কি অদ্ভুত ঘটনা! দেহ থেকে জীবন বায়ুটা বের হয়ে গেলে আপনি লাশ,আর আপনি যখনই লাশ তখননি আপনার আর কোনো মূল্য নেই। মায়ার পৃথিবী থেকে সবাই আপনাকে বিদায় দিতে ব্যতিব্যস্ত। আপনার বাবা-মা হয়ত অনেক ধুমধাম করে আপনার একটি নাম রেখেছিল, সেই নাম ভুলে মানুষ আপনাকে লাশ বলে ডাকবে। যে প্রিয় মানুষগুলো আপনাকে ছাড়া একটা মুহূর্ত চলতে পারত না, তারাও আপনাকে ভুলতে চেষ্টা করবে , আপনার যে প্রিয় মানুষটা আপনার কাছে ,আপনার বুকে মাথা দিয়ে, না ঘুমালে রাতে ঘুম আসত না, যে মানুষটা আপনাকে জড়িয়ে ধরে না ঘুমালে রাতে ভয়ে কাঁপত, আপনার যে প্রিয় সন্তাকে না খাইয়ে দিলে সে খেত না, সেও আপনাকে ভুলে যাবে। চলবে সর্বত্র প্রস্তুতি আপনাকে বিদায় দেওয়ার। তারা কিছু খাবে না ততক্ষণ পর্যন্ত, যতক্ষণ না আপনাকে বিদায় দেয়,আবার অেেনকে আপনার রেখে যাওয়া সম্পত্তি নিয়ে ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে অতি ব্যস্ত হয়ে পড়বে। আপনি লাশ তাই আপনার কথা আর কেউ শুনবে না। আপনার কাছে আর কেউ আসবে না। দূর থেকে আপনাকে দেখবে? আসলে বাস্তবতা কেন এমন হয় ? স্বার্থের কারণে প্রিয় মানুষগুলো কি সবকিছু ভুলে যায়?
ইসলাম ধর্মীয় বিশ্বাসমতে, একজন মানুষ মারা যাওয়ার পর ৪০ দিন পর্যন্ত বাড়ির ত্রিসীমানায় সেই মৃত ব্যক্তির আত্মা ঘোরাফিরা করে। যদি তাই হয় তাহলে সেই মৃত ব্যক্তি কতই না কষ্ট পায় এই সব ঘটনা দেখে। তার মৃত্যুর পরপর তার প্রিয় মানুষদের কী রকম পটপরিবর্তন হয়। জীবনে সবচেয়ে চরম সত্য আমাদেরও একদিন মারা যেতে হবে। জন্মগ্রহণ করলে প্রতিটি ব্যক্তিকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে ।
এই চরম সত্যটা সময়ের সাথে সাথে ভুলে যেতে যায়, আর যখনই ভুলে যায় তখনই তো অঘটন ঘটে, মানুষ আর মানুষ থাকে না, হয়ে যায় অমানুষ। প্রতিটি ধর্মীয় বিশ্বাস অনুসারে সৃষ্টিকর্তা বলতে একজন আছে। মানুষ বিভিন্ন সময় নিজের জ্ঞান-বুদ্ধি দিয়ে সেই সৃষ্টিকর্তাকে আবিষ্কার করার চেষ্টা করেছে, আবার সেই সৃষ্টিকর্তাকে নিজের মতো করে করে সন্তুষ্ট করার চেষ্টাও করেছে , তখন নিজেকে জ্ঞানী ভেবে নিজের মনগড়া ভাবে সৃষ্টিকর্তাকে খুশি করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। আজ পৃথিবীতে প্রায় আড়াই হাজার ধর্ম রয়েছে। প্রতিটি ধর্ম বিশ্বাসী মনে করে, তার ধর্মই শ্রেষ্ট ধর্ম, তার ধর্ম মতে তিনি মৃত্যুর পরে স্বর্গে যাবেন। এটা তাদের নিজ নিজ ধর্মীয় বিশ্বাস কিন্তু আজ পৃথিবীতে যত অশান্তি সৃষ্টি হয়েছে, যত জীবন হানি ঘটেছে, তার জন্য ধর্মীয় অনুসারীরা দায়ী। অথচ কোনো ধর্মই কখনও সমাজ বা মানুষের কোনো অমঙ্গল হোক তার কথা বলে না ।
একটা ব্যক্তিগত ঘটনার কথা বলি—কয়েকদিন আগে আমার জেঠাতো ভাই মারা গিয়েছে। ভাইটা আমার অনেক শুভাকাঙ্ক্ষী ছিল, সব সময় আমার খোঁজ-খবর। ভাইটা পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে গিয়েছে সত্যিই কিন্তু সবাইকে কাঁদিয়েছে । তিনি গাজীপুরে একটা গামেন্টর্স ফ্যাক্টরিতে কাজ করতেন। অন্য দিনের মতো যথারীতি অফিস থেকে আসার পরে। মোবাইলে নাকি খবর শুনেছিল। কিছু দিন থেকে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে লোডশেডিং মাত্রারিক্ত, বিশেষ করে শহর বিদ্যুৎ না থাকলে রুমের মধ্যে থাকে খুবেই কষ্ট সাধ্য। ভাইটা আমার গরমের কারণ রাত প্রায় সাড়ে এগারাটার সময় গোসল করার জন্য ওয়াশরুমে যায়, ওয়াশরুম বাইরে ছিল, ওয়াশরুমে গিয়ে ঝরনা ছেড়ে দেওয়া মাত্র , মাথায় পানি পড়ার কারণে মনে হয় সাথে সাথে স্ট্রোক করেছিল। ওয়াশরুমে পড়ে গেলে অনের জোরে শব্দ হয়, কারণ সে অনেক ভারি ও লম্বা ছিলেন পড়ে যাওয়ার কারণে পাশের বাসার লোকেরা তাকে ধরে পোশাক পরিবর্তন করে রুমে নিয়ে আসে, উপস্থিত লোকদের ভাষ্যমতে, সেখানে তার মৃত্যু হয়।
রাত তখন আনুমানিক ১২ টা, গ্রাম থেকে আমার জেঠাতো ভাই আমাকে ফোন দেয়। আমি তখন গভীর ঘুমে ছিলাম, যখন ফোনে কল এসেছিল আর রিংটনটা বেজে উঠেছিল তখন ফোনটা ধরতে কেন জানি খুব ভয় হয়েছিল। কলটা রিসিভ করার আগে, সময়টা দেখে নিয়েছিলাম ,কলটা রিসিভ করতে ওইদিক থেকে বলছে, জানিস নিরাশা মারা গিয়েছে। আমি শোনার পর ৫ মিনিট কিছুই বুঝতে পারিনি। আমার রুমমেট আমাকে বলছে , ভাই কী হয়েছে ? আমি শুধু তাকে বললাম আমাকে গাজীপুর যেতে হবে। উত্তরে সে বলে কীভাবে যাবেন, এত রাতে, রাত তো অনেক গভীর হয়েছ ? খুব ভয় হচ্ছিল, রাত অনেক গভীর, রাস্তায় কোনো গাড়ি নেই একটা সিএনজি পেয়েছিলাম—দশগুণ বেশি ভাড়া চেয়ে বসল। কোনো উত্তর না দিয়ে বললাম চলেন। আমার এই বয়সে দেখেছি মানুষ বিপদে পড়লে, বাঙালিরা সাহায্যে না করে বরং আরো বেশি করে বিপদে ফেলার চেষ্টা করে।
আমি গাজীপুর পৌঁছা মাত্র কিছু লোক এগিয়ে আসল, সবার সাথে কথা বলে সবকিছু বোঝার চেষ্টা করি। বাড়িওয়ালা নাকি বলছে তাড়াতাড়ি লাশ নিয়ে যেতে হবে। আমি বেশ কয়েকবার ভাইয়ের বাসা গিয়েছিলাম, তখন দেখেছি বাড়িওয়ালার সাথে ভাইয়ের অনেক ভালো সর্ম্পক ছিল। আজ লাশ হতেই না হতে পটপরিবর্তন, এটাই কি বাস্তবতা?
যাইহোক ভাইয়ের লাশ বাড়ি নিয়ে যেতে হবে! পরিবার থেকে সেই দায়িত্ব আমার উপর দিয়েছে , আমি ছোটো থেকে লাশ দেখলে ভয় পেতাম, হাসতালের আশ-পাশে দিয়ে কখনই যেতাম না, অ্যাম্বুলেন্স দেখলে অনেক দূরে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম। গাড়ি ঠিক করে ভাইয়ের লাশ নিয়ে রওনা দেই, অ্যাম্বুলেসে কেন জানি না বারবার মনে হচ্ছিল, নিরাশা ভাই যেন আমাকে বলে উঠল আমারে নিয়ে কই যাস? অনেক বার প্রার্থনা করেছি! গাড়িতে বেশ কয়েকবার হাউ মাউ করে কেঁদে উঠেছিলাম, বারবার নিজকে চেষ্টা করেছিলাম শান্ত রাখার, আমি ভেঙে পড়লে চলবে না।
রাস্তায় দেখেছি মানুষ কেন জানি, অ্যাম্বুলেন্সকেও সাইড দিতে চায় না । তাদের ব্যস্ততা অনেক বেশি, মনে মনে এটা ভেবেছিলাম, খুব গুরুতর রোগীর বেলায় এ মানুষগুলোর কি কোন মায়া হয় না। ড্রাইভারকে দেখলাম ড্রাইভের সাথে সাথে মনের সুখে কার সাথে রসিকতার ছলে কথা বলছে ? অনেক প্রতীক্ষার পরে, বাড়িতে পৌঁছেছি। বাড়িতে গিয়ে দেখি, ভাইকে দাফনের জন্য সবাই ব্যস্ত।
যদি বাস্তবতা এত কঠিন হয়, তাহলে মিথ্যা মায়ায় কেন পৃথিবী চলছে ? সবকিছু যদি লাশ হওয়ার সাথে সাথে শেষ হয়, তাহলে এই ক্ষমতা অর্জনের জন্য কেন এত , বিশৃঙ্খলা? লাশ হওয়ার সাথে সাথে যদি অর্থের কোনো মূল্য না থাকে তাহলে কেন সারা জীবন অর্থের পিছনে ছুটতে হবে? লাশ হওয়ার সাথে সাথে যদি সব মায়া-মমতা শেষ হয়ে যায় তাহলে এই মিথ্যা মায়া নিয়ে, কেন এত মায়া কান্না? আজ ভাই নেই কিন্তু ভাইয়ের স্মৃতিগুলো হৃদয়ে আছে। বিশ্বাস করি ভাই ওপারে ভালো আছে; যদিও আর কোনোদিন বলবে না, চিন্তা করিস না, কোনো কিছু লাগলে বলিস। তবে ভাইয়ের বিদায় এই শিক্ষা দিয়ে গিয়েছে, লাশ হলে আর কোনো কিছুর মূল্য থাকে না। তাই সব ধন-সম্পদ ক্ষমতা অর্থহীন।
নাহিদ বাবু : তরুণ লেখক।





Users Today : 41
Views Today : 57
Total views : 188220
