সবার জীবনে প্রেম আসে, তাই তো সবাই ভালোবাসে; যে কাউকে যে কোন সময় ভালো লাগতে পারে। সময় ও মানুষ ভেদে ভালোবাসার সংজ্ঞা ভিন্ন হতে পারে। ভালোবাসার সংজ্ঞা যেমন ভিন্ন তেমনি ভালো লাগার সংজ্ঞা ভিন্ন। জীবনের প্রথম ভালোলাগার সময়টা খুব বেশি মন করতে পারছি না। যতদূর মনে আছে তখন হাই স্কুলে পড়তাম, একটা জুনিয়র মেয়েকে খুব ভালো লেগেছিলো কিস্তু তাকে কখনো বলা হয়নি। তারপর কলেজ জীবনে একটা মেয়েকে অনেক ভালো লেগেছিল কিন্তু মনের ভেতরে তাকে যত্ন করে পুষেছিলাম, কলেজ লাইফে অনেক বার চেষ্টা করেও বলা পারিনি।
মেয়েটার নাম সুমনা একই ভার্সিটিতে পড়তাম কিন্তু ডিপার্টমেন্ট ছিল ভিন্ন, ভাসির্টিতে তার সাথে নিয়মিত গল্প হত, আমার কফি পছন্দ আর ওর পছন্দ ফুসকা। আমাকে কফি খেতে সে প্রায় ট্রিট দিত আর আমি ওকে ফুসকা খাওয়াতাম। আমি যে ওকে কলেজ লাইফ থেকে পছন্দ করতাম কোনদিন তা আমি ওকে বুঝতে দেই নি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটা উক্তি আমার কানে সব সময় বেজে উঠত, যাকে ভালোবাস তাকে বন্ধু করে রাখ, কারণ জীবনে সবকিছু হারিয়ে যাবে কিন্তু বন্ধুত্ব কখনো হারাবে না! যখন থেকে আমি ওরে ভালোবাসতে শুরু করেছিলাম তখন থেকে আমার মধ্যে এই ভয়টা কাজ করছিল। আমার সাথে আড্ডা দিতে দিতে সেও আমার প্রতি অনেক দুর্বল হয়ে পড়ে, তা সেও কখনও বুঝতে দেয়নি।
ভ্যালেন্টাইস ডে আগে সুমনা আমাকে বলে, সে নাকী এবার ভ্যালেন্টাসে আমাকে সারপ্রাইজদিবে। আমি এবার সিন্ধান্ত নেই, যা হবার হবে, আমি এবার আমার ভালো লাগার বিষয়টি বলে দিব সুমনাকে। সে যাই মনে করে করুক। বন্ধু রাসেলকে আমি আমার ভালোলাগার বিষয়টি জানাই, সুমনার সাথে আমার একটা ভালো বন্ধুত্ব রাসেল তা জানত, যেই কথা সেই কাজ। সুমনা ১৪ ফেব্রয়ারি সুমনা শাড়ি পরে ক্যাম্পাসে হাজির। ওকে একদিন আমি বলেছিলাম আমার লাল শাড়ি খুব পছন্দ। আর তাই সত্যি সত্যি সে লাল শাড়ি পরে এসেছে, হাতে একটা লাল গোলাপ নিয়ে আমি ওকে দেখে জিজ্ঞাস করি কিরে? গোলাপ কার জন্য? সরাসরি আমাকে বলে তোর জন্য। এত কষ্ট করে শাড়ি পরে এসেছি আর গোলাপ আনবো অন্যকার জন্য! কোনো কিছু বুঝে ওটার আগে আমাকে প্রপোজ করে বসে। ডিপার্টমেন্টের সামনে, আমি তো অবাক, ওকে জোর করে ক্যান্টিনের দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি, বলি কি হচ্ছে এসব? সুমনা আমাকে বলে, ‘কেন আমাকে তোর ভালো লাগে না!’ আমি বললাম তুই তো অনেক সুইট মেয়ে কেন ভালো লাাগবে না?
এভাবে অনেক ভালো চলছিল আমাদের রিলেশনটা। আমাদের অনার্স তখন শেষের দিকে আমরা ফাইনাল ইয়ার। একদিন আমি সুমনাকে ফোনে পাইচ্ছিলাম না, সেদিন সে অনেক দেরিতে ক্যাম্পাসে আসে, এসে বলে তুই কি আমাকে ছেড়ে থাকতে পারবি? প্রশ্ন শুনে আমি তো অবাক, ওকে শান্ত হতে বলি, তারপর বলি কী হয়েছে খুলে বল! সে বলে তার অজান্তে ওর পরিবার নাকি বিয়ে ঠিক করে ফেলেছে। ছেলে ইঞ্জিনিয়ার। সুমনাকে ছেলের খুব পছন্দ। ছেলের বাড়ি-গাড়ি আছে। সুমনা আমাকে বলে কিছু একটা করো। অনেক অসহায় লাগছিল ওকে। ওকে সান্ত¦না দিয়ে বলি কিছু একটা হবে ভয় করো না।
আমরা সিন্ধান্ত নেই পালিয়ে বিয়ে করব। যে দিন পালানোর কথা ছিল সে দিন বাবা হঠাৎ খুব অসুস্থ হয়ে পড়ে, তাকে হাসপাতালে নিতে হয়, ফোনটা যে কোথায় হারিয়ে গিয়েছিল তা বুঝতে পারিনি। বাবা একটু সুস্থ হলে তাকে নিয়ে বাড়ি আসি। তখন সুমনার খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করলে কেউ খোঁজ দিতে চাচ্ছিল না, অবশেষে নিজে ওদের বাসা যাই ওর পরিবার জানত আমি সুমনার বেস্টফ্রেন্ড। ওর ভাবি জানত আমাদের রিলেশনের কথা। আমাকে দেখে ভাবি কিছুটা আশ্চর্য্য হয়ে বলে, তোমাকে সুমনা কিছু বলেনি? ওর তো বিয়ে হয়ে গিয়েছে। শোনার পর আমার মাথায় বাজ ভেঙে পড়ে। অনেক কষ্ট করে বাড়িতে ফিরে আসি আর সুমনার সাথে কাটানো সেই স্মৃতিগুলো খুব মনে পড়ে।
জীবন তো থেমে থাকার নয়। কার অনুপস্থিতিতে জীবন তো থেমে থাকতে পারে না। মানসিক ভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টায় কর্মজীবনে প্রবেশ করি। ইতিমধ্যে পরিবার আমার জন্য মেয়ে দেখা শুরু করছে। আমাকে অনেক মেয়ে ছবি পাঠিয়েছিল। একদিন বাড়ি থেকে বাবা ফোন করে বলল, তো মা অসুস্থ তাড়াতাড়ি বাড়ি চলে আয় যদি তোর মাকে দেখতে চাও। আমার মাথার ওপর তখন বাঁজ পড়ল, মাত্র চাকুরিতে ঢুকছি। বস্কে ফোন করে বললাম, মা অসুস্থ বাড়ি যাচ্ছি, তখন বস্রে সাথে একটা ভালো সস্পর্ক ছিল। বস্ বলল, হৃদয় সাবধানে যেও, কি হয় জানিয়ো।
অনেক কষ্ট করে বাড়ি গিয়ে দেখি আত্মীয়-স্বজনে বাড়ি ভরা। মা দিব্বি বাড়ির সব কাজ করছে। তার একমাত্র ছেলের বিয়ে। আমি দেখে তো পুরো অবাক। কিছুটা বিরক্ত হলাম। মাকে ডেকে নিয়ে বললাম এসবের কি দরকার ছিল! মা অনেকটা অবেগ কণ্ঠে বলল, অনেক আশা করে এসব করেছি, মেয়েটা অনেক ভালো তোর জরিনা খালার মেয়ে বকুল। বকুলকে শেষ করে যে দেখেছি মনে পড়ে না।
কি আর করার পরিবারের সম্মান রক্ষা করতে রাজি হয়ে গেলাম। বাসর রাতে বকুলকে স্পষ্ট বলে দিয়েছি, বিয়েটা আমার ইচ্ছার বাইরে হয়েছে, কোনোদিন স্ত্রীর দাবি নিয়ে আসবা না। একটু মাথা নাড়িয়ে বলল, আচ্ছা।
একদিন বন্ধুরা অনেক জোর করছিল বকুলকে দেখার জন্য। আমি কখনো বকুলকে নিয়ে কোথাও ঘুরতে যাইনি। বকুল গ্রামের মেয়ে, শহর ওর কাছে ততটা ভালো লাগে না, বাসায় থাকতে ভালোবাসত। বিয়ের পাঁচ মাসের মাথায় বন্ধুদের সাথে বকুলকে নিয়ে একটা পার্টিতে যাই, ওখানে গিয়ে সে এত বিভ্রান্তবোধ করেছে তা বলার মতো না। বাসায় এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে অনেক কান্না করেছে, কোন ছেলে নাকি তার গায়ে হাত দিয়েছিল। আমার এক বন্ধু আমাকে বলেই ফেলেছে বকুল নাকি আনসোশ্যাল। আমার খুব মাইন্ডে লেগেছিল। আমাকে বকুল বলে আমাকে আপনি আর কোনোদিন এমন জায়গায় নিয়ে যাবেন না। আমার খুব খারাপ লেগেছে। আমি বললাম ঠিক আছে, আস্তে আস্তে আমি বকুলকে প্রেমে পড়তে থাকি। মাঝে মাঝে বাইরে ঘুরতে নিয়ে যেতাম।
একদিন বকুল আমাকে বলে, আমার কেন জানি না শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। আমি বললাম, ঠিক আছে তোমাকে একবার ডাক্তারে কাছে নিয়ে যাওয়ার দরকার। একদিন অফিস থেকে তাড়াতাড়ি চলে আসি ডাক্তারে কাছে নিয়ে গেলে ডাক্তার ওর কাছ থেকে সব কিছু শুনে, কিছু টেস্ট দেয়, আমি সব রিপোর্ট নিয়ে গেলে পর। ডাক্তার রিপোর্ট দেখে আমাকে বলেন, হৃদয় সাহেব মিষ্টি খাওয়ান আমাদের। আমি কিছু বুঝলাম না, তার পর বলে আমি নাকি বাবা হতে চলছি। বিশ্বাস করেন আমি আমি মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না, বকুল তো অনেক খুশি হয়। আমি একটু ওর যত্ন করা শুরু করি। অফিস থেকে সরাসরি বাসায় আসি, কোথাও আর আগের মতো আড্ডা দেই না।
একদিন অফিসে অনেক বেশি কাজের চাপের কারণে বাসা ফিরতে অনেক দেরি হয়ে যায় ফোনটা যে কখন বন্ধ হয়ে গিয়েছিল বুঝতে পারিনি। বকুল নাকি আমাকে অনেক বার ফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছে, অনেক অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। এমন অবস্থা দেখে পাশের ফ্ল্যাটের এক ভাই ওকে নিয়ে হাসপাতালে যায়, কিন্তু কাছের কোন লোক না থাকায় বকুলকে অপারেশন থিয়েটরে নিয়ে যায়নি। আমি যাওয়ার পর আমাকে দেখে সে যেন সজিব হয়ে ওঠে, বকুল নিজে অসুস্থ তার ওপর আমার হাতটা ধরে আমাকে আস্তে আস্তে বলেছিল আমি কিছু খেয়েছি কি না? অফিস থেকে আসতে কষ্ট হয়েছে কিনা! যেখানে তাকে আমার সান্ত¦না দেওয়ার কথা সেখানে আমি ওর কাছ থেকে উল্টো সান্ত¦না পেয়েছিলাম।
সেদিন কেন জানি না ওর জন্য খুব কষ্ট হচ্ছিল, কিছুতে ওর হাতটা ছাড়তে ইচ্ছা করছিল না। হাতটা ধরে অপারেশন থিয়েটার পর্র্যন্ত গিয়েছিলাম। ডাক্তার বলেছে পেশেন্ট এর অবস্থা বেশি ভালো না। সেদিন আমি সৃষ্টিকর্তাকে অনেক ডেকেছিলাম নিজের জন্য কখনও এমন করিনি। দীর্ঘ সময় পর ডাক্তার অপারেশন থিয়েটর থেকে বের হয়ে বললেন, হৃদয় সাহেব দুটো সংবাদ আছে কোনটা আগে শুনবেন? আমি বললাম ভালোটা আগে বলেন। ডাক্তার বললেন, আপনি মেয়ের বাবা হয়েছেন। কিন্তু আপনার স্ত্রীকে আমরা বাচাঁতে পারিনি। শোনার পার আমি নিজকে কন্ট্রোল করতে পারিনি। হাসপাতালে অনেক কান্নাকাটি করেছি।
বকুলকে ছাড়া আজ অনেকটা বছর কেটে গেল, সিন্ধান্ত নিয়েছি সারা জীবন একা থাকব। বেচেঁ থাকতে বকুলের ভালোবাসা না বুঝতে পারলেও এখন বুঝছি, বকুল আমার হৃদয় কতটা জায়গা জুড়ে ছিল। এখনো বকুলের জন্য অনেক কষ্ট হয়, নিজকে অপরাধী মনে হয় মেয়েটা আমাকে কতটা ভালোবেসেছিল কিন্তু আমি তাকে বুঝতে পারিনি।





Users Today : 22
Views Today : 23
Total views : 177665
