মেজাজ গরম হয়ে যায় অনলের। কী সুখে যে ও গাড়ি নিয়ে গ্রামের বাড়ি আসার কথা মাথায় এনেছিল! ঢাকা থেকে সকাল আটটায় রওনা দিয়েছিল। পথে বগুড়ায় একটু কাজ ছিল। তাই ভেবেছিল, ছয়টা সাড়ে ছয়টার মধ্যেই বাড়ি পৌঁছে যাবে। কিন্তু এখন ৮ টা বাজে, রংপুরেই পড়ে আছে। সামনে প্রচণ্ড জ্যাম। সারি সারি গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। সৈয়দপুর রোডের পাগলাপীরের কাছে নাকি এক্সিডেন্ট হয়েছে, তাই রাস্তা বন্ধ।
অনল দেশের বাইরে থাকে। প্রায় পাঁচ বছর পর দেশে এসেছে। ঢাকার বাসাতেই ছিল। গ্রাম থেকে অনলের বড়দা, মানে জ্যাঠাতো বড়ভাই ডেকে পাঠিয়েছে। বলেছে, এবার দুর্গা পূজায় অষ্টমী পূজার দিন সব ভাইবোন একসাথে গ্রামের পূজাতে থাকবে। ছোটবেলায় ওরা সবাই পূজায় গ্রামে আসতো। অষ্টমী পূজার দিন সবাইকে অবশ্যই গ্রামের পূজায় থাকতে হতো। কারণ এই দুর্গামন্দির ওর দাদু প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাই পূজাটা গ্রামের হলেও অষ্টমী পূজাটা ওরাই করতো। আর পূজাটাকে অনেকেই ওদের পরিবারের বলে জানে। সেনবাড়ির পূজা বলে অনেকেই।
প্লেনের টিকিট না পেয়ে অনল নিজের গাড়ি নিয়েই রওনা হয়। আসলে ওর একটু নস্টালজিয়া কাজ করছিল। ছোটবেলায় পূজাতে ঢাকা থেকে বাসে গ্রামের বাড়ি যেতো। এবার বগুড়ায় একটু কাজ ছিল, সব মিলিয়েই এই সিদ্ধান্ত নেয় অনল।
কিন্তু এমন বিপদে পড়বে এটা ভাবেনি। প্রায় সাড়ে দশটার দিকে ও সৈয়দপুর পার হয়। সামনে একটা ছোট বাজার, দু-একটা দোকান। অনল একটা দোকানের কাছে দাঁড়িয়ে একটা মিনারেল ওয়াটারের বোতল কেনে। গাড়িতে উঠবে এমন সময় অচেনা এক মেয়ে ওর দিকে এগিয়ে আসে। বয়স ২৪/২৫ হবে। একেবারে সাধারণ ইনোসেন্ট চেহারার মেয়ে । এসে বলে, ‘‘আমাকে একটু লিফট দিবেন? সামনে যাবো।’’ অনলের মনে হয়, আজ সাধারণ পরিবহণ বন্ধ , মেয়েটা হয়ত বিপদে পড়েছে। বলে, ‘‘ঠিক আছে ওঠেন।’’
রাস্তায় আজ গাড়ি নেই বললেই চলে। এক্সিডেন্টের কারণে মারামারি হয়। তাই দিনাজপুরগামী বাসগুলো রাস্তা ঘুরিয়ে অন্য দিক দিয়ে দিনাজপুরে যাচ্ছে। বেশ কিছুদূর যাওয়ার পর অনল জিজ্ঞাসা করে, ‘‘কই যাবেন?’’
মেয়েটা বলে, ‘‘আর একটু সামনে।’’ আর একটু এগুনোর পর একটা কাঁচারাস্তা দেখিয়ে মেয়েটা বলে, ‘‘এইদিকে গাড়িটা নেন।’’ অনল বলে, ‘‘না আমি কাঁচারাস্তায় গাড়ি নিব না। আপনি নেমেই যান। ’’
মেয়েটা বলে, ‘‘কেন? ভয় পাচ্ছেন? ভাবছেন, ভূত পেতনি কিনা? এতো রাতে তো রাস্তায় একা মেয়ে থাকার কথা না, বলেন? ’’ অনল একটু রেগেই বলে, ‘‘কই নামবেন বলেন, আমি আপনাকে ভূত ভাবছি না। ” মেয়েটা বলে, ‘‘সামনে কাঁচারাস্তার পাশেই ফাঁকা মাঠ, কেউ আসবে না। এখানকার হাইওয়ে পুলিশকে খুশি করি, ভয়ের কিছু নেই। আপনার গাড়ির পিছনে অনেকটা জায়গা। গাড়িতেই হবে নামতে হবে না।’’
অনলের নিজের ওপর রাগ হয়। এতো বোকামি ও কীভাবে করলো! অচেনা একটা মেয়েকে গাড়িতে তুলে নিল। মেয়েটা তো এখন ব্লাক মেইলও করতে পারে।
খুব শান্তভাবে বললো, ‘‘তোমার রেট কতো বলো? আর শোন, আমাকে বিপদে ফেলার চেষ্টা করো না, নিজেই সমস্যায় পড়বে।’’
মেয়েটা বলে, ‘‘পাঁচশ, এক হাজার যা দিতে চান দিয়েন। চলেন তাহলে।’’
অনল আর কিছুদূর এসে একটা বাজারের মতো জায়গার সামনে গাড়ি দাঁড় করে, মেয়েটাকে দুই হাজার টাকা দিয়ে বলে, ‘‘নেমে যাও।’’
এমন সময় অনলের ফোনে ওর বড়দার কল আসে। অনল টুকটাক কথা শেষ করে। দেখে মেয়েটা তখনো গাড়িতে। অনল তাকাতেই বলে, ‘‘দশমাইল পার হয়ে যাবেন তো গ্রামে , আমাকে একটু কষ্ট করে দশমাইলে নামিয়ে দিয়েন।’’ অনল রাজি হয়। মেয়েটা বলে, ‘‘আপনার ফোনের কথা শুনলাম, গ্রামে পূজা দেখতে এসেছেন মনে হচ্ছে, সেন বাড়িতে অনেক বড়ো পূজা হয় দেখিয়েন।’’ অনল কিছু বলে না। সেনবাড়ির পূজা মানে ওদের গ্রামের পূজার কথাই বলছে মেয়েটা। দশমাইল আসতেই মেয়েটা বলে, ‘‘অনেক ধন্যবাদ স্যার। পূজার কয়দিন আমাকে আর ধান্দায় বের হতে হবে না। আর আমি আপনার ক্ষতি করতাম না, আমি কারো ক্ষতিই করি না। এই ইভার শরীরে ভালো বংশের রক্ত, ভাগ্যদোষে আজ এই পথে।’’ গাড়ি থেকে ঠিক নামার সময় বলে, ‘‘ওই সেনবাড়ির রক্ত আমার শরীরে । শুনেছি ওই বাড়ির সবাই অনেক বড় মানুষ, নিজের পরিচয় দেই না কাউকে কখনো, ভালো থাক সবাই। আপনাকে কেন জানি বলে ফেললাম।’’
অনল চমকে ওর দিকে তাকায়। ভাবে মেয়েটাকে মিথ্যা বলার জন্য কিছু বলবে আবার ভাবে এরা তো মিথ্যা বলেই। এদের কিছু বলে লাভ নেই। আপদ নেমে গেছে ভালো।
ও ওদের গ্রামের রাস্তায় চলে আসে। দেখে ওদের বাড়ির কেয়ারটেকার নেপালকাকা আর ওর বড়দার ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। ওদের গাড়িতে তুলে রাত প্রায় ১২ টায় অনল বাড়িতে পৌঁছে।
পরের দিন অষ্টমী পূজা, সন্ধিপূজা শেষে প্রচুর লোক খাওয়া দাওয়া করে। সন্ধ্যায় একটা আলোচনাসভা বসে। সবাই পূজা নিয়ে ভালো ভালো কথা বলে। বড়দা সেই সাথে ভাষণে লাগিয়ে দেয়, বংশ তাদের কতো ভালো, এইসব।
কিছুক্ষণ থাকার পর অনল বাড়ির দিকে আসতে যায়। হঠাৎ কানে আসে দুইজন লোক কথা বলছে। একজন বলছে, ‘‘কী ভালো বংশ! কাকায় তো বিয়া করছিল একটা রাস্তার মেয়েক!’’
অনলের মাথায় হঠাৎ কিছু এসে ভর করে। ও যখন ফোর বা ফাইভে পড়ে, ওর ছোটকাকা দ্বিতীয় বিয়ে করেছিল। এই নিয়ে ওদের পরিবারে বিশাল গণ্ডগোল হয়েছিল। ওর কাকীমা রাগ করে ওদের বাড়িতে এসে কিছুদিন ছিল। তারপর অনল আর কিছু জানে না। ও ছোটো ছিল জন্য ওর কাছে ব্যাপারটা লুকিয়ে রাখা হতো। অনলের কোথায় যেন একটা অস্বস্তি হতে থাকে। কাকা মারা গেছে, এসব নিয়ে কাকীমাকে প্রশ্ন করা ঠিক না। অনলের বাবা , মা কতোটুকু জানে তা অনল জানে না।
ও ওদের কেয়ারটেকার নেপালকাকাকে ডাকে, জিজ্ঞেস করে, ‘‘কাকা তুমি কতদিন আমাদের বাড়িতে আছো?’’
—‘‘সে তোমার বাপের বিয়ার অনেক আগোত থাইক্যা। ক্যা বাপই?’’
—‘‘আচ্ছা ছোটো কাকা আর একটা বিয়ে করেছিল না? কাকে যেন?’’
—‘‘হ, ওই গুচ্ছগ্রামের একটা বেটি ছাওয়াক । আস্তাত মাটিকাটা কাম কত্তো। দেখিবার মানান আছিল ।
কিন্তু তোমার দাদু তো ওইটাক বাড়িত তুলিবার দেয় নাই।
পরে উকিলের মাধ্যমে ডাইভোস নিয়ে মেয়েটাকে টাকা দিয়ে দূরোত পাঠি দিছিল।’’
—‘‘এখন কই সে ? জানো?’’
—‘‘আর কইও না বাপ, অনেক আগত একদিন দিনাজপুর শহরত দেকছি, ঠোঁটত নিপিস্টিক, চোখোত কালা চশমা কী ঠাট! বেশ্যাগিরি করত।’’
—‘‘একটা বাচ্চা ছিল না?’’
—‘‘হয় আসিল, বেটি।’’
—‘‘ওই মেয়েটা কই জানো?’’
—‘‘জানি না কিন্তু মায়ের মতোনই হবে। পাপের আস্তাত গেইছে।’’
অনলের ভীষণ খারাপ লাগতে থাকে, কাল রাতের ওই মেয়েটা কি তাহলে ওর কাকাতো বোন ছিল ! ওদের বোন এই পথে!
ভীষণ অস্বস্তি হয় ওর। ও ভাবে, মেয়েটাকে খুঁজে বের করবে। সত্যি যদি তাই হয়, তো ওকে উদ্ধার করতে হবে।
অনল ওর বড়দি মানে পিসাতো দিদিকে আর বড়দাকে আলাদা করে ডাকে।
অনল আগের রাতের সব ঘটনা বলে যায় তাদের কাছে। তারপর , বলে, ‘‘ওই মেয়েটা যদি সত্যি ছোটকাকার মেয়ে হয় তো মেয়েটাকে উদ্ধার করতে হবে।’’
বড়দি বলে, ‘‘তোর কি মাথা খারাপ, আমরা সব ভাই-বোনরা দেশে বিদেশে ভালো ভালো জায়গায় আছি। কতো সম্মান আমাদের। মামাবাড়ি নিয়ে আমি সব জায়গায় গর্ব করি। পরের প্রজন্মও এখন বড় হয়েছে।
আমার মেয়ের বিয়ে দিয়েছি। সেখানে একটা সম্মান আছে। এই মেয়েকে এখন খোঁজা মানে নিজেদের সম্মান নষ্ট করা। এই মেয়ের কথা আর মুখেও আনবি না তুই।’’
বড়দা বলে, ‘‘মনে কর তুই খুঁজে পেলি, তারপর এই মেয়েকে কই রাখবি? কে দেখবে? তুই তো চলে যাবি বিদেশে।’’
অনল বলে, ‘‘টাকা পয়সা দিয়ে কোন এন জিওতে রাখা যায়। এমন অনেক এন জিও আছে।’’
—‘‘ছোটোকাকা কি পরিচয় করে দিছিল কখনো যে তার আর একটা মেয়ে আছে? আর এই মেয়ের যদি ভদ্র জীবন চাওয়ার থাকতো তো আগেই আমাদের সাহায্য চাইতো।’’
—‘‘ছোটোকাকা পরিচয় করে দেয় নাই ঠিক। তবে আমরা কিন্তু সবাই জানি ওনার একটা মেয়ে আছে। ছোটকাকা বা আমরা কেউই কিন্তু আর খোঁজ নেই নাই। এই মেয়ে আর ওর মা এই পথে যাওয়ার জন্য ছোটোকাকা কিন্তু দায়ী।’’
— ‘‘শোন অনল, আমি রাজনীতি করি। সামনে ইলেকশন।
সাংবাদিকরা ওত পেতে থাকে। ছোট জিনিসকে বড় করে ওরা।
এখন এমন একটা ইস্যু যদি সামনে আসে ফলাফল আন্দাজ করতে পারছিস তো!
যার ভাগ্য যাকে যেখানে নিয়ে গেছে যাক। কাকীমা বা ছোটোকাকার ছেলে, মেয়েও এটা পছন্দ করবে না। তুই আর এসব ঘাঁটতে যাস না।পরিবারে অশান্তি ডেকে আনিস না।’’
অনল দশমীর একদিন পর ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হয়।
এই কয়দিন ও বিভিন্নভাবে চেষ্টা করেছে ইভা নামে মেয়েটার খুঁজে পাওয়ার। স্থানীয় থানাতেও বলে রেখেছে। কিন্তু কোনো খোঁজ পায় নাই।
ঢাকা যাওয়ার আগে ও থানায় একবার আসে। দারোগা খুব যত্ন করে ওকে বসায়। বলে, “অনেক খুঁজেছি এই নামে কোনো মেয়ে পাই নাই। আসলে এরা নিজের আসল নাম পরিচয় দেয় না। আপনি তো আরো কিছুদিন দেশে আছেন। কোনো সংবাদ পেলে আপনাকে জানাবো।’’
অনল থানা থেকে বের হয়ে গাড়ির দিকে যায়।
দারোগা সাথে সাথে অনলের বড়দাকে ফোন দেয় বলে, ‘‘স্যার আপনি চিন্তা করবেন না। আপনার ভাইকে না বলে দিয়েছি। আর যে কয়দিন আপনার ভাই দেশে থাকবে এই মেয়েকে থানায় রাখবো। কেউই খুঁজে পাবে না। আপনি নিশ্চিত থাকেন।’’
কয়দিন হলো ইভা আর তার মাকে থানায় একটা ঘরে বন্দী করে রাখা হয়েছে। ইভা সব কিছু শুনে বুঝতে পেরেছে কী হয়েছে। অনলের কথা আর দারোগার কথাও ও শুনতে পেরেছে।
ঘরে খুব ছোটো একটা জানালা। ও অনেক কষ্টে জানালা দিয়ে অনলকে দেখতে পায়। ওর ইচ্ছে করে দৌডে ও অনলের কাছে যায়। চিৎকার করে ডাকে। কিন্তু কিছুই করে না। শুধু মনে মনে বলে , ‘‘দাদা আমি এতোদিন পুরুষের একটা রূপ দেখেছি। যারা আমি ছোটো থাকতে মার কাছে আসতো আর এখন আমার কাছে। আমি বাবা, কাকা, ভাই কাউকে চিনি না। এই প্রথম ভাইকে চিনলাম যে নিজের সম্মানের কথা না ভেবে বোনকে কাদা থেকে তোলার চেষ্টা করেছে। কিন্তু আমি চোরাবালিতে আটকা দাদা, তুমি তুলতে পারবে না। এই বোন তোমার সম্মান নষ্ট করবে না। তুমি ভালো থাকো, ভগবানের কাছে এই প্রার্থনা করবো সব সময়।’’
অনলের কী যেন মনে হয়, ও একবার থানার দিকে তাকায় আর তারপর গাড়িতে উঠে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হয়।
( গল্প গল্পই। কেউ বাস্তব ভেবে নিবেন না। নাম বা ঘটনা যদি কিছু মিলে যায়, তা কাকতালীয়)




Users Today : 17
Views Today : 20
Total views : 175524
