বিভাগীয় সম্পাদক ● পণ্য রপ্তানি ও প্রবাসী আয় (রেমিট্যান্স)—দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান দুই উৎস। তবে গত একবছরে এই দুই খাতের সম্মিলিত চিত্রে দেখা গেছে ভিন্নধর্মী প্রবণতা। প্রবাসী আয়ে ইতিবাচক প্রবাহ অব্যাহত থাকলেও রপ্তানি আয়ে বেশ রকমের বড় পতনের কারণে দেশে আসা মোট বৈদেশিক মুদ্রা কমেছে প্রায় ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে শুধু রপ্তানি আয়ই কমেছে প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলার।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৪ সালের মার্চ থেকে ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত ১২ মাসে রপ্তানি ও রেমিট্যান্স মিলিয়ে দেশে এসেছে প্রায় ৮৫ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা। এর মধ্যে রপ্তানি থেকে এসেছে প্রায় ৫৫ বিলিয়ন ডলার এবং রেমিট্যান্স এসেছে প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার।
অপরদিকে ২০২৫ সালের মার্চ থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত সর্বশেষ ১২ মাসে এই দুই খাত মিলিয়ে দেশে এসেছে প্রায় ৮১ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৮ বিলিয়ন ডলার এবং রেমিট্যান্স এসেছে প্রায় ৩৩ বিলিয়ন ডলার।
ফলে এক বছরের ব্যবধানে প্রবাসী আয় প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার বাড়লেও রপ্তানি আয় কমেছে প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলার। রফতানির এই বড় পতনের কারণেই সামগ্রিক বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহ কমে গেছে।
রেমিট্যান্সে রেকর্ডেও ঘাটতি পুষছে না
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ মাসে দেশে এসেছে প্রায় ৩ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স, যা দেশের ইতিহাসে এক মাসে সর্বোচ্চ প্রবাসী আয়। আগের বছরের একই মাসের তুলনায় এই আয় প্রায় ১৪ শতাংশ বেশি।
ব্যাংকিং খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বৈধ পথে অর্থ পাঠাতে প্রবাসীদের আগ্রহ বাড়া, ডলারের বিনিময় হার সমন্বয় এবং ব্যাংকিং চ্যানেলের সুবিধা বাড়ানোর ফলে রেমিট্যান্স প্রবাহে ইতিবাচক ধারা দেখা যাচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও প্রবাসী আয়ের এই প্রবাহ বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে কিছুটা স্বস্তি এনে দিয়েছে। তবে রফতানি আয়ের বড় পতনের কারণে সেই স্বস্তি পুরোপুরি স্থিতিশীলতা আনতে পারছে না।
রফতানিতে অব্যাহত পতন
রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ মাসে দেশের পণ্য রপ্তানি হয়েছে প্রায় ৩৪৮ কোটি মার্কিন ডলার, যা আগের বছরের একই মাসে ছিল প্রায় ৪২৫ কোটি ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রপ্তানি কমেছে প্রায় ১৮ শতাংশ।
এর মাধ্যমে টানা আট মাস ধরে রপ্তানি আয়ের নিম্নমুখী ধারা অব্যাহত রয়েছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে (জুলাই-মার্চ) মোট রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৫ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৫ শতাংশ কম।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের রপ্তানি খাত এত দীর্ঘ সময় ধরে নেতিবাচক ধারায় খুব কমই দেখা গেছে।
পোশাক খাতেও রড় ধাক্কা
দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। কিন্তু এই খাতেও সাম্প্রতিক সময়ে বড় ধরনের চাপ দেখা গেছে।
খাত-সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মার্চ মাসে তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছিল ৩ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। কিন্তু এক বছরের ব্যবধানে সেই আয় কমে ২০২৬ সালের মার্চে দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন ডলারে।
এই সময়ে পোশাক শিল্পের দুই প্রধান উপখাত—নিটওয়্যার ও ওভেন পোশাক—উভয় ক্ষেত্রেই রফতানি কমেছে। এর মধ্যে নিটওয়্যার রপ্তানি কমেছে প্রায় ২১ শতাংশ এবং ওভেন পোশাক রপ্তানি কমেছে প্রায় ১৭ শতাংশ।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানান, “গত কয়েক মাস ধরেই রপ্তানি আয়ে নেতিবাচক ধারা চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক আরোপের পর থেকেই পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। এর ফলে অনেক ক্রেতা ক্রয়াদেশ কমিয়ে দিয়েছেন।”
খাত-সংশ্লিষ্টদের মতে, বিশ্বের প্রধান বাজারগুলোতে চাহিদা স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত তৈরি পোশাক রপ্তানিতে দ্রুত ইতিবাচক প্রবণতা ফিরে আসার সম্ভাবনা সীমিত। তবে নতুন বাজার অনুসন্ধান, পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো এবং উৎপাদন দক্ষতা উন্নত করা গেলে এই চাপ কিছুটা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হতে পারে।’’
বৈশ্বিক অস্থিরতা ও প্রতিযোগিতার চাপ
রপ্তানিকারকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ, ইউরোপের বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতা এবং বৈশ্বিক চাহিদা কমে যাওয়ার কারণে বাংলাদেশের রপ্তানি খাত চাপে পড়েছে।
বিশেষ করে চীন, ভিয়েতনাম ও ভারতের মতো প্রতিযোগী দেশগুলো কম দামে পণ্য সরবরাহ করে ইউরোপীয় বাজারে বড় অংশের ক্রয়াদেশ নিয়ে নিচ্ছে। ফলে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন।
নীতিগত সহায়তার দাবি
রফতানিকারকরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে শিল্প খাতকে টিকিয়ে রাখতে সরকারের দ্রুত কিছু নীতিগত পদক্ষেপ প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে শিল্পে জ্বালানি সরবরাহে অগ্রাধিকার, উৎপাদন ব্যয় কমাতে সহায়তা এবং নতুন বাজার অনুসন্ধানে কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার করা।
অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘‘উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে রপ্তানি গন্তব্য দেশগুলোতে ভোক্তা চাহিদা কমে যাচ্ছে। এর ফলে পোশাকসহ বিভিন্ন পণ্যের অর্ডারও কমছে।’’
জ্বালানি সংকটের প্রভাব
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতও রফতানি খাতে নতুন চাপ তৈরি করেছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনার কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। রফতানিকারকদের মতে, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। একই সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা থাকায় অনেক শিল্পকারখানায় উৎপাদন কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।
আগামীর চ্যালেঞ্জ
অর্থনীতিবিদদের মতে, রেমিট্যান্স ও রফতানি—এই দুই খাতই বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান ভিত্তি। তবে বর্তমানে এই দুই উৎসের প্রবণতা ভিন্ন দিকে যাচ্ছে। রেমিট্যান্স বাড়লেও রপ্তানি আয় কমে যাওয়ায় সামগ্রিক বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহে ভারসাম্যহীনতার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি, খাদ্য ও কাঁচামাল আমদানির জন্য বড় অঙ্কের ডলার প্রয়োজন হওয়ায় এই পরিস্থিতি অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে। রপ্তানি বাজার বৈচিত্র্য করা, উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং শিল্প খাতে জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল করা অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায় রপ্তানি আয়ের এই নিম্নমুখী ধারা দীর্ঘমেয়াদে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য বৃহৎ চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।





Users Today : 97
Views Today : 105
Total views : 179850
