সাম্প্রতিক সময়ে দেশে শিশু ধর্ষণ এবং শিশুদের ওপরে যৌন নির্যাতনের ঘটনা আশংকাজনক হারে বেড়েছে। এর মধ্যে শুধু মেয়ে শিশুই নয়, ছেলে শিশুও রয়েছে। আর এ পরিস্থিতিতে শঙ্কিত সংশ্লিষ্ট সবাই। বেসরকারি সংস্থা মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায়, এ বছরের প্রথম ৬ মাসে অর্থাৎ জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ৩৯৯ শিশু ধর্ষণ ও ধর্ষণ চেষ্টার শিকার হয়েছে। এদের মধ্যে মেয়ে শিশু ছাড়াও ছেলে শিশুও রয়েছে। অথচ গত বছরে শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছিল ৩৫৬টি। ২০১৯ এর প্রথম ৬ মাসে ধর্ষণ এবং ধর্ষণের পরে একজন ছেলে শিশুসহ ১৬ জন শিশু মারা গেছে। তুলনামূলক হিসেবে করলে বিষয়টি নিঃসন্দেহে গভীর উদ্বেগের। অপরদিকে বেসরকারি সংস্থা নারীপক্ষ বলছে, তারা এক গবেষণার অংশ হিসাবে ২০১১ সাল থেকে ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত ছয়টি জেলায় ধর্ষণের মামলা পর্যবেক্ষণ করে দেখেছে এই সময়ে ৪৩৭২টি ধর্ষণের মামলা হয়েছে, কিন্তু সাজা হয়েছে মাত্র পাঁচ জনের। এই গবেষণাটি পরিচালনার জন্য থানা, হাসপাতাল এবং আদালত-এ তিনটি জায়গা থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে আমরা কথা বলছিলাম ঢাকাস্থ জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের শিশু সুরক্ষা বিশেষজ্ঞ শাবনাজ জাহিরিনের সঙ্গে। সেই আলাপচারিতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ তুলে ধরা হলো সচেতন পাঠকের জন্য। বিভাগীয় সম্পাদক
বাংলাদেশে ধর্ষণের হাত থেকে শিশুদের রক্ষার জন্যে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো সংগঠিত?
শাবনাজ জাহিরিন : বাংলাদেশে ধর্ষণের হাত থেকে শিশুদের রক্ষার জন্যে প্রাতিষ্ঠানিক তেমন কোনো ব্যবস্থা নেই। ধর্ষণ রোধ করে শিশুদের নিরাপদ রাখার জন্য যে ধরনের অবকাঠামো, লোকবল বা সেবা দরকার সেগুলো এখনো অনেক কম। সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ে বিশেষ করে কমিউনিটি লেভেলে যে ধরনে সুরক্ষা ব্যবস্থা থাকার প্রয়োজন আছে সেগুলো এখনো কার্যকর নয়। কিছু সার্ভিস আছে বা লোকজন আছে। কিন্তু শিশুদের বিষয় বা এধরনের ঘটনাকে কেউই সেভাবে আমলে নেন না। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সামাজিক কল্যাণ কার্যক্রমের পক্ষ থেকে সোশ্যাল ওয়ার্কারদের থাকার কথা, কমিউনিটি লেভেলে এবং প্রবেশন অফিসার যার একটা বিশেষ দায়িত্ব আছে, অনেক জায়গায়ই তারা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল।
এরা ভালোভাবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত না এবং শিশুদের বিষয়গুলো যেভাবে দেখা উচিত বা কেস ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম থাকা উচিত সেগুলো এখনো ওইভাবে আমাদের দেশে গড়ে উঠেনি। উন্নত বিশ্বে স্কুলে শিশুদের নিরাপত্তার উদাহরণ দিয়ে বলা হয়ে থাকে যে সেসব দেশে কোনো স্কুলে কোনো শিশুর সাথে দেখা করতে হলে আগে তার একটা ছবি তোলা হয়, একটা কার্ড দেয়া হয় এবং কেউ সাথে করে স্কুলের ভেতরে নিয়ে যাওয়া হয়। যাতে অন্য শিশুদের সমস্যা না হয়।
ফ্ল্যাট বাসায় বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের রক্ষায় কোনো ব্যবস্থা রয়েছে কিনা?
শাবনাজ জাহিরিন : এ ধরনের সিস্টেম শহরাঞ্চলে কিছুটা দেখা গেলেও গ্রামাঞ্চলে যেসব প্রাইমারি স্কুল রয়েছে সেখানে একেবারেই নেই। ফ্ল্যাট বাড়ি বা অন্য জায়গাগুলোতে পারিবারিক যে মেকানিজম যেমন শিশু কোথায় যাবে, কখন যাবে, সাথে কে যাবে এগুলোর বিষয়ে তেমন কোনো মেকানিজম নেই। আর উন্নত বিশ্বের প্রতিটা দেশে একটা সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার বিভাগ থাকে। যার কর্মীরা নিয়মিত বাড়ি বাড়ি গিয়ে খোঁজ খবর করে। আমাদের দেশেও সেরকম একটা সিস্টেম থাকা উচিত। এটি আমাদের আইনে থাকলেও এর জন্য কোনো বাজেট বরাদ্দ হয় না, দক্ষ লোকবলও নেই, যারা এগুলো করবে।
ধর্ষণ থেকে রক্ষা করার জন্য কী করা উচিত?
শাবনাজ জাহিরিন : ধর্ষণ থেকে শিশুদের রক্ষা করতে হলে স্কুল পর্যায়ে আত্মরক্ষার কৌশল শেখাতে হবে। মেয়েশিশুর পাশাপাশি ছেলেশিশুকেও ধর্ষণ ও যৌন হয়রানি বিরোধী মূল্যবোধ শেখাতে হবে যাতে ভবিষ্যতে সে এ ধরনের আচরণ না করে।
বারবার এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তির কারণ?
শাবনাজ জাহিরিন : ধর্ষণ রোধে মনিটরিং বা নজরদারি জোরদার করতে হবে। বারবার এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তির জন্য এ ঘটনায় বিচার না হওয়াই অনেকটা দায়ী করেন। বড়ো বিষয় হচ্ছে যে, মামলা গুলোর দীর্ঘসূত্রিতার কারণে শাস্তি হচ্ছে না। মামলা হচ্ছে, গ্রেফতার হচ্ছে কিন্তু সেগুলোর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হচ্ছে না। যেটা দেখে আরেক জন ভয় পাবে।
কেবল আইন দিয়ে ধর্ষণ রোধ সম্ভব কিনা?
কিছুটা হলেও সম্ভব আমার মতে। কারণ তারা দেখছে যে তারা পার পেয়ে যাচ্ছে বা কেউ তাকে খুঁজে পাচ্ছে না খুঁজে পাবে না বা তাকে পুলিশে ধরতে পারবে না। এরকম একটা দৃষ্টিভঙ্গি চলে আসছে। এর ফলে এক ধরনের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি চলে আসে। যখন তারা দেখে যে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো ইচ্ছা নেই বা তারা ধরা-ছোঁয়ার বাইরে বা তাদের পেছনে কোনো বড়ো ভাইয়ের হাত আছে।





Users Today : 29
Views Today : 29
Total views : 177432
