সেই সময়ে আগাস্ট সিজারের এই আদেশ বের হলো যে, সমুদয় পৃথিবীর লোক নাম লিখে দিবে। সিরিয়ার শাসনকর্তা কুরীণিয়ের সময়ে এই প্রথম নাম লেখান হবে। সকলে নাম লিখে দেয়ার নিমিত্তে আপন আপন নগরে গমন করল। আর যোষেফও গালীলের নাসরৎ নগর হতে যিহূদিয়া বৈৎলেহম নামক দাযূদের নগরে গেলেন, কারণ তিনি দায়ৃদের কুল ও গোষ্ঠীজাত ছিলেন; তিনি আপনার বাগ্দত্তা স্ত্রী মরিয়মের সঙ্গে নাম লিখে দেয়ার জন্য গেলেন; তখন ইনি গর্ভবতী ছিলেন। তাঁরা সেই স্থানে আছেন, এমন সময়ে মরিয়মের প্রসবকাল সম্পূর্ণ হলো। আর তিনি আপনার প্রথমজাত পুত্র প্রসব করলেন, এবং তাঁকে কাপড়ে জড়িয়ে যাবপাত্রে শুইয়ে রাখলেন, কারণ পান্থশালায় তাঁদের জন্য স্থান ছিল না। অঞ্চলে মেষপালকেরা মাঠে অবস্থান করছিল, এবং রাত্রিকালে আপন আপন পাল চৌকি দিচ্ছিল। আর প্রভুর এক দূত তাদের নিকটে এসে দাঁড়ালেন, এবং প্রভুর প্রতাপ তাদের চারিদিকে দেদীপ্যমান হলো; তাতে তারা অতিশয় ভীত হলো। তখন দূত তাদের বললেন, ভয় করো না, কেননা দেখ, আমি তোমাদেরকে মহানন্দের সুসমাচার জানাচ্ছি; সেই আনন্দ সমুদয় লোকেরই হবে; কারণ অদ্য দায়ূদের নগরে তোমাদের জন্য ত্রাণকর্তা জন্মেছেন; তিনি খ্রীষ্ট প্রভু। আর তোমাদের জন্য এই চিহ্ন, তোমরা দেখতে পাবে, একটি শিশু কাপড়ে জড়ান ও যাবপাত্রে শয়ান রয়েছে। পরে হঠাৎ স্বর্গীয় বাহিনীর এক বৃহৎ দল ঐ দূতের সঙ্গী হয়ে ঈশ্বরের স্তবগান করতে করতে বলতে রাগলেন, ‘‘ঊর্দ্ধলোকে ঈশ্বরের মহিমা, পৃথিবীতে (তাঁর) প্রীতিপাত্র মনুষ্যদের মধ্যে শান্তি” দূতগণ তাহাদের নিকট হতে স্বর্গে চলে গেলে পর মেষপালকেরা পরস্পর বলল, চল, আমরা একবার বৈৎলেহম পর্যন্ত যাই, এবং এই যে ব্যাপার প্রভু আমাদের জানালেন, তা গিয়ে দেখি। পরে তারা শীঘ্র গমন করে মরিয়ম ও যোষেফ এবং সেই যাবপাত্রে শয়ান শিশুটিকে দেখতে পেল। দেখে বালকটির বিষয়ে যে কথা তাদেরকে বলা হয়েছিল, তাহা জানাল। তাতে যত লোক মেষপালকগণের মুখে ঐ সব কথা শুনল, সকলে এই সকল বিষয়ে আশ্চর্য্য জ্ঞান করিল। কিন্তু মরিয়ম সেই সকল কথা হৃদয় মধ্যে আন্দোলন করতে করতে মনে সঞ্চয় করে রাখলেন। আর মেষপালকদিগকে যেরূপ বলা হয়েছিল, তাহারা তদ্রূপ সকলই দেখে-শুনে ঈশ্বরের প্রশংসা ও স্তবগান করতে করতে ফিরে আসল’’ [লূক লিখিত সুসমাচার ২:১-২০]
এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যীশুর জন্ম বেথেলহামে গোয়াল ঘরে হওয়া! কেননা পূর্বেই বর্ণিত ছিল মিকার্হ নবীর মধ্যে দিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন― “এহুদিয়া দেশের বেথেলহেম, এহুদিয়ার মধ্যে তুমি কোনোমতেই ছোট নও, কারণ তোমার মধ্যে থেকেই এমন একজন শাসনকর্তা আসবেন, যিনি আমার ইসরাইল জাতিকে পরিচালনা করবেন এই ভবিষ্যদ্বাণীটি করেছিলেন ঈশ্বর মির্কাহ নবীর মধ্যে দিয়ে মির্কাহ ২:৫ আর এর পূর্ণতা আমরা দেখতে পাই [মথি ২:১] এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মরিয়ম ও ইউসুফ কিন্তু গালীল প্রদেশে নাসরতের অধিবাসী ছিলেন। কিন্তু যীশুর জন্মের পূর্বে সম্রাট অগাস্টাস সিজার ঘোষণা করলেন সবাইকে নিজ নিজ এলাকায় গিয়ে তার নাম লেখাতে হবে (এটাকে আমরা আদমশুমারী বলতে পারি) মরিয়ম ও ইউসুফ ছিল নবী দায়ুদের বংশের লোক তাই তাদেরকে জেরুশালেমে গিয়ে নাম লেখাতে হবে। তাই তারা গালীলের প্রদেশের নাসরত থেকে এহুদিয়া প্রদেশের জেরুশালেমে গেলেন আর ঠিক সে সময়ই যীশুর জন্ম হলো এখানে মির্কাহ নবী ভাববাণী করে বলেছিলেন তিনি ইসরাইল জাতির রাজা হবেন। আর এ কথা এহুদিয়া প্রদেশের বাদশা হেরোদ জানতেন। যখন সেই পণ্ডিতেরা রাজার কাছে এসে যীশুর বিষয়ে বললেন এবং জিজ্ঞাস করলেন সেই খ্রীষ্ট কোথায় জন্মগ্রহণ করেছেন। পণ্ডিতেরা হয়তবা ভেবেছিলেন তিনি কোন রাজ প্রসাদে জন্মগ্রহণ করবেন। যখন রাজা মসীহের বিষয়ে জানতে পারলেন তখন তিনি অস্থির হয়ে উঠলেন তিনি সকল পণ্ডিতদের ডাকলেন এবং বললেন সেই মসীহ কোথায় জন্মিবেন? তখন তারা তাকে বললেন বেথেলহামে জন্মিবেন। আর কৌশলে রাজা পণ্ডিতদের বললেন আপনারা গিয়ে সেই শিশুটিকে দেখে এসে আমাকে বলেন, যাতে আমি গিয়েও সেই শিশুকে মাঠিতে উপুড় হয়ে সেজদা করতে পারি। কিন্তু স্বর্গদূত রাখালদের সাবধান করে দিলে পরে তারা আর রাজার কাছে ফিরে গেল না। ভিন্ন পথে দেশে চলে যান, আর রাজা হেরোদ এ বিষয় জানার পর ভীষণ রেগে যান, পণ্ডিতেরা তাকে ঠকিয়েছে বলে। তাই তিনি পণ্ডিতের কথা অনুয়ায়ী সে সময় হতে দুই বছরের নিচে যত শিশু ছিল সবাইকে হত্যা করার নিদের্ষ দেন। কেননা ঈশ্বর হয়রত ইয়ারমিয়া নবীর মাধ্যমে এই ভাববাণী করেছিলেন “রামায় ভীষণ কান্নাকাটির শব্দ শোনা যাচ্ছে; রাহেলা তার সন্তানদের জন্য কাঁদছে, কিছুতেই শান্ত হচ্ছে না, কারণ তারা আর নেই” [ইয়ারমিয়া ৩১:১৫] এই ঘটনার আগে স্বর্গদূত ইউসুফকে ভঃবি করেছিল তারা যেন শিশু যীশুকে নিয়ে মিশরে চলে যায়। মিশরে চলে গিয়ে শিশু যীশু রাজা হেরোদের হাত থেকে রেহাই পায়। রাজা হেরোদ মারা গেলে পরে তারা মিশর দেশ থেকে ফিরে এসে গালিল প্রদেশের নাশরত গ্রামে বাস করেছিলেন কেননা নবীদের মধ্যে দিয়ে এই কথা বলা হয়েছিল তাকে নাসরতীয় বলা হবে। “কাল পূর্ণ হলো” [গালাতীয় ৪:৫]।
যীশু যদি সত্যিই কোনো রাজপ্রসাদে জন্মগ্রহণ করতেন তাহলে সাধারণ মানুষ তাহার কাছে আসতে পারতেন না, কেননা তিনি সাধারণ মানুষের পাপের ক্ষমা করতে এসছেন। ঈশ্বর যেহেতেু শতভাগ পবিত্র, তাই তার পক্ষে কোন অপবিত্র মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা সম্ভব না। তাই ঈশ্বর সিন্ধান্ত নিলেন, হারিয়ে যাওয়া সম্পর্ক পুনঃউদ্ধারে তিনি তাঁর প্রিয় পুত্রকে এই পৃথিবীতে পাঠাবেন।
প্রভু যীশুর জন্ম কোনো ঐতিহাসিক পটভূমিতে লেখা নয় বরং আধ্যাত্মিক, যখন আমরা তাঁকে হৃদয়ে ধারণ করি তখন তিনি আমাদের জীবনে বাস্তব হয়ে উঠেন। যখন আমরা ভালোবেসে মানুষের মাঝে অকাতরে বিলিয়ে দেই তখন তিনি আমাদের হৃদয়ে জন্মগ্রহণ করেন। “মনে রেখ, ইবনে আদম সেবা পেতে আসেনি বরং সেবা করতে এসেছেন এবং অনেক লোকের মুক্তির মূল্য হিসাবে নিজের প্রাণ দিতে এসেছেন” [ইঞ্জিল শরীফ, মার্ক ১০:৪৫] এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা, মুক্তির মূল্য কিসের মুক্তি? একজন কয়াদীর কাছে তার কাছে আনন্দের দিন হচ্ছে, যে দিন সে মুক্তি পাবে, এ দিনের অপেক্ষায় সে থাকে, তার মুক্তির দিনেই হচ্ছে তার কাছে বড় দিন। ঠিক তেমনি মানুষ শয়তানের পাপ জগতে বন্দি ,আর এই পাপ জগত থেকে বেরিয়ে আসতে মুক্তিপর্ণ একটি মাধ্যম বা উপায় একারণে যীশুর মধ্যে দিয়ে সব পাপের মুক্তি পায়। তাই তাদের কাছে যীশুর জন্মদিনেই বড়দিন,তাদের কাছে সবচেয়ে আনন্দের দিন।
প্রতি বছর ঘুরে-ফিরে বড়দিন আসে, আমাদের এই বারতা দিয়ে যায়, মানুষ্যপুত্র দারিদ্রবেশ ধারণ করে এসেছিল এই ধরণীতে। তিনি মানুষকে ভালোবাসে অন্যান্য দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন। প্রভু যীশু এই পৃথিবীতে যে শান্তি স্থাপন করার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করিয়েছিলেন, তা ফিরে আসুক, পৃথিবীতে। মানুষ মানুষের জন্য, মানবতার সেবাই সবচেয়ে উত্তম ধর্ম। সব ধর্মই সম্প্রীতির কথা বলে। এ সম্প্রীতি বজায় রাখলেই বিশ্ব শান্তিময় হবে। মানুষে- মানুষে বন্ধুত্ব ও প্রীতি বাড়বে। একে-অপরের প্রতি শ্রদ্ধা বাড়বে। সমাজ শান্তি হবে, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা থামবে। ভালোবাসা দিয়েই থামাতে হবে হানাহানি। পৃথিবী হোক শান্তিময়, বন্ধ হোক সকল হানাহানি, ফিরে আসবে পৃথিবীতে শান্তি।
নাহিদ বাবু: খ্রীষ্টিয় ধর্মতত্ত্বে অধ্যয়নরত ও লেখক।





Users Today : 19
Views Today : 26
Total views : 175712
