মানুষের জীবন থেকে সৌন্দর্যবোধ যেন হারিয়ে যাচ্ছে দিন দিন। মুক্তবাজার অর্থনীতির করালগ্রাস মানুষকে এমনভাবে উদরস্ত করছে, আজ মানুষ যেন তার সত্তা হারাতে বসেছে। হিন্দু পুরাণে শ্রীকৃষ্ণের একটি উক্তি ছিল এইভাবে “মারি অরি পারি যে কৌশলে” শত্রু নিধন করতে গিয়ে আমরা বিভিন্ন ছলাকলার আশ্রয় নিয়ে থাকি। শত্রু নিধনের ক্ষেত্রে যে কৌশলটি প্রয়োগ যা আয়েস করা যায় সর্বক্ষেত্রে সেই কৌশলটি খাটে না। মুক্তবাজার অর্থনীতির যুগে আমাদের প্রত্যেকের মধ্যে একটা প্রতিযোগী মনোভাবের সৃষ্টি হয়। সে ক্ষেত্রে আমার প্রতিযোগী আমার শত্রু নয়। প্রতিযোগী ধ্বংস করতে হলে আমার ধ্বংসও যে অনিবার্য সে কথা প্রয়াশয় ভুলে যাই। কৌশল খাটতে গিয়ে আমরা নিজেদেরকে দিন দিন একাকিত্বের দিকে ঠেলে দেই, হঠাৎ করে আবিষ্কার করি আমি বন্ধুহীন হয়েছি। ব্যবসায় লাভের জন্যে আমরা কৌশলী হতে পারি। তাই বলে মানুষকে ঠকাবার জন্যে নয়। আজ আমরা কৌশল নিয়ে খেলতে গিয়ে এমন এক স্তরে পৌঁছে যাচ্ছি আমরা আর কৌশল প্রয়োগ করতে পারছি না বরং কৌশলই আমাদেরকে প্রয়োগ করতে শিখাচ্ছে। আরও একটু স্পষ্ট করে বললে বলা যায় যে লাভের আশায় কৌশল করে আমার উৎপাদিত বস্তুর মূল্য বৃদ্ধি ঘটিয়ে দিলাম। আমার উৎপাদিত বস্তুটি যদি একাই রাজত্ব করে মানুষ যদি বাধ্য হয়ে অন্য উপায় না দেখে তাহলে চড়া দাম দিয়ে আমার বস্তুটি কিনতে বাধ্য হবে বৈকি। রমজানের সময় সমস্ত বস্তুর দাম বেড়ে যায়। সেই দাম আর কখনই পূর্বের দামে ফিরে যায় না, চড়া দামই একদিন আমাদের গ্রাহ্য হয়ে যায়। আমরা চড়া দামে কিনতে অভস্ত হয়ে পড়ি এবং এভাবেই অহেতুক মূল্য বৃদ্ধিকে আমাদের নৈতিক বৃদ্ধি বলে মেনে নেই। একবার পশ্চিমবঙ্গে পেঁয়াজের দাম হঠাৎ করে বেড়ে যায়। যাদের কাছে পেঁয়াজের মজুদ বেশি ছিল অধিক মুনাফা লাভের আশায় তারা পেঁয়াজের দাম আরও বাড়িয়ে দেয় বাঙালি মাত্রই আমরা সুস্বাধু খাবার খেতে পছন্দ করি। সেই সুস্বাধু খাবার তৈরিতে পেঁয়াজের ভূমিকা অপরিসীম। সরকার বিদেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানি করতে বাধ্য হয়। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মানুষ এতটাই সচেতন যে মুনাফা লোভী ব্যবসায়ীদের উপযুক্ত শিক্ষা দিয়ে দেয়। উচ্চ দামের ফলে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিরা পেঁয়াজ খাওয়া বন্ধ করে দেয়। আমদানীকৃত বস্তা বস্তা পেঁয়াজ আড়তে বসে পঁচতে থাকে, পেঁয়াজ আর বিক্রি হয় না। শেষে মূল্য কমিয়ে লোকসান দিয়ে সেই পেঁয়াজ বিক্রি করতে তারা বাধ্য হয়। তারপর থেকে ভারতীয় ব্যবসায়ীরা যেকোনো পণ্যের মূল্য হঠাৎ করে বেশি বাড়িয়ে দেয় না। আমাদের দেশেও অনুরূপ সচেতনাতা প্রকাশের একান্তই প্রয়োজন।
ইদানীং মূল্য বৃদ্ধির সাথে ভেজাল বৃদ্ধির এক নতুন উপক্রম শুরু হয়েছে। জীবন রক্ষাকারী পানিতে ভেজাল, দুধের মধ্যে এন্টিবায়োটিকের প্রকোপ আমাদের জীবনকে দূষিত করছে। দ্বিতীয় দফার পরীক্ষায় পাস্তুরিত ও অপাস্তুরিত দুধের ১০টি নমুনার সবগুলোতেই মানবদেহের চিকিৎসায় ব্যবহৃত এন্টিবায়োটিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়ে এ তথ্য জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োমেডিকেল রিসার্চ সেন্টারের সদ্য সাবেক পরিচালক অধ্যাপক আ ব ম ফারুক। এই নিয়ে কার দোষ কার ঘারে দেওয়া যায় তার প্রতিযোগিতা চলছে। কিন্তু আমজনতা যূপকাষ্ঠে পড়ে যে বলি হচ্ছে তার খবর কে রাখে। ওয়াসার পানির মধ্যে যে নোংরা ও দুর্গন্ধ তার প্রমাণ অনেকবার দেয়া হয়েছে। ওয়াসার চেয়ারম্যানের অফিসে গিয়েও জনতা হানা দিয়ে তার কোনো প্রতিকার পায়নি। তারপরেও কারও কোনো ভাবান্তর নেই। উপরন্তু চেয়ারম্যান সাহেব ঘোষণা করেছেন “আমাদের সবরাহকৃত পানি শতভাগ বিশুদ্ধ” এত কিছুর পরেও ওয়াসার চেয়ারম্যান সাহেব যে ঔদ্ধত্য ও দাম্ভিকতা দেখিয়েছেন তার জন্য তিনি হয়ত কোনো পুরস্কার পেয়ে যেতে পারেন। তাহলে ব্যাপারটা দাঁড়ালো কী? প্রতিবাদ করে কোনো ফল লাভ তো হলোই না বরং চেয়ারম্যান সাহেব তার চাকরি বাঁচিয়ে নির্লজ্জভাবে কাজ করে যাচ্ছে। কোনো এক ব্যক্তি ব্যবস্থাপনা প্রশিক্ষণে (পারসোনাল ম্যানেজমেন্ট) কোনো বক্তা বলেছিলেন, সম্মানিত কোনো লোককে শিক্ষা দিতে হলে তার সম্মানের ওপর কিছু আঁচর ফেলতে হবে তাহলে তার প্রকৃত শিক্ষা হয়ে যাবে। সম্মানিত কোনো লোক তার সম্মানের ওপরে কোনো আঘাত সহ্য করতে পারে না। কিন্তু এই ব্যাপারে ওয়াসার চেয়ারম্যানের কোনো লজ্জা আছে বলে মনে হয় না।
বাজার ব্যবস্থাপনায় একটা কথা বেশ প্রচলিত আছে। Every day the world is becoming more noisier place, The more you shout The more you sell. ভেজাল বাণিজ্যে এত সয়লাব হয়ে গেছে যে সবকিছু ভেজালময় হয়ে গেছে। আমাদের এখন বলতে শিখতে হবে, সবার ওপরে ভেজাল সত্য তাহার ওপরে নাই। মানুষ ও মনুষ্যত্বের মধ্যে ভেজালের এতটাই অনুপ্রবেশ ঘটেছে যে মানুষের মধ্যে মনুষত্ব খুঁজে পাওয়াই আজ একান্ত অভাব। জ্ঞানী শ্রেষ্ঠ সলাইমান নবী বলেছেন, দুশ্চিরিত্রা নারী ব্যভিচার করে আর মুখ মুছে ফেলে মনে মনে বলে আমি পাপ করি নাই আর বাস্তবে গিয়ে সে তা ভুলে যায়। ভেজালের রাজত্বে আজ মানুষের চরিত্র এতটাই কলুষিত হয়েছে যে দুষ্কর্মকারী সেই ব্যভিচারী নারীর মতো করে থাকে।
ইদানীং পত্রিকা খুললেই ধর্ষণের খবর এতটাই ব্যাপকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে যে মনুষ্যত্ব জ্ঞানসম্পন্ন যেকোনো ভদ্র মানুষই শিওরে উঠবেন। আমরা খুবই পরিতাপের সাথে লক্ষ করছি যে ধর্ষকেরা শুধু ধর্ষণ করে খান্ত হচ্ছেন না কন্যা শিশুরা এর থেকে রক্ষা পাচ্ছেন না। আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে এই ধর্ষকেরা বেশির ভাগই এক বিশেষ সম্প্রদায়ের লোক। তারা বেশির ভাগই ধর্মীয় শিক্ষক হিসাবে নিয়োগ প্রাপ্ত হয়ে এই সমস্ত দুষ্কর্ম করে যাচ্ছেন। হায় যারা ধর্ম দিয়ে মানুষের মধ্যে মনুষ্যত্বের আলো জ্বলবেন তারাই আজ ধর্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হচ্ছেন। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এই যে, যারা সমাজে ধর্মীয় গুরুর ভূমিকা পালন করে থাকেন তারা যেন কোনোই উচ্চবাচ্য করছেন না। ফতোয়া জারী যাদের একমাত্র ব্যবসা তারাও যেন কেন আজ নিশ্চুপ রয়েছেন। সারাদেশব্যাপী ধর্ষণের এক অভিজান চলছে কন্যা শিশুরা রেহাই পাচ্ছেন না। রাজনৈতিক দলগুলো এই ব্যাপারে মুখে কুলুপ এটেছেন। ‘নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ ছাড়া আর কিছুই বুঝে না’ এই বিষয়টি আরও স্পষ্ট করে দিচ্ছে। যাদের এই বিষয়ে মূল দায়িত্ব ছিল তারা কিছুই করছেন না দেখে মিডিয়া সামনে এসে তাদের গুরু দায়িত্ব পালন করছে। খালি একটি রাজনৈতিক বক্তব্য দেয়াই উপযুক্ত নয় ধর্ষণকারীদের শাস্তি দিতে না পারলে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশের মতো এটাই না কোনো স্বতঃসিদ্ধ ব্যাপার হয়ে যায়। সম্প্রতি ইউক্রেনে একটি আইন পাস হয়েছে ধর্ষকের যৌন সক্ষমতা নষ্ট করে শাস্তি। শিশুর ধর্ষণকারীদের ইনজেকশনের মাধ্যমে রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় যৌন সক্ষমতা ধ্বংস করার আইন প্রণয়ন করেছে ইউক্রেন। এ আইনটি ধর্ষণ ও শিশুকে যৌন নিড়ীপণকারী হিসেবে প্রমাণিত হলে ১৮ থেকে ৬৫ বছরের পুরুষের ক্ষেত্রে কার্যকর করা হবে। র্যাডিক্যাল পার্টির নেতা ওলেগ লিয়াশকো শাস্তির প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন। ইউক্রেনের জাতীয় বার্তা সংস্থার বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে সংবাদ মাধ্যম মেইল অনলাইন। যদি ওরা করতে পারে তাহলে আমরা করতে পারবো না কেন? আমরা কেবল কবিতা পড়ে যাব আর কবিতা লিখে যাব। কবির আবেদনে কি কোনোদিন সাড়া দিব না? জীবনানন্দ দাস ও সুকান্ত ভট্টাচার্জের কথা বলতে গিয়ে আমরা গলা ভিজিয়ে ফেলি। সুকান্ত তার ‘ছাড়পত্র’ কবিতায় যে আবেদন রেখেছিল তার কথায় কি সাড়া দিতে পারি না। নাকি ফতোয়া খাওয়ার ভয়ে আমরা কি চিরকাল এভাবে চুপটি করে থাকবো। একটিবার সত্য প্রকাশের স্বার্থে আমরা সরব হতে পারি না? আমরা কি উপলব্ধি করতে পারছি না কি এক ভয়াবহ পৃথিবীর দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। যেখানে আমার প্রাণকে সংরক্ষণ করাই আমার জন্যে এক দুরূহ কাজ হয়ে যাচ্ছে।
আজকাল জীবন ধারণ ও রাজনীতি দুটোই খুব সঙ্গীন হয়ে উঠছে। মুখে আমরা যতটই বলি না কেন উন্নয়নের চাকা ঘুরে ঘুরে আমরা ওপরে উঠছি, শিশু ধর্ষণের ঘটনা যেভাবে আমাদের পিছনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে সেই দিকে কি আমরা কেউ খেয়াল রাখছি? গণতন্ত্র যেন একটি পণ্য হয়ে যাচ্ছে, যেই দেশের পার্লামেন্টে বেশির ভাগ সদস্য ব্যবসায়ী সেই দেশে ব্যবসায়ীদের স্বার্থ ছাড়া জনসাধারণের স্বার্থ সংরক্ষিত হবে কীভাবে? আজকাল মনে হয় পয়সা দিয়ে সবকিছু কেনা যায় কিন্তু যে শিশুটি ধর্ষিত হলো তার ওপর দিয়ে যে মানসিক চাপ বয়ে গেল তার দায়ভার আমরা কীভাবে নেব? পয়সা দিয়ে কি সেই দায়ভার মিটবে শিশুটির যে আতঙ্কগ্রস্ততা, সমাজের কাছে তাকে যেভাবে হেয় প্রতিপন্ন হলো তার মূল্য কে দিবে। যারা ধর্ষক তাদের মধ্যে অনুশোচনা তো দূরের কথা কোনো ভাবান্তরই তো হচ্ছে না। ফতুল্লার অধ্যক্ষ মাওলানা আল আমিন ১২ জন ছাত্রীকে ধর্ষণের কথা স্বীকার করেছে; তবে স্বীকার করলেও সে স্পষ্ট করে বলেছে, এই ধর্ষণের জন্য সে নিজে দায়ী নয়, দায়ী হচ্ছে শয়তান। মাওলানা সাহেব যেভাবে শয়তানের ওপর দায় চাপিয়ে ইহকাল, পরকাল দুটোই রক্ষার চেষ্টা করেছে তাতে মাদ্রাসার শিশু ছাত্র, ছাত্রীর জন্য বিপদ আরও অনেক বেশি বেড়ে গেল ( দৈনিক সংবাদ ১৪-৭-১৯)।
আমি ভেবে আশ্চর্য হই এই সমস্ত জালেমেরা এখনো কীভাবে নির্বিঘেœ টিকে আছে। ফতোয়াবাজরা নিশ্চুপ কেন? ক্রসফায়ারে যারা বিরোধিতা করেছেন এ ব্যাপারে তাদের বক্তব্য খুবই জানতে ইচ্ছা করে। শিশুদের জন্য সত্যি যদি কিছু করতে হয় তবে আমাদের শিকার করতে হবে কবি নির্মলেন্দু গুণের ভাষায় “আমি যেখানে রাখি হাত সেখানে তুমি সেই অসীম শূন্যতা”। এখনো আমাদের দেশে অসংখ্য মানুষের আশা ভরসার স্থল ধর্মীয় গুরুরা। এই সংকটের সময় তারা যদি এগিয়ে না আসেন তবে ধর্মের ওপরে মানুষের আস্থা অনেকাংশে বিনষ্ট হবে। ব্লগারদের দোষ দিয়ে লাভ নেই, এই অবস্থার সৃষ্টি করছে ধর্মের ধ্বর্জাধারী কিছু মাদ্রাসা শিক্ষক, ইমাম ও মাওলানা। তাদের উপযুক্ত মুকাবেলায় প্রকৃত ধর্মানুরাগীদের একান্তই এগিয়ে আসা দরকার। দেশের উন্নয়ন যতই প্রবৃদ্ধি লাভ করুক না কেন আমরা যদি আমাদের দেশকে বাঁচিয়ে রাখতে না পারি, ধর্মকে টিকিয়ে রাখতে না পারি, বিশ্বাসকে বাঁচিয়ে রাখতে না পারি তাহলে আমাদের জন্মই হবে আজন্ম পাপ। মানুষের শুভবুদ্ধির জয় হোক, ধর্ষকরা বিচারের সম্মুখিন হোক, ধর্ম টিকে থাকুক আমরা আমাদের বিশ্বাস নিয়ে বেঁচে থাকি। শিশুদের জন্য যা করণীয় তা করতে পারি। কবি সুকান্তের ছাড়পত্র কবিতা দিয়ে শেষ করতে চাইÑ
‘‘এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি
নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গিকার”
ড. এলগিন সাহা : এনজিও ব্যক্তিত্ব ও করামিস্ট।




Users Today : 29
Views Today : 29
Total views : 177432
