ডিজিটাল যান্ত্রিকতা আমাদের আবেগ, বিবেক ও আন্তরিকতা একেবারেই শূন্যের কোঠায় নিয়ে গেছে। কতই না অলস সময় পার করছি আমরা আমাদের জীবনে অথচ মনে হচ্ছে যেন কাজের ঠেলায় এতটুকুও কারো সাথে কথা বলবার অবকাশটুকুও আমাদের নেই। ডিজিটালতা যদিও এটা এক প্রকার আধুনিকতা, আর এই সময়েও আন্তরিকতা-শূন্য মানুষগুলোকে মুখোশ নিয়েই চলতে দেখা যায় এই ডিজিটালতায়। মুখোশের আড়ালে বিশ্বাসঘাতকতা আজ যেন আমাদের সংস্কৃতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। সত্যিকার সুখ শান্তি আমাদের ধরা-ছোঁয়ার অনেক বাইরে চলে গেছে। কৃত্রিম সুখের অন্বেষণে আমরা আজ দিগ্বিদিক ছুটে চলেছি। অবসর নেই। কোথাও নাগাল পাচ্ছি না সুখের।
তিব্বতের ধর্মীয় প্রধান দালাই লামা বলেছিলেন, সুখ বা শান্তি আসলে তৈরি করার মতো কিছুই নয়। এটা নিজের কর্ম থেকেই আসে। তাহলে তো নিজের কাজের মধ্যেই সুখকে খুঁজে বের করাই হলো বুদ্ধিমানের কাজ। আমিও নিজেকে এই ধরনের বুদ্ধিমানদের কাতারে ফেলে সুখ খুঁজতে চেষ্টা করে যাচ্ছি। কিন্তু আমিও পাচ্ছি না। এই দুনিয়াটা বড়োই নিষ্ঠুরতায় ভরা। জীবন চলার পথে যারা পৃথিবীর এই নিষ্ঠুরতার শিকারে আক্রান্ত হয়েছে, একমাত্র তারাই বুঝতে পেরেছে এর পরিনাম কতই না ভয়ংকর। ব্রিটিস প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন, তার বিদায়ী ভাষণে আবেগে আপ্লুত হয়ে বলেছিলেন, ক্ষমতার মায়া সবাই ত্যাগ করতে পারে না। পৃথিবীর সেরা পদটি ছেড়ে যেতে আমারো কষ্ট হচ্ছে কিন্তু রাজনীতিতে কেউই অপরিহার্য নয়। আবার শুধু রাজনীতিতেই নয়, এই জগৎ সংসারের জন্যও কোথাও কেউই অপরিহার্য নয়। এই যে অপরিহার্যতা তার প্রমাণ কোথাও নেই। আমার কোটি টাকার সম্পদ, বাড়ি, গাড়ি সব কিছুই মুহূর্তের মধ্যে অন্য কারো হয়ে যাবে। অথচ যেগুলোতে আমার রক্ত মেশা ঘাম ও মেধা মিশে একাকার হয়ে আছে। আসলে নিজের জন্য নিজেই অপরিহার্য। এই সূত্রই পৃথিবীর একমাত্র শান্তির সূত্র, যা আমার কাছে মনে হয়েছে। আমি তাই তো নিজেকে নিজের কাজের মধ্যেই আনন্দে রাখবার চেষ্টা করেই যাচ্ছি। সারাদিন সবাই তো কারো না কারো ভালোর জন্যে, কতই না কাজ করে থাকি, কিন্তু নিজের জন্যে একান্তভাবে কিছু সময় কাটানো , নীল আকাশের বিশালতায় নিজেকে হারিয়ে ফেলা, নদীর স্রোতের কলকল শব্দের সাথেই নিজের জীবনের আবর্জনাগুলো ধুয়ে ফেলে দেওয়া, সাদা এক টুকরো কাগজে-কলমের নিবের ঘষাঘষির অ-দামী ফসলগুলোকে একটু দামের আশায় নিজের গোলায় সঞ্চয় করা, আবার অন্য কোনো গুণীজনের ঘসাঘসির ফসল নিয়ে, তা নিজের জীবনের সাথে কিছুটা হলেও মিলিয়ে নেওয়া, আমার তো মনে হয় এগুলো নিজেকে সুখ শান্তির দরজা খুলে দিয়ে, শান্তির রাজ্যে ঢুকতে সাহায্য করবেই। এটা আমি বিশ্বাস করি। আমার বিশ্বাসের সাথে সবার বিশ্বাস তো নাও মিলতে পারে।
পবিত্র বাইবেল বলে, যারা দুঃখ করে, যারা নিজেকে গরীব বলে মনে করে, যাদের স্বভাব নম্র, যারা দয়ালু, যাদের অন্তর খাঁটি, যারা অন্য মানুষের জীবনে শান্তি আনার জন্য চিন্তা করে, যারা সৎ পথে চলতে অত্যাচার সহ্য করে, স্বর্গ রাজ্য নাকি তাদেরই হবে। আসলে আমরা যে যাই বলি না কেন, ধর্মীয় অনুভূতির জায়গা সবার আছেই। কারো বা কম, কারো বা বেশি, আবার কারো বা উগ্রতায় ভরা। তবে যে যেভাবেই প্রকাশ করি না কেন, মনের সুপ্ত স্বর্গীয় সুখের বাসনা সবার অছেই। প্রত্যেকের জীবনে দুটো জিনিস দরকার আছেই আর তা হলো—জীবনকে বাঁচিয়ে সুন্দরভাবে এই পৃথিবীতে চলতে টাকা। তবে সেটা সৎ পথের হতে হবে, আর মৃত্যুর পরে স্বর্গ, আর সেটাও নিশ্চিত হতে হবে। চলুন এই দুটো বিষয় নিয়ে চোখ বন্ধ করে একটু ভাবি। একটু খুঁজে দেখার চেষ্টা করি। কেননা জীবন তো একটাই। মৃত্যু দিয়েই এই অতিথিশালার আতিথেয়তার পারসমাপ্তি ঘটবে। তাই তো আসুন না আমরা এই ডিজিটালিকতায় আমাদের আবেগ, বিবেক ও আন্তরিকতাকে ধরে রাখি।
ডা. অলোক মজুমদার : চিকিৎসক ও লেখক; বিশেষ প্রতিনিধি সাপ্তাহিক সময়ের বিবর্তন।





Users Today : 36
Views Today : 52
Total views : 188215
