জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী দেশের আদিবাসীরা আড়ম্বরের সাথেই উদযাপন করার চেষ্টা করেছে। সামাজিকভাবে নানান অনুষ্ঠান—আলোচনা সভা, সেমিনার, র্যালি, সংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং প্রকাশনা আয়োজনের মাধ্যমে যেমন, অনুরূপভাবে শ্রদ্ধায়, ভালোবাসায়, সম্মানে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের উল্লেখযোগ্য বিষয়গুলোকে নিজ নিজ মাতৃভাষায় রূপদান করার মাধ্যমেও। আদিবাসীরা বাংলাদেশের স্থপতির স্মরণার্থে গান, কবিতা, রাজনৈতিক মাইলফলক বক্তৃতা অনুবাদ করেছেন। বিগত ২৬ আগষ্ট নেত্রকোণার বিরিশিরিতে ১২টি জনগোষ্ঠীর কবিরা ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষার কবিতায় বঙ্গবন্ধু’ শীর্ষক সভায় স্বরচিত কবিতা উৎসর্গ করেছেন। কবিরা হলেন—সনজিৎ কুমার সিনহা, রিপন বানাই, সোহেল হাজং, স্বপন এক্কা, যুগলকিশোর কোচ, রিপ্রুচাই মারমা, সুবোধ এম বাস্কে, থিওফিল নকরেক, মতেন্দ্র মানখিন, বরেন্দ্রলাল ত্রিপুরা, এ কে শেরাম, মৃত্তিকা চাকমা। বোধকরি, বঙ্গবন্ধুর প্রতি যে আদিবাসীদের আকুণ্ঠ সমর্থন, নিরেট ভালোবাসা, অবিচ্ছিন্ন আত্মার বন্ধন ছিলো; এগুলোর বহিঃপ্রকাশ আমরা প্রতিনিয়ত দৃশ্যত হচ্ছি। আদিবাসী প্রবীণ-প্রবীণারা ভালোবেসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সম্মোধন করতেন ‘শেখ সাহেব’ বলে। আর স্নেহে-ভালোবেসে বর্তমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ডেকে থাকেন—শেখের বেটি।
শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ বাঙালির ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ ইতোমধ্যেই ২২টি ভাষায় (বম, বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী, চাকমা, গারো, হাজং, খাসিয়া, খিয়াং, কোচ, কোল, লুসাই, মাহালী, মেইতে মণিপুরী, ম্রো, মুণ্ডা, ওরাঁও- কুড়–ক্ষ, ওরাঁও- সাদ্রি, পাহাড়ি, পাংখোয়া, সাঁওতাল, তঞ্চঙ্গ্যা, উসই ত্রিপুরা এবং কোডা) অনূদিত হয়েছে। প্রত্যেকটি জাতিগোষ্ঠীর সদস্যরা যাতে মাতৃভাষায় বঙ্গবন্ধুকে উপলব্ধি করতে সমর্থ হয়, নতুন প্রজন্মরা যেন জাতিরজনককে আবিষ্কার করে। মাতৃভাষাতেই উপস্থাপনের মাধ্যমে আরো যেন আপন করা, কাছের করে নেয়া হয়। মনে হয়, বঙ্গবন্ধু সাঁওতালী ভাষাতেই কিংবা কোল ভাষাতেই বক্তৃতা দিয়েছিলেন। সাঁওতালী ভাষার অনুবাদক মি. প্রদীপ হেমব্রম আমাকে জানাচ্ছিলেন—‘বঙ্গবন্ধুর ভাষণটিকে সাঁওতালী ভাষাতে অনুবাদ করতে গিয়ে নিজ ভাষা সম্পর্কে অনেক বেশি আগ্রহী হয়েছি। ভাষণের যর্থাথতা উপস্থাপন করতে গিয়ে উপযুক্ত শব্দ খোঁজার ও ব্যবহারে যত্নশীল হয়েছি। যখন মাতৃভাষায় হৃদয়গ্রাহী ভাষণটিকে লিপিবদ্ধ করছিলাম, আমার রক্তকণাগুলো নিজ থেকেই উপ্তত হয়ে উঠেছে। বাংলা ভাষার সাবলীলতাকে মাথায় রেখে সাঁওতালী ভাষায় রূপান্তর করেছি, এতে করে যে কোনো দেশের সাঁওতালী ভাষাভাষীর মানুষ শ্রবণে উজ্জীবিত হবে, উদ্বেলীত ও আন্দোলিত হবেন।’ দেখেছি, দুয়েকজন আদিবাসী যুবর মধ্যে একটা চেতনার শক্তি, দুর্বার গতি এবং বঙ্গবন্ধুর প্রতি প্রগাঢ় ভালোবাসা। ৭ মার্চের ভাষণই জাতিকে দিয়েছিলো স্বাধীনতার দিক-নির্দেশনা, দিশা, অজানা পথের নিশানা। এই ইতিহাসখ্যাত ভাষণ শোনার পর সাড়ে সাত কোটি বাঙালীকে আর ঘরে আঁটকে রাখা যায়নি। বলা হয়ে থাকে, মহান মুক্তিযুদ্ধের বিজয় স্মারক।
স্বাধীনতার আন্দোলনে ১৯৬৬ খ্রিষ্টাব্দের ৬ দফা একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল ও জনমানসে অবিস্মরণীয় স্থান দখল করে আছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৬ দফাকে সামনে রেখে পাকিস্তানের সামরিক সরকারকে রুখে দিয়েছিলেন। স্বাধীনতাকামী মানুষের ঐক্য, সমর্থন, অংশায়ন দাবী আদায়ের আন্দোলনকে করেছিলো অপ্রতিরোধ্য সফলতা। ইতিহাসের এই অংশটি ওরাঁও-সাদ্রী ভাষায় অনুবাদ করেছেন যোগেন মিনজি। এছাড়াও মি. যোগেন মিনজি বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা আমাদের জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’ নিজ মাতৃভাষায় উপস্থাপন করেছেন। কিন্তু কেন? নিশ্চয়ই অন্তর্নিহিত কারণ রয়েছে। জানার চেষ্টা করছিলাম যোগেন মিনজি’র কাছে। জয়পুরহাট উঁচায়ের অধিবাসী যোগেন মিনজি জানাচ্ছিলেন—‘আদিবাসী ওরাঁও, মুণ্ডা, পাহানদের মাতৃভাষা প্রায়ই কাছাকাছি, একে-অপরের ভাষার মধ্যে অনেকাংশই মিল রয়েছে। স্বাধীনতা আন্দোলনের মূলসুত্র ৬ দফাকে আতস্ত ও হৃদয়াঙ্গম করাতেই মাতৃভাষায় অনুবাদ করেছি। বাংলা ভাষায় ছয় দফা এবং মাতৃভাষার ছয় দফার মধ্যে মাতৃভাষার ছয় দফার প্রতিই গ্রামীণ সাধারণ মানুষের আগ্রহ ও সমর্থন দেখা যায়; কারণ সেটি তাদের হৃদয়কে স্পর্শ করতে পেরেছে। দ্বিতীয়ত- নৈতিকতাবোধ থেকেই, মহান মুক্তিযুদ্ধের আদিবাসী বীরযোদ্ধাদের প্রতি সম্মার্থে জাতীয় সঙ্গীত মাতৃভাষায় উপযোগী করতে উদ্বুদ্ধ হয়েছি। মুক্তিযুদ্ধের রক্তগঙ্গায় প্রবাহিত হয়েছে জাতি, ধর্ম, বর্ণ, নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষের; রয়েছে ওরাঁও, মুণ্ডা, পাহান, সাঁওতাল, মাহালী, কোল, ভীল, কোডাদেরও। আমাদের প্রজন্মরা যাতে জানতে পারে, বুঝতে পারে ও বিশ্বাস করতে পারে—‘জাতীয় সংগীত’ শুধু বাংলা ভাষাতেই নয় মাতৃভাষাতেও গাওয়া যায়। মাতৃভাষাতে গাইলে ভাষাভাষীরা দেশের প্রতি আরো মমত্ববোধ, দায়িত্ববোধ, অধিকারবোধ ও ভালোবাসা জন্মাবে।’
সোনার বাংলা’র স্বপ্ন দ্রষ্টা শেখ মুজিবুর রহমানের সপরিবারে হত্যাকাণ্ডের প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করেছিল আদিবাসীরা। বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে সেদিন গারো, হাজংসহ অন্যান্য আদিবাসীরা পুনর্বার অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিল। রাজধানী ঢাকায় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ করেছিল সীমন্তবর্তীর আদিবাসীরা। সত্যিই কতটুকু ভালোবাসা, হৃদয়ের টান অনুভব করলে পিছিয়েপড়া, অনগ্রসর কিংবা প্রান্তিক মানুষেরা বিক্ষুব্ধ হতে পারে! একমাত্র ভালোবাসার মানুষের জন্যই তো মানুষ বিদ্রোহী হয়, আত্মত্যাগ করে এবং নিজেকে উজাড় করে এগিয়ে যায়, রক্ষার আকাঙ্খী হয়। আদিবাসীরা বঙ্গবন্ধুকে ভালোবেসেছিলেন আত্মিকতায়, জাগতিক বন্ধনে নয়; কারণ জন্মান্তরে তাদের সাথে মুখোমুখি, নিবিড়ান্তে দেখা হয় নাই তবুও তার স্বপ্ন, চেতনা, দর্শন, অঙ্গীকার, আশ্বস্ততা, ভালোবাসা দূর থেকেই অনুভব করেছিল। আমাদের নতুন প্রজন্মদেরকে জানতে হবে বঙ্গবন্ধুকে, মহান মুক্তিযুদ্ধকে, বাংলাদেশকে। ১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ আগষ্ট জাতির জন্য কালো রাত্রি, খাঁটি বাঙালির মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড সমগ্র বিশ্ব বিবেককে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে তিনি—রাজনীতির কবি, বিবিসি’র জরিপে—শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ বাঙালি। মৃত্যুর পরবর্তীকালে কবি লিখেছেন, ‘তুমি চলে গেছ, জেগে আছে তোমার নাম শেখ মুজিবুর রহমান’।
মিথুশিলাক মুরমু : আদীবাসী গবেষক ও লেখক।





Users Today : 6
Views Today : 7
Total views : 184561
