়েছে। মানুষের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য তালিকাভুক্ত ১১৭টি ওষুধের দাম বাড়ানোর ক্ষমতা রয়েছে সরকারের হাতে। ওষুধের এই মূল্যবৃদ্ধির আগে অন্তত বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের মাধ্যমে মানুষকে জানানোর নিয়ম। কিন্তু সেসবের তোয়াক্কা না করে শুধুমাত্র কোম্পানিগুলোর সুপারিশের ভিত্তিতে এবার ২০টি জেনেরিকের ৫৩টি ব্র্যান্ডের ওষুধের দাম বাড়ানো হয়েছে।
সর্বশেষ ২০১৫ সালে কয়েকটি ব্র্যান্ডের ওষুধের দাম বাড়ানো হয়েছিল। প্রায় সাত বছর পর আবারো বাড়ানো হয়েছে অতি প্রয়োজনীয় ওষুধের দাম। এর মধ্যে বিভিন্ন মাত্রার প্যারাসিটামলের দাম বাড়ানো হয়েছে ৫০ থেকে শতভাগ। মাত্র ৪০ টাকার এমোক্সিসিলিনের দাম করা হয়েছে ৭০ টাকা, ২৪ টাকার ইনজেকশন ৫৫ টাকা। ৯ টাকার নাকের ড্রপের দাম বাড়িয়ে করা হয়েছে ১৮ টাকা।
বর্তমানে অনেক পরিবারেই মানুষের চিকিৎসা বাবদ মোট খরচের বড়ো অংশই ওষুধের পেছনে ব্যয় হয়, সেখানে ওষুধ ভেদে এত বেশি ব্যবধানে দাম বাড়ায় নিঃসন্দেহে বিপাকে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। বিশেষজ্ঞ ও সাধারণ মানুষ ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তাঁরা প্রশ্ন তুলেছে, ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর কি সাধারণ জনগণের না ওষুধ কোম্পানির স্বার্থ বিবেচনা করবে? আর এটা অবশ্যই যৌক্তিক জিজ্ঞাসা।
ওষুধ প্রশাসনের মূল্য নিয়ন্ত্রণ কমিটির পরামর্শক্রমে ওষুধের দাম আপডেট করেছে
মো. আইয়ুব হোসেন
পরিচালক, ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর।
নিয়ম মেনেই ওষুধের দাম বাড়ানো হয়েছে। একটি টেকনিক্যাল কমিটি ওষুধ উৎপাদনকারীদের প্রস্তাবনা যাচাই-বাছাই করে মূল্য নির্ধারণের সুপারিশ করেছে। এরপর ওষুধের মূল্য পুনর্মূল্যায়ন করে সেগুলোর নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। আচমকা বাড়ানো হয়েছে বিষয়টা এমন নয়।
কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধিসহ নানা কারণে বাজারে ওষুধের স্বল্পতা দেখা দিয়েছে। কোম্পানিগুলো কিছু ওষুধ উৎপাদনে উৎসাহিত হচ্ছে না। সবকিছু পর্যালোচনা করে ওষুধ প্রশাসনের মূল্য নিয়ন্ত্রণ কমিটির পরামর্শক্রমে সরকার ওষুধগুলোর দাম আপডেট করেছে।
ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানিগুলো আরও বেশকিছু ওষুধের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব ঔষধ প্রশাসন অধিদফতরে জমা দিয়েছে।
সেগুলো যাচাই বাছাই করে, যৌক্তিক মনে হলেই দাম বাড়ানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
অনেক ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলোর প্রস্তাবিত দামের চেয়ে মূল্য অনেকটা বেশি নির্ধারণ করা হয়েছে
অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান
চেয়ারম্যান, ফার্মাকোলজি বিভাগ
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়।
প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য তালিকাভুক্ত ওষুধের দাম বাড়ানোর ক্ষমতা সরকারের হাতে। এক্ষেত্রে আরও যাচাই-বাছাই করা প্রয়োজন ছিল। কিছু কিছু ওষুধের দাম যৌক্তিকভাবে বাড়ানো হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলোর প্রস্তাবিত দামের চেয়ে মূল্য অনেকটা বেশি নির্ধারণ করা হয়েছে।
ব্যবসায়ীদের সুবিধা দিতেই ঔষধ নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ ভোক্তা প্রতিনিধি বা নাগরিক প্রতিনিধিদের পাশ কাটিয়ে অগণতান্ত্রিক উপায়ে ওষুধের দাম বাড়িয়েছে
মহিউদ্দিন আহমেদ
আহ্বায়ক, বাংলাদেশ সাধারণ নাগরিক সমাজ।
ঔষধ নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ কেবল ১১৭টি জেনেরিক ওষুধের মূল্য বৃদ্ধি করতে পারে। বাকি সব ওষুধের মূল্য উৎপাদনকারী ও আমদানিকারকরা নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। গত কয়েক বছরে জীবন বাঁচানোর উপকরণ এই ওষুধের মূল্য দফায় দফায় বাড়িয়েছে তারা। দেশে ঘরে ঘরে এখন ওষুধের চাহিদা। বিকেল হলেই ওষুধের দোকানগুলোতে মানুষের লাইন লেগে যায়। এমন কোনো নাগরিক খুঁজে পাওয়া যাবে না, যিনি দৈনিক ২০ টাকার ওষুধ খান না। দেশে প্রত্যেক পরিবারে মাসে গড়ে দুই থেকে আড়াই হাজার টাকার ওষুধ লাগে। সেখানে নিত্যপ্রয়োজনীয় ওষুধের মূল্য এভাবে বাড়ালে জীবনযাত্রায় ব্যাপক প্রভাব পড়বে।
এ ছাড়া মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় ভোক্তা প্রতিনিধিদের রাখার বাধ্যবাধকতা থাকলেও ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর তা করে না। ব্যবসায়ীদের সুবিধা দিতেই ঔষধ নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ ভোক্তা প্রতিনিধি বা নাগরিক প্রতিনিধিদের পাশ কাটিয়ে অগণতান্ত্রিক উপায়ে ওষুধের দাম বাড়িয়েছে। আমরা এই মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারি না। ঔষধ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের উচিত হবে শুনানির মাধ্যমে বর্তমান দেশের প্রেক্ষাপট ও আন্তর্জাতিক বাজার ব্যবস্থা বিচার-বিশ্লেষণ করে ওষুধের মূল্য নির্ধারণ করা।
ভুক্তভোগীদের বক্তব্য
নাটোরের বাসিন্দা আফতাব উদ্দীন, তিনি ডায়বেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের রোগী। তাঁকে মাসে অন্তত দুই হাজার টাকার ঔষধ কিনতে হতো। বর্তমান পরিসিস্থিতি আরও হাজারখানেক টাকা বেশি লাগবে ওষুধ কিনতে। কিন্তু তার মাসিক আয় কিন্তু এক টাকাও বাড়েনি! আফতাব উদ্দীন হতাশ হয়ে বলেন, বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় সকল পণ্যের দাম দিনে দিনে বাড়ছে এরমধ্যে অতি দরকারি ঔষধের দামও অনেক বাড়ায় আমাদের মতো আয়ের মানুষরা খুব বিপদে পড়বে।
যেখানে নিত্য প্রয়োজনীয় প্রায় সব পণ্যের দাম বাড়ায় সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস ওঠার অবস্থা সেখানে গত জুলাই মাসে বহুল ব্যবহৃত ৫৩টি ওষুধের দাম বাড়ানোর ঘোষণা আসে।
পটুয়াখালীর বাসিন্দা শাহ নেওয়াজ মোল্লার পরিবারকেও এ ধরনের অতি প্রয়োজনীয় ওষুধ নিয়মিত কিনতে হয়। ঔষধের দাম বাড়ায় রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে পরিবারটিকে।
অনেকটা দুঃখ করে শাহনেওয়াজ মোল্লা বলেন, আমার বাচ্চার ওষুধ যদি এক হাজার থেকে দুই হাজার টাকা হয়ে যায়, আমার বাবার ওষুধের দাম যদি তিন থেকে ছয় হাজার টাকা হয়, তাহলে আমার মাসে চলব কীভাবে? আমাদের আয়-রোজগারই বা কতটুকু। ওষুধ বাদ দিলে তো হাসপাতালে দৌড়তে হবে। সেই অবস্থাও তো নেই। ওষুধ তো বাদ দেয়া সম্ভব না।
ওষুধের ফার্মেসিগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্যারাসিটামল, সেইসাথে রক্তাচাপ, হৃদরোগ, ব্যাথানাশক ও পেটে গ্যাসের সমস্যার নিয়মিত ওষুধগুলোর দাম ৫০% থেকে ১৩৪% বেড়েছে। অর্থাৎ কিছু কিছু ওষুধের দাম দ্বিগুণ অতিক্রম করেছে।
আবদুল মুক্তাদির
সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট, শিল্প সমিতি।
ওষুধের দাম বাড়ানোর কারণ হিসেবে ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধির ভূমিকা রয়েছে। গত মাসে ওষুধের কাঁচামাল আমদানির জন্য এলসি খোলা হয়েছিল ৮০ টাকা ডলারে। শিপমেন্ট পৌঁছানোর পর ডলারের দাম উঠেছে ১১০ টাকায়। প্রতি ডলারে ৩০ টাকা করে বেশি দিতে হয়েছে। এছাড়া মোড়ক, পরিবহণ, বিপণন ব্যয় বাড়ার প্রভাবও ওষুধের বাজারে দেখা যাচ্ছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের তথ্যমতে, বাংলাদেশে একজন মানুষের মোট চিকিৎসা ব্যয়ের ৬৪% ওষুধ বাবদ খরচ হয়। এবং এই খরচ করতে রোগীর পকেট থেকেই। অর্থাৎ দেশের হাসপাতালগুলোয় চিকিৎসা নিতে গিয়ে ওষুধেই মানুষের সবচেয়ে বেশি ব্যয় হচ্ছে।
ওষুধে এই বাড়তি দাম রোগীর ওপরে চাপ আরও বাড়াবে
অধ্যাপক নাহিদ আক্তার জাহান
স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিভাগ, ঢাবি।
বাংলাদেশে যেখানে স্বাস্থ্যবীমা খুবই সীমিত সেখানে ওষুধে এই বাড়তি দাম রোগীর ওপরে চাপ আরও বাড়াবে বলে আশঙ্কা করছি।
সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে যে ওষুধ রয়েছে, সেগুলোর মূল্য নির্ধারণ করে ওষুধ কোম্পানিগুলো। এক্ষেত্রে সরকারের নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন। তা নাহলে দেশের চিকিৎসাখাত নিম্নবিত্ত মানুষের আওতার বাইরে চলে যাবে এবং যার সার্বিক প্রভাব জনস্বাস্থ্যের ওপর পড়বে।
এক্ষেত্রে দুটি উপায় মেনে চলা যেতে পারে, সরকার অতি প্রয়োজনীয় ওষুধের দাম নির্ধারণ করে দিতে পারে, যেন এর বেশি দামে কেউ বিক্রি করতে না পারে।
অথবা সরকার নিজেই উৎপাদন করে অল্প দামে ক্রেতাদের কাছে সরবরাহ করতে পারে। জীবনরক্ষাকারী ওষুধগুলোর দাম প্রাইভেট মার্কেটের ওপর ছেড়ে দেয়া যাবে না। এই দামের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ থাকা উচিত। বাংলাদেশের মানুষকে চিকিৎসা নিতে পকেট থেকেই বেশি খরচ করতে হয়, স্বাস্থবীমা নেই বললেই চলে তাই এই দামের ওপর সরকারি নজরদারির প্রয়োজন।
দেশে তৈরি অতি প্রয়োজনীয় ওষুধই শুধু নয়, বিদেশি ওষুধের দামও অনেক বেড়েছে। এসব ওষুধস্বল্পতা দেখিয়ে গ্রাহককে এক প্রকার জিম্মি করে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বহুগুণ বেশি দাম রাখা হচ্ছে। অনেক সময়ই গিণমাধ্যমে সংবাদ উঠে আসে আইসিইউতে থাকা রোগীদের চিকিৎসায় সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হওয়া ইনজেকশন, যা পরিমাণের ভিত্তিতে ২১ থেকে ৪০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। আবার এটির কৃত্রিম সংকটও তৈরি করে বিক্রি করা হয় ৬০ থেকে ৮০ হাজার টাকায়। আমদানি করা ওষুধের গায়ে বাংলাদেশি টাকায় মূল্য লেখার নিয়ম রয়েছে, কিন্তু এই নিয়ম অনেক ক্ষেত্রেই মানা হয় না। বিদেশি ওষুধ অনেক সময় লুকিয়ে রাখা হয়। এরপর সংকট দেখিয়ে চড়া মূল্যে বিক্রি করা হয়। রোগীরা বাধ্য হয়ে এসব ওষুধ কেনেন। সরকারিভাবে ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণে জাতীয় পর্যায়ে শক্তিশালী কমিটি থাকা প্রয়োজন।
ওষুধের দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের ভূমিকা মোটেই সন্তোষজনক নয়। ১৯৮২ সালের ওষুধ নীতি কঠোরভাবে অনুসরণ করা হলে রোগী ও উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান উভয়ের স্বার্থই রক্ষা হবে। এ বিষয়ে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। দুঃখের বিষয় চিকিৎসা এখন আর সেবাধর্মী কাজ নয় পরিণত হয়েছে বাণিজ্যের প্রধান উপকরণে। দেশের সাধারণ জনগণের বৃহৎ স্বার্থে এ তৎপরতা বন্ধ হওয়া উচিত। ওষুধপত্রের যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণে ঔষধ প্রশাসনের এমন ভূমিকা থাকা উচিত, যাতে দেশের মানুষ সুলভে ওষুধ পেতে পারে।
ওষুধের দাম নির্ধারণে সরকারের দায়সারা মনোভাব কারো কাছেই কাম্য নয়। ওষুধের দাম যেন যৌক্তিকভাবে নির্ধারণ করা হয়, তা সরকারকেই নিশ্চিত করতে হবে। কাজটি করতে হবে জনগণের স্বার্থে, কতিপয় ঔষধ কোম্পানির লাভের কথা বিবেচনা না করে।
নাজিম উদদীন, বিশেষ প্রতিবেদক।
[প্রতিবেদনটি সাপ্তাহিক সময়ের বিবর্তন’র বর্ষ ৬ সংখ্যা ২৮, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২২ সংখ্যায় প্রকাশিত]





Users Today : 8
Views Today : 8
Total views : 184451
