নারীর সামাজিক নিরাপত্তা বলয় সুসংহত করতে সামগ্রিক প্রচেষ্টা জরুরি। শিশু অবস্থা থেকেই প্রতিক‚ল পরিবেশ ও প্রতিবেশ অনুধাবন করেই সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিয়ে পরিণত বয়সে পৌঁছাতে হয় একজন নারীকে। গ্রাম বা শহর সর্বত্রই নারীকে প্রতিক‚লতার মুখোমুখি হতে হয়। প্রেক্ষাপটে কিছু ভিন্নতা থাকলেও সামাজিকভাবে সব অবস্থানে থাকা নারীকে নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত হতে হয়। একজন নারী যেই এলাকায় বসবাস করুক না কেন, যে কোন বয়সেই থাকুক না কেন, যে কোন পেশায়, যেকোনো অবস্থানেই থাকুক না কেন, সবখানে সে অনিরাপদ। কেন এই নিরাপত্তাহীনতার সমুদ্রে আমরা ডুবে আছি? পুরুষ শাসিত সমাজ ব্যবস্থার কারণে?
মূলত সামাজিক অব্যবস্থাপনা, দৃষ্টিভঙ্গির সীমাবদ্ধতা, নৈতিকতার চরম অবক্ষয়ের কারণে আজ এই পরিস্থিতি চলমান বলে আমি মনে করি। নারী ও শিশুদের উপর নিপীড়ন রোধ করার জন্য অনেক আইন ও কর্মসূচি প্রণীত হলেও কোনো অংশে তা কার্যকর প্রভাব বিস্তার করতে সমর্থ হয়নি। বয়স্কভাতা, মাতৃত্বকালীন ভাতা, নির্যাতিত, তালাকপ্রাপ্ত, বিধবা ভাতাসহ কার্যক্রম সরকারের পক্ষ থেকে গ্রহণ করা হলেও বাস্তবায়ন বা কার্যকারিতা সফলতার মুখ দেখেনি। তাছাড়া নারীর সামাজিক নিরাপত্তা এসব কার্যক্রম দ্বারা বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়।
গ্রামাঞ্চলে এখনো বাল্যবিবাহের প্রচলন রয়েছে। প্রাপ্ত বয়স্ক মেয়েরাও বিয়ের ক্ষেত্রেও তাদের মতামত প্রকাশের সুযোগ পায় না। যৌতুক, শারিরীক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার এসব মেয়েরা সারা জীবন নিরাপত্তাহীনতায় থাকে। সামাজিকভাবে অবহেলিত এসব মেয়েরা আত্মসম্মানের কথা ভেবে আইনি সহায়তা গ্রহণ করে না। শহুরে সমাজের মেয়েদের তুলনামূলক বাল্যবিবাহের হার কিছুটা কম। তবে যৌন হয়রানি, ধর্ষণ, শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন, হত্যা এবং আত্মহত্যার পরিসংখ্যান গ্রাম ও শহরে প্রায় সমান। নিকট আত্মীয়, প্রতিবেশী, সহপাঠী, এমনকি শিক্ষক বা কর্মক্ষেত্রে সহকর্মী, যানবাহনে প্রায় সর্বত্রই লাঞ্চনার শিকার হচ্ছে নারীরা। ন্যূনতম নৈতিক অধিকারটুকু তারা পায় না। সাধারণত যৌন হয়রানির ঘটনাগুলো প্রশাসন আমলে নেয় না। আর যদি নির্যাতিতা অভিযোগ করে তবে তাকে নির্যাতন প্রমাণ করার জন্য সর্বোচ্চ বিব্রত হতে হয়। আর ধর্ষিতারাতো ধর্ষণের প্রমাণ দিতে আবারও ধর্ষিত হয়। সেই সাথে প্রভাবশালীদের বিস্তার, সামাজিক সংস্কারতো রয়েছেই। এ হলো নির্মম বাস্তবতা।
কর্মক্ষেত্রে মজুরী বৈষম্য, নিরাপদ পরিবেশের অভাব নারীদের সামাজিক নিরাপত্তাকে ব্যাহত করে। একজন পুরুষ যখন নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টায় থাকে, একই সময় একজন নারীকে ক্যারিয়ারের পাশাপাশি সন্তান ধারণ ও লালন করতে হয়। মনোজগতের বিশাল পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই তাকে এগিয়ে যেতে হয়। তাই নারীদের জন্য ঐ সময়টা অনেক চ্যালেঞ্জিং, কঠিন। তারপরও শারীরিক ও মানসিক সকল প্রতিবন্ধকতাকে অতিক্রম করে একজন নারী এগিয়ে যায়। কিন্তু আমাদের সমাজ সেই নারীকে নিরাপত্তা দিতে অক্ষম।
ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে নারীকে যতটুকু সম্মান ও নিরাপত্তা দেয়া হয়েছে তা প্রয়োগ করা গেলেও নারীদের সামাজিক নিরাপত্তা লঙ্ঘিত হতো না। নির্যাতিতা নারীরা সুবিচার পেতো। শৈশব থেকেই নারী-পুরুষ নির্বিশেষে যদি নৈতিক শিক্ষার বাধ্যবাধকতা থাকে, নৈতিকতাকে লালন ও ধারণ করতে সামাজিকভাবে বাধ্য করা হয় তবে নারী ও পুরুষ উভয়ই সমান সম্মান, মর্যাদা ও নিরাপত্তা গ্রহণের সুযোগ পাবে। সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা খুব কঠিন বা অসম্ভব কোনো কাজ নয়। সরকার, প্রশাসন ও নাগরিকের সমন্বয় ও ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার মাধ্যমে আমরা পেতে পারি নিরাপদ বাংলাদেশ।
বর্তমান সময়ের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা নারীনিগ্রহ ও নারীর ক্ষমতায়ন। শৈশব থেকেই মেয়েদের সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়টি পরিলক্ষিত হয়। মেয়েরা যেকোনো বয়সে, যেকোনো স্থানে নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে তাদের জীবন অতিবাহিত করে। শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধকতার এই চৌকাঠ নারীরা কখনো অতিক্রম করতে পারে না। যদিও আমাদের সর্বোচ্চ ক্ষমতায় নারী রয়েছেন, তথাপি গুটিকতক ক্ষমতাধর নারী দ্বারা সমগ্র দেশের নারীকে কখনোই মূল্যায়ন করা যাবে না। অধিকাংশ শিক্ষিত, স্বল্প শিক্ষিত ও অশিক্ষিত নারী নিজেদের ন্যূতম অধিকার পায় না।
বহুল আলোচিত নারীর ক্ষমতায়ন বর্তমানে সামাজিক সূচকে বিবেচিত হচ্ছে। কেবলমাত্র মানবেতর অবস্থান থেকে নারীর মুক্তিই নয়, বিশ্বের অনেক সমস্যা থেকেই উত্তরণের প্রথম ধাপ হলো নারীর যথাযথ ক্ষমতায়ন। বাংলাদেশের স্থানীয় পর্যায় থেকে জাতীয় পরিসরে নারীর ক্ষমতায়নকে গুরত্ব দেয়া হলেও দেশজুড়ে নারী হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে মেয়ে শিশু ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনাও আশঙ্কাজনক বেড়েছে। নারীর পরিস্থিতি উন্নতি না হয়ে ক্রমশ অবনতির দিকে ধাবিত হচ্ছে। এ পরিস্থিতি হতে উত্তরণে কার্যকর পদক্ষেপ দ্রæত গ্রহণ করা উচিত।
ক্ষমতায়ন একটি জটিল এ বহুমুখী প্রত্যয়। ক্ষমতায়নের সাথে ক্ষমতা শব্দটি জড়িত। বস্তুগত, মানবিক ও বুদ্ধিভিত্তিক সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণই হলো ক্ষমতা। ক্ষমতা হলো নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার একটি প্রক্রিয়া। নারীর ক্ষমতায়নকে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়। অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন, সামাজিক ক্ষমতায়ন ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন। অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন বলতে বোঝায় অর্থনৈতিক কর্মকান্ড মূলধারায় নারীর পূর্ণ অংশগ্রহণ। এর পূর্ণ ব্যাখ্যায় বলা যায়-সিদ্ধান্ত গ্রহণ, বাস্তবায়ন, অভিগম্যতা, নিয়ন্ত্রণ এ সমতার ভিত্তিতে সুফল ভোগে নারীর পূর্ণ মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হওয়া। সামাজিক ক্ষমতায়ন বলতে নারীর অধিকারের বিষয়টি প্রথমে আসে। সমাজে নারী কি ধরনের ভ‚মিকা পালন করতে পারে এবং সে ভ‚মিকা পালনে তার ক্ষমতার চর্চা কতটা গুরত্বরপূর্ণ সে বিষয়টি বোঝায়। রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন হলো রাজনীতি চর্চায় নারীর পূর্ণ অংশগ্রহণ। ভোট প্রদান, নির্বাচনে অংশগ্রহণ, রাজনৈতিক দলে সমতার জায়গা নিশ্চিতকরণকে বোঝায়। এসব জায়গায় নারী বৈষম্যের শিকার বলে পুরুষের পাশাপাশি নারীর ক্ষমতায়ন একই অর্থে ব্যাখ্যা করা যায় না। সেজন্য ক্ষমতায়নের ধারণা পুরুষের জন্য একরকম, নারীর জন্য অন্যরকম। নারীর ক্ষমতায়ন সমতাভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থার প্রধান দিক।
ক্ষমতায়ন কোনো মানবিক দর্শন নয়। নারী বা পুরুষ যেই হোক না কেন, শুভবুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তি না হলে ক্ষমতায়নের অপব্যবহার ঘটে। যথাযথ ক্ষমতায়নের মাধ্যমে নারীনিগ্রহ প্রতিহত করা অনেকাংশেই সম্ভব। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের ক্ষমতাবান নারীরা যদি এগিয়ে আসেন তবে এদেশের নারীদের সার্বিক সক্ষমতা বৃদ্ধি সম্ভব, প্রতিহত করা যাবে নারীনিগ্রহ। পুরুষের ইতিবাচক মানসিকতা, নারীর প্রতি সম্মানবোধ ও ইতিবাচক দৃষ্টভঙ্গি সার্বিক সুফল বয়ে আনবে।





Users Today : 31
Views Today : 35
Total views : 177997
