ইসলাম ধর্মে কোরবানি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত যা নির্দিষ্ট সময়ে সামর্থ্যবান প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর ওপর ওয়াজিব এবং এ ইবাদত পালনের মাধ্যমে মুমিনগণ মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে সচেষ্ট হন।
ঈদুল আজহা—যা কোরবানির ঈদ নামে আমাদের দেশে অধিক পরিচিত। কোনো কোনো মুসলিম দেশে এটি ঈদুজ্জোহা, ঈদুল কুরবান বা ঈদুল নাহর নামেও অভিহিত করা হয়। পবিত্র কুরআনুল কারিমে সরাসরি কোরবানি শব্দটির ব্যবহার লক্ষ করা যায় না তবে ‘কোরবান’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। আর হাদিসে কারিমায় ‘কোরবানি’ শব্দটি ব্যবহৃত না হয়ে ‘উযহিয়্যাহ্’ ও ‘যাহিয়া’ প্রভৃতি শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। আর এ জন্যই কোরবানির ঈদকে ‘ঈদুল আজহা’ বলা হয়। আরবি ‘কোরবান’ শব্দটি ‘ফারসি বা উর্দু ভাষায় ‘কোরবানি’ রূপে ব্যবহার করা হয়, যার অর্থ নৈকট্য। আর পারিভাষিক অর্থে ‘কোরবানি’ ওই মাধ্যমকে বলা হয়, যার দ্বারা আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা যায়। প্রচলিত অর্থে ঈদুল আজহার দিন আল্লাহ্ তাআলার সন্তুষ্টির লাভের উদ্দেশ্যে ইসলামী শরিয়াহ্ মোতাবেক যে পশু জবেহ করা হয়, তাকে কোরবানি বলা হয়।
মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনের সূরা কাউসারের ২য় আয়াতে ইরশাদ করেন, ‘তোমার প্রতিপালকের জন্য নামাজ আদায় কর এবং কোরবানি কর।’ এছাড়াও হাদিসে বর্ণিত রয়েছে যে, হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, নবী (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কোরবানি করে না, সে যেন আমাদের ঈদের মাঠের ধারে-কাছেও না আসে। (সুনানে ইবনে মাজাহ : ৩১২৩)
যুগে যুগে মহান আল্লাহ্ প্রত্যেক নবী-রাসূলগণের ওপরেই কোরবানির দায়িত্ব ন্যস্ত করেছেন এবং এর বিধি-বিধান সব শরিয়তেই বিদ্যমান ছিল; যার ধারাবাহিকতা এখনো প্রবহমান। ইসলামে কোরবানির ইতিহাস সুপ্রাচীন। আদি পিতা হযরত আদম (আ.) এর দুই পুত্র হাবিল ও কাবিলের দেয়া কোরবানি থেকেই মানব ইতিহাসে সর্বপ্রথম কোরবানির ইতিহাসের গোড়াপত্তন হয়। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনুল কারিমের সূরা মায়িদার ২৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ্ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘হে রাসূল আপনি আদমের দুই পুত্রের বৃত্তান্ত তাদেরকে যথাযথভাবে শোনান। যখন তারা উভয়েই কোরবানি করেছিল। তাদের একজনের কোরবানি কবুল হলো। অন্যজনের কোরবানি কবুল হলো না।’ অবশ্য আমাদের ওপর যে কোরবানির বিধান প্রচলিত হয়ে আসছে তা মুসলিমদের আদি পিতা হযরত ইবরাহিম (আ.)-এর আত্মত্যাগের ঘটনারই স্মৃতিবহ।
সূরা হজের ৩৪ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেন, ‘আমি প্রত্যেক উম্মতের জন্য কোরবানিকে ইবাদতের অংশ করে দিয়েছি। যাতে জীবন উপকরণ হিসেবে যে গবাদিপশু তাদেরকে দেয়া হয়েছে, তা জবাই করার সময় যেন তারা আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে আর সব সময় যেন মনে রাখে একমাত্র আল্লাহ্ই তাদের উপাস্য।’
হযরত আয়েশা (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (সা.) ইরশাদ করেছেন, ঈদুল আজহার দিন মানুষ যে কাজ করে তার মধ্যে আল্লাহ্ তাআলার নিকট সবচাইতে পছন্দনীয় কাজ হচ্ছে রক্ত প্রবাহিত করা (কোরবানি করা)। (মুসতাদরেকে হাকিম: ৭৫২৩)
ইসলামী ভাষ্যমতে, মহান আল্লাহ তাআলা নবী হযরত ইবরাহিম (আ.)-কে স্বপ্নের মাধ্যমে তাঁর সবচেয়ে প্রিয় বস্তুটি কোরবানি করার নির্দেশ দেন। তিনি ভাবলেন, আমার কাছে তো এ মুহূর্তে প্রিয় পুত্র ইসমাইল (আ.) ছাড়া আর কোনো প্রিয় বস্তু নেই। তখন তিনি পুত্রকে কোরবানির উদ্দেশ্যে আরাফাতের ময়দানের উদ্দেশে যাত্রা করেন। যখন ইবরাহিম (আ.) আরাফাত পর্বতের ওপর তাঁর পুত্রকে কোরবানি দেয়ার জন্য গলদেশে ছুরি চালানোর চেষ্টা করেন, তখন তিনি বিস্মিত হয়ে দেখেন যে তাঁর পুত্রের পরিবর্তে একটি প্রাণী কোরবানি হয়ে গেছে এবং তাঁর পুত্রের কোনো ক্ষতি হয়নি। তখন আল্লাহর আদেশ বাস্তবায়নে ইবরাহিম (আ.)-এর মানসিকতা আল্লাহর কাছে কবুল হয়ে গিয়েছিল। এই ঘটনাকে স্মরণ করে সারা বিশ্বের মুসলিম আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য প্রতি বছর জিলহজ মাসের ১০-১২ তারিখ এই তিন দিন ঈদুল আজহা উদযাপন করে থাকে। ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় আমাদের সমাজ ও সংস্কৃতিতে ঈদুল আজহা তথা কোরবানি এক ঐতিহ্যময় স্থান দখল করে আছে।
ইসলামী শরিয়াহ্ অনুযায়ী উট, গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা দ্বারা কোরবানি করা জায়েজ; তবে তা হতে হবে মানুষের গৃহপালিত পশু। এ ছাড়া অন্যান্য হালাল পশু যেমন-হরিণ, বন্যগরু ইত্যাদি দ্বারা কোরবানি করা বৈধ নয়। উট, গরু, মহিষ সর্বোচ্চ সাতজন শরিক হয়ে কোরবানি দেয়া যাবে। এ পশুগুলো একাকীও কোরবানি করা যাবে তবে এককভাবে কোরবানি করাই উত্তম। আর ছাগল, ভেড়া বা দুম্বার যেকোনোটিই সর্বোচ্চ একজনের দ্বারা কোরবানি করা বৈধ। (মুয়াত্তা মালেক, মুসলিম শরিফ)
কোরবানির পশু নিখুঁত হওয়া বাঞ্ছনীয়। হযরত বারা ইবনে আজিব (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ (সা.) হাত দিয়ে ইশারা করেছেন এবং বলেছেন, চার ধরনের পশু দ্বারা কোরবানি করা যায় না। সেগুলো হলো, যে পশুর এক চোখের দৃষ্টিহীনতা স্পষ্ট, যে পশু অতিশয় রুগ্ন, যে পশু সম্পূর্ণ খোড়া এবং যে পশু এত শীর্ণ যে তার হাড়ে মজ্জা নেই। (সহীহ্ ইবনে হিব্বান : ৫৯১৯)
অন্য এক হাদিসে হযরত আলী ইবনে আতি তালিব (রা.) বলেন, ‘রাসূল (সা.) আমাদের শিং ভাঙা বা কান কাটা পশু দিয়ে কোরবানি করতে নিষেধ করেছেন। (সুনানে ইবনে মাজাহ: ২২৭)
আল্লাহ্ তাআলা বলেন, ‘সকল সম্প্রদায়ের জন্য আমি কোরবানির বিধান দিয়েছি, তিনি তাদেরকে জীবন-উপকরণস্বরূপ যেসব চতুুষ্পদ জন্তু দিয়েছেন, সেগুলোর ওপর যেন তারা আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে।’ (সূরা হজ : ৩৪)
হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে আমর (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা.) বলেছেন, আমাকে ইয়াওমুল আজহার আদেশ করা হয়েছে। (অর্থাৎ এ দিবসে কোরবানি করার আদেশ করা হয়েছে।) (মুসনাদে আহমদ: ৬৫৭৫)
হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে উমর (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা.) মদিনার ১০ বছরের প্রতি বছরই কোরবানি করেছেন। (জামে তিরমিযি: ১৫০৭, মুসনাদে আহমদ: ৪৯৫৫) নবী (সা.) বলেছেন, সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি কোরবানি করল না, সে যেন আমাদের ঈদগাহে না আসে। (সুনানে ইবনে মাযাহ্: ৩১২৩)
কোরবানির ইতিহাস
কোরবানি কেবল পশু কোরবানি নয়; নিজের আমিত্ব, পশুত্ব, ক্ষুদ্রতা, হীনতা, দীনতা, নীচতা, অহঙ্কার, স্বার্থপরতা ত্যাগের কোরবানি। নিজের জীবন-মরণ, নামাজ, রোযা, কোরবানি, সহায়-সম্পদ সব কিছুই কেবল আল্লাহর রাহে, শুধু তাঁরই সন্তুষ্টির জন্য চূড়ান্তভাবে নিয়োগ ও ত্যাগের মানস এবং বাস্তবে সেসব আমল করাই হচ্ছে প্রকৃত কোরবানি।
কোরবানি ইতিহাস প্রায় চার হাজার বছর পুরোনো। ইবরাহিম (আ.)-এর হৃদয় গভীর ভালোবাসা ত্যাগের মহিমায় দীপ্যমান। বৃদ্ধ বয়সে নিরাশার অন্ধকারে আলোর বিচ্ছুরণ। শিশুপুত্র ইসমাইলের আবির্ভাব। হাজেরার মাতৃক্রোড় আলোকিত।
মা-বাবার আদর-ভালোবাসয় বেড়ে ওঠে শিশু। হঠাৎ নির্দেশ আসে মা ও দুই বছরের শিশুকে নির্জন তপ্ত মরুভূমিতে রেখে আসার। স্রষ্টার প্রতি গভীর ভালোবাসায় তাদের রেখে দেয়া হয় খাবার-পানিবিহীন মরুপ্রান্তরে। হাজেরা পিপাসার্ত শিশুর তৃষ্ণা নিবারণে ছুটে বেড়ান সাফা ও মারওয়ার পাদদেশে। এক ফোঁটা পানির খোঁজে। মাতৃহৃদয় পাগলের মতো ছটফট করতে থাকে। একপর্যায়ে শিশুর পদচিহ্নে প্রবহমান ঝরনাধারা দেখে বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে পড়েন। জমজম কূপের সেই স্মৃতিময় ঝরনাধারা আজো মুসলিম বিশ্বের কাক্সিক্ষত পবিত্র পানীয়।
কালের পরিক্রমায় পিতা-পুত্র মহান আল্লাহর ইবাদতে মশগুল। আবারো পরীক্ষার পালা। এলো শিশুপুত্রকে কোরবানির নির্দেশ। একমাত্র কলিজার টুকরো সন্তানকে কোরবানির আদেশে হৃদয় কেঁপে ওঠে। স্রষ্টার কী অপার মহিমা! যেমন পিতা তেমন পুত্র। একবাক্যে রাজি হয়ে যান মাত্র ৮-১০ বছরের শিশু ইসমাইল। বলে ওঠেন, আল্লাহ যদি সন্তুষ্ট হন তা হলে আমার জীবন সার্থক। নেই কোনো ভাবনা চিন্তা। মিনার প্রান্তরে পুত্রকে নিজ হাতে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোরবানি দিতে প্রস্তুত পিতা। পৃথিবীতে বোধহয় এর চেয়ে হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা ঘটেনি। জীবন যার দান সবই তার হাতে নিবেদিত সমর্পিত। পিতা চোখ বেঁধে চালালেন ধারালো ছুরি। জবাই শেষ করলেন মহান রবের তরে। চোখ খুলে পাশে তাকিয়ে দেখেন শিশুপুত্র হাসছে আনন্দের হাসি। কবুল হয়ে গেল কোরবানি। মানব ইতিহাসে এক নতুন ধারায় প্রচলন হয় কোরবানির।
কোরবানি মহান সত্তার ভালোবাসা লাভে ধন্য হওয়ার উপায়। নৈকট্য লাভের সুবর্ণ সুযোগ। পশু কোরবানির প্রতীকে হৃদয়ের সব পঙ্কিলতা লোভ লালসা ধুয়ে মুছে পরিষ্কার হয়ে যায়। অপার্থিব এক আনন্দময় অনুভূতির সঞ্চার হয়। কোরবানি আত্মসমর্পণ নিজেকে সঁপে দেয়ার প্রাণান্ত প্রচেষ্টা। আল কুরআনের ভাষায়, ‘আল্লাহ তায়ালার কাছে কখনো কোরবানির গোশত ও রক্ত পৌঁছায় না। বরং তাঁর কাছে তোমাদের তাকওয়াটুকুই পৌঁছায়। (সূরা আল হাজ্জ, আয়াত ৩৭)
কোরবানি মহান আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পণের এক অনুপম নিদর্শন। আমাদের সকল ইবাদত, প্রার্থনা, জীবন-মরণ সবই তাঁর উদ্দেশ্যে নিবেদিত। মানুষের চূড়ান্ত ঠিকানা তাঁরই কাছে।
পবিত্র ঈদুল আজহা প্রতিবছর আমাদের কাছে ফিরে আসে। বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ পশু কোরবানির মাধ্যমে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের প্রত্যাশা করে। এই কোরবানির শিক্ষা কী, তা আমাদের সকলেরই স্পষ্ট জানা দরকার। মনে রাখতে হবে, কোরবানি শুধু পশু জবেহ করা নয়, কোরবানি হলো নিজের ভেতরের পশু সত্তাকে জবেহ করা। তার মানে মনের সব কুপ্রবৃত্তিকে খতম করা। কোরবানির গোশত পেয়ে গরিব-দুঃখী খুশি হয়। কোরবানি করার মাধ্যমে মানুষ আল্লাহর আনুগত্য ও নির্দেশ মানার শিক্ষা গ্রহণ করে। কোরবানির দিন মুসলমানরা একে অপরের সঙ্গে মহামিলনে মিলিত হয়। এদিন ধনী-গরিব কোনো ভেদাভেদ থাকে না। সবাই সাম্য, ঐক্য, সম্প্রীতি ও সহানুভূতির মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসে। এতে সমাজে শান্তি, শৃঙ্খলা ও সহমর্মিতার পরিবেশ তৈরি হয়। কোরবানি যাবতীয় আহকাম মেনে খোদাভীতির মানসিকতা নিয়ে কোরবানি করা দরকার। কেবল তখনই আমরা আশা করতে পারি, আল্লাহর দরবারে আমাদের কোরবানি কবুল হবে। আমরা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভে সমর্থ্য হবো।





Users Today : 67
Views Today : 68
Total views : 177471
