ভবিষ্যত বাণীই অক্ষরে অক্ষরে প্রতিফলিত হয়েছে। প্রভু যীশু খ্রিষ্টের জন্ম, কর্ম, শিক্ষা, মৃত্যু, পুনরুত্থান এবং প্রত্যাবর্তন সম্পর্কে পবিত্র শাস্ত্রে অজস্রবার ভবিষ্যৎ বাণী করা হয়ে। মৃত্যুকে পরাজিত করে খ্রিষ্টের পুনরুত্থানের দিন কয়েকের মধ্যেই তাঁরই শিষ্য সন্দেহের তীর ছুঁড়ে দিয়েছিলেন। তাঁর চ্যালেঞ্জের সম্মুখে অন্য শিষ্যেরা কিংবা ইতোপূর্বে যাদেরকে দেখা দিয়েছেন, প্রত্যেকেই হতবুদ্ধি হয়েছিলেন। যাঁর সাথে সাড়ে তিন বছর ঘুরে বেড়িয়েছেন, স্বচক্ষে অবলোকন করেছেন—জন্মান্ধকে চোখের আলো ফিরিয়ে দিয়েছেন, খঞ্জকে হাঁটার শক্তি দিয়েছেন, অসুস্থ-পীড়িতকে সুস্থ করেছেন; ভূতগ্রস্তকে ছাড়িয়েছেন, উত্তাল সাগরকে ধমকে শান্ত করেছেন, মৃতকে জীবন দিয়েছেন; এতকিছু দৃষ্টান্ত দেখার পরও মন সাঁই দিচ্ছিল না যে প্রভু যিশু খ্রিষ্ট পুনরুত্থিত হয়েছেন! মৃত্যুকে পরাজিত করে পুনরুত্থান, সেটি অসম্ভব! অন্যতম শিষ্য থোমা দাম্ভিকতার সাথেই উচ্চারণ করেছেন, ‘…আমি যদি তাঁহার দুই হাতে প্রেকের চিহ্ন না দেখি, ও সেই প্রেকের স্থানে আমার অঙ্গুলি না দিই, এবং তাঁহার কুক্ষিদেশ মধ্যে আমরা হাত না দিই, তবে কোন মতে বিশ্বাস করিব না’ (যোহন ২০:২৫)। সত্যি সত্যিই প্রভু যিশু খ্রিষ্ট থোমার ইচ্ছাকে পূর্ণ করেছিলেন, দেখা দিয়েছিলেন; কুক্ষিদেশ দেখিয়ে, হাত বাড়িয়ে দিয়ে স্পর্শ করতে আহ্বান জানালেন। অনুতপ্ত হৃদয়ে কৃতজ্ঞতায় থোমা বললেন, ‘প্রভু আমার, ঈশ্বর আমার’ (যোহন ২০:২৮)। পরবর্তীকালে ৪৯ খ্রিষ্টাব্দে সাধু থোমা কিসের সাহসে সাহসিত হয়ে সাত-সমুদ্র তের নদী পাড়ি দিয়ে ভারতবর্ষে হাজির হয়েছিলেন? প্রভু যিশু খ্রিষ্টকে ভালোবেসে, তাঁর আদর্শকে ছড়িয়ে দিতে, পৃথিবীর প্রান্ত পর্যন্ত পৌঁছাতে প্রত্যেকটি শিষ্য সাক্ষ্যমর হয়েছেন। পুনরুত্থিত যিশুর দিব্য দর্শন ও আত্মিক ক্ষমতা ভীতু শিষ্যদেরকে সাহসিত করে তুলেছিলো। রোমান সাম্রাজ্যের অত্যাচার-নির্যাতন, কারাভোগ, হত্যা কোনো কিছুতেই পুনরুত্থিত যিশু খ্রিষ্টের প্রচারিত আদর্শকে থামাতে পারেনি। যিশু খ্রিষ্ট জাগতিক মৃত্যুকে জয় করে বিজয়ী বেশে পুনরুত্থিত হয়েছেন, তাইতো শিষ্যেরা গুরুর পদাঙ্ক অনুসরণ করে মৃত্যুকে গুরুত্বহীন করেছেন। মৃত্যুর পরাজয়কে নিশ্চিত করে আজো খ্রিষ্টের সৈনিকরা মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে তাঁর ভালোবাসার বাণী বহন করে চলেছেন।
রোম সম্র্রাটের প্রশিক্ষিত সৈন্যসামন্ত এবং খ্রিষ্ট বিদ্বেষী ধর্মবেত্তারা সক্রিয়তার সাথেই যিশু খ্রিষ্টের কবরস্থ ও পুনরুত্থানের বিষয়টি তত্ত্বাবধান করছিলেন। সপ্তাহের প্রথম দিন রবিবারে সূর্যের আলো পরিষ্কার হওয়ার পূর্বেই সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্তরা আবিষ্কার করলেন শূন্য কবরের। কবরের মুখে থাকা বড় পাথরের গুড়িটি কেউ যেন সরিয়ে দিয়েছে এবং মৃদু ভুমিকম্পও অনুভূত হয়েছে। ধর্মবেত্তারা পরাজয়কে ঠেকাতে সৈন্যদের সত্য বলা থেকে বিরত থাকতে পরামর্শ দিয়েছিলেন। সৈন্যদের সমূহ শাস্তি ও প্রশাসনকে ম্যানেজ করার দায়িত্ব নিয়ে ধর্মবেত্তারা কৌশলের আশ্রয় নিয়েছিলেন। অর্থের বিনিময়ে প্রহরী সৈন্যরা বলেছিলো, ‘আমরা রাতে যখন ঘুমাচ্ছিলাম, তখন তাঁর শিষ্যরা এসে তাঁকে চুরি করে নিয়ে গেছে’ (মথি ২৮:১৩)। শূন্য কবরই প্রমাণ করে প্রভু যিশু খ্রিষ্ট কবরে নেই, তিনি পুনরুত্থিত হয়েছেন।
সেদিন আবছা আলোয় একদল নারী কবরের মুখে রওনা হয়েছেন, কাছে গিয়ে দেখলেন কবরের মুখ খোলা। সন্দেহ মনে চিন্তার উদ্রেক হলো, নিশ্চয়ই যিশুর দেহ চুরি হয়ে গেছে। সন্দেহের সময়কে দীর্ঘায়ু হতে দেন নি, দেরী না করেই প্রভু যীশু খ্রিষ্ট মগলিনী মরিয়মকে দেখা দিলেন (মার্ক ১৬: ৯-১১); ক্ষণমুহূর্তেই সঙ্গে থাকা আরো অন্যান্য মহিলাদের দেখা দিয়ে বললেন, ‘তোমাদের মঙ্গল হোক’ (মথি ২৮:৯-১০); ক্লিয়পা ও অন্যজন শিষ্য যিরূশালেম থেকে সাত মাইল দূরত্বের গ্রামে যাবার প্রাক্কালে যিশুর সাথে কথোপকথন হয় এবং সন্ধ্যায় নিজেদের সাথে থাকার জোরাজুরি করলে ঠিক খাবার সময় ধন্যবাদ ও প্রার্থনাকালীন যিশুকে চিনতে পেরেছিলেন। সুসমাচার লেখক লূক বর্ণনা করেছেন, ‘তখন তাদের চোখ খুলে গেল, তাঁরা যিশুকে চিনতে পারলেন’ (লূক ২৪:৩১)। যিশু তাঁর শিষ্য শিমোনকে দেখা দিয়েছেন (লূক ২৪:৩৪); পুনরুত্থানের দিনের বাকী শিষ্যেরা যখন মিশ্র অনুভূতিতে দ্বিধাবিভক্ত, সে সময় খ্রিষ্ট আবার তাদের মাঝে উপস্থিত হলেন। ‘তোমাদের শান্তি হোক’ সম্ভাষণ আরো বিষন্ন করে তুলল, পরবর্তীতে তাদের সাথে খাদ্য খেয়ে শাস্ত্রের মর্মার্থ ব্যাখ্যা করলেন (লূক ২৪:৩৬-৪৯)। দিন যতই গড়িয়েছে, দেখা দিয়েছেন তাঁর অনুসারীদেরকে। পরবর্তী রবিবার আবারো শিষ্যদের দেখা দিলেন, সে সময় শিষ্যেরা কুঠরিতে মিলিত হয়েছিলেন (যোহন ২০:৩১)। শিষ্যেরা যে হতাশা-নিরাশায় ভুগছিলেন, সেটি বোঝা যায় পুরানো পেশায় ফিরে যাওয়ায়। গালীল সমুদ্রে মাছ ধরার নেশায় রাতভর পরিশ্রমের পর ব্যর্থ মনোরথে জাল জড়াচ্ছিলেন, সে সময় প্রভু যিশু খ্রিষ্ট আবারও হাজির হয়েছেন। তাঁর ভালোবাসার শিষ্য পিতরই যিশুকে চিনতে পারলেন, বললেন, ‘উনি প্রভু’। এবার সংখ্যা বাড়িয়ে প্রায় পাঁচ শতাধিক মানুষকে দেখা দিলেন যিশু (১ম করিন্থীয় ১৫:৬) এবং শেষান্তে স্বর্গে উন্নীতের সময় শিষ্যদের কাছ থেকে বিদায় নিয়েছিলেন জৈতুন পর্বতের পাদদেশ থেকে।
তাঁর এই বিজয়ী পুনরুত্থান খ্রিষ্টধর্মের অন্যতম স্তম্ভ। খ্রিষ্টের পুনরুত্থানই খ্রিষ্টধর্ম প্রসার লাভের উৎস। প্রেরিত পৌল যিনি দম্মেশক যাবার পথিমধ্যে দর্শনে দেখেছিলেন যিশুকে, তিনিই সর্বাধিক খ্রিষ্টধর্মের প্রসার করিয়েছেন। এক পত্রে অভিজ্ঞতার আলোকে বিশ্বাসীদের লিখেছেন, ‘বাস্তবিক খ্রিষ্ট মৃতগণের মধ্য হইতে উত্থাপিত হইয়াছেন, তিনি নিদ্রাগতদের অগ্রিমাংস।…কারণ আদমে যেমন সকলে মরে, তেমনি আবার খ্রিষ্টেই সকলে জীবনপ্রাপ্ত হইবে’ (১ম করিন্থীয় ১৫: ২০-২২)। প্রভু যিশু খ্রিষ্টের পুনরুত্থান সম্পর্কে পবিত্র বাইবেলে আরো অনেক সত্য ও তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে, প্রমাণিত হয়েছে তিনি মৃত্যুঞ্জয়ী। মৃত্যুকে পরাভূত করবেন বলেই তিনি শোনালেন, ‘আমি জীবিত আছি, সেজন্য তোমরাও জীবিত থাকবে’ (যোহন ১৪:১৯)। মরণকে জয় করে তিনি আমাদের আত্মাকে অমরত্বে উন্নীত করলেন।
পুনরুত্থানের শক্তিতেই জেলে, করগ্রাহী ও সমাজের নিচু শ্রেণীর শিষ্যেরা সর্বত্রই ছড়িয়ে পড়েছিলেন। শাসকের রক্তচক্ষুকে পরোয়া করেনি, মৃত্যুভয় তাদেরকে পিছুপা হতে দেয়নি। প্রেরিত পৌল সহসা বলেছেন, “মৃত্যু জয়ে কবলিত হইল,’। ‘মৃত্যু তোমার জয় কেথায়? মৃত্যু, তোমার হুল কোথায়? মৃত্যুর হুল পাপ, ও পাপের বল ব্যবস্থা। কিন্তু ঈশ্বরের ধন্যবাদ হউক, তিনি আমাদের প্রভু যিশু খ্রিষ্ট দ্বারা আমাদেরকে জয় প্রদান করেন” (১ম করিন্থীয় ১৫:৫৫-৫৭)। কবির ভাষায়,





Users Today : 22
Views Today : 24
Total views : 177666
