
২০২২ খ্রিস্টাব্দের ২৩ অক্টোবর সুযোগ হয়েছিল সাঁওতাল বিদ্রোহের তীর্থভূমি ভগনাডিহির মাটিতে পা রাখার। পাকুড় থেকে গাড়িতে উঠে বসলাম ৪ জন, একজন নরওয়েজিয়ান মিশনারী রেভারেন্ড তরবিজন লিড, দুজন বাংলাদেশি (ষ্টেফান সরেন এবং সর্ন্দভ লেখক) এবং জিদআতো মিশনের পরিচালক রেভারেন্ড ষ্টিফেন সরেনের পুত্র আলফ্রেড সরেন আমাদের পথপ্রদর্শক। ভগনাডিহির কথাতে সত্যিই রোমাঞ্চিত হয়ে উঠেছিলাম। যাবার প্রাক্কালে চোখে পড়ে পাকুড় শহরের প্রান্তভাগে ‘সিধুু-কানু’ পার্ক; বিশাল জায়গা নিয়ে নির্মিত, এখানেই ক্লান্ত-শ্রান্ত মানুষেরা জিরিয়ে নেন; আবার প্রিয়জন নিয়ে মুক্ত বাতাসে বিহঙ্গের মতো পাখা মেলে। ইতিমধ্যেই জেনেছি, পাকুড় থেকে প্রায় ঘণ্টা দুয়েক পথ অতিক্রম করতে হবে, আর পথটিও বেশ দুর্গম এবং আঁকাবাঁকা। সাঁওতাল অধ্যুষিত ভগনাদিহি পৌঁছাতে অনেকগুলো আদিবাসী গ্রাম, বাজার, কিছুটা পাহাড়ি পথ আমাদেরকে আকর্ষিত করে তুলেছে। যাবার রাস্তায় খোলা চোখে আদিবাসী সাঁওতালদের ভগ্নদশা দেখে মনে পীড়া লেগেছে কিন্তু পরক্ষণেই আশ্বস্ত হয়েছি, এলাকাটিতে আদিবাসীদেরই আধিপত্য; আদিবাসীরাই মিলেমিশে বসবাস করছে স্মরণাতীতকাল থেকে। দূর থেকেই ভগনাডিহির রূপের ঔজ্জ্বলতা আঁচ করতে পেরেছিলাম, ইট-পাথরের নির্মিত স্মৃতিস্মারক আমাদেরকে বিকুলিত করে তোলে।
দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছানোর পর ১৬৭ বছর পেছনে ফিরে তাকানোর চেষ্টা করেছিলাম, কী চেতনা কিংবা কতটুকু আত্মসম্মান থাকলে অরণ্যচারীরা শৃঙ্খলাকে অস্বীকার করে! প্রায় পৌনে দু’শো বছর পরেও যেখানে শিক্ষার আলো ঠিকভাবে বিকশিত হতে পারেনি, তাহলে বীরযোদ্ধারা কীসের আলোয় আলোকিত হয়েছিলেন! কোন উলসী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সমগ্র সাঁওতাল সমাজের নীতি-নৈতিকতা এবং বন্ধনকে উৎরিয়ে হুল বা বিদ্রোহের আগুন প্রজ্জ্বলিত হয়েছিলো! সাঁওতালরা কর্মঠ, আনন্দ প্রিয়, শান্তি সৌন্দর্য জীবনের পরম প্রাপ্তি, সত্যিই সেদিন সাঁওতাল পল্লীতে আনন্দের মাদলের ধ্বনিতে বিবেক শাণিত হয়েছিলো; অন্যায়ের বিরুদ্ধে, প্রিয়জনদের সম্মান রক্ষার্থে হিংসাত্মক পথে নয় কিন্তু শান্তিপূর্ণভাবেই কলকাতার পথে লংমার্চ করেছিল। যারা দিনের পর দিন আদিবাসী সাঁওতালদের ঠকিয়েছে, খাটিয়েছে; দাস শ্রমিকের ন্যায় অনন্তকাল দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করতে চেয়েছিল; তারা নড়েচড়ে উঠেছে, প্রশাসনের সহযোগিতা চেয়েছে, আর প্রশাসন সাঁওতালদের ক্ষান্ত করতে ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে। ৭ জুলাই মহেশলাল দারোগা ভগনাডিহিতে দলবল নিয়ে গ্রেপ্তার করতে আসলে হত্যার শিকার হন; সিধু-কানু হুল হুল বলে চিৎকার করে, স্বাধীনতার চিৎকার পৌঁছায় পাহাড় ডিঙ্গিয়ে দিক-দিগন্তে।
পশ্চিমাকাশের সূর্য বারবার তাগিদ দিয়েছে, দেরি না করেই সিধু-কানু, চাঁদ-ভাইরো, ফুলো-জানোরা চেতনার স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে দিয়েছে হাজার হাজার সাঁওতালদের রুদ্ধ বিবেকে। রাজমহল পাহাড়ের পাদদেশ থেকে ভাগলপুর এবং মুর্শিদাবাদের একাংশ নিয়ে গঠিত ‘দামিন-ই কোহ’ অঞ্চল; সাঁওতাল বিদ্রোহের প্রাক্কালে এই অঞ্চলে ছিল সাঁওতালদের ১৪৭৩টি গ্রাম, যেখানে বসবাস করতো ৮২,৭৯৫জন সাঁওতাল। ৩০ জুন, ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দে ৩২-৩৩ বৎসর বয়সের বীর্যবান যুবক সিদু-কানু অপেক্ষাকৃত উঁচু জায়গায় দাঁড়ালেন। অশান্ত হৃদয় কিন্তু সুস্থির, গায়ের রং কালো হলেও তারা সাদা মনের মানুষ। মাথাভর্তি ঝাঁকড়া চুল, লম্বা চেহারা; সমবেত ১০ হাজার বিক্ষুব্ধ আদিবাসী সাঁওতালদের উদ্দেশ্যে দরাজ গলায় বলে উঠলেন, ‘আমরা রাজা মহাজনদের সবাইকে খতম করব, পরে হিন্দু ব্যবসায়ীদের গঙ্গার ওপারে তাড়িয়ে দেব, আমাদেরই রাজ্য হবে। আমরা মহিষে টানা লাঙ্গল ৮ আনায় ও বলদে টানা লাঙ্গল ৪ আনায় দেব আর সরকার আমাদের কথা না রাখলে আমরা যুদ্ধ আরম্ভ করব, দেকোদের খতম করব এবং আমরাই রাজা হব।’ সেদিন হয়ত তিনি আরো বলেছিলেন, ‘আমাদের লোকেরা দিনের পর দিন নির্যাতন, অত্যাচার ও অবিচারের ভারে ন্যুব্জ হয়ে পড়েছে; ন্যায় বিচারের আজাহারি সরকার বাহাদুরের কাছে পৌঁছাচ্ছে না; পৌঁছাচ্ছে না ঠাকুরজিউর কাছেও। আমাদের মেয়েরা, স্ত্রীরা, সন্তানেরা ধর্ষণের শিকার হচ্ছে, শ্লীলতহানী হচ্ছে, ঋণের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হতে গৃহপালিত পশু গরু-ছাগল-মহিষ, থালা-ঘটি-বাটি এমনকি ঘরের দেবতা খ্যাত নারীদের হাতের বালা পর্যন্ত লোলুপ দৃষ্টি থেকে এড়ায়নি। আর কতকাল আপনারা নিশ্চুপ থাকবেন, জেগে ওঠুন; দেয়ালে আমাদের পিঠ ঠেকেছে। স্বরাজ প্রতিষ্ঠা ব্যতীত আমাদের সামনে আর কোনো বিকল্প পথ নেই। জয় হোক ঠাকুরজিউর, জয় হোক পারগানা, মাজহী বাবাদের।’ উল্লেখ্য যে, সমসাময়িক এক ইংরেজ লেখকের বর্ণনা থেকে জানা যায়, সুদের হার ছিলো ক্ষেত্র বিশেষে ৫০ থেকে ৫০০ শতাংশ। ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে শস্য, গবাদি পশু, এমনকি নিজে কিংবা নিজের পরিবারের সদস্যকে আজীবন বিক্রি করে দিতে হতো।’
সিধু-কানু’র নাড়ীপোতা বাড়ির অদূরেই আরেকটি স্মৃতিপার্ক। অনুমিত হয়, একাবিংশ শতাব্দীর ঊষালগ্নে নির্মিত হয়েছে। আকাঙ্খিত হয়ে দ্রুতই হাজির হলাম, এখানে রয়েছে দুটি স্বতন্ত্র জায়গায় সিধু-কানু’র ব্রোঞ্চ নির্মিত অবয়ব। আরেক পার্শ্বের চাঁদ—ভাইরো’র অবয়ব। হুলে ব্যবহৃত নিজস্ব অস্ত্র গুচ্ছিত তীর-ধনুক পেছনের ঠোঙ্গাতে দণ্ডায়মান; মনে হয়েছে কোনো একজন সিদু-কানু প্রেমিক ঠোঙ্গা থেকে তীর সংগ্রহ করেছে, এটি তার জন্যে প্রদীপ্ত হওয়ার স্মারক। সঠিক তত্ত্বাবধান ও যত্নবান হওয়ার বাসনা অভাবে ঐতিহাসিক স্মারকগুলো নিশ্চিহ্ন হতে পারে, সেক্ষেত্রে যথাযথ কর্তৃপক্ষের শ্যেন দৃষ্টি আবশ্যিক। একটি দুটি করে ১২টি সিঁড়ির ওপর বসানো অবয়বগুলো সাঁওতাল হুলের পূর্ণতার প্রতীকই ঘোষণা করে চলেছে। জেনেছি—কোনো এক সময় দুর্বৃত্তরা সিধু-কানুর অবয়বকে গুঁড়িয়ে দিতে আক্রান্ত হয়েছিল, বোধকরি এখনও সমাজ ও দেশের শত্রুরা সক্রিয় রয়েছে। সর্বোপরি, স্মৃতিস্মারক পার্কটির প্রতি স্থানীয় প্রশাসন কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আশু পদক্ষেপ প্রত্যাশিত। এবার সিধু-কানুদের উত্তসূরীদের পরিবার পরিদর্শন করি। ভগনাডিহির কাঁচা রাস্তায় পিচের ছোঁয়া পড়েছে নিকট সম্প্রতিতে, তবে সেখানেও অবহেলার ছাপ স্পষ্ট। এঁটেল মাটিতে নির্মিত ঘরগুলো বেশ পরিচ্ছন্ন, দেওয়ালে সৌন্দর্যবর্ধন ফুল-পাতার সমাহার। ঘরে প্রবেশ মুখেই সিধু-কানুর আবক্ষ অবয়ব। অতিথির মতোই আমাদেরকে স্বাগতম জানানো হলো, দেওয়া হলো ঘটিতে জল; কুশল বিনিময়ের পরই উপস্থিত নারীদের সঙ্গে মতবিনিময় করি। শীর্ণ দেহের উত্তসূরীরা সরকারের দৃষ্টিতে এখনো উপেক্ষিত, চতুর্থ শ্রেণীর সরকারি চাকরিও যেন পরিবারের জন্য সোনার হরিণ সাদৃশ্য। নারী সদস্যদের অপলক দৃষ্টির চাহনিতে হতাশা, দুশ্চিন্তা, ভবিষ্যতের দুরাশাগুলোই পাখির চোখে দেখেছিলাম। স্পষ্ট উপলব্ধি করেছিলাম, সুস্থ জীবনের শারীরিক-মানসিক যুদ্ধ নিয়তই জীবনচক্রকে আচ্ছন্ন করে তুলেছে। প্রয়োজন তাদের পুনর্বাসন, স্বাভাবিক স্বচ্ছলতা; এতে করে অধিকার আদায়ের সংগ্রামে জীবন বিসর্জনের তালিকা দীর্ঘ হবে বৈ কমবে না। প্রায় পৌনে দু’শ বছর পূর্বে চেতনার প্রজ্জ্বলিত মশাল নেতিয়ে গেছে, শিক্ষার মশাল প্রজ্জ্বলিত হলেই প্রজন্মরা সিধু-কানু, চাঁদ-ভাইরো, ফুলো-জানোর আত্মত্যাগ, আত্মদানের যর্থাথ মূল্যায়নে সামর্থ হবে। চেতনার আলোকচ্ছটার বিচ্ছুরণ বিশ্বকে আলোকময় করবে।
ভগনাডিহি গ্রামকে এক পলক দেখার লক্ষ্যে সামনে এগুতেই মসজিদের উপস্থিতি আমাকে কিছুটা আর্শ্চান্বিত করেছে। আমার কল্পনার সীমানা পেরিয়ে মুসলিমদের আবাসকেন্দ্রের উপস্থিতিতে এখনো আমার বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়েছে। হতে পারে এটি আমার বিশ্বাসের দুর্বলতা, স্থান-কাল-পাত্রভেদে বিশ্বাসের আঁকর ভিন্ন হতে পারে। আমি আমার বিক্ষুব্ধ মনকে বোঝাতে চেষ্টা করেছি, সবকিছুই সম্ভবপর কিন্তু হৃদয়াকাশে কালো মেঘের ঘনঘটা, আনাগোণা কমেনি। ১৮৫৫ খ্রিষ্টাব্দের ৩০ জুন ডিকুদের অর্থাৎ বৃহত্তম জনগোষ্ঠী হিন্দুদের কচলন থেকে বাঁচার লড়াইয়ে প্রায় ৩০ হাজার আদিবাসী সাঁওতালকে আত্মহুতি দিতে হয়েছে; পুনরাবৃত্তির আশঙ্কাকে একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আশপাশের রাজ্য কিংবা রাষ্ট্রের দিকে বিশ্লেষণাত্বকভাবে পর্যবেক্ষণ করা দরকার। ২৩ জুন ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে বৃটিশরা ভারতীয় উপমহাদেশকে করায়ত্ব করে, শাসন ক্ষমতা দীর্ঘায়িত হয় ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। সিধু-কানুর ভগনাডিহি কী ৩০ জুনের পুনরাবৃত্তিতে সক্ষম! আদিবাসী সাঁওতালদের অবিবেচক সিদ্ধান্ত গোটা জাতিকে চরম মূল্য দিতে হতে পারে।
দামিন-ই কোহ ফরাসি শব্দ, এটির শব্দগত অর্থ হলো পর্বতের পাদদেশ। সাঁওতাল বিদ্রোহের পরবর্তীকালে অঞ্চলটি সাঁওতাল পরগণা হিসেবে আখ্যায়িত। বুকানন হ্যামিল্টনের অপ্রকাশিত দলিল থেকে জানা যায়, বীরভূমের রাজাদের পুনঃ পুনঃ নির্যাতন-অত্যাচারের থাবা থেকে বাঁচার লক্ষ্যে ১৮০৯ খ্রিস্টাব্দের দিকে সাঁওতালরা বীরভূম ত্যাগ করেন এবং গোড্ডা মহকুমা অঞ্চলের বনাঞ্চল পরিষ্কার করে থিতু হন। ১৮৩৬ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে এই স্থানে প্রায় ৪২৭টি সাঁওতাল গ্রাম বসতি স্থাপন করে এবং জীবন নির্বাহ করতে থাকে। ইতিমধ্যেই অর্থাৎ ১৮৩২-৩৩ খ্রিস্টাব্দে সার্ভেয়ার ক্যাপ্টেন টানারের নেতৃত্বে দামিন-ই কোহর সীমানা নির্ধারিত হয়। তৎকালীন সময়ে এটির আয়তন দাঁড়ায় ১৩৬৬.০১ বর্গমাইল। এরমধ্যে ৫০০ বর্গমাইলে কোনো পাহাড় ছিল না, তবে ২৫৪ বর্গমাইল ছিল জঙ্গলাকীর্ণ। মাত্র ২৫৪ বর্গমাইল জমি ছিল আবাদযোগ্য।
বড়লাট লর্ড বেন্টিঙ্ক ১৮২৮-১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে সরকারিভাবে রাজমহলের পশ্চিম দিকের জঙ্গল পরিষ্কার করে সাঁওতালদের বসবাসের আহবান জানায়। অরণ্যচারী সাঁওতালরা স্বতঃস্ফূর্তভাবেই দলে দলে কটক, ধলভূম, মানভূম, বরাভূম, ছোটনাগপুর, পালামৌ, হাজারীবাগ, মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, বীরভূম থেকে দামিন-ই- কোহতে বসবাস শুরু করে। সাঁওতালরা জঙ্গল সাফ করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করে, সুখ-শান্তি, আনন্দ ও উৎসব প্রিয়রা জীবনের চাকাকে সচল করতে উদয়স্ত হস্তে পরিশ্রম করতে থাকে। ইংরেজ কোম্পানির মি. পানসেট নামে একজনকে অত্র অঞ্চলের সুপারিনটেনডেন্ট নিযুক্ত করে। তার অধীনে ছিল আরো চারজন নায়েব সেজোয়াল বা দারোগা। এদের কাজ ছিল রাজস্ব আদায় করা। এই অঞ্চলের ফৌজদারী দায়িত্বে ছিলেন ভাগলপুরের ম্যাজিস্ট্রেট এবং থানা ছিল ভাগলপুর, বীরভূম ও মুর্শিদাবাদে, যা ছিলো এই অঞ্চল থেকে ক্রোশ ক্রোশ দূরে; অর্থনৈতিকভাবে ভগ্নদশা সাঁওতালদের পক্ষে পৌঁছানো অকল্পনীয়। মাত্র ১৬/১৭ বছরের মধ্যেই ভয়ংকর হারে খাজনার পরিমাণ বেড়ে গিয়েছিল। কোম্পানির এই বর্বরোচিত অত্যাচারের, জোরজুলুমের সহযোগী ছিল জমিদার এবং মহাজনেরা। উপর্যুপরি খাজনার চাপে অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে গিয়েছিল, সহজ-সরল মানুষগুলো নিঃস্ব হয়ে পড়েছিল। সাঁওতালদের জীবনে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে আর্বিভাব হয় জমিদার-মহাজনেরা। সাঁওতালরা শুধুই যে জমিদারদের শোষণের মুখে পড়েছে এমন নয়, তাদের শোষণ করেছে মহাজন, এমনকি স্থানীয় মধ্যবিত্ত হিন্দু ব্যবসায়ীরা পর্যন্ত।
বাংলাদেশের ‘আরণ্য জনপদে’ নামে আদিবাসীদের নিয়ে বেশ নামকরা একটি বই আছে। গ্রন্থটির লেখক আবদুস সাত্তার ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দের সাঁওতাল বিদ্রোহকে ‘হাঙ্গামা’ বলে উল্লেখ করেছেন। কার্ল মার্কস তাঁর Notes on Indian History তে সাঁওতাল বিদ্রোহকে ‘গেরিলা যুদ্ধ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৩০০ বাংলায় তার ‘ইংরাজের আতঙ্ক’ প্রবন্ধে সাঁওতাল বিদ্রোহ বা হুলকে ‘সাঁওতাল উপবিপ্লব’ বলেছেন। ভারতীয় ইতিহাসকার দিগম্বর চক্রবর্তীই সাঁওতাল সমাজের বাইরের কেউ যিনি ১৮৯৫-৯৬ লিখিত তার History of the Santal Hul (1988) পুস্তকে হুলকে প্রথম ‘হুল’ হিসেবেই আখ্যায়িত করেছিলেন। ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দের সাঁওতাল বিদ্রোহকে ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম হিসেবে উল্লেখ করা হয়। সংগ্রাম শুরু হয়েছিল ইংরেজ শাসনের কবল থেকে, ইংরেজ শাসকের দেশীয় তাঁবেদার জমিদারদের শোষণ থেকে মুক্তি ও স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার ধ্বনি নিয়ে।
বিহার, ঝাড়খণ্ড, পশ্চিমবঙ্গসহ ভারতের অনেক রাজ্যেই সাঁওতাল বিদ্রোহের মহান নায়ক সিধু-কানু, চাঁদ-ভাইরো, ফুলো-জানো’দের স্মৃতি রক্ষায় ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত হয়েছে ‘সিধু-কানু বিশ্ববিদ্যালয়,’ অসংখ্য প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং সড়কের নামকরণ করা হয়েছে। পার্ক ও স্ট্যাচু নির্মাণ করে চেতনার বিস্ফোরণ অব্যাহত রয়েছে। ২০০২ খ্রিস্টাব্দে ভারত সরকার চার রুপীর স্মারক ডাকটিকেট উন্মুক্ত করেছে। সত্যিই সমস্ত কিছু আমাদেরকে উদীপ্ত করে চলেছে কিন্তু ভগনাডিহির ভগ্নদশা আমাকে ব্যথিত করেছে। সাঁওতাল বিদ্রোহের সুতিকাগার সিধু-কানু, চাঁদ-ভাইরো, ফুলো-জানোদের বিচরণ ভূমি দৈন্যতার পরিচায়ক। চেতনার দৈন্যতার গণ্ডি পেরিয়ে ভগনাডিহি থেকেই আবারো ধ্বনিত হোক অন্যায়, অন্যায্য, অজাচার, অবিচার বিরুদ্ধে কণ্ঠস্বর; প্রতিষ্ঠা হোক শান্তি ও সমৃদ্ধি, সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি।






Users Today : 67
Views Today : 68
Total views : 177471
