নীতিশাস্ত্র, নীতিকথা, নীতিজ্ঞান-এই সমস্তই ছিল আমাদের শিক্ষা ও জ্ঞানের মূল প্রতিপাদ্য বিষয়। গুরুজনেরা বলেছেন, ‘সময় বহিয়া যায় নদীর স্রোতের প্রায়’। তাই সময়ের বিবর্তনের সাথে সাথে আমাদের জ্ঞানেরও অনেক বিবর্তন ঘটেছে। সেই সাথে নীতি শাস্ত্র জাতীয় কথায় আমাদের মনোযোগ আস্তে আস্তে কমে এসেছে। নীতি কথার প্রশ্ন উঠলেই আমরা সজ্ঞানেই বলে উঠি-আরে যা যা আর জ্ঞান দিস না। তাই আজকাল জ্ঞান নিয়ে ঘ্যানঘ্যানানির খুব বেশি একটা প্রচলন নেই। তার পরেও যদি বলা হয় নীতি জ্ঞান ও নীতি বিষয় নিয়ে লিখতে-আমি একটু চমকে যাই বটে। অনীতির যুগে বাস করতে করতে আমরা এতটাই অভ্যস্থ হয়ে পড়েছি যে নীতিকে খুঁজতে গেলে দুর্নীতির মধ্যেই একে আবিষ্কার করতে হবে। কারণ দুর্নীতিরও একটা নীতি আছে। শৈশবটা এমনভাবেই নীতি কথার মধ্যে বেড়ে উঠে ছিলাম যে নৈতিকতার একটা ন্যূনতম মানদন্ড বহু দিন জীবনে পালন করে এসেছি। তাই কোনো দুর্নীতির সম্মুখীন হলেই সেই দুর্নীতির সংস্পর্শে গিয়ে তলিয়ে যাই না বটে কিন্তু দুর্নীতির আকার প্রকার সম্যক উপলব্ধি করতে পারি। তাই দুর্নীতিটা যতটাই আপাত বলে মনে হোক না কেন সেটাকে এড়িয়ে চলা অভ্যাসটা এখনো ছাড়তে পারিনি। অতএব নীতির খোঁজে এখন দুর্নীতির সন্ধানে বেড়িয়েছি।
খুব বেশি দূরে যেতে হলো না, খবরের কাগজে পাতা উল্টালেই ভুরি ভুরি দুর্নীতির ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়। সাম্প্রতিককালে মাত্র তিনদিনের দৈনিক সংবাদে প্রকাশিত (৩, ৯ ও ১২ই সেপ্টেম্বর থেকে উদ্ধৃত) দুর্নীতি বিষয়ক খবর সমহের শিরোনাম উল্লেখ করছি।
১) নৌপরিবহন অধিদপ্তরে ঘুষসহ হাতেনাতে আটক সার্ভেয়ার।
২) রংপুরে ভিক্ষুকের জমি দখলের অভিযোগ। তদন্ত না করেই ওসিকে নির্দোষ বলে প্রতিবেদন।
৩) শিল্প প্রতিষ্ঠানের দৌরাত্মৌ দখল হচ্ছে মেঘনা নদী। অবৈধ স্থাপনায় নেই কোনো তালিকা।
৪) ১৭৪ কোটি টাকা আত্মসাৎ মোস্তফা গ্রুপের চেয়ারম্যানসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে মামলা।
৫) পরিক্ষা ছাড়াই ঢা.বি. তে ভর্তি।
৬) কৃষকদের কাছ সরাসরি ধান ক্রয় কেন নয়?
৭) ধর্ষণ মামলা নিয়ে থানায় বিয়ে দুই আ’লীগ নেতা গ্রেফতার।
৮) আটকে চাঁদা দাবি নোয়াখালী থেকে দুই যুব লীগ নেতা গ্রেফতার।
প্রকাশিত খবরের উদ্ধৃতি দিয়ে পৃষ্ঠার অকুলান করতে চাইছি না। উল্লেখ করলাম এই ভেবে যে, আমরা চাই বা না চাই ধিক্কার জানাই কি না জানাই দুর্নীতিকে যে কীভাবে প্রতিষ্ঠানিকরণ করা হয়েছে তা ভেবে সবাইকে শিউরে উঠতে হবে। দুর্নীতি মুক্ত সমাজ আমরা সকলেই চাই। বিভিন্ন টকশোও গুলোতে এই নিয়ে যতই কথার পিঠে কথা বলে ও শুনে আমরা সান্ত¡না পেতে চাইতে পারি, কিন্তু তাই বলে কি দুর্নীতির মাত্রা কি কমেছে কোনো দিক থেকে?
প্রশ্ন করা যেতে পারে আমি কি তবে এই বিষয়ে কোনো ব্যবস্থাপত্র সুপারিশ করতে যাচ্ছি? আসলে মোটেও তা নয়। আমরা সকলেই জানি গুড ইগো থেকে ইভিল ইগো মানুষের মধ্যে বেশি ক্রিয়াশীল। তাই মানুষ নীতি জ্ঞান থেকে দুর্নীতির গল্প শুনতে বেশি ভালোবাসে। পবিত্র বাাইবেলে বর্ণিত আছে-হযরত সুলাইমান নবী বলেছেন “উপদ্রব জ্ঞানীমানকে ক্ষিপ্ত করে, এবং উৎক্রশ বুদ্ধি নষ্ট করে। কুসংসর্গ শিষ্ঠাচার নষ্ট করে। (১ম করি : ১৫ : ৩৩) আমাদের অঙ্গসমূহের মধ্যে জিহ্বা অধর্মের জগ যে আছে, তা সমস্ত দেহ কলঙ্কিত করে ও প্রকৃতির চক্রকে প্রজ্জ্বলিত করে এবং নিজে নরকালনে জ¦লে ওঠে। কারণ পশু ও পাখির, সরীসৃপ ও সমুদ্রচর জন্তু সমস্ত স্বভাবকে মানব স্বভাব দ্বারা দমন করা যায় ও দমন করা গেছে, কিন্তু জিহ্বাকে দমন করতে কোনো মানুষের সাধ্য নয় এটা অশান্ত মন্দ বিষয়, মৃত্যুজনক বিষে পরিপূর্ণ।” (যাকব ৩ : ৬)। আমরা যদি আমাদের চরিত্রকে পুনর্গঠন না করতে পারি ও সমস্ত লাভের বিনিময়েও সত্যকে প্রতিষ্ঠা করার যুদ্ধে নিজেদেরকে নিয়োগ না করি তাহলে দুর্নীতিকে কখনোই উচ্ছেদ করা যাবে না। নিজেদেরকে বঞ্চিত করে হলেও আমাদের ন্যায় প্রতিষ্ঠার যুদ্ধে জাগরণ থাকতে হবে। কথাটি গুরু গম্ভীর হলেও কথাটির সত্যতা একান্তভাবে সিদ্ধ।
শিক্ষাখাত থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য ভ‚মি প্রশাসন কোথায় যে দুর্নীতি তার থাবা বিস্তার করেনি তার প্রমাণ কেউ দিতে পারবে বলে মনে হয় না। আজ আমরা সবাই স্তাবকদের খাতায় নিজেদের নাম উঠানোর জন্যে ব্যস্ত হয়ে পড়েছি। ইনিয়েবিনিয়ে কেবলমাত্র সরকারের প্রশংসা করা ছাড়া আমাদের বুদ্ধিজীবীদের যেন তেমন কোনো আর ফুসরত নেই যে স্তাবকের পর্যায়ে না নেমে গিয়ে সৎ ভাবে সত্য কথাটি কেউ প্রকাশ করেন। ইয়াকুব নবী বলেছেন তুমি প্রেমের সাথে সত্য কথাটি বলো। আমরা অনেক সময় উচিত কথাটি বলি বটে কিন্তু কদাচ তা ভালোবাসার সাথে নয়। ফলে সত্য কথা উদগীরণ করতে গিয়ে আমরা যতটা না সমলোচনাকে সামনে নিয়ে আসি ঠিক ততটাই সত্য প্রকাশের বিষয়টি পিছিয়ে যায়। একটা ছোট্ট উদাহরণ দেই। ট্রেনে করে ময়মনসিং যাচ্ছিলাম। উঠতি বয়সের এক ছেলে গুন গুন করে গান গাইছিল আর ভুক্ ভুক্ করে সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়ছিল। পিতৃতুল্য এক প্রাচীন বলে উঠল, বলল “মানসম্মানের বালাই নাই তোর বাবার বয়সি মানুষরা এখানে বসে আছে আর তুই নির্দ্বিধায় সিগারেট খাচ্ছিস-তাড়াতাড়ি সিগারেট ফ্যাল্, তা না হলে এক চপাটে তোর দাঁত সব ফেলে দিব।” কমপার্টমেন্টে থাকা আরো অনেক বয়সী লোক তার সঙ্গে যোগ দিয়ে যুবককে প্রায় ঠেসে ধরলো। ভয়ে যুবকটি তাড়াতাড়ি সিগারেটটা ফেলে দিল। এই বিষয় নিয়ে আরো বেশ কিছু নীতি কথা আরম্ভ হলো। তখনকার দিনে বিষয়টা যত সহজ ছিল আজকালকার দিনের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি ততধিক কঠিন। কোনো অর্বাচীনও এরকম কোনো পদক্ষেপ নিতে যাবে না। বরঞ্চ বুদ্ধির বৈকল্য প্রদর্শনের জন্য প্রাচীন ব্যক্তিটিরই সমালোচনা করবে। এই উদাহরণ থেকে আমরা নীতি-দুর্নীতির বিষয়টিও সমাজে তার অবস্থান সম্পর্কে উপলব্ধি করতে পারি। নীতি জ্ঞানের যে অভাব ঘটেছে তা এমন নয় কিন্তু তা আমরা প্রকাশ করতে চাই না। সঙ্গোপনে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে নিজেদের নিরাপদ বলয় রেখে সুখ অনুভব করি। আমাদের কথা চিন্তা করেই হয়ত রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন “ঐ যে প্রবীণ ঐ যে পরম পাকা, ঝিমায় যেন চিত্রপটে আঁকা। বাহির পানে চায় না যে ওরা কেউ, দেখে না যে বিশ^পানে উঠেছে প্রবল ঢেউ।” কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এই যে বর্তমানের দিকে, দিকপাত করলে দেখা যায় যে সুনীতি নয় দুর্নীতির প্রবল ঢেউয়ে আমরা ভেসে যাচ্ছি। এর শেষ যে কোথায় তা আমরা জানি না। তাই সজোরে না হলেও খুব ম্রিয়মান কণ্ঠেই বলতে চাইÑদুর্নীতি আমাদের চারদিক থেকে ধেয়ে আসলেও আমাদের গ্রাস করতে উদ্যত হলেও দুর্নীতির জয় শেষ পর্যন্ত হবে না। নির্দিষ্ট কোনো দুর্নীতি নতুন করে সমাজে অবস্থান নিলেও তার অবসান হয়নি। তবে তখন থেকেই যে সুনীতির বাতাস চারিদিক থেকে বইবে এমনটাও নয়। তখন হয়ত নতুন একটা দুর্নীতি আবার নতুনভাবে বাসা বাঁধতে শুরু করবে। দুর্নীতির বিপক্ষে সোচ্চার হবার ইচ্ছাটা আমাদের একান্তই মনে পোষণ করতে হবে। তা না হলে দুর্নীতির নদীতে ভেসে যাওয়া আমাদের জীবন দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পরলে আমাদের জীবন নৌকা দুর্নীতির অতলে তলিয়ে যাবে।
এটা বিস্ময়কর হলেও সত্য যে দুর্নীতি বিষয়টি সব দেশে রয়েছে তবে আমাদের দেশের মতো বিষয়টি এত ব্যাপকতা পায়নি অন্য কোনোদিন। বিদেশেও অনেক দুর্নীতি হয়েছে যেগুলো এতই সূক্ষèভাবে পরিচালিত হয় যে আমাদের মতো সাধারণ মানুষের তা উদ্ঘাটন করা সম্ভব হয় না। দুর্নীতির খবর শুধুমাত্র প্রকাশ পেলেই বিদেশের মন্ত্রী স্থানীয় লোকেরা পদত্যাগ করে থাকেন। আমাদের দেশে একটা ভালো সংস্কৃৃতি দাঁড়িয়ে গেছে যে দুর্নীতি আইনগতভাবে প্রমাণ হলেও রাজনীতির খেলা খেলে দুর্নীতিগ্রস্তরা কখনোই তাদের পদ ছাড়তে রাজি থাকেন না। প্রকৃষ্ঠ উদাহরণ বেগম খালেদা জিয়া ও তার পুত্র তারেক জিয়ার নাম সর্বপ্রথমে মনে আসবে। আমি বিএনপির সমর্থক হই বা না হই বুকে হাত দিয়ে আমি কি বলতে পারব তারা দুর্নীতি করেননি? এই সাধারণ বিবেচনা বোধ থেকে আমরা যত দিন নিজেদেরকে আচ্ছন্য মুক্ত করতে না পরব ততদিন দুর্নীতি প্রতিষ্ঠানীকরণ আমাদের দেশে রাজনীতি থেকে মুক্ত করা যাবে না।
বহুল পরিচিত একটি গল্প দিয়ে এই রচনার শেষ টানতে যাচ্ছি। রাজা ও মন্ত্রীবর্গ বিচার কার্যে বসেছেন দুর্নীতিগ্রস্ত এক লোকের সাজা হলো সেই বিচার শেষ হতে না হতে রাজা বলে উঠলো, “মন্ত্রী এই লোকটি তো আগেও একই রকম শাস্তি পেয়েছিল’। মন্ত্রী বললেন, ‘হ্যাঁ মহারাজ’। রাজা বেশ কঠিন স্বরে বললেন, ‘এই লোকটিকে এমন একটি চাকরি দাও যাতে সে কোনোমতে চুরি করতে না পারে’। মন্ত্রী বেশ ভাবনায় পরে গেলেন। অনেক চিন্তার পর লোকটিকে প্রহরে প্রহরে ঘণ্টা বাজানোর দায়িত্ব দেয়া হলো। ভালোই চলছিল! বছর ঘুরতে না ঘুরতে একজন এসে রাজাকে বললেন, ‘রাজা মশাই ঐ লোক আবার চুরি করতে শুরু করেছেন’। রাজা মন্ত্রীকে ডেকে বললেন, ‘এবার তো তোমার চাকরি থাকার কোনো কারণ দেখছি না। প্রহরের ঘণ্টা বাজাবার কাজ করেও সে কীভাবে চুরি করে?’ মন্ত্রী খবারখবর নিয়ে রাজাকে বললেন, ‘হুজুর ও চুরি করে না তবে চোরদের কাছ থেকে ভাগ পায় টাকা প্রতি চার আনা’। রাজা বলেন, ‘সেটা কী রকম?’ মন্ত্রী বলেন, ‘রাজা মশাই আমাদের দেশের চোরেরা রাত দ্বি প্রহরে চুরি করতে বের হয় আর তৃতীয় প্রহরে ঘরে ফিরে। আমাদের সেই ঘণ্টাবাদক দ্বি প্রহরে তিনটা ঘণ্টা বাজিয়ে দেয় সকাল হয়েছে ভেবে চোরেরা আর চুরি করতে পারে না ফলে সব চোরেরা মিলে সেই ঘণ্টা বাদকের কাছে গিয়ে বলে তুই কী চাস? ঘণ্টা বাদক বলে টাকা প্রতি চার আনা। তারপর থেকে সব ঠিকঠাক চোরেরাও খুশি ঘণ্টাবাদকও খুশি।’ আমাদের দেশে আজ এমন কোনো কাজ খুঁজে পাওয়া একান্তই দুষ্কর। যেখান থেকে অসৎ লোকেরা চুরি করতে পারবে না। আপনি ঘুষ দিতে না চাইলেও ঘুষ দিয়েই আপনাকে পাসপোর্ট বের করতে হবে। শুধু শুধু ঝামেলায় কেউ জড়াতে চায় না তাই বিদেশিরা এই ঘুষের নাম দিয়েছেন টিপস্। এই টিপসের মাহত্বে সমগ্র দেশ সয়লাব। কথাটা নিমর্ম হলেও সত্য। আমার জীবনে আমি হয়ত সত্যকে প্রতিষ্ঠিত দেখে যেতে পারব না তাই বলে সেই প্রচেষ্টা থেকে আমাদের বিরত থাকা কখনোই উচিত নয়। সমাজে নায় প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতি মুক্ত সমাজ গঠনে আমাদের করণীয় সম্পর্কে আগামী সংখ্যায় কিছু বলার অঙ্গীকার করে আজ এখানেই শেষ করছি।
ড. এলগিন সাহা : কলামিস্ট ও এনজিও ব্যক্তিত্ব।





Users Today : 29
Views Today : 29
Total views : 177432
