পুনরুত্থান হলো পুনরায় জীবন পাওয়া বা লাভ করা। খ্রীষ্ট যন্ত্রণাভোগ করেছেন, মৃত্যুবরণ করেছেন এবং পুনরুত্থান করেছেন। এই পুনরুত্থানের ওপর ভিত্তি করেই খ্রীষ্টধর্ম প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। খ্রীষ্ট যে পুনরুত্থিত হয়েছেন তা ঐতিহাসিক সত্য। তিনি শিষ্যদের দেখা দিয়েছেন। এম্মাউসের পথে শিষ্যদের সঙ্গে যাত্রা করেছেন এবং রুটি ছেড়া অনুষ্ঠানে যোগদান করেছেন। যখন শিষ্যরা উপলব্দি করেছেন যীশু তাদের সঙ্গে রয়েছেন, চিনতে পেরেছেন, তখনই তিনি মিলিয়ে গেছেন। যীশুর পুনরুত্থান আমাদের প্রত্যেকের জন্য আনন্দ কারণ তার মধ্য দিয়ে আমরা নব জীবন পেয়েছি। আমাদের প্রত্যেকের জীবনে পুনরত্থান আসে বিভিন্ন আঙ্গিকে বিভিন্ন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে। তখন থেকেই আমরা নব জীবনের যাত্রা শুরু করি।
পুনরুত্থান বা পাস্কা পর্ব হলো নব জীবনের উৎসব। পাস্কা পর্ব পালনের পূর্বে আমরা পূণ্য দিবসত্রয়ের কথা স্মরণ করি। পূণ্যবৃহস্পতিবার—প্রভুর অন্তিম ভোজ বা শেষ ভোজ, পূণ্য শুক্রবার—যীশুর ক্রুশীয় মৃত্যু এবং পূণ্য শনিবার—নিস্তার জাগরনি। ইস্রায়েল জাতি কিভাবে মিশরের দাসত্ব থেকে ঈশ্বরের পরিকল্পনায় মুক্তি লাভ করেছে সেই কথা স্মরণ করি। ইস্রায়ের জাতি হল আমাদের প্রত্যেকের প্রতীক। তারা রাজনৈতিক থেকে আধ্যাত্মিক মুক্তি লাভ করেছে। আর আমরা যীশুর মৃত্যু ও পুনরুত্থানের মাধ্যমে আধ্যাত্মিক মুক্তি পেয়েছি। খ্রীষ্টের বাণী প্রথেমে ইহুদীদের কাছে প্রকাশিত হয়েছে তারা যেহেতু গ্রহণ করেনি পরবর্তীতে অইহুদী অর্থাৎ আমাদের সবার কাছে তা প্রকাশ করা হয়েছে। যারা তা গ্রহণ করবে এবং বিশ্বাস করবে সেই আঙ্গিকে জীবনযাপন করবে তারা পরিত্রাণ লাভ করবে। এর মধ্য দিয়ে আমরা সবাই পরিত্রাণ পেয়েছি। আমরা যে আধ্যাত্মিকতায় খ্রীষ্টেতে নব জন্ম লাভ করেছি এটাই হল আমাদর নব জীবনের আনন্দ। এটাই হল আমাদের জীবনে পুনরুত্থান। নতুনভাবে খ্রীষ্টেতে জীবন লাভ করা।
মাগ্দালার মারীয়া যখন যীশুর কবরে প্রবেশ করেন তখন শূন্য সমাধি দেখে তিনি ভয় পান। তিনি মনে করেছিলেন যীশুর দেহ চুরি করা হয়েছে। শিষ্যরাও দৌড়ে এসে তাই দেখলেন সমাধি শূন্য। যখন যীশু বাগানে দেখা দিলেন তখন তাদের দুঃখ আনন্দে পরিণত হলো। ঠিক তেমনিভাবে যখন আমরা বিপদের মধ্যে থাকি তখন অন্ধকার দেখি। সবকিছু শূন্য মনে হয়। যখন যীশুর আশীর্বাদে সেই বিপদ থেকে মুক্ত হই বা শূন্যতা কেটে যায় তখন আনন্দেপূর্ণ হয়। যীশু ছাড়া আমাদের জীবন হতাশাময়। যীশু যখন আমাদের জীবনে থাকে তখন জীবন আনন্দময়। আমাদের জীবনের মাঝি হলেন পুনরুত্থিত খ্রীষ্ট। তিনিই আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যান। আমাদের জীবনের সমস্ত তমসা দূর করেন।
পুনরুত্থিত খ্রীষ্ট আমাদের জীবনে আশার প্রতীক। যারা নিরাশার মধ্যে থাকে তাদের জীবন বিষাদময়। বিশ্বাসময় জীবনে খ্রীষ্টই আমাদের আশার আলো দেখান। বর্তমান পৃথিবীতে মানুষ অনেক কিছু নিয়ে ব্যস্ত। তারা পুনরুত্থিত খ্রীষ্টকে দেখতে পান না। পুনরুত্থিত খ্রীষ্টকে দেখার পরিবর্তে অন্য কিছু দেখে। তারা খ্রীষ্টের জন্য সময় দেয় না। আর এই কারণে দেখা যায় পরিবারে অশান্তি, ঝগড়া-বিবাদ, হতাশা-নিরাশা, বিচ্ছিন্নতা এবং আত্ম-হত্যার প্রবণতা। এর মূল কারণ হলো আমরা পুনরুত্থিত খ্রীষ্টের আনন্দ হৃদয়ে উপলব্দি করতে পারছি না। আমরা আমাদের হৃদয় দূয়ার বন্ধ করে রাখছি। বন্ধ দুয়ার দিয়ে খ্রীষ্ট আমাদের অন্তরে প্রবেশ করতে পারছে না। তাই আমাদের হৃদয় খুলতে হবে যেন পুনরুত্থিত খ্রীষ্ট আমার অন্তর আত্মায় রাজত্ব করেন। যীশু আমাদের জীবনে আলো হয়ে কাজ করেন। তাই পাস্কা প্রদীপ পুনরুত্থিত খ্রীষ্টের প্রতীক। এর আলোর মধ্য দিয়ে আমাদের অন্তর আত্মা আলোকিত করতে হবে। যেন মনের তমসা দূরীভূত হয়। জীবনে যতই ঝড়-ঝঞ্ঝা আসুক না কেন আমাদের পুনরুত্থিত খ্রীষ্টের প্রতি আশা রাখতে হবে। যেন আমরা পুনরুত্থিত খ্রীষ্টের আনন্দ উপলব্দি করি। নিজেরা খ্রীষ্টের সাথে পুনরুত্থিত হই।
পুনরুত্থান হলো আনন্দের উৎসব। এই পুনরুত্থানকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন ধরনের উৎসবের আয়োজন করা হয়। এই উৎসবের মধ্য দিয়ে মানুষ নতুনভাবে উৎসাহ প্রেরণা লাভ করে। এই প্রেরণা লাভ করাই হলো কারো কারো জন্যে নতুন জীবন পাওয়া। যখন মানুষ কর্মজগতে ব্যস্ত থাকে তখন মানুষ আস্তে আস্তে ক্লান্ত-শ্রান্ত হয়ে পড়ে তখন তার জন্যে বিরতির প্রয়োজন। এই বিরতির জন্যে নাড়ীর টানে অনেকে শিকড়ের সন্ধানে পরিবারের কাছে ছুটে যায়। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগ দান করে। এখান থেকে ঈশ্বরের আশীর্বাদ লাভ করে। আবার নতুনভাবে জীবন শুরু করে। আমরা যে কোন মুহূর্তে নতুনভাবে জীবন শুরু করতে পারি। কেউ যদি পাপের অবস্থায় থাকে যখন সে মন পরিবর্তন করে তখন সে নতুন জীবন লাভ করে। যখন মানুষ দুর্ঘটনায় পতিত হয় সেখান থেকে রক্ষা পায়। এর পরে যে জীবন শুরু করবে তাই হল তার নতুন জীবন লাভ। পুনরুত্থিত খ্রীষ্ট আমাদের প্রত্যেকে আহ্বান করে নতুন ভাবে জীবন শুরু করতে।
পুনরুত্থান হলো পাথর সরানোর উৎসব। যীশুর সমাধিতে প্রবেশের পূর্বে শিষ্যরা কবর থেকে পাথর সড়িয়েছে। ঠিক তেমনিভাবে আমাদের হৃদয় থেকে আমাদের পাথর সড়াতে হবে। এই পাথর হলো আমাদের অহংকার, পাপময় অবস্থা, যাদের ক্ষমা করতে পারি না তাদের ক্ষমা করা, যাদের দেখতে পারি না বা ঘৃণা করি তাদের ভালবাসা। নম্র হওয়া, ধৈর্য ধরা। মূল কথা যখন খ্রীষ্টিয় মূল্যবোধের মধ্য দিয়ে জীবনকে পরিচালিত করি তাই হলো আমাদের নব জীবনের পথে চলা। আমরা যেকোনো সময় থেকে এই নব জীবনের পথে চলা শুরু করতে পারি। এই নব জীবনের পথে চলার জন্য যীশু সর্বদা আমাদের আহ্বান করেন। আমরা যেন পুনরুত্থানের আনন্দে নব জীবনের পথে চলি। অন্যদের যেন সেই পথে চলতে উৎসাহিত করি।





Users Today : 39
Views Today : 41
Total views : 177683
