পবিত্র বাইবেলের দৃষ্টিকোন থেকে আমরা দেখতে পাই যে, আমরা সকলেই পাপী। আর এই পাপী মানব জাতিকে বিচার করতে নয়, কিন্তু মুক্তি দিতেই আমাদের প্রভু যীশু খ্রীষ্টের এ জগতে আগমন। তাই তো শাস্ত্র বলে, “কেননা ঈশ্বর জগতের বিচার করতে পুত্রকে জগতে প্রেরণ করেননি, কিন্তু জগত যেন তাঁর দ্বারা পরিত্রাণ পায় ” [যোহন ৩:১৭ পদ]।
এই সমস্ত ধর্মপ্রবণ লোকদের আচরণ লক্ষ করুন। ফরীশীরা পাপ কার্যের সময়েই স্ত্রীলোকটিকে বিচারের জন্য নিয়ে এসেছিল, কিন্তু যে লোকটি তার সঙ্গে ছিল, তাকে নিয়ে আসেনি। তাদের মতে যীশুর পক্ষে এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করা কঠিন হবে।
তাই তারা যীশুর পরীক্ষার করার জন্যই এই পাপীষ্ঠা নারীকে বিচারের জন্য ধরে নিয়ে আসল যেন যীশুকে সবার সামনে অপদস্থ করিতে পারে। তাদের ধারণা ছিল, হয় তিনি মোশীর আইনের বিরোধিতা করবেন নতুবা অনুগ্রহ ও ক্ষমার বিষয়ে যে প্রচার তিনি করেছেন; সেই বিষয় অস্বীকার করবেন। কিন্তু তিনি ৭ পদের উত্তরের দ্বারা তিনি তাহাদের ফাঁদকে ব্যর্থ করে দিয়েছেন এবং একই সাথে তাদেরই নিজেদের ভন্ডামি ও পাপের সম্মুখীন করে দিয়েছিল।
এই পাপী স্ত্রীলোকটিকে নিয়ে কী করতে হবে―এও ছিল তাঁর পক্ষে একটা বিশেষ সমস্যা। তিনি কি তার বিচার করবেন, নাকি তাকে মুক্তি দিবেন। তিনি তার পাপ মার্জনা করতে পারেন না কিংবা পাপীকে শাস্তি দিতে পারেন না- ১৫ পদ। ১১ পদে তিনি তাকে যে উত্তর দিয়েছিলেন যাতে উভয় সংকট এড়ানো সম্ভব হয়েছিল। এ বুঝা যায় যে, তিনি তার অন্তরে পাপের জন্য প্রকৃত অনুতাপ/অনুশোচনা দেখতে পেয়েছিলেন। এছাড়া (অনুতাপ) পাপের কোনো ক্ষমা হতে পারে না। সে তাঁকে ‘হে গুরু’ বলিয়া সন্বোধন করেছিল।
একমাত্র এই ৬ পদেই বলা হয়েছে যে, যীশু কিছু লিখেছেন; কিন্তু তিনি কি লিখেছেন, তা এখানে বলা হয়নি। এটাই এখন বোঝার বিষয়। চলুন, জানা যাক!
পরে তারা যখন পুনঃ পুনঃ তাঁকে (যীশুকে) জিজ্ঞাসা করতে লাগল, তখন তিনি মাথা তুলে তাদেরে বললেন, তোমাদের মধ্যে যে নিস্পাপ, সেই প্রথমে একে পাথর মারুক। পরে তিনি পুনর্বার হেঁট হয়ে অঙ্গুলি দিয়ে ভূমিতে লিখতে লাগলেন।
বিষয়টি যদি আমরা এভাবে দেখি,
১ম জন পাথর নিয়ে এসে দাঁড়াল, আর যীশুর হাতের দিকে তাকিয়ে দেখলেন যে, যীশু লিখছেন, ‘‘তুমি তোমার ক্ষমতার অপব্যবহার করেছো, স্বজন প্রীতি করেছো, অনিয়ম-দুর্নীতি তোমার নিত্যদিনের সঙ্গি। একজন অন্যায় করলে তাকে কীভাবে শাস্তি দেওয়া যায়, সে বিষয় তুমি খুব পটু; কিন্তু তুমি যখন কোনো অপরাধে ধরা পড়ো, তখন নিজের দোষ ঢাকার জন্য কত না টালবাহানা, নাটক করে থাকো। কি ঠিক বলিনি? এই কথা দেখার পর ১ম জন দেখলেন, আরে, এ তো আসলেই সত্যি। তখন তিনি পাথর ফেলে দিয়ে চলে গেলেন।
২য় জন পাথর নিয়ে দাঁড়াল আর যীশুর হাতের লেখার দিকে তাকিয়ে দেখে যীশু লিখছেন, তুমি ঈশ্বরের প্রভুত্ব স্বীকার না করে জগতের প্রভুর দাসত্ব করছো। কি ঠিক বলিনি? তখন দ্বিতীয় জনও পাথর ফেলে চলে গেল।
৩য় জন পাথর নিয়ে দাঁড়াল আর যীশুর হাতের লেখার দিকে তাকিয়ে দেখে যীশু লিখছেন, তুমি হিসাবরক্ষক, তোমার কাছে টাকা-পয়সা থাকে। কত টাকা-পয়সা এদিক-সেদিক করে থাকো, তার তো কোনো হিসেব নাই। কি ঠিক বলিনি? আরে এ তো সবই সত্যি। তখন সেও পাথর ফেলে চলে গেল। এভাবে একে একে চলে যাওযার পর সব শেষে কনিষ্ঠ জন আসল। সে বয়সে সবার ছোটো। সেও পাথর মারার জন্য পাথর তুলে নিল, এবং ধীরে ধীরে পাথর মারার জন্য এগিয়ে আসল। সেও যীশুর হাতের লেখার দিকে তাকিয়ে দেখল, যীশু লিখছেন, তুমি তো অনেক চালাক, এই বয়সেও তুমি অনেক দুষ্টুমি করে তোমার ক্লাসের সামনের বেঞ্চে বসা তোমার বন্ধুর পিঠে কলম দিয়ে দাগাওনি? হ্যাঁ তাই তো, আমি তো এ কাজটি করেছি। তখন সেও পাথর ফেলে চলে গেল।
এভাবে একে একে সকলেই নিজ নিজ সংবেদ অর্থাৎ বিবেকের কাছে হেরে গিয়ে সকলেই পাথর ফেলে চলে গেল। ঠিক এর পরেই যীশু পুনরায় মাথা তুলে তাকালেন, দেখলেন, স্ত্রীলোকটি ছাড়া সেখানে আর কেউ নেই। তখন যীশু তাকে বললেন, হে নারী, যাহারা তোমার নামে অভিযোগ করেছিল, তাহারা কোথায়? কেহ কি তোমাকে দোষী করে নাই? সে বলল, না, প্রভু, কেউ করে নাই। তখন যীশু তাকে বললেন, আমিও তোমাকে দোষী করি না, এখন অবধি আর পাপ করিও না।’’
খ্রীষ্টেতে প্রিয় ভাই-বোন, এটি কোনো গল্প নয়, কিন্তু বাস্তব ঘটনা যা কেবল সাধু যোহন লিখিত সুসমাচারেই লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। পবিত্র বাইবেলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদটিও এই যোহনের সুসমাচারেই আছে। আমি বলতে চাই, মানুষ হিসেবে আমরা কেউই নিষ্পাপ নই। কেননা পবিত্র বাইবেল এই কথা বলে, ‘ধার্মিক কেহই নাই, একজনও নাই, কেননা সকলেই পাপ করেছে, এবং ঈশ্বরের গৌরব-বিহীন হয়েছে’ [রোমীয় ৩:১০, ২৩ পদ]। আর সেই জন্যই সেই দিন ১ম জন থেকে শুরু করে শেষ জন পর্যন্ত কেউই সেই নারীকে দোষী করতে পারিনি। আর আমাদের প্রভু যীশু খ্রীষ্টও কাউকে দোষী করতে এই জগতে আসেন নাই কিন্তু জগত যেন তাঁহার দ্বারা পরিত্রাণ পায় [যোহন ৩:১৭ পদ]। আর এই কারণ সেই সময়ের বিচার ব্যবস্থার বিরুদ্ধে তিনি দাঁড়িয়েছিলেন। একই সাথে তিনি সেই নারীকেও সতর্ক বার্তা দিলেন, বললেন, আমিও তোমাকে দোষী করি না; এখন থেকে আর পাপ করিও না।
খীশু খ্রীষ্টের এই মহান বিচার পদ্ধতি আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয় যেন আমরা পাপ থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করে পবিত্র জীবনযাপন করতে পারি। কারণ খ্রীষ্টিয় জীবন পরিত্রাণের জীবন। পরিত্রাণ পাওয়ার চেয়ে সেই জীবন রক্ষা করা আরও কঠিন।
পাস্টর কিশোর তালুকদার: খ্রীষ্টিয় ধর্মতত্ত্ববিদ।





Users Today : 16
Views Today : 19
Total views : 175705
