পুরোনো একটি গল্প এখনও প্রায়ই শোনা যায় এক পুরুষ সাংবাদিক একবার মনস্থির করলেন বিয়ে করবেন। সেই সাংবাদিকের পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন কোমরে গামছা বেঁধে পাত্রী নির্বাচনে নেমে পড়েন। পাত্রীর মুখদর্শনে গেলে পাত্রীর বাবা প্রশ্নকরে বসেন ছেলে কী করেন, অর্থাৎ পেশা কী? ছেলেপক্ষের উত্তর ‘ছেলে নাম করা পত্রিকার সাংবাদিক’। মেয়ের বাবার পাল্টা প্রশ্ন ‘বুঝলাম সাংবাদিক, কিন্তু কী চাকরি করে’?
সাংবাদিকতা পেশাকে নিয়ে এমন অনেক নেতিবাচক গল্প প্রচলিত ছিল। এক সময় বলা হতো, যার হয় না অন্য কোনো গতি, তিনি হন সাংবাদিক। কিন্তু এখন যুগ পাল্টে গেছে, বর্তমান ‘মিডিয়া বুম’ বা বিস্ফোরণের যুগে এমন গল্পগুলো এখন মিথ। যুগ শুধু পাল্টায়নি, অনেকখানি পাল্টেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুরোপুরি বিপরীত চিত্রও বলা যায়।
সংবাদপত্রের যাত্রা বহু প্রাচীন হলেও বিংশ শতাব্দীতে এসে এর আমুল পরিবর্তন হয়ে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে এক ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে। শুধু তাই নয় রাখছে অগ্রণী ভূমিকাও। রাজধানী ঢাকার বাইরে ও মফস্বলে এক ব্যাপক বিস্তৃতি ঘটেছে। নানা প্রতিকূলতা সত্বেও সাংবাদিকতা ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে বিপুল সম্ভাবনার স্বাক্ষর রাখতে সক্ষম হয়েছে।
সংবাদপত্রকে আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার অনিবার্য এক উপাদান হিসাবে বিবেচনা করা হয়। সাংবাদিকদের জাতীর বিবেকও বলা হয়। সংবাদপত্রের যাত্রা যথেষ্ট প্রচীন হলেও বিংশ শতাব্দিতে সংবাদপত্র বিভিন্ন দেশীয় আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে বেশ কিছু তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল, বর্তমানেও করছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ওয়াটার গেট কেলেংকারী সংশিষ্ট সাংবাদিকতার গভীর তাৎপর্যপূর্ণ নিয়ামকের ভূমিকা পালন করেছিল। বাংলাদেশের সাংবাদিকগণ তাৎপর্যপূর্ণ ইতিবাচক ভূমিকার স্বাক্ষর রেখেছেন। একটি দেশের সাংবাদিক, পুলিশ, রাজনৈতিক নেতা, এমপি, মন্ত্রী যদি সৎ, যোগ্য, বাস্তববাদী হয় তবে যেকোনো ধরনের উন্নতি করতে কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হওয়ার কথা নয়। রাজধানী ও বিভাগীয় শহরের বাইরে মফস্বলের সাংবাদিকতাও পর্যাপ্ত বিস্তৃত হয়েছে এবং বিভিন্ন সমস্যা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও বাংলাদেশের মফস্বল সাংবাদিকতা বিপুল সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করেছে। মফস্বল শব্দটির আভিধানিক অর্থ শহর বহির্ভূত ‘‘স্থান” বা ‘‘গ্রাম”। এই অর্থে মফস্বলের খবর মানে গ্রামের খবর কিন্তু বাস্তবে ঢাকার বাইরে শহর গ্রামগঞ্জ জনপদের খবরই মফস্বলের খবর—সুতরাং মফস্বল সাংবাদিকতা বলতে রাজধানী ঢাকার বাইরে বিভিন্ন মাত্রার সাংবাদিকদের বুঝানো হয়। বাংলাদেশের মফস্বলে মুদ্রণ গণমাধ্যম সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকতাকে প্রধানত দুইভাগে ভাগ করা যায়।
মফস্বল এলাকা থেকে প্রকাশিত দৈনিক, সাপ্তাহিক পত্রিকার সাথে সংশ্লিষ্ট সংবাদ কর্মীদের সাংবাদিকতা একভাগে চিহ্নিত হতে পারে। আর অন্য ভাগে ঢাকা থেকে প্রকাশিত জাতীয় পর্যায়ের দৈনিক সাপ্তাহিক পত্রিকার সাথে সংশ্লিষ্ট সংবাদ কর্মীদের কার্যক্রমকে দ্বিতীয় ভাগে দেখানো যায়।
বাংলাদেশে তীব্র আন্দোলন সংগ্রামের পর ১৯৯১ সালে সংসদীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা পুনরায় চালু হওয়ার পর ঢাকা থেকে যেমন প্রচুর সংখ্যক জাতীয় দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছে তেমনই দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকেও বিপুল সংখ্যক নতুন নতুন স্থানীয় দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকাও প্রকাশিত হয়েছে, দেশে স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলের সংখ্যাও কিন্তু কম নয় ব্যাঙের ছাতার মত গজিয়ে উঠেছে অন লাইন পত্রিকা, যেখানে কোন নিয়ম নীতি অনুস্মরণ করা হয় না। যে-সে সাংবাদিক হয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন সরকারের আমলে দলীয় বিবেচনায় অনেক টিভি চ্যানেল হয়েছে। এ বিপুল সংখ্যক পত্রিকার দায়িত্ব পালনের জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যক সংবাদকর্মীর প্রয়োজন হয়েছে। কিন্তু এসব মফস্বল সংবাদকর্মীদের সমস্যা ও সম্ভাবনাও অনেক।
ঢাকা থেকে প্রকাশিত সংবাদপত্রগুলোতে মফস্বল ডেক্স নামে একটি ডেক্স আছে। এটা বার্তা বিভাগেরই অংশ। এ ডেক্সের একজন প্রধান থাকেন, তার সহযোগী থাকেন আরও কয়েকজন। ঢাকার বাইরে থেকে সংবাদদাতা, নিজস্ব প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর এ ডেক্সে কর্মরত সাংবাদিকরা প্রয়োজনীয় সংশোধন ও পরিমার্জন সাপেক্ষে প্রকাশের ব্যবস্থা করেন। ঢাকার বাইরে থেকে পাঠানো সংবাদগুলো গুরুত্ব অনুযায়ী সংবাদ পত্রের বিভিন্ন পাতায় প্রকাশিত হয়।
এছাড়া মফস্বলের সংবাদ প্রকাশের জন্য স্বতন্ত্র পাতা আছে প্রতিটি সংবাদপত্রে। দৈনিক যুগান্তরে বাংলার মুখ, প্রথম আলো সারা দেশ, বিশাল বাংলা, দৈনিক জনকন্ঠের দেশের খবর, জনপদের খবর, দৈনিক সমকালে লোকালয় এর পাশাপাশি বিভিন্ন দৈনিক সংবাদ পত্রের অঞ্চল, মহানগর, বিভাগ ও জেলা কেন্দ্রিক স্বতন্ত্র পাতাও প্রকাশ করে থাকে। এমনও কেউ কেউ আছেন যারা কেবল মাত্র কোনো দৈনিক, জাতীয় দৈনিক, সাপ্তাহিক পত্রিকার সংবাদদাতা হিসেবে কাজ করে থাকেন। তাদের সকলের পরিচয় সাংবাদিক। কিন্তু বিভেদ কেন? এ বিভেদের একটি গুরুত্বের কুফল এই যে, যারা উপজেলা, পৌরসভা, জেলা, বিভাগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের সংবাদদাতা হিসেবে কাজ করেন তাদের অনেকই কেন্দ্রীয় দপ্তরে সাংবাদিক হিসেবে কাজ করেন তাদের তুলনায় নিজেদেরকে হীন ভাবেন। আবার কেন্দ্রীয় দপ্তরে এমন সব সাংবাদিক কাজ করেন যাদের মধ্যে এমন অনেক আছেন যারা নিজেদের মফস্বল সাংবাদিকদের চেয়ে শ্রেয়তর ভাবেন এবং এ নিয়ে অহংকার করে থাকেন। কোনো কোনো সময় মফস্বলের সাংবাদিকদের বিভিন্নভাবে হয়রানিও করে থাকেন। একজন সফল সাংবাদিক যে শিক্ষা দিক্ষা, অভিজ্ঞতা, দক্ষতা, যোগ্যতা, পর্যবেক্ষণক্ষমতা, মেধা ও প্রতিভা থাকা দরকার তা একজন মফস্বল সাংবাদিকেরও থাকতে পারে, আবার কেন্দ্রীয় পরিদপ্তরে যারা কাজ করেন তাদের অনেকের মধ্যে সে সব যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, মেধা, প্রতিভা নাও থাকতে পারে। সুযোগ সুবিধা দেওয়ার ব্যপারটি তার পারফরমেন্সের ওপর হওয়া উচিত। সংবাদপত্র কর্তৃপক্ষ এটা কোনো সময় ভেবে দেখেন না। উপজেলা পর্যায়ের সাংবাদিক, এমন কি জেলা পর্যায়ের কোনো কোনো সাংবাদিককে পত্রিকা কর্তৃপক্ষ কোনো প্রকার বেতন ভাতা, সুযোগ সুবিধা দেন না। তবে তারা কোনো কোনো সময় অস্থায়ী নিয়োগ পত্র, নাম মাত্র একটি পরিচয়পত্র, পত্রিকার সৌজন্য কপি হাতে ধরিয়ে দিয়ে দায়িত্ব কর্তব্য শেষ করেন। তার পরেও কোনো কোনো সময় গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ না পাঠানো হলে ধমক খেতে হয়। সাংবাদিকতা হারানো ভয় থাকে। তবে হাতে গোনা কয়েকটি জাতীয় পত্রিকায় নিয়োজিত সাংবাদিকরা মাত্র ৫০০ টাকা করে প্রতিমাসে সন্মানী দিয়ে থাকেন। যারা উপজেলা পর্যায়ে সাংবাদিককে সার্বক্ষণিক পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছেন তাদের করুণ দশা। তাদের নুন আন্তে পান্তা ফুরায় অবস্থা। আর যারা সাংবাদিককে নেশা বা দ্বিতীয় পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছেন তাদের কথা আলাদা। জীবনযাপনের জন্য সার্বক্ষণিক সাংবাদিকদের আরও অনেক কিছু করতে হয়। স্থানীয় দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকার সাংবাদিকদের অবস্থা আরও করুন। বেতন ভাতা, সুযোগ সুবিধাবিহীন নিয়োগকৃত সাংবাদিক পরিচয়পত্র বহনকারী ওই সব সাংবাদিকরা পরিচয়পত্র ভাঙ্গিয়ে খেতে তারা অভ্যস্ত। ওই সব সাংবাদিকরা বাধ্য হয়ে হলুদ সাংবাদিকতার পথ বেছে নেয়। তারা সারাক্ষণ থানায় কর্মরত অসৎ পুলিশ, এএসআই, এসআই, ওসির পেছন পেছন ঘুর ঘুর করতে থাকে। কোনো ধর্ণাঢ্য ব্যক্তিকে অস্ত্র, হেরোইন, ফেনসিডিলসহ মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে চার্জসিট থেকে বাদ দিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয় পুলিশ ও সাংবাদিক, রাজনৈতিক দলের নেতা পাতিনেতাদের মিলে ভাগ বাটোয়ারা করে খাওয়া এসব অবৈধ কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িয়ে পড়ে। মাদক সম্রাট, ইয়াবা, হেরোইন ব্যবসায়ীদের বাড়ি, তাদের পিছন পিছন ঘুরতে থাকে। কিছু অর্থিক সুবিধার জন্য। শুধু কি তাই মেয়র, এমপি, মন্ত্রীসহ জনপ্রতিনিধি ও মাদক সম্রাটদের সাথেও সখ্যতা রেখে অবৈধ পথে কালো টাকা আয় করতেও দ্বিধা করে না। ফলে জাতির বিবেক সাংবাদিকতা হয়ে যায় বিতর্কিত কলঙ্কিত, মহান পেশা সাংবাদিক থেকে সাংঘাতিক। এত কিছুর পরেও সংবাদপত্র কর্তৃপক্ষ পত্রিকার প্রচার সংখ্যা বাড়ানো, বিজ্ঞাপনের জন্য বিনা বেতন ভাতায় মফস্বল এলাকায় সাংবাদিক নিয়োগ দিতে মরিয়া হয়ে উঠেন। অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও বাস্তব সত্য রাজশাহী থেকে প্রকাশিত একটি পত্রিকায় গোদাগাড়ী উপজেলায় ৬/৭ সাংবাদিক নিয়োগ দেওয়ার নজীর রয়েছে। গোদাগাড়ী প্রতিনিধি, পৌরসভা প্রতিনিধি, প্রেমতলী প্রতিনিধি, রাজাবাড়ী প্রতিনিধি, বালিয়াঘাটা প্রতিনিধি, বরেন্দ্র অঞ্চল প্রতিনিধি, কাঁকনহাট প্রতিনিধি। ২/১জন ছাড়া মফস্বল সাংবাদিকদের যোগ্যতা, অভিজ্ঞা, মেধা, প্রতিভা যা থাকা দরকার তা কোন অংশে কম নেই অথচ তারা মর্যদা ও আর্থিক সুযোগ সুবিধা পান না। সাংবাদিকতা সবচেয়ে ঝঁকিপূর্ণ পেশা। এ পেশায় দৈহিক নিরাপত্তার ঝুঁকি যেমন আছে, তেমনী আছে অর্থনৈতিক ঝুঁকিও। এ উভয় ঝঁকি তুলনামূলকভাবে মফস্বল সাংবাদিকের বেশী। অথচ আর্থিক তেমন সুযোগ সুবিধা নেই। দেশ ও জনস্বার্থে অবৈধ অস্ত্র, মাদক, চোরাকারবারী, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, সরকারি জমি দখল, শোষণ জুলুম ইত্যাদি সম্পর্কে বস্তনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন করতে গেলে কায়েমী স্বার্থান্বেষী মহলের বিরাগ ভাজন হতে হয়। প্রতিটি রিপোর্টের ক্ষেত্রে প্রতিপক্ষ থেকেই। পুলিশ, ডিবি পুলিশ, বিজিবি, র্যাব, প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা, পৌর মেয়র, চেয়ারম্যান, এমপি, মন্ত্রীদের রিপোর্ট করলেই হতে হয় হয়রানির শিকার। মিথ্যা ধর্ষণ, হত্যা, চাঁদাবাজি প্রভৃতি মামলার আসামি। যেতে হয় জেলাখানায়, অন্যথায় ঘরবাড়ি, পরিবার পরিজন ত্যাগ করে মাথায় হুলিয়া নিয়ে পালিয়ে বেড়াতে হয়। অকালে হারাতে হয় প্রাণ, পঙ্গুত্ব বরণ করতে হয়, মামলা হামলাসহ চোরাচালানী মাদক ব্যবসা, পুলিশ, প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা ও জনপ্রতিনিধিদের হাতে জিম্মি হয়ে পড়তে হয়। স্থানীয় দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকায় নিয়োগকৃত সাংবাদিকদের বেতন ভাতা তো দূরের কথা প্রতিষ্ঠিত জাতীয় দৈনিক সংবাদপত্রে নিয়োগকৃত সাংবাদিকরা কোন বেতন ভাতা পান না। এমন অনেক দৈনিক সংবাদপত্র আছে যারা তাদের উপজেলা পর্যায়ের সাংবাদিকদের পরিচয়পত্র সরবারাহ করেই সব কাজ আদায় করে নেন। বেতন ভাতা তো দূরের কথা তাদের নিয়োগপত্র পর্যন্ত দেওয়া হয় না। যারা সাংবাদিক হিসেবে কাজ করেন, তারা নিয়োগ পত্র না পেয়ে বেতন ভাতা না পেয়ে কিভাবে চলেন, কিভাবে জীবনজীবিকা নির্বাহ করেন সেটা একটা বড়ো প্রশ্ন থেকেই যায়। আগেই বলা হয়েছে সাংবাদিকতা করেন অনেকে পেশা হিসেবে, মফস্বল এলাকায় এমন কতকগুলো সাংবাদিক রয়েছে যাদের কোনো একাডেমিক সনদপত্র নেই। ওই সব সাংবাদিকরা সাংবাদিকতাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন। তারা সাংবাদিকতার পরিচয় পত্রকে ভাঙিয়ে খান, সারাদিন চষে বেড়ান থানা, উপজেলা, পৌরসভা, রাজনৈতিক নেতা, এমপি, মন্ত্রী, মাদক সম্রাট, চোরাকারবারীর বাড়ি। অনেকে তাদেরকে সাংবাদিক না বলে সাংঘাতিক বলে থাকেন। যারা শখের বসে কিংবা দ্বিতীয় পেশা হিসেবে সাংবাদিকতা করে থাকেন তাদের সংখ্যা খুব একটা বেশী না। তারাও ওই সব সাংঘাতিকদের জন্য বিতর্কিত হয়ে পড়েন। দৈনিক সংবাদপত্র মালিক সম্পর্কে অভিযোগ আছে, তারা নাকি সাংবাদিকদের একটি পরিচয় পত্র হাতে ধরিয়ে দিয়ে খুঁটে খাওয়ার পরামর্শ দেন, স্পষ্টত ওই সব মালিক সাংবাদিকদের ঘুষ দুর্নীতি, চাঁদাবাজিতে লিপ্ত হতে প্ররোচণা দেন। এমন কথাও শুনা যায়, একটি পত্রিকায় প্রতিনিধি, পৌর প্রতিনিধি, উপজেলা প্রতিনিধি, ফাঁড়ি প্রতিনিধি, কলেজ প্রতিনিধি, বরেন্দ্র অঞ্চল প্রতিনিধি, বিশেষ প্রতিনিধি, স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে একই উপজেলায় ৫/৬ নিয়োগ করে থাকেন। পত্রিকা মালিক সাংবাদিকদের বিজ্ঞাপনের ঠিকভাবে কমিশন না দিয়ে উল্টো তাদের কাছে মাসোয়ারা নিয়ে থাকেন। মাসোয়ারা না দিলে তাদেরকে পূর্ব নোটিশ ছাড়াই বাদ দিয়ে নিজ পত্রিকায় সংবাদদাতা নিয়োগের বিজ্ঞাপন দিয়ে থাকেন। এরা সাংবাদিক নামে চাঁদাবাজ সাংঘাতিক তৈরি করছেন না সাংবাদিক পেশাকে কলুষিত করছে, এর মর্যাদা নষ্ট করছে। এ ধরনের সাংবাদিক ও পত্রিকার অসৎ মালিকদের খুঁজে বের করে উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা করা উচিৎ।
প্রত্যেকটা পেশাতেই একটি নির্দিষ্ট পেশাগত ন্যূনতম যোগ্যতার মাপকাঠি কোনো সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান দ্বারা নির্ধারিত থাকে। কিন্তু সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেই এ ধরণের কোন মাপকাঠি এখনো নির্ধারিত হয়নি। প্রেস কাউন্সিল এ ব্যাপারে একটু আওয়াজ তুললেও তা আলোর মুখ দেখেনি। শুধু তাই নয়, সব পেশাতেই কর্মীর জন্য অর্থনৈতিক ও অন্যান্য আকর্ষনীয় সুবিধাদি বরাদ্দই থাকে। সে বিবেচনায় সাংবাদিকতা পেশায় কর্মরত মানুষ, নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান হতে এ ধরণের যুগোপযোগী সুবিধাদি প্রত্যাশা করতেই পারে, আর তা প্রত্যাশা করা অমূলকও নয়। আমার মতে, একজন সাংবাদিক কে হতে হবে দক্ষ, প্রজ্ঞা আর মেধা সম্পন্ন মানুষ। কিন্তু মফস্বল সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে অনেক সময়ই এটির সম্মিলন ঘটে না। এর উপযুক্ত কারণও আছে, কারণ প্রত্যেকটি পেশাজীবীই চায়, তার পেশার উৎসতেই পূর্ণ সময় ব্যয়ের মাধ্যমে নিজ ও পরিবারের অর্থনৈতিক চাহিদার স্বমন্বয় ঘটাতে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই মফস্বল সাংবাদিকদের এ প্রত্যাশা পূরণ করা প্রায় অসম্ভব। গুটি কয়েক স্বনামধন্য পত্রিকা ছাড়া অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলো ঠিক মতো সাংবাদিকদের খোঁজ-খবর বা বেতনই দেয় না। কিন্তু পত্রিকার পাতা খুললেই যে খবরগুলো আমাদের চোঁখে পড়ে, যে সংবাদগুলো একটা দৈনিকের প্রাণ হয়ে দাঁড়ায়, সে মফস্বল সাংবাদিকদের খবর কেউ রাখে না। তারা কতটুকু কষ্ট, ঝুঁকি নিয়ে সংবাদগুলো সংগ্রহ করছে, কতটা সময় ব্যয় করে একটা প্রতিবেদন তৈরি করছে, সে খবরই বা আমরা ক-জন রাখি? অনেক ক্ষেত্রেই সংবাদের পেছনে ছুটতে গিয়ে সন্তান-পরিবার-পরিজনকেও ঠিকভাবে সময় দিতে পারেন না। কিছুটা যেন অন্তহীন দৌড়! কখনো সংবাদ প্রকাশের কারণে আইনী জটিলতায় পড়ে আদালতের কাঠগড়ায়, কখনো স্থানীয় প্রভাবশালীর শিকার হয়ে আহত শরীর নিয়ে হাসপাতালের বেডে শুয়ে অসহ্য যন্ত্রণায় ছটফট করা। এ সবই মফস্বল সাংবাদিকদের জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনার সারাংশ। তবুও নেই সাহায্যের হাত বাড়ানোর মানুষ, নেই আইনী লড়াইয়ের সক্ষমতা। কিন্তু অনেকেই এসকল ঝামেলায় না জড়িয়ে উল্টো পথে যাত্রা করেন, যাদের অনেক সাংবাদিককেই স্থানীয়রা সাংবাদিক এর বদলে সাংঘাতিক বলে আখ্যায়িত করে। স্থানীয়দের মতে, সাংবাদিকতা মানে ধান্ধাবাজি করা। আর তাই এসকল মফস্বল সাংবাদিকের ক্ষেত্রে এধরণের ঝামেলা তো ঘটেই না, বরং স্থানীয় প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাথে সাংবাদিক পরিচয়ের বদৌলতে জুটে জামাই আদর। সবই যেন ভূতের কারসাজি!
মফস্বলে থেকে আমার দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতার আলোকে মফস্বল সাংবাদিকদের যে সব চ্যালেঞ্জ এর সম্মুখিন হতে হয় তা তুলে ধরার চেষ্টা করছি।
জাতীয় পর্যায়ের নামীদামী মিডিয়া হাউজগুলো উপজেলা সংবাদদাতা তথা মফস্বল সাংবাদিকদের তেমন মূল্যায়ন করতে চায় না। অনেক পত্রিকাই তাদের সম্মানিভাতাও ঠিকমতো পরিশোধ করে না বা দেয় না। এ কারণে মফস্বলের প্রকৃত সংবাদকর্মীরা সাংবাদিকতার নীতিচ্যুত হওয়ার কষ্টে ভোগেন। কিন্তু তারা প্রতিবাদী হওয়ার সাহস দেখাতে পারেন না। বেতন-ভাতা না পাওয়ায় তাদের জন্য কঠিন সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। অথচ মফস্বলের সাংবাদিকরাই যে কোন পত্রিকা ও গণমাধ্যমকে টিকিয়ে রাখার প্রধানতম পুঁজি।
সাংবাদিকতা একটি সম্মানজনক পেশা হলেও ঝুঁকিপূর্ণ চ্যালেজিং পেশা হলো সাংবাদিকতা। মফস্বল সাংবাদিকদের ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জ আরো বেশি। নানা ধরণের হুমকি ধামকির মধ্য দিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে হয় তাদের। নিজের নিরাপত্তা নিজেকেই স্থির করতে হয় তাদের। মফস্বল সংবাদ ও সাংবাদিকতা গণমাধ্যম এর একটি অপহিার্য অংশ হলেও এদিকে নজর নেই মিডিয়া হাউজগুলোর। তারপরে হলুদ সাংবাদিকতার চ্যালেঞ্জতো রয়েছেই। নানা প্রতিকূলতার মধ্যে এক প্রকার যুদ্ধ করে টিকে থাকতে হয় মফস্বল সাংবাদিকদের।
শিল্পপতি, ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক নেতার হাতে পত্রিকা ও মিডিয়া হাউজ চলে যাওয়ায় মফস্বল সাংবাদিকদের বিপদ আরো বেড়েছে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বা রাজনৈতিক চরিত্র আড়াল রাখার জন্য তারা পত্রিকাকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করছেন। যার কারনে মফস্বলে এখন সাদা, কালো, হলুদ, নীল তথা নানা বর্ণের সাংবাদিকে ভরে গেছে।
মফস্বল সাংবাদিকদের বড় সমস্যা হলো নিজেদের সৃষ্ট সমস্যা। তাদের মধ্যে ঐক্যের অভাব রয়েছে। তাছাড়াও একে অপরের মধ্যে হিংসা, অহংকার বোধতো রয়েছেই। যার কারণে মফস্বলের প্রতিটি জেলা উপজেলায় একাধিক প্রেসক্লাব, রিপোটার্স ইউনিটি, সাংবাদিক সংস্থা নামে বেনামে নানা সংগঠন বিদ্যমান রয়েছে।
সমাজের নানা অসঙ্গতি নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করতে গেলেই সমাজ ও রাষ্ট্রের ক্ষমতাবান অসৎ ব্যক্তিবর্গ ক্ষুদ্ধ হন। তারা নানা কৌশল প্রয়োগ করে মফস্বল সাংবাদিকদের সত্য প্রকাশ থেকে বিরত রাখার অব্যাহত চেষ্টা করেন। না পারলে তাদের নানা হুমকি ধমকির শিকার হতে হয় সাংবাদিককে। সত্য প্রকাশ করতে গিয়ে মফস্বলের অনেক সাংবাদিককে হত্যার শিকার হতে হয়েছে। প্রভাবশালী ঐ চক্রটি মফস্বল ভিত্তিক মুক্ত সংবাদ চর্চা ও মফস্বল সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে প্রধান বাধা।
মফস্বলে সাংবাদিকতাকে পুঁজি করে অনেকেই অপসাংবাদিকতায় লিপ্ত হন। সমাজপতি, রাজনৈতিক নেতা ও প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের তৈলমর্দন করে নিজের সুবিধা আদায়ই তাদের কাজ। অনেকেই আবার প্রাইভেটকার ও মটরসাইকেলে স্টিকার সাটিয়ে সারাদিন ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তারা সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ তৈরি ও প্রকাশের চাইতে ফাঁদে ফেলে সুবিধা আদায়ে ব্যস্থ থাকেন বেশি। এদের কারণে সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিককতা প্রশ্নবিদ্ধ।
বর্তমানে মফস্বল সাংবাদিকতায় স্বল্প শিক্ষিতদের ছড়াছড়ি বেশি। বই বিক্রেতা, বীমাকর্মচারী, চা বিক্রেতা, মাদকব্যবসায়ি থেকে শুরু করে রাজমিস্ত্রী, সিএনজি চালক, ড্রাইভার, বিভিন্ন অফিস আদালতের দালালরাও সাংবাদিকতার খাতায় নাম লিখিয়েছেন। এছাড়া বর্তমান যুগে ফেসবুক ব্যবহারকারী সকলেই সাংবাদিক বলা যায়, কারণ অনেকেই ফেসবুকে বিভিন্ন ঘটনার ছবি ও ভিডিও আপলোড করে সাংবাদিক বনে যান। নীতিমালা না থাকায় প্রতিটি জেলা-উপজেলা সদরে বিভিন্ন নামে ফেসবুক পেইজ খুলে সংবাদকর্মী নিয়োগ দিচ্ছেন এবং নিজেকে মিডিয়া হাউজের পরিচয় দিচ্ছেন। সমাজপতি, কোন রাজনৈতিক নেতা ও কোন কোন দপ্তরে এদেরই কদর বেশি। যার কারণে শিক্ষক ও মেধাবীরা এ পেশায় যেতে এখন আগ্রহী হন না।
এখন সময় এসেছে গণমাধ্যম কর্মী ও কাজের গুণগত উন্নয়নের। কিন্তু সর্ষের মধ্যে ভূত রেখে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব নয়, তথা হলুদ সাংবাদিকতার প্রভাব রোধ করা সম্ভব নয়। আর এই অন্ধকারকে ঢাকতে বিশ্বব্যাপীই এজন্য নতুন রং সৃষ্টির তোড়জোড় সৃষ্টি হয়েছে। যাকে পশ্চিমা বিশ্ব ডাকতে শুরু করেছে গ্রিণ জার্নালিজম বা সবুজ সাংবাদিকতা। সর্বোপরি প্রয়োজন মফস্বল পর্যায়ে যোগ্য ও শিক্ষিত সাংবাদিক তৈরির সৃজনশীল উদ্যোগ, পাশাপাশি এ পেশায় কর্মরতদের আর্থিক ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির মাধ্যমে মফস্বল পর্যায়ে পেশাগত গণমাধ্যম কর্মী সৃষ্টির পথ সহজতর করা।
মফস্বল সাংবাদিকদের আর্থিক অনিশ্চয়তা দূর করার দায়িত্ব সংবাদপত্র কর্তৃপক্ষের যেমন; তেমনি সরকারের অনেক কিছু করার আছে। তাদের ওয়েজবোর্ড অনুযায়ী বেতন ভাতার ব্যবস্থা করা এবং ওয়েজবোর্ড যাতে ঠিকমতো বাস্তবায়িত হয় সেদিকে নজর দেওয়া। আর এ কাজটি করতে পারলে দেশ জাতি সমাজের কল্যাণে আসবেই মফস্বল সাংবাদিকরা।
জেমস আব্দুর রহিম রানা : জ্যেষ্ঠ গণমাধ্যমকর্মী ও কলামিস্ট।




Users Today : 1
Views Today : 1
Total views : 180735
