জীবন সায়াহ্নে আজ দাঁড়িয়ে বাকরুদ্ধ তপতীর চোখের সামনে সব ঝাপসা হয়ে আসছে। এমনিতেই এই ৯৩ বছর বয়সে ভালো করে চোখে দেখতে পায় না, শুধু নিজের মানুষদের হাতড়ে হাতড়ে চিনে নেয়। অস্পষ্টভাবে বুঝতে পারে, তার বিছানার পাশে ছেলেরা, নাতি, নাতনিরা বসে আছে। হয়ত ভাবছে কখন এ আপদ বিদায় হবে! তপতীর মনের চোখে স্পষ্ট হয়ে আসছে সেই ১৯৪৪ সালের কথা। সে তখন ক্লাস এইটে পড়ে। তার বয়স তখন চৌদ্দ বছর। বাবা-মা র সবচেয়ে ছোটো সন্তান বলে বরাবরই খুব আদরে মানুষ হয়েছে। ওর বড়োদির বিয়ে হয়েছে তপতীর যখন মাত্র তিন বছর বয়স তখন। তাই বড়োদি, জামাইবাবু ওকে মেয়ের মতোই ভালোবাসতেন। বড়োদা, ছোটোদা সবাই তাকে ভালোবাসতো। তপতীর ইচ্ছে ছিল, অনেক লেখাপড়া করবে। স্কুলে ভালো রেজাল্টও করেছিল, কিন্তু একদিন দাদা এসে বললো, তুই এখনই তৈরি হয়ে নে তপু। তোকে পাত্রপক্ষ আজ দেখতে আসবে।” বাড়ির সবাই ওকে আদর করে আমাকে তপু ডাকতো। ‘‘’’
মাথায় ব্জ্রপাত হয়ে গেল। সাথে সাথে মাকে বললো, ‘‘আমি বিয়ে করবো না।’’ আগেরদিন দিদি, জামাইবাবু তাদের বাড়িতে এসেছিলেন। তপুর অবস্থা দেখে জামাইবাবু ওর বাবাকে বললেন, ‘‘আমরা না হয় তপুকে মালদহ নিয়ে গিয়ে স্কুলে ভর্তি করে দিই। ওর যতদিন পড়তে ইচ্ছে করে পড়বে, তারপর না হয় ওর বিয়ে দিব।’’ বাবা শুনে রাজি হলেন না। বললেন, ‘‘তা কী করে হয়! সোমত্ত মেয়ে নিজের বাড়ি ছেড়ে অন্যের বাড়িতে গিয়ে থাকবে? কন্যাদান না করে মরে গেলে আমার জায়গা নরকে হবে। আর পালের ঘরের মেয়েরা আবার কবে এতো লেখাপড়া করেছে! লেখাপড়া করেই বা কী হবে তার!’’ পাত্রপক্ষ দেখতে এলো, পছন্দ করে গেল। পাত্রের বয়স বেশি না, ৩৬ বছর চলছে। পাত্রের জমিজমা আছে, পৈতৃক ভিটা। ব্যবসা করে। নওগাঁর পত্নীতলা নিবাসী নিবাস পালের মেয়ে তপতী পালের সাথে বগুড়ার পালসা নিবাসী মনোমোহন পালের ৩য় পুত্র নিরঞ্জন পালের বিয়ে ঠিক হয়ে গেল। শুভদিনে কাজটা সম্পন্নও হয়ে গেল। নিরঞ্জনের বাবা, মা কেউ জীবিত নেই। চার ভাইয়ের পৃথক সংসার। প্রথম দিন থেকেই তপতী বুঝতে পেরেছিল, নিরঞ্জন আত্মভোলা এবং অতীব বোকা একজন মানুষ। এতটাই বোকা যে, সংসারের জন্য বেমানান। এতটাই বোকা যে, তার জমিজমা তার অন্য ভাইয়েরা সামান্য দামে কিনে নিতো এবং সে দিয়েও দিতো। নিরঞ্জন লেখাপড়া জানতো না। তাই তপতী বেশ বুঝতে পেরেছিল, তার এই সংসার নিজেকেই গড়ে তুলতে হবে। কারিগররা এসে বাড়িতে হাঁড়িপাতিল বানাতো আর নিরঞ্জন দোকানে নিয়ে সেসব বিক্রি করতো। তপতী আস্তে আস্তে নিজে এসব বানানো শুরু করে দিল। ৪ জন কারিগর না রেখে ২ জন রেখে দিল। নিরঞ্জন প্রথমে বাধা দিল, কিন্তু স্ত্রীকে সে ভালোবাসতো আবার ভয়ও পেত। তাই মনে মনে ক্ষুণ্ন হলেও মুখে কিছু বলতে পারতো না। দেখতে দেখতে তাদের বিয়ের ১৫ বছর হয়ে গেছে। ইতিমধ্যে তপতীর ঘর আলো করে জন্ম নিয়েছে চার সন্তান। বড় মেয়ে নীলা আর তিন ছেলে। মেয়েটাকে তপতীর পড়ালেখা শেখানোর খুব ইচ্ছা ছিল।কিন্তু মেয়েটা ক্লাস টু পর্যন্ত স্কুলে গিয়ে আর যায় না। মেয়ে তার খুব রূপবতী। আস্তে আস্তে নিরঞ্জনের ব্যবসায় লাভ হওয়া শুরু হলো। এসব দেখে নিরঞ্জনের বড়ো বৌদি মুক্তা তার বরকে বললো, ‘‘শোন, এভাবে তো চলতে দেওয়া যাবে না। এভাবে চলতে থাকলে নিরঞ্জনকে ঠকিয়ে তোমরা যা আদায় করেছো তা আবার ফিরিয়ে দিতে হবে।’’ নিরঞ্জনের বড় ভাই অখিল বললো, ‘‘চিন্তা করো না। তুমি দেখো, আমি কী করি!’’ পরের দিন থেকে হিসেবের গরমিল শুরু হয়ে গেল। প্রতিদিন বাড়ি ফেরার পর তপতী নিরঞ্জনের কাছে হিসাব নিতো। সকালে দোকানে যাওয়ার সময় তপতী হিসেব করে দিতো, কতগুলো হাঁড়িপাতিল সাথে দিয়েছে। আবার সন্ধ্যায় হিসেব করে দেখতো বিক্রি করে কতগুলো বাড়িতে ফেরত এসেছে। কিছু হাঁড়ি কম দেখে তপতী জিজ্ঞেস করলো, ‘‘এগুলো কোথায় গেল?’’ নিরঞ্জন তো কিছুই বলতে পারে না। তখন বললো, ‘‘তুমি কি দোকান থেকে বাইরে গিয়েছিলে?’’ অনেক চিন্তা করে বললো, ‘‘বড়দা এসে একবার চা খেতে ডেকেছিল তখন গিয়েছিলাম।’’ তখন তপতী বুঝতে পারলো যে, বড়োদা কোনোদিন ভাইয়ের সাথে কথা পর্যন্ত বলে না, সে চা খাওয়াবে! তপতীর আর বুঝতে বাকি রইলো না। পরেরদিন সকালে তপতী তার বড়ো ছেলেকে সাথে দিয়ে দিল। এরপর থেকে চুরি বন্ধ হয়ে গেল। নীলার বিয়ের প্রস্তাব আসা শুরু করেছে। অনেক বড়ো ঘর থেকে বিয়ের প্রস্তাব এলো। তপতী বিয়ের পর থেকেই টাকা জমিয়েছে, কষ্ট করে মেয়ের ভবিষ্যতের জন্য গয়না গড়িয়েছে। বেশ ধুমধামের সাথে বিয়ে হয়ে গেল। তপতীর বড়ো ছেলে সুধেন ভালোভাবেই ব্যবসা সামলাচ্ছে। সুধেনের বিয়ে দিয়ে তপতী বাড়িতে বৌ নিয়ে এলো। এখন তারা বৌ, শাশুড়ী মিলে ব্যবসার কাজ করে। তখন ১৯৭১ সাল এপ্রিল মাসের ১৯ তারিখ। দেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। সবাই পালিয়ে ভারতে চলে যাচ্ছে। তপতীর মেয়ে নীলা বাড়িতে এসে ২০ ভরি গহনা তার মায়ের কাছে রেখে গেল। তপতী তার ছেলে, বৌ আর বাকি দুই ছেলেকে তাদের মাসির বাড়ি মালদহতে পাঠিয়ে দিল। বললো, ‘‘তোরা আগে যা, আমি আর তোর বাবা পরে যাব।’’ ২০ এপ্রিল ভোরে এসে তপতীর বাড়িতে কাজ করা মিঠু এসে বলে গেল, এক এক করে পাড়ার সবাই মিলিটারির ভয়ে দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে। মিঠু অনেক ছোট থেকেই তপতীর বাড়িতে কাজ করে। তাই তপতীকে ফেলে রেখে মিঠু যাবে না। তপতী অনেক চিন্তা করে তার এবং নীলার সমস্ত গহনা রান্নাঘরের চুলার ভেতরে রেখে ছাই চাপা দিয়ে দিল। সারাদিন ধরে গুলির আওয়াজ। তপতী ভেবেছে আজ রাতেই তারা বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে। থালায় গরম ভাত বেড়ে দিয়েছে। নিরঞ্জন স্নান করে খেতে বসবে। এসময় নিরঞ্জনের বড় ভাই এসে তাকে ডেকে নিয়ে গেল। তপতী বলেছিল, ‘‘এভাবে গরম ভাত ফেলে রেখে যেও না। ভাত খেয়ে তারপর যাও।’’ নিরঞ্জন বলেছিল, ‘‘এখনি চলে আসবো।’’ সন্ধ্যা হয়ে গেল, তপতী ভাত নিয়ে বসে আছে। নিরঞ্জন আর বাড়িতে আসেনি। তারপর মিঠুকে তপতী বাইরে পাঠিয়ে খোঁজ আনতে বলে। মিঠু ফিরে আসে রাত ৯ টায়। এসে সব খুলে বলে। নিরঞ্জনকে তার ভাই বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে গিয়ে সামান্য কিছু টাকা দিয়ে তাদের ১০ বিঘার আমবাগান কিনে নেয়। নিরঞ্জনও নাকি ঐ দামে বাগানটা বিক্রি করে দেয়। তারপর দাদার বাড়ি থেকে বের হয়ে নীলুদের বাগানের ভেতর দিয়ে নিরঞ্জন বাড়ির পথ ধরে। এসময় মিলিটারির একটি গাড়ি যাচ্ছিল। নিরঞ্জন ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে পড়ে। মিলিটারিদের গাড়ি চলে যেতে উদ্যত হয়।
পাশ থেকে কাজিম মিয়া এসে বলে, ‘‘হুজুর, ঝোপের আড়ালে এক মালোয়ান আছে।” টানতে টানতে নীলাঞ্জনকে নিয়ে আসে। মিলিটারিরা গাড়ির পেছনে দড়ি দিয়ে নীলাঞ্জনকে বাঁধে। এরপর গাড়ি চালাতে শুরু করে। নীলাঞ্জন যন্ত্রণায় ছটফট করে। একসময় ছটফট করতে করতে মারা যায়। মিঠুর মুখে এসব কথা শুনে তপতী কান্নায় ভেঙে পড়ে। খুব ভোরে তপতীকে নিয়ে মিঠু বের হয়ে যায়। সারাদিন হেঁটেছে। খাওয়া নাই। ঘুম নাই। রাতে এসে এক বাড়িতে আশ্রয় নেয় তারা। তখন তপতী জানে না, তার ছেলেরা কেউ বেঁচে আছে কিনা। তিনদিন ধরে হেঁটে হেঁটে তারা ভারতে পৌঁছায়। মুর্শিদাবাদের শেখপাড়া পৌঁছতে তার আরো দুইদিন লেগে গেল। শরণার্থী ক্যাম্পে গিয়ে একে একে ছেলে, বৌমা সবার সাথেই তার দেখা হয়ে গেল। নীলাঞ্জন তাদের ছেড়ে চলে গেছে। নীলাঞ্জনের লাশও তারা দেখতে পায়নি।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর শুরু হয় তপতীর আর এক সংগ্রামময় জীবন। শূন্য ভিটে ছাড়া কোনো সম্পদই অক্ষত ছিল না। নীলাঞ্জন নাকি মৃত্যুর আগে তার ভাইদের কাছে সব বিক্রি করে দিয়ে গেছে। তপতী রাস্তায় রাস্তায় ফেরি করে হাঁড়িপাতিল বিক্রি করে ছোট দুই ছেলেকে মানুষ করেছে। কেটে গেছে অনেক বছর। জীবন সায়াহ্নে এসে তার শুধু মনে পড়ছে নীলাঞ্জনের মুখ। এইতো নীলাঞ্জন তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। তপতী বললো, ‘‘দাঁড়াও আমি তোমার কাছে আসছি।’’ কিন্তু তপতীর কথা নীলাঞ্জন ছাড়া আর কেউ হয়ত শুনতে পেল না। শুধু তার শয্যাপাশ থেকে আত্মীয়-স্বজনের কান্নার রোল শোনা গেল।





Users Today : 17
Views Today : 20
Total views : 175524
