এই প্রেরিত পত্রটি যেন একটা খ্রীষ্ট আন্দোলনের কাহিনী। অন্দোলন বলতে আমরা যেটা সাধারণভাবে বুঝি এটা আসলে তেমনটা নয়। কেননা আন্দোলনে সাধারণভাবেই দেখা যায় ভাঙচুর, রাস্তা ঘাট বন্ধ, হরতাল, অবরোধ, আগুনে পোড়ানো আরো কত কিছুই না দেখি আজকের সমাজে আর সব কিছুই যেন এক শ্রেণীর মানুষের স্বার্থ হাসিলের জন্যই হয়। একজনকে বা একটা গোষ্ঠিকে ধ্বংস করে কীভাবে নিজের ফায়দা লুটে নেওয়া যায সেটাই হলো বর্তমান আন্দোলন। আমরা সবাই জয়ী হতে চাই কিন্তু স্থান তো খুবই সামান্য। জয়ী হতে প্রস্তুতি দরকার আর প্রস্তুতি আত্মবিশ্বাস তৈরি করে। তাই তো কোনো কাজের প্রস্তুতির প্রথম কাজ হলো পরিকল্পনা করা ও সেই কাজের অনুশীলন করা। ভুল হতেই পারে। আবার সেই ভুল থেকে আমাদের শিক্ষা নেওয়া এবং সংশোধনের পথে এগুনোই ভালো। আর সেটা সংশোধন করতে পারে একজন ভালো শিক্ষক। যদিও কথাটা সত্য হবে কিনা জানি না তবে আমার সামনে কোনো সময় যদি ঈশ্বর ও শিক্ষক এসে দাঁড়িয়ে যায় তবে আমি কিন্তু আমার স্যালুটটা শিক্ষককেই দেব কেননা ভালো শিক্ষকই আমাকে ঈশ্বরকে চিনিয়েছেন। নইলে হয়ত শয়তানকেই ঈশ্বর বলে মনে করতাম। আর এই ভুলটা যে এখন হচ্ছে না তা কিন্তু নয়। আর তাই তো মানব মুক্তির আন্দোলন না করে নিজের আখের গোছানোর আন্দোলনে যেন ব্যস্ত হয়েছি আমরা। সেই প্রেরিত আন্দোলনটা ছিল ধ্বংসকামী বা হুমকিস্বরূপ নয়। বর্তমানের মতো আখের গোছানোর নয়। আর সেটা ছিলো সুসমাচারের আন্দোলন। মুক্তির আন্দোলন।
আর অন্য কারো কাছে পরিত্রাণ নেই। কেননা আকাশের নীচে মানুষ্যদের মধ্যে দত্ত এমন আর কোনো নাম নেই যে নামে পরিত্রাণ পাওয়া যায়। (প্রেরিত ৪ : ১২) এটাই ছিল সেই পরিত্রাণের আন্দোলন। যেটা ছিল মানুষের একমাত্র পাপ মুক্তির ব্যবস্থার আন্দোলন। আর সেটা হয়েছিল যীশুর মৃত্যুর অনেক পরে। যীশুর মৃত্যুর পরে যখন সবাই দুঃখ করছিল তখন এই বাক্যই এলো যে, ‘‘তোমরা যীরুশালেম থেকে যেও না। পিতার অঙ্গীকৃত দান সেই পবিত্র আত্মার অপেক্ষায় থাকো।… মন ফেরাও। স্বর্গ রাজ্য নিকটবর্তী।’’
মন ফেরানো বড়ো কঠিন কাজ। সংসার, সমাজ, পরিবার, গ্রাম, নিজের কর্ম। সব কিছুতেই যেন মন ফিরাতে বাধা আছে এবং থাকবেই। অনেকেই আছি যারা বাহ্যিক পরিবর্তনে বিশ্বাসী। আমাদের বাহ্যিক পরিবর্তন এমনিতেই দেখা যাবে যখন আমাদের ভেতরের পরিবর্তন হবে। তাই সবার আগে ভেতরের পরিবর্তন দরকার। একটা কাচের গ্লাস ভেতর দিকে পরিষ্কার করতে গেলে বাহিরে এমনিতেই পরিষ্কার হয়ে যায়। যদি আমরা ভেতরে পরিষ্কৃত হই তবেই তো তিনি আমার ডাকে সাড়া দেবেন। যেমনটি লেবীয় পুস্তকে তিনি বলেছেন, ‘‘আমি তোমার মধ্যে গমনাগমন করব। তোমাদের ঈশ্বর হবো। আর তোমরা আমার প্রজা হবে।’’ তার মানে প্রজা সহজে হওয়া যায় না। ইচ্ছা করলেই ভালো কোনো দলের সদশ্য হওয়া যায় না যদি না সেই দল তাকে মনোনীত করে। বর্তমানে নিবন্ধন পেতে গলাবাজী, তেলবাজী, আর অর্থই যথেষ্ট। মানে সহজেই মনোনীত হওয়া যায়। বুদ্ধ অহিংসা ও সাম্যের বাণী প্রচার করেছেন। জন্ম হোক যথাতথা কর্ম হোক ভালো। এই বিদ্যা যেন আজ অবিদ্যায় ঢেকে গেছে। আমাদের নৈতিক শক্তি আজ আর কাজ করে না। লালসা, কামনা, বাসনা, লোভ, দ্বেষ, মোহ ব্যর্থতা, হতাশা, যেন একসাথে আকড়ে ধরেছে। কোনো ভালো লোকের মূল্য আর এই সময়ে নেই। আমরা যদি আমাদের প্রতিদিনের কাজ কে ক্যামেরাতে রেকর্ড করে দিনের শেষে দেখতে পারতাম তবে হয়ত কিছুটা হলেও লজ্জা পেতাম। কেননা বুঝতে পারতাম যে আমার এই মনটা কতটা বিশ্রী কাজই না করলো সারাদিনে। সারাজীবন লালন করছি রাগ ও লোভকে। যা আমাদের সবকিছুকেই নষ্ট করে দিচ্ছে। তাই তো নিজেকেই ভাবতে হবে ধর্ম জীবনে আমার নিজের ভবিষ্যত কি। নিজের গ্রন্থ থেকেই খুঁজে বের করতে হবে। শুধু কল্পনা নিয়ে থেকে বা বংশের দিকে চেয়ে ধর্মের আসল স্বাদ কখনো পাওয়া যাবে না।
ছাত্রজীবনের শুরু থেকেই আমি পেয়েছি অনেক আদর্শ শিক্ষককে। যারা ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে অনেক আদর্শের গল্প আমাদের শোনাতেন। সবাই আমার শ্রদ্ধেয়। অনেক ভালো ও মন্দের পার্থক্য আমি তাঁদের কাছ থেকে শিখেছি। আসলে সেই সময় আমাদের শিক্ষকদের মধ্যে সবাই আদর্শিক ছিলেন। আমার শিক্ষকদের মধ্যে আমি যাদেরকে একটু বেশি আদর্শিক পেয়েছিলাম তারা সবাই আমার বাবার ছাত্র ছিলেন। আমার বাবা অখিল মজুমদার ছিলেন একজন আদর্শ শিক্ষক। আমাদের প্রথম অক্ষর হতেখড়ি হয়েছিল তার কাছেই। আমার শিক্ষকদের কাছ থেকে আমি কোনোদিন সেই আন্দোলনের কথা শুনিনি যা মানুষের কোন ক্ষতি করে। অথচ আজ সম্পূর্ণ উল্টো চিত্র। যদি কোনো শিক্ষক ক্ষমতাশীন দলীয় রাজনীতির সাথে যুক্ত থাকে তবে তার ক্লাস থেকে শুরু করে সব কিছুই মাফ হয়ে যায়। আমার বাবাকে স্কুল কামাই করতে দেখিনি। বাবার যারা ছাত্র ছিলেন আবার আমার শিক্ষক ছিলেন তারাও কামাই করেনি। তারা একটা আদর্শ নিয়ে চলতেন। সেই সময় থেকেই ভালোবাসা ছিল কমিউনিষ্টের আদর্শের প্রতি। কমিউনিষ্ট মানেই তো হলো অন্তরঙ্গ সঙ্গী বা সহকর্মী বা সহযোগী যাদেরকে কমরেড বলা হয়। এখনো এক শ্রেণীর মানুষ মনে করে কমিউনিষ্টরা ধর্ম মানে না। আসলে তা নয়। তারা ধর্মের আসল সত্যটুকু মানে। চিটা দিয়ে ব্যগ বোঝাই করে রাখে না তারা। দানাদার বীজটুকুই সযত্নে লালন করে। আমরা ঈশ্বরের সৃষ্ট মানুষ। অনেক সযত্নে তিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন। তারা সৃষ্টিকে ঘৃণা করতে বা ফাঁকি দিতে নয়। তারা সবসময় মুক্ত মানুষের মুক্ত চিন্তার সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্যই আহুত। তাদের কাছে নিজের চেয়ে জনগণ ও দেশের স্বার্থই বড়ো। আজ আমরা যারা সত্যের দলে মনোনীত তারা গম বা চালের জন্য নয়। অর্থের জন্য নয়। গণ-মানুষের শুধু অর্থনৈতিক মুক্তিই নয়, ঈশ্বরেরর দান প্রেম দিয়ে, ভালোবাসা দিয়ে খাঁটি মানুষ তৈরিতে সাহায্য করার চেষ্টায় রত থাকতে চেষ্টা করি।কিছুদিন আগে আমাদের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নূরানী চেহারার একজন ড্রাইভারের বাড়ির দরজাসহ যা কিছু দেখলাম পত্রিকায় তাতে তো মনে হয় মনোনীতের রাস্তা হয়ত পরিবর্তন হয়ে গেছে। এতা সুন্দর চেহারা ঈশ্বর তাকে দিয়েছেন কি এই কাজ করার জন্যে। তিনি মনোনয়ন পেয়েছেন জাগতিকতায়। আর তা হলো সামান্য সময়ের জন্য। হয়ত ৫/১০ বছরের মধ্যেই মনোনয়নের সব ডুবে যায়। কত সুন্দর সুন্দর নামের ও চেহারার মানুষগুলো আজ বিকৃত মানসিকতার।
জাগতিক লাভের জন্য ঈশ্বর আমাদেরকে মনোনয়ন দেয়নি। চিরস্থায়ী মনোয়নে মনোনীত করেছেন। তাই আমাদের সব সময় সতর্ক থাকতে হবে। তাই তো আমাদের যেমন এই পৃথিবীতে মুক্তি দরকার তেমন মৃত্যুর পরেও মুক্তি দরকার। কলশীয় পত্রে (১ : ১৪ -১৭) বলেছেন, ‘‘ইহাতেই আমরা মুক্তি ও পাপের মোচন পাইয়াছি। ইনিই অদৃশ্য ঈশ্বরের প্রতিমূর্তি সমুদয় সৃষ্টির প্রথম জাত।’’ কে সে? যিনি আমার মুক্তি নিয়ে ভাবেন। আজ কি আমরা তাঁর ডাক শুনতে পাই? যদি সত্যিই পেতাম তবে কি সামান্য কয়দিনের জন্য এত সম্পদের পাহাড় গড়ার কাজে বিভোর থাকতে পারতাম। কবি কামিনী রায় তার চেতনা থেকে লিখেছিলেন, ‘‘আপনারে লয়ে বিব্রত রহিতে আসে নাই কেহ অবনির পরে, সকলের তরে সকলে মোরা প্রত্যকে মোরা পরের তরে।” বর্তমান সময়ে যেন সকলের তরে সকলে নয় মোরা, প্রত্যকেই মোরা নিজের তরে।
অলোক মজুমদার : চিকিৎসক ও লেখক।





Users Today : 26
Views Today : 28
Total views : 177670
