খ্রীস্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দী হতে অর্থাৎ ইসকান্দারে আযম তথা আলেকজাণ্ডার উপমহাদেশ আক্রমণ করার পর হতে ইউনানী তথা গ্রীসীয় চিকিৎসা বিজ্ঞানের সাথে উপমহাদেশের পরিচিত হয়। তখন হতেই বৈদিক ও ইউনানী ভেষজদ্রব্য উভয় দেশের মধ্যে আদান-প্রদান হতো। কেননা আলেকজাণ্ডারের আগমনের পূর্বেই উপমহাদেশে যে বৈদিক চিকিৎসা বিজ্ঞান প্রচলিত ছিল, তাও আর্যগণ মধ্য এশিয়া হতেই নিয়ে এসেছিলেন। চিকিৎসা বিজ্ঞানের সূচনায় বেবিলনীয় চিকিৎসা বিজ্ঞানের অধ্যায়ে এ বিষয়টি আলোচিত হয়েছে। মূলতঃ সর্বপ্রকার চিকিৎসার সূতিকাগারই ছিল বেবিলন (বাবেল)।
ইসলামের আবির্ভাব ঘটলে মুসলমানগণ যখন ইরানের জুন্দিশাপুর ও মিসরের ইসকান্দারিয়া হতে চিকিৎসা বিজ্ঞান আয়ত্ত করেন তখন তারা উক্ত বিজ্ঞানের নামের কোনো পরিবর্তন না করে পূর্বের নামেই তাকে সম্বোধন করতে থাকেন। পক্ষান্তরে মুসলিম জাতীয়তা বিশ্বের কোনো সীমাবদ্ধ অঞ্চলের জাতীয়তা নয় বরং তা বিশ্বভ্রাতৃত্ব নামেই পরিচিত। তাই ইউনানী চিকিৎসা বিজ্ঞানকে বিশ্বভ্রাতৃত্বের আলোকে ইউনানী নামেই রেখে দেয়া হয়।
পূর্বে এ বিদ্যা ওস্তাদ-শাগরেদেরে মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। কারণ নিয়মিতভাবে ইসকান্দারিয়া বিশ্ববিদ্যালয় এবং জুন্দিশাপুর চিকিৎসা বিদ্যাপীঠ ছাড়া বিশ্বের কোথাও কোনো শিক্ষাগার অষ্টম শতাব্দী পর্যন্ত গড়ে উঠেনি।
নবম শতাব্দীর প্রথমার্ধে আব্বাসিয়া খলীফা হারুনুর রশীদের প্রধান উযীর নিযামুল মুলক বাগদাদে নিযামিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ও স্পেনের উমাইয়া বংশের খলীফাগণ কর্ডোভায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করলেই কেবল তথায় তিব্বী বিভাগের গোড়াপত্তন হয়। তারপরেও ওস্তাদ-শাগরেদ পরম্পরা শিক্ষাধারার মাধ্যমে অন্যান্য বিদ্যার মত চিকিৎসা বিদ্যাও প্রসার লাভ করে। এমন শিক্ষায় শিক্ষিত শিক্ষার্থিগণই চিকিৎসক হিসেবে শাহী সৈন্যবাহিনী, মুবাল্লিগ, মুআল্লিম, ইমাম ও বণিক রূপে সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে ইউনানী তথা ইসলামী চিকিৎসা বিজ্ঞানের প্রচার ও প্রসার ঘটান। এমনি প্রকারে মুবাল্লিগ, মুআল্লিম, ইমাম, বণিক সর্বশেষে সৈন্যবাহিনীর মাধ্যমে উপমহাদেশে ইউনানী চিকিৎসা বিজ্ঞানের আগমন ঘটে। চিকিৎসক হিসেবে মুসলিম সালতানাতের আমলে ইতিহাসে যাঁদের নাম পাওয়া যায় তাদের মধ্যে পাঠান বাদশা মুহাম্মদ তুগলক (১৩২৫-১৩৫১ খ্রীষ্টাব্দ) ও তাঁর পুত্র বাদশা ফিরোজশাহ তুগলকের নাম সর্বাগ্রে উল্লেখযোগ্য। ফিরোজ শাহ তুগলক (১৩৫১-১৩৮৮ খ্রীষ্টাব্দ) নিজেও একজন হাকীম ছিলেন।
লোধী সালতানাতের আমলে চিকিৎসকগণ আরবী ও সংস্কৃত ভাষা হতে চিকিৎসা বিষয়ক জ্ঞানকে তখনকার যুগের রাষ্ট্রভাষা ফার্সীতে অনুবাদ আরম্ভ করেন। শল্যবিদ্যায় পারদর্শী হাকীমগণ ইরান, তুর্কীস্তান, সমরকন্দ, বোখারা ও কাবুল হতে উপমহাদেশে আগমন করতে থাকেন এবং তাঁদের লেখা ও ব্যবহারিক বিদ্যার দ্বারা উক্ত শাস্ত্রের ভিতকে আরো দৃঢ় করতে থাকেন।
মোগল সালতানাতের আমলে ইউনানী চিকিৎসা বিজ্ঞান বলতে গেলে উপমহাদেশে চরম উৎকর্ষ সাধন করে। মোগল সুলতান জালালুদ্দীন মুহাম্মদ আকবরের আমলে রাষ্ট্রের সর্বস্তরে ফার্সী ভাষা প্রচলিত হয়। বস্তুতঃ এজন্যই অনেক আরবী গ্রন্থ ফার্সীতে অনূদিত হয়। এ যুগে হাকীম জীলানী ইবনে সীনার ‘আল কানুন ফিত-তিব্ব’-এর ব্যাখ্যা রচনা করেন। হাকীম শরফুদ্দীন ‘তিব্বে শেফায়ী’ রচনা করেন।
সুলতান জাহাঙ্গীরের (১৬০৫-১৬২৭ খ্রীষ্টাব্দ) আমলে ‘মোমিয়ায়ী’র ক্রিয়া আবিষ্কার হয়। হাকীম ছদরা জাহাঙ্গীরের দরবারী চিকিৎসক ছিলেন। সুলতান শাহজাহানের আমলে সাতীউননিসা নামক এক মহিলা হাকীম (তবীবা) সুলতানের হেরেমের নারীদের চিকিৎসার জন্য নিযুক্তি পেয়েছিলেন। উক্ত আমলেই মুহাম্মদ আকবর আরযানী চিকিৎসা বিজ্ঞানের উপর অনেক বই-পুস্তক রচনা করেন। তাঁর ‘তিব্বে আকবর’, ‘কারাবাদীনে কাদেরী’ ও ‘মীযানুত-তিব্ব’ ইত্যাদি বই-পুস্তক আজও বিখ্যাত হয়ে রয়েছে। মোগল আমলের চিকিৎসা বিজ্ঞান বিষয়ক উৎকর্ষতা সম্পর্কে হাকীম সাইয়েদ আলী আহমদ চান্দপুরী তাঁর বিখ্যাত রচনা ‘আতিব্বায়ে আহদে মোগলিয়া’ নামক গ্রন্থে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করেছেন।
বস্তুতঃ এভাবেই আমরা দেখতে পাই যে, ইউনানী চিকিৎসা বিজ্ঞান উপমহাদেশে আপন শিকড় অতি গভীরে বিস্তার করে। কিন্তু পর্তুগীজ ফরাসী ও ইংরেজদের এদেশে বেনিয়ার বেশে আগমন করতঃ দণ্ডমুণ্ডের মালিক হয়ে যাওয়ার পর হতে ইউনানী চিকিৎসা বিজ্ঞানের প্রতি অবহেলার সূচনা হয় এবং দেশীয় পদ্ধতির একিৎসাদ্বয়ের প্রতি তাদের বিমাতাসুলভ আচরণ আরম্ভ হয়। কারণ তাদের উদ্দেশ্য ছিল এদেশে দেশীয় চিকিৎসার পরিবর্তে এলোপ্যাথিক চিকিৎসার ভিতকে দৃঢ় করা, যাতে এদেশের ধন-সম্পদ লুট করে নিয়ে যাওয়ার পর ঔষধি সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে এলানী তৈরী করতঃ আবহমানকাল কর্তৃত্বের ছড়ি ঘোরানো যায়।
এমনি এক চরম মুহূর্তে কাওমী মাদ্রাসাসমূহ (দরসে নিযামী পাঠ্যসূচীর আলোকে বিচালিত) শিক্ষার প্রাথমিক স্তরে সাধারণভাবে এলমে তিব্বের প্রাথমিক জ্ঞানের বই-পুস্তকসমূহ পাঠ্যভক্ত করে উক্ত জ্ঞান অর্জনের জন্য জনগণকে আগ্রহী করে ভোলে। তাছাড়া কাওমী মাদ্রাসাসমূহে ‘শহরে আসবাব’, ‘মুজযুল কানুন’, ‘কল্লিয়াতে নাফীসী’ ও ‘কানুনে ইবনে সীনা’ও পড়ানো হতো। কোনো কোনো মাদ্রাসায় শুধু ‘স্মীযানুততিব’, ‘তিব্বে আবকর’ ও ‘মুফাররেহুল কুলুব’ নামীয় ফার্সী ভাষায় লেখা তিল-এর বই পুস্তক পড়ানো হতো। উপরের শ্রেণীর ছাত্রদের জন্য ‘যখীরায়ে খাওয়ারেজম শাহী’, ‘আকছারায়ী’, ‘সাদীদী’, ‘কানুনে ইবনে সীনা’-এর ব্যাখ্যা, যেমন শরহে আমেলী, শহরে গীলানী ইত্যাদি পাঠ দেয়া হতো।
উপমহাদেশে ১৮৮৩ খ্রীষ্টাব্দ হতে হাযেকুল মুলক হাকীম মুহাম্মদ আবদুল মজীদ খান দিল্লীতে নিয়মিতভাবে তিব্বী শিক্ষার জন্য মাদ্রাসায়ে তিব্বিয়ার প্রতিষ্ঠা করেন, যা ১৮৮৯ খ্রীষ্টাব্দে উদ্বোধন হয়। অতঃপর ১৯০২ খ্রীষ্টাব্দে লক্ষ্মৌয়ে হাকীম আবদুল আযীয সাহেব তাকমীলুব্বি কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯০৮ খ্রীষ্টাব্দে দিল্লীতে একটি মহিলা তিব্বিয়া কলেজও প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল। অবশ্য কিছুকাল পরে এটি বন্ধ হয়ে যায়।
১৮৯০ সালে হায়দারাবাদের নিযাম মন্ত্রিসভায় তিব্বী মন্ত্রণালয় নামে একটি মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করেন এবং একটি তিব্বী মাদ্রাসাও প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯০৪ খ্রীষ্টাব্দে হাকীম আহমদ হুসাইন সাহেব এলাহাবাদে একটি তিব্বিয়া কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। তারপর হতে নানা স্থানে তিব্বী স্কুল ও কলেজ প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে।
মসীহুল মুলক হাকীম হাফেজ আজমল খানের আমলে এলোপ্যাথিক চিকিৎসার প্রসারে এক প্রশাসনিক প্রচেষ্টা আরম্ভ হয়ে দেশীয় তথা ইউনানী-আয়র্বেদিক চিকিৎসা পদ্ধতিকে কোণঠাসা করে দিলে হাকীম সাহেব হাকীম-কবিরাজদের এক যুক্ত সম্মেলন আহ্বান করেন। উক্ত সম্মেলনে প্রস্তাব গৃহীত হয় যে, দেশীয় চিকিৎসাকে জীবিত রাখার জন্য যথাসম্ভব সকলে মিলে চেষ্টা করে যেতে হবে। এ প্রস্তাবের আলোকেই দিল্লীর মাদ্রাসায়ে তিব্বিয়াকে তিব্বিয়া কলেজে রূপান্তর করে ইউনানী, আয়ুর্বেদিক দু’টি শাখায় ভাগ করে উক্ত কলেজে শিক্ষা দিতে থাকেন। মসীহুল মুলকের উদ্দেশ্য ছিল উক্ত কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করা, কিন্তু তাঁর মৃত্যু সে আশা পূরণে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়।
মোটকথা এই যে, উপমহাদেশে ইউনানী চিকিৎসা বিজ্ঞান তার মৌল রূপ নিয়ে মুসলমানদের চরম উৎকর্ষের যুগেই পদার্পণ করে। তাই আমরা দেখতে পাই, সর্বপ্রথম মুবাল্লিম, ইমাম ও মাশাইখদের দ্বারাই এলমে তিব্ব এ দেশে আগমন করে। ৭৩৯ খ্রীষ্টাব্দে মুহাম্মদ ইবনে কাসেম কর্তৃক সিন্ধু জয় হলে শাসকদের মাধ্যমেও এলমে তিব্ব-এর প্রচার আরম্ভ হয়।
মোস্তফা কামাল: ভেষজবিদ ও শিক্ষক;
জয়পুরহাট ব্যুরো চিফ সাপ্তাহিক সময়ের বিবর্তন।





Users Today : 28
Views Today : 32
Total views : 175647
