দেশের আদিবাসীরা কি স্মার্ট বাংলাদেশে বেমানান? বাংলাদেশের চতুর্কোণ থেকে আদিবাসীদের কান্নার রোল শোনা যায়, কিন্তু কেন? তারা কি বাংলাদেশের সাথে তাল মিলিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে পারছে না, নাকি তাদেরকে উন্নয়নের মহাসড়কে উঠে আনা সম্ভবপর হচ্ছে না! বিগত ১৬ জুন তারিখে টাঙ্গাইলের গারো আদিবাসীরা মধুপুর বনাঞ্চলে আমতলী বাইদে লেক খনন প্রকল্প বাতিলের দাবিতে সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিল করেছে। শত শত আদিবাসী গারোরা পীরগাছা সেন্ট পৌলস উচ্চ বিদ্যালয়ে সমবেত হয়ে দোখলায় বন বিভাগের রেঞ্জ কার্যালয়ে সম্মুখে প্রতিবাদ জানিয়েছে। সাম্প্রতিককালে সরকার ‘স্থানীয় ও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সহায়তায় মধুপুর জাতীয় উদ্যানে ইকো ট্যুরিজম উন্নয়ন ও টেকসই ব্যবস্থাপনা’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় মধুপুর বনের আমতলী বাইদ এলাকার ৪৭ বিঘা জমিতে কৃত্রিম লেক ও শিশুপার্ক নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। গত বছরের ২২ এপ্রিল বন বিভাগ ওই জমিতে সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দিয়ে সর্বসাধারণের প্রবেশ নিষিদ্ধ করে। প্রকল্পটিতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৬০ লক্ষ টাকা। অত্র অঞ্চলের সাংসদ কৃষিমন্ত্রী মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেছেন, লেক খনন প্রকল্প শিগগিরই বাস্তবায়ন করা হবে। জায়গাটির ওপর ১৪টি গারো আদিবাসী পরিবার বসবাস করছেন এবং অন্যরাও জমিটিতে যুগ যুগ ধরে কৃষিজমি হিসেবে ব্যবহার করে আসছেন। আদিবাসীদের উচ্ছেদ ও সম্পত্তি দখল করে আদিবাসীদের উন্নয়ন কিংবা বিনোদন কেন্দ্র গড়ে তোলা আদিবাসীদের বেমানানরই নীরব বহির্প্রকাশ।
পার্বত্য চট্টগ্রামের পিছিয়েপড়া ম্রো আদিবাসীদের উচ্ছেদ করে পাঁচ তারকা হোটেল নির্মাণের প্রতিবাদে জাতীয় প্রেসক্লাবে আদিবাসী সংগঠনসহ বিশিষ্টজনেরা দাঁড়িয়েছেন। প্রকৃতির সাথে মেলবন্ধনে বসবাসকারী আদিবাসীদের প্রথাগত অধিকারকে অস্বীকার করে শহরের মানুষের আয়েসের যে প্রক্রিয়াকরণ সত্যিই নিজেদেরকে হতভাগ্য মনে হয়। সিকদার গ্রুপের পাঁচ তারকা হোটেল ম্যারিয়টের স্বপ্নে বিভোর হয়েছেন একদল আরাম আয়েসী মানুষ। অবহেলিত আদিবাসীদের আনস্মার্ট মনে করে স্মার্ট এলাকা থেকে বিতাড়নই যেন তাদের কপালে অমোচনীয় কালির ভাগ্যলিখন। ম্রোদের উচ্ছেদে ম্রো সম্প্রদায়ের ১০ হাজার নাগরিক তাদের ভিটেমাটি, আবাসস্থল, এবং জুম ফসলি জমির ওপর আগ্রাসন হিসেবে দেখেছে। এ বছরের শুরুতেও ২৬ এপ্রিল লামা উপজেলার সরই ইউনিয়নের লাংকমপাড়া, জয়চন্দ্রপাড়া ও রেংয়েনপাড়ার জুমচাষের প্রাকৃতিক বনাঞ্চল, ফলদ-বনজ বাগান ও ধানের জমি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। গোষ্ঠী ও ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষার জন্য জাতীয় স্বার্থ উপেক্ষা করে বান্দরবানের মতো সংবেদনশীল পরিবেশে পর্যটনসহ সব অনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থগিত করার এবং ভূমি দখলদারদের উচ্ছেদ করে আদিবাসীদের উপযোগী করে তোলার দিকে মনোযোগী হওয়া সরকারের আবশ্যিক।
উত্তরবঙ্গের সবচেয়ে বড়ো ধাক্কা পেয়েছে জয়পুর-মাদারপুর গোবিন্দগঞ্জ, গাইবান্ধার আদিবাসী সাঁওতাল পল্লীর বাসিন্দারা। ২০১৬ খ্রিষ্টাব্দের ৬ নভেম্বর ৩ জন সাঁওতাল হত্যা, অগ্নিসংযোগ ও উচ্ছেদের যে আতঙ্ক বিরাজ করছে; আজো তা অব্যাহত রয়েছে। পাঁচটি বছর গুজরিয়েছে কিন্তু কোনো সুরাহা হয়নি। আদিবাসী সাঁওতাল, উরাঁও, মাহালী, মুন্ডা, কর্মকাররা বারংবার সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণের প্রয়াস চালিয়েছে, অতঃপরও সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আদিবাসীদের উচ্ছেদ প্রতিজ্ঞায় অনড়। ১৮৪০ একর আদিবাসীদের জমি, চুক্তিতে উল্লেখ ছিল উৎপাদন কাজে ব্যবহৃত না হলে সেটি প্রকৃত মালিকদের ফিরিয়ে দেয়া হবে; সেটিকে লঙ্ঘন করে এখন সরকারের একদল সুবিধাবাদীরা ইপিজেড নির্মাণে আদিবাসীদের জায়গাকেই সবচেয়ে উপযুক্ত হিসেবে গণ্য করছেন। আশ্চর্য হই, এমনিতেই আদিবাসীরা দারিদ্রসীমার নিচে বসবাস করে, প্রান্তিক ও অবহেলিত এবং নিষ্পেষিত; সেক্ষেত্রে দেশ ও দশের উন্নয়নে কেন আদিবাসীদের ভূমিকে লক্ষ্য করা হচ্ছে! তাহলে কী সত্যিই আদিবাসীরা ননস্মার্ট! তাদের হাতে থাকা জমিগুলো ব্যবহারে তারা সক্ষম নন নাকি ‘গরিবের বৌ সবার ভাবি’ হয়। সরকারের পুলিশ বাহিনীর বুলেটের আঘাতে নিহত ৩ জনের বিচার প্রক্রিয়া বার বার বিঘ্নিত হচ্ছে। ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দে ২৩ জুলাই ৯০ জনের নাম আদালতে চার্জশিট দেয় পিবিআই। এ চার্জশিট প্রত্যাখ্যান করে ৪ সেপ্টেম্বর সাবেক এমপি আবুল কালাম আজাদসহ ১১ জনের নাম নারাজি দেন থমাস হেমব্রম। পিটিশন আমলে নিয়ে ওই বছরের ২৩ ডিসেম্বর সিআইডিকে তদন্তের নির্দেশ দেন আদালত। একইভাবে ২০২০ খ্রিষ্টাব্দের ২ নভেম্বর আদালতে প্রতিবেদন দেয় সিআইডি। এরই প্রেক্ষিতে ২০২১ খ্রিষ্টাব্দের ৪ জানুয়ারী সিআইডির অভিযোগপত্রের বিরুদ্ধে নারাজি দেন বাদী। ১৬ জুন ২০২৩ খ্রিষ্টাব্দে নির্ধারিত ধার্য দিনে শুনানি থাকলেও আবারও পেছাল নারাজি শুনানির আদেশ। একদিকে বিচারহীনতা ও উচ্ছেদ আতঙ্কে দিনাতিপাত করছে গোবিন্দগঞ্জের আদিবাসী সাঁওতাল, উরাঁওসহ বাঙালী জাতিগোষ্ঠীও।
সমগ্র বাংলাদেশের আদিবাসীরা দারিদ্র সীমার নিচে বসবাস করে আসছে। এখন জাতীয় দারিদ্র সীমার হার ২১ শতাংশে। আর চরম দারিদ্রসীমার হার ১১ শতাংশের নিচে চলে এসেছে কিন্তু আদিবাসীর দারিদ্রসীমা পার্বত্য চট্টগ্রামে ৬৫ শতাংশ এবং সমতলে ৮০ শতাংশ। দেশের জাতীয় গড় আয় বাড়লেও আদিবাসীদের আয় এখনো বাড়েনি। বৈশ্বিক মহামারি কোভিড-১৯ পরবর্তীকালে ‘ইনডিজিনাস পিপলস ডেভেলপমেন্ট সার্ভিসেস’ আদিবাসীদের ওপর গবেষণা পরিচালনা করে, তাতে দেখা গেছে, ৯২ শতাংশ আদিবাসী মানুষের আয় কমে গেছে। নতুন করে দারিদ্রসীমার নিচে যুক্ত হয়েছে পাঁচ লক্ষাধিক মানুষ। বাজেট বক্তৃতায় দু’এক লাইন আদিবাসীদের কথা থাকলেও এখন সেটির আকাল পড়েছে। ২০২১-২২ অর্থ বছরে সমতলের আদিবাসীদের জন্য মাথাপিছু বরাদ্দ ১১ হাজার ২৭০ টাকা, আর পাহাড়িদের মাথাপিছু বরাদ্দ ১৬ হাজার ৭২৪ টাকা। অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় পাহাড়ি কিংবা সমতলের আদিবাসীদের দারিদ্রতার কোনো তথ্য-উপাত্ত অনুপস্থিত। নাগরিক জীবনের অতিব গুরুত্বপূর্ণ নিরাপদ পানীয় জলের সুবিধা থেকেও আদিবাসীরা বঞ্চিত। মৌলিক অধিকারগুলো তাদের কাছে যেন সোনার হরিণ সাদৃশ্য। তথ্যে দেখা যায়, বিগত ১১ বছরে আদিবাসীদের ওপর ৪৬০টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে অর্থাৎ প্রতিমাসে গড়ে সাড়ে তিনটি করে সংঘটিত হয়েছে। অপরদিকে মাত্র ১২৮টি ঘটনার মামলা রুজু হয়েছে। দেখা গেছে যে, যারা সহিংসতার শিকার হয়েছেন, প্রত্যেকেই আর্থিক ও সামাজিকভাবে প্রান্তিক, তাদের সঙ্গতি একেবারেই কম। অন্যদিকে নিপীড়নকারীরা অনেক প্রভাবশালী, তাই অপরাধ হলেও বিচার হয় কমই।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে ৪টি মানদ- নির্ধারণ করেছেন। চারটি মানদণ্ড হচ্ছে—১. স্মার্ট সিটিজেন অর্থাৎ আমাদের প্রত্যেকটা সিটিজেন প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ হবে; ২. স্মার্ট ইকোনোমি অর্থাৎ ইকোনোমির সমস্ত কার্যক্রম আমরা প্রযুক্তি ব্যবহার করে করব; ৩. স্মার্ট গভর্নমেন্ট এবং ৪. স্মার্ট সোসাইটি। বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে বসবাসরত আদিবাসীরা কি স্মার্ট? কতটুকু স্মার্ট? তথ্যানুযায়ী সারা বাংলাদেশের ১৭৬.৯৪ মিলিয়ন লোক মুঠোফোনের সাথে যুক্ত, অন্যদিকে ৩০ লক্ষাধিক আদিবাসীর মধ্যে কতজনের মুঠোফোন রয়েছে! কতজনের বাড়িতে টেলিভিশন রয়েছে! কতোটি আদিবাসী গ্রামে বিদ্যুৎ সংযোগ রয়েছে! জীবন মান উন্নয়নের লক্ষ্যে মুজিববর্ষে ঘর দিয়েছেন কিন্তু আদৌ কতজন ভূমিহীন আদিবাসী ঘর পেয়েছেন। উত্তরবঙ্গের কোল জনগোষ্ঠী মধ্যে ১জন ঘর পেয়েছেন, সেটিও আবার বেশ নগদ অর্থ দিতে হয়েছে। কোডা জনগোষ্ঠীর একজনও বরাদ্দ পাননি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী স্মার্ট সোসাইটি বা সমাজের জন্য আপনার যে দর্শন সেটি আদিবাসীদের সমাজকে স্পর্শ করতে পারেনি বা পৌঁছায়নি। স্মার্ট গর্ভমেন্ট বা বিচার ব্যবস্থার মধ্যে দিয়ে আদিবাসীদের স্মার্ট ন্যায় বিচার নিস্পত্তি করুন। আদিবাসীদেরকে স্মার্ট করে তুলুন, নইলে বেমানান লাগবে।
মিথুশিলাক মুরমু : আদিবাসী গবেষক, লেখক ও কলামিস্ট।





Users Today : 87
Views Today : 88
Total views : 177491
