প্রভু যীশু খ্রিষ্টকে শুক্রবার দিন ক্রুশারোপিত করা হয়েছিল। ক্রুশ ছিল সবচেয়ে ঘৃণ্য ও জঘন্য ব্যক্তিদের সর্বোচ্চ দণ্ড, এরূপ ব্যক্তিকে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে পাপী হিসেবেই গণ্য করা হতো। মূলতঃ এই যাত্রার সূচনা হয়েছিল—বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় প্রভুর ভোজ অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে। তিনি প্রভুর ভোজ অনুষ্ঠানে তিনি ভবিষ্যতের পথরেখা অঙ্কিত করেছেন—‘এই পানপাত্র আমার রক্তে নূতন নিয়ম, যে রক্ত তোমাদের নিমিত্ত পতিত হয়।’ এটি আবশ্যিক ছিল যে, রক্ত ব্যতিরেকে পাপমোচন অসম্ভব, আর সেই রক্তধারায় শোণিত হলেন মসীহ, যীশু খ্রিষ্ট। সৃষ্টির আদিপর্বে এদন উদ্যানে আদম-হবা পথহারা হয়েছিলেন, আর প্রভু যীশু সেই পথের দিশা দিয়েছেন গেৎশিমানী বাগানে। আদম-হবা উদ্যান থেকে বিতাড়িত হওয়ার পর উদ্যোনে প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছিলেন পিতা ঈশ্বর, প্রবেশমুখে প্রহরী হিসেবে নিয়োজিত ছিল—করূবগণ; ছিল ঘূর্ণায়মান তেজোময় খড়গ। পুণ্যবান প্রভু যীশু খ্রিষ্ট স্বর্গীয় এদন উদ্যানে মনুষ্যের প্রবেশার্ধে নিজেকে উৎসর্গ করেছেন, অনিষিক্ত রক্ত ধারায় আমাদেরকে পুণ্যবান করে তুললেন।
পৃথিবীর ইতিহাসে তিনিই একমাত্র ব্যক্তি যিনি মৃত্যুকে পরাভূত করেছেন। জগতের অধিপতি দিয়াবল শয়তান, যীশুর ক্রুশারোপিত মৃত্যুতে নিশ্চিত হয়েছিলেন, আর কোনোকালেই মানুষ সত্যকে জানবে না। কেননা শয়তান মৃত্যু দেখেছে কিন্তু কখনোই পুনরুত্থান দেখেননি। যীশুকে মানুষ হিসেবে বিবেচনা করেছেন, কখনোই ঈশ্বর পুত্র হিসেবে নয়। প্রভু যীশু পিলাতকে জানান দিয়েছিলেন—‘‘আমি এই জন্যই জন্মগ্রহণ করিয়াছি ও এই জন্য জগতে আসিয়াছি, যেন সত্যের পক্ষে সাক্ষ্য দিই। যে কেহ সত্যের, সে আমার রব শুনে।’’ পবিত্র শাস্ত্র বলে—সত্য হলো ঈশ্বর, সদাপ্রভু, যিহোবা। ধর্মীয় রীতি রেওয়াজকে উপেক্ষা করে রাতের অন্ধকারে কিংবা দিনের আলোতে ধর্মবেত্তাদের প্রহসনের বিচারের মুখোমুখি হয়েছেন। কখনো মহাযজক কায়াফা, দেশাধ্যক্ষ পিলাত, রাজা হেরোড দোষ না করেও দোষী স্যবস্ত করেছেন, দেশাধ্যক্ষ পিলাত স্ত্রীর মুখ থেকে নিদোর্ষিত যীশুর কথা শুনে তিনি মনোবল হারিয়ে ফেলেছিলেন। প্রভু যীশুর জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে পিলাত ও হেরোড-এর মিলন ঘটেছে, পারস্পারিক রাজনৈতিক বিরোধ মিটে গেছে। কী আশ্চর্য কৌশল, সত্যিই অকল্পনীয়।

প্রভু যীশু খ্রিষ্ট শারীরিক ও মানসিক কষ্টের মধ্যেও ঈশ্বরকে গৌরবান্বিত করেছেন। খালি পায়ে ক্রুশ বহন করে নিজেকে শূন্য করেছেন, উৎসর্গের মেষের মতো করেই মাথার খুলি নামক জায়গার দিকে এগিয়ে গিয়েছেন। জিজিফাস স্পিনা ক্রিস্টি নামক গাছের ডাল দিয়ে মুকুট তৈরি করে মাথায় পরানো হয়েছিল। এটির কাঁটাগুলো অত্যন্ত শক্ত, ধারালো এবং দীর্ঘ হয়, যা শরীরের অংশে বিঁধলে প্রচ- যন্ত্রণার সৃষ্টি করে। কাঠফাটা রৌদ্রে যীশুকে প্রলম্বিত করা হলো—হাতে পায়ে পেরেক দিয়ে বিদ্ধ করে সঠান করে খাড়া করা হলো। উপস্থিত সৈন্যরা মেতে উঠলেন মদ্যপানে, গুলিবাট করলেন তাঁর পরিধেয়, তিনি চেয়ে দেখলেন—পৃথিবীর মানুষ সত্যকে অস্বীকার করে ছুটে চলেছে জগতের অধিপতিকে সন্তুষ্টিতে। কালভেরীর উপ্তত্ত বাতাসে পবিত্র রক্তের ফোটা চুঁইয়ে চুঁইয়ে মাটিকে সিক্ত করেছে; সিক্ত হয়নি মানুষ। অদ্যাবধি ক্রুশারোপিত যীশুর সেচিত রক্তের ধারা ‘ক্রন্দন করিতেছে’ (আদিপুস্তক ৪:১০)। যীশুর মাথা, হাত-পা ও কুক্ষিদেশের রক্ত আমাদেরকে শূচি ও শুভ্র করে। আমাদের সকল চিন্তা ও কর্মের উৎস হচ্ছে মাথা, মাথা থেকেই উৎসারিত হয় ভালো-মন্দ, জ্ঞান-প্রজ্ঞা, পাপ ও পুণ্যের ব্যবধানকে নিশ্চিত করতে। আমরা যে চিন্তা করি—সেটিকে বাস্তবে রূপদান করতে পা ও হাতের ভূমিকা অবশ্যম্ভাবী, যীশু আমাদের দ্রুতগামী পা-হাতকে নিরাময় করেছেন, যাতে করে অন্যায়, অপরাধ কিংবা পাপের প্রশস্ত রাস্তায় নিজেকে উজাড় করে না দিই। আর কুক্ষিদেশ, ডানপাশের কুক্ষিদেশ; দীর্ঘক্ষণ ক্রুশে ঝুলে থাকার ফলে যীশুর ফুসফুস ও হৃদপিণ্ডের চারপাশে তরল জমা হয়েছিল। বল্লমের আঘাতে সেই থলি ছিদ্র হয়ে যাওয়ার কারণে রক্ত ও জলের মতো তরল বেরিয়েছিল। খ্রিষ্টিয় বিশ্বাসে একে আত্মার শুদ্ধি এবং নতুন জীবনের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। পবিত্র শাস্ত্রে বর্ণিত হয়েছে—
১. খ্রিষ্টের সঙ্গে ক্রুশবিদ্ধ হয়েছি (গালাতীয় ২:২০)
২. খ্রিষ্টের সঙ্গে মরেছি (কলসীয় ২:২০)
৩. খ্রিষ্টের সঙ্গে কবরপ্রাপ্ত হয়েছি (রোমীয় ৬:৪)
৪. খ্রিষ্টের সঙ্গে পুনরুত্থিত হয়েছি (কলসীয় ৩:১)
৫. খ্রিষ্টের সঙ্গে দুঃখভোগ করেছি (রোমীয় ৮:১৭)
৬. খ্রিষ্টের সঙ্গে জীবিত আছি (ইফিষীয় ২:৫)
৭. খ্রিষ্টের সঙ্গে গৌরবপ্রাপ্ত হয়েছি (রোমীয় ৮:১৭)
দেশাধ্যক্ষ পিলাত যীশুকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করতেই ক্রুশের উপরে সেঁটে দিয়েছিলেন—এ ব্যক্তি যিহুদিদের রাজা। ইতিপূর্বে পরিষ্কার করেছেন—‘আমার রাজ্য এ জগতের নয়’। তাঁর রাজ্য ঊর্ধ্বে, স্বর্গে; সেখানে যাওয়ার পথের ভিত রচনা করেছেন। যারা মুখে স্বীকার ও অন্তরে বিশ্বাস করে, একমাত্র তারাই এ রাজ্যের নাগরিক হওয়ার অধিকারী। ভাগাড় পরিবেশে তিনটি ক্রুশ দণ্ডায়মান— মাঝখানে প্রভু যীশু আর দুদিকে দুইজন ডাকাত, দস্যু; যারা জীবনভর মানুষের অপকার করেছে। মৃত্যুক্ষণে ডানদিকের দস্যুর চেতনা হলো—মৃত্যুর যোগ্য অপরাধ করেছে কিন্তু তিনি, প্রভু যীশু তো নিরপরাধ, যার কোনো পাপই নেই। অন্তিম মুহূর্তে নিজেকে সঁপে দিলেন খ্রিষ্টের চরণে। প্রতিদানে প্রতিশ্রুতি পেয়েছেন—‘অদ্যই তুমি পরমদেশে আমার সঙ্গে উপস্থিত হইবে’। পুণ্য শুক্রবার প্রকাশ করে যে, চরম যাতনা ও মৃত্যুর পরেও শেষ পর্যন্ত সত্য ও প্রেমের জয় হয়।
কবি জীবনানন্দ দাশ ‘ক্যাম্পে’ কবিতায় লিখেছেন—
‘শান্তি?—তবুও তো শান্তি ওইখানে;
যেখানে শিয়রে এসে দাঁড়িয়েছে কুরুশ;
যেখানে যিশুর মৃতদেহে স্তব্ধ হয়ে আছে
নীল আকাশের রৌদ্রে—।’






Users Today : 97
Views Today : 105
Total views : 179850
