রূপা পালবাড়ির সবার ছোটো মেয়ে। পালবাড়ি বলতে আমি মনীষ পালের কথা বলছি। এটা সেই ধর্মপাল বা রামপালের কথা নয়। মনীষ পাল পুঠিয়া রাজবাড়িতে ছোটোখাটো এক কর্মচারী। সংসারে তার তিন কন্যা কিন্তু একটিও পুত্রসন্তান ছিল না। এটা নিয়ে মনীষের স্ত্রী ইন্দুর খুব কষ্ট ছিল। সবসময় বলতো, আমাদের শেষ বয়সে কে দেখবে বল তো? মনীষ হাসতে হাসতে বলত, ভগবান আছেন তো, তিনিই আমাদের দেখবেন। তিন মেয়ের মধ্যে বড়ো মেয়ে মিথিলা ছিল মনীষের সবচেয়ে আদরের। মনীষ যখনই রাজার আদেশে বাইরে কোথাও যেত, মিথিলা তার সঙ্গে থাকত। একবার রানীর জন্য একটা পারফিউম আনতে মনীষকে কলকাতা যাওয়ার আদেশ দিলেন রাজামশাই। দিন পনেরোর জন্য মনিষ কলকাতা যাবে, ইন্দুমতি তার অপর দুই কন্যা এ কটা দিন সোনাতলা, তার বাবার বাড়িতে থাকবে। উল্লিখিত কাহিনী দেখে পাঠকের মনে হতে পারে যে, আজকের গল্পের নায়িকা মিথিলা। যদি পাঠক এটা ভেবে থাকেন তবে ভুল ভেবেছেন। আজকের গল্পটি মনিষ পালের ছোটো কন্যা রূপাকে নিয়ে। রূপা তার মায়ের আদরের ছোটো মেয়ে। সব বোনের চেয়ে ছোটো হওয়ার কারণে ইন্দুমতি রূপাকে বেশিই ভালোবাসতো। মায়ের সাথে মামার বাড়িতে যেতে রূপার বেশ ভালোই লাগতো কারণ সেখানে তার খেলার সাথী নীলা আছে। রূপার বয়স তখন সাত বছর। রূপার মামার বাড়ির পাশেই মস্ত খেলার মাঠ। সেদিন বিকালে রূপা তার খেলার সাথীদের নিয়ে ফুল কুড়াতে গিয়েছিল। হঠাৎ কেউ একজন দৌড়ে এসে তার হাত থেকে গন্ধরাজ ফুলটা ছিঁড়ে নিয়ে পালিয়ে গেল। রূপা ভয় পেয়ে কাঁদতে শুরু করলো। তার সই নীলা বললো, রূপা তুই এভাবে কাঁদিস না। ও তো আমাদের সোনা , ঘোষবাড়ির ছেলে। তুই তো ওদের গাছের ফুল তুলেছিস তাই তোর কাছ থেকে নিয়ে গেছে। রূপা কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফিরে এল। ইন্দুমতি মেয়েকে সান্ত¡না দেওয়ার জন্য একটা লজেন্স কিনে দিল। পরের দিনই রূপা তার মায়ের সাথে পুঠিয়া ফিরে এল। তার বড়ো বোনের বিয়ে হয়ে গেল। এর এক বছর পর মেজ বোনের বিয়ে হয়ে গেল। বাকি রইলো শুধু রূপা। রূপার মায়ের ইচ্ছে ছিল মেয়েকে লেখাপড়া শিখিয়ে তারপর বিয়ে দিবে। মেজো বোনের বিয়ের পর ইন্দু তার মায়ের সঙ্গে মামাবাড়ি গেল। একদিন বিকেলে নীলাকে সঙ্গে করে আবার সেই ঘোষদের বাগানে ফুল তুলতে গেল। ফুল ছিঁড়তে গিয়েই পাশ থেকে কেউ এসে হাতটা চেপে ধরলো। তাকিয়ে দেখলো সোনা। অন্যকে না বলে কোনো কিছু নিলে তাকে চুরি করা বলে, এটা কি তুমি জানো না? রূপা হেসে বললো, তুমি তো দেখছি বড্ড বোকা। ফুল তুললে সেটাকে চুরি বলে না। আমি যদি তোমাদের গাছের ফল পাড়তাম তবে সেটা চুরি করা হতো। রূপার সাথে কথায় পেরে উঠতে না পেরে সোনা রাগ করে বাড়ির মধ্যে চলে গেল। রূপাও খুশি মনে বাড়ি চলে গেল। যাওয়ার পর দেখে তার মা খুব কাঁদছে। পরে দেখে তাদের পাশের বাড়ির মঙ্গল কাকা রূপা ও তার মাকে নিয়ে যেতে এসেছে। রূপার বাবা সকালেই মারা গেছে। রূপার বাবার শেষকাজ করে সবাই একে একে ফিরে গেল। রূপার মা চিন্তায় পড়ে গেছে , তাদের চলবে কি করে। জমিদারি প্রথা উঠে গেছে তাই রূপার বাবার জমানো কোনো টাকাও নেই। আছে একটা ছোটো বাড়ি কিন্তু কি করে দিন চলবে। একদিন রূপার মেজো বোন আর তার বর এসে ওদেরকে রাজশাহী নিয়ে যায়। রাজশাহীর তানোরে শুরু হয় তাদের মা-মেয়ের নতুন জীবন। মেজো বোনের অনেক কৃষি জমি আছে, গৃহস্থ বাড়ি। খাওয়া-পরার কোনো অভাব নেই। তবে রূপার মেজো বোন অর্থাৎ বিভা খুব গল্প করতে আর ঘুরতে পছন্দ করে। এদিকে বিভারও ভরা সংসারÑদুই পুত্র আর দুই কন্যা। ইন্দুমতি আসার পর থেকে বিভাকে আর বাড়িতেই খুঁজে পাওয়া যেত না। সংসারের সমস্ত ভার মা এর হাতে দিয়ে বিভা মনের আনন্দে পাড়া ঘুরে বেড়াতো, আর বাড়ি ফিরেই মায়ের কাজের ভুল বের করতো।
অন্যের সংসারে হলেও রূপার দিনগুলো খারাপ কাটতো না, তার দিদির ছেলে-মেয়ের সাথেই বিভা স্কুলে যেত। সেই যে মামা বাড়িতে গিয়েছিল এরপর আর রূপা সেখানে যায়নি। মামার বাড়িতে গিয়েছিল বলেই তো সে তার বাবাকে শেষবারের মতো দেখতে পায়নি। এজন্য সে ঠিক করেছিল আর কখনো মামাবাড়িতে যাবে না। না যাওয়ার কথা উঠলেই মনে হতো আর কি তবে সোনার সাথে এ জীবনে দেখা হবে না? রূপা এসএসসি পাশ করেছে, কলেজে পড়বে। কিন্তু বিভা বলে দিয়েছে, কলেজে পড়ার খরচ সে দিতে পারবে না। ইন্দুমতি বলেছিল, তবে আমাদের পুঠিয়ার বাড়িটা বিক্রি করি। যা টাকা পাবো তা দিয়েই মেয়েকে পড়াবো। বিভা বলেছে, সব টাকা যদি পড়িয়েই শেষ করো তবে মেয়েকে বিয়ে দিবে কি করে। উপায় না দেখে রূপার বড়ো জামাইবাবুকে চিঠি লিখে। এর কিছুদিন পর রূপার বড়ো জামাইবাবু এসে বগুড়া নিয়ে যায়। আজিজুল হক কলেজে রূপা ভর্তি হয়। ক্লাস শেষ করে বাসায় ফিরছে। হঠাৎ একজন এসে একগুচ্ছ গন্ধরাজ ফুল হাতে তুলে দিল। রূপা ফুলগুলো ফিরিয়ে দিল। ফিরিয়ে দিচ্ছো কেন? আগে তো খুব চুরি করে ফুল তুলতে আসতে, আর এখন। রূপার বুঝতে বাকি রইলো না যে এ সোনা ছাড়া আর কেউ হতেই পারে না। রূপা অনেক চেষ্টা করেও আবেগ ধরে রাখতে পারলো না। তার দুচোখ গড়িয়ে জল বয়ে গেল। সোনা বললো, অনেক হলো, আর কাঁদতে হবে না। সোনা বিএ পাশ করেছে। চাকরি করার কোনো ইচ্ছা তার নেই। রাতারাতি বড়োলোক হতে চায় বলে ব্যবসা শুরু করেছে। প্রতিদিন কলেজ শেষ করে দুজনার দেখা হতো। এরমধ্যে রূপার মা একদিন বগুড়া গেল মেয়ের সাথে দেখা করতে। মেয়ের মুখ থেকে সব কথা শুনে, সোনার সাথে দেখা করতে চাইলো। কলেজ শেষ করে মাকে নিয়ে এক পার্কে রূপা গেল। সেখানে সোনা এল দেখা করতে। ইন্দুমতির খুব ইচ্ছে ছিল তার বড়ো দুই জামাই দেখতে কালো, তাই ফর্সা ছেলে ছাড়া মেয়ের বিয়ে দিবে না। সোনার গায়ের রং দুধে আলতা, তারপর আবার গলায় সোনার মোটা চেইন, হাতে কয়েকটি আংটি। ইন্দুমতি ভাবলো, মা-বাবা ছেলের নামটি যথার্থই রেখেছে। ইন্দুমতি মনে মনে সব ঠিক করে রাখলো যে মেয়ে পরীক্ষা দেওয়ার সাথে সাথেই বিয়েটা দিয়ে দিবে। সোনার খুব ইচ্ছে রূপা তাকে নিজের হাতে রান্না করে খাওয়াবে। ইচ্ছেটা প্রকাশ করতেই রূপা বললো, আমি তো রান্না করতে পারি না। পরদিন রূপা খুব চেষ্টা করে চিংড়ি মাছের মালাইকারি রান্না করে আনলো। যদিও তা ছিল ঝাল আর লবণে ভরা। তবুও সোনা রান্নার খুব প্রশংসা করলো।
ইতিমধ্যে রূপার মেজো বোন কমলেশ পোদ্দারের সাথে রূপার বিয়ে ঠিক করে ফেললো। কমলেশ সোনালী ব্যাংকে চাকরি করে। রূপার মা সব জানতে পেরে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলো। বিভাকে বলেছিল যে সে তার মেয়ের বিয়ে সোনার সাথেই দিবে। কিন্তু ইন্দুমতি জানতেন, সংসারে তার কথার দাম কেউ দিবে না কারণ অন্যের আশ্রয়ে থাকলে নিজের কোনো মতামত থাকে না। এসবের কিছুই রূপা জানতো না। সোনার গ্রামের আরেকটি মেয়ে রূপার সাথেই কলেজে পড়তো, নাম ছিল সরযূ। সরযূ ছেলেবেলা থেকেই সোনাকে ভালোবাসতো, অনেকবার হয়তো সোনাকে বলার চেষ্টা করেছে কিন্তু সোনা গুরুত্ব দেয়নি। ঝগড়াটে আর হিংসুটে বলে পাড়ার মধ্যে সরযূর খুব বদনাম ছিল। দিনের পর দিন রূপাকে সোনার সাথে মিশতে দেখে সরযূ সব বুঝতে পারলো। সে মনে মনে ঠিক করে রাখলো কিছু একটা সে করবেই। সোনা অনেকদিন ধরেই ভেবেছে যে রূপাকে সে তার ভালোবাসার কথাটা বলবে, কিন্তু সামনে গেলে আর বলা হয় না। তাই সে ঠিক করেছে চিঠিতে লিখে সবকিছু তাকে জানাবে। চিঠি লিখে পোস্ট করতে যাবেÑহঠাৎ মনে হলো রূপা তো ওর বোনের বাড়িতে থাকে তাহলে চিঠি তো পোস্ট করা যাবে না। সরযূর সাথে দেখা হতেই চিঠিটা ওর হাতে দিয়ে বললো, এটা রূপাকে দিও। সরযূ চিঠিটা নিয়ে পড়লো। তারপর চিঠিতে লিখে দিল যে, সোনা আসলে সরযূকে ভালোবাসে, রূপাকে না। চিঠি পড়ে রূপা খুব কাঁদলো তারপর ক্লাস থেকে বের হয়ে গেল। রাস্তায় সোনার সাথে দেখা হলো। রূপা শুধু বলেছিল তুমি আর কোনোদিন আমার সাথে যোগাযোগ রাখবে না। পরীক্ষা শেষে বাড়িতে গিয়ে বিয়ের কথা রূপা জানতে পারলো। সে আর কোনো আপত্তি করলো না। কমলেশ খুব ভালো মানুষ। তাই রূপার সংসারে কোনো কিছুরই অভাব রাখেনি। ইন্দুমতি একদিন খবর এনেছিল যে সোনার সাথে সরযূর বিয়ে হয়েছে। রূপা আর কিছু বলেনি। প্রাইমারি স্কুলে রূপা চাকরি করে। কমলেশ তাকে খুব সুখেই রেখেছে। সোনা বিয়ের পরে সরযূর চিঠির কথা সব বুঝতে পারে কিন্তু তার তো আর কিছুই করার ছিল না। নেশা ছিল বড়োলোক হওয়ার কিন্তু বারবার ব্যবসায় লোকসান করে তার অভাব যেন বেড়েছে আর তার সাথে সরযূ সমস্ত দিন ঝগড়া করেই চলেছে। এত বছরে কখনো চিংড়ি মাছ সোনা আর খায়নি। রূপার কিন্তু আগের কোনো কথা নিয়ে আর আগ্রহ নেই। ৩০ বছর বাদে এক বিয়ের অনুষ্ঠানে দুজনের দেখা। সোনার খুব ইচ্ছে ছিল আজ এতবছর বাদে রূপাকে সত্যিটা জানাবে। রূপার সাথে কথা শুরু করার কিছুক্ষণ পরই সরযূ কোথা থেকে ছুটে এল। মরণ! এতদিনেও তোমার ছুকছুকানিটা গেল না দেখছি। সোনা লজ্জায়, ঘৃণায় কোনো কথা না বলে চলে গেল। রূপা শুধু সোনার পথের দিকে চেয়ে রইলো।





Users Today : 141
Views Today : 182
Total views : 182030
