দলীয় প্রতীকে আর স্থানীয় পরিষদের নির্বাচন নয়, এমনটিই ভাবতে হচ্ছে বর্তমান সরকারকে। অথচ স্থানীয় পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানকে আরও গণতান্ত্রিক আরও শক্তিশালী করার জন্য আওয়ামী লীগ সরকারই স্থানীয় পরিষদ নির্বাচন দলীয় প্রতীকে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু যতই দিন যাচ্ছে ততই এ সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন ওঠছে। এমনকি দলের অনেক নেতা, তৃণমূলের কর্মীরাই চাচ্ছে না দলীয় প্রতীকে আর কোনো স্থানীয় পরিষদের নির্বাচন হোক। চলমান ইউপি নির্বাচনের দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচনের পরে দাবি আরো জোরদার হচ্ছে।
যে উদ্দেশ্য নিয়ে সরকার ৫ বছর আগে আইন করে ইউপিসহ সকল স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে করার ব্যবস্থা করেছিল তা সফল হয়নি। বরং দলীয় প্রতীকে নির্বাচনের কারণে তৃণমূল পর্যায়ে সংঘাত-সহিংসতা আগের চেয়ে বেড়ে গেছে। নেতাকর্মীদের মধ্যে দলীয় কোন্দল বেড়ে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সরকারি দল আওয়ামী লীগ। আর এ কারণেই দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের মধ্য থেকে প্রতীক ছাড়া নির্বাচনের বিষয়টি সামনে এসেছে। এ পরিস্থিতিতে সরকারও দলীয় প্রতীক ছাড়া স্থানীয় পরিষদ নির্বাচন না করার বিষয়ে ভাবছে। কেননা,ক্ষমতাসীন দলের প্রতীক পাওয়া প্রার্থী আর বিদ্রোহী প্রার্থীর এমন সংঘাত চলছে প্রায় গোটা দেশজুড়ে।
১১ নভেম্বর ও ২৮ নভেম্বর দুই ধাপে প্রায় দুই হাজার ইউপিতে প্রার্থী হওয়া আওয়ামী লীগের নেতাদের সমর্থকদের এমন সংঘর্ষে এক মাসে এক ডজনের বেশি মানুষ মারা গেছে। এনিয়ে দলের মধ্যে যেমন হতাশা বাড়ছে তেমনি নির্বাচন কমিশনও ‘বিব্রত বোধ’ করছে।
আওয়ামী লীগের শত্রু এখন বিএনপি জামায়াত বা অন্য কোনো দল নয়! আওয়ামী শত্রু এখন আওয়ামী লীগই। চলমান ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে এমনই একটি চিত্র ফুটে ওঠেছে। এ পর্যন্ত যতটা ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন হয়েছে এর মধ্য বেশির ভাগ ইউপিতেই আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীরা জিতেছে। বিএনপি, জামায়াত বা অন্যান্য দলের স্থানীয় পর্যায়ের নেতারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অনেক ইউপিতে জয়লাভ করেছে। যদিও দলীয় বা জোটগতভাবে তারা নির্বাচন বয়কটের কথা বলে আসছে। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে কিন্তু এ বয়কটের কোনো প্রতিফল দেখা যাচ্ছে না; স্থানীয় পর্যায়ের নেতারা নির্বাচনে যেমন অংশগ্রহণ করছে এবং যেখানে এমন প্রার্থী নেই সেখানে আওয়ামী লীগের নৌকা মার্কার প্রার্থীকে হারানোর জন্য আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীকে ভোট দিচ্ছে। পত্রিকায় প্রকাশিত দ্বিতীয় ধাপের কয়েক কিছু ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের ফলাফলের দিকে তাকালেই সারাদেশের এ নির্বাচনের হালচাল স্পষ্ট হয়ে যাবে। কয়েকটি ইউপি নির্বাচনের ফলাফলের দিকে চোখ বুলিয়ে নেয়া যাক।
খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার রঘুনাথপুর ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী মনোজিৎ বালা ৬ হাজার ৬০৩ ভোট পেয়ে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী একই দলের আরেক বিদ্রোহী এএম আমিনুর রহমান। তিনি পেয়েছেন ৪ হাজার ৬২২ ভোট। এ দুই বিদ্রোহী প্রার্থীর দাপটে কোণঠাসা আওয়ামী লীগের প্রার্থী খান সাকুর উদ্দীন ভোট পেয়েছেন মাত্র ১ হাজার ৫৯১। এখানে নৌকা মার্কারপ্রার্থী জামানত হারিয়েছে।
পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলার বুড়াবুড়ি ইউপি নির্বাচনে ৩ হাজার ৩১৫ ভোট পেয়ে দ্বিতীয়বারের মতো চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী মো. তারেক হোসেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের আরেক বিদ্রোহী কামারুজ্জামান কামু ভোট পেয়েছেন ২ হাজার ৮৬৬টি। আওয়ামী লীগের প্রার্থী মো. শেখ কামাল এতই কম ভোট পেয়েছেন যে, তিনিও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আসতে পারেননি। এমনকি জামানতও রক্ষা করার মতো ভোটও পাননি।
১৩৮টি ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে প্রতিযোগিতায় আসতে পারেননি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা। এসব প্রার্থী এতই কম ভোট পেয়েছেন যে তারা দ্বিতীয় অবস্থানও অর্জন করতে পারেননি। এই ১৩৮টি ইউনিয়ন পরিষদের মধ্যে দুটিতে জাতীয় পার্টি ও বাকি ১৩৬টিতে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ভোট পাওয়ার দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছেন। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বেশিরভাগই শাসক দলের মনোনয়ন না পেয়ে বিদ্রোহী হিসাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এখানে ২০২টি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছেন আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা। দ্বিতীয় ধাপের ফল ঘোষিত ৮৩৩টির মধ্যে ৩৪৮টি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে হেরে গেছেন আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ৭৭ জনসহ ৪৮৫টিতে জয় পেয়েছেন। দ্বিতীয় ধাপে স্বতন্ত্ররা ৩৩০, জাতীয় পার্টি ১০, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ৪ ও অন্য চারটি রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা একটি করে ইউনিয়নে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন।
এমন ধরনের ফলাফলে আ. লীগের তৃণমূলে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। তারা প্রার্থী মনোনয়নে ‘মনোনয়ন বাণিজ্য’কে দায়ী করেছেন। তারা চলমান ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মনোনয়নে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ তুলে বলছেন, টাকার বিনিময়ে মনোনয়ন পাইয়ে দেওয়ার বিষয়টির জন্য স্থানীয় সংসদ সদস্যরাই বহলাংশে দায়ী। দলের পুরনো ও যোগ্য নেতাদের বাদ দিয়ে টাকার জোর আছে এমন নেতাদের মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। এ কারণে অনেক ইউপিতে ক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা নৌকার বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছেন। ফলে দ্বিতীয় ধাপের ইউপি নির্বাচনে ৪২ শতাংশ ইউনিয়ন পরিষদে নৌকা পরাজিত হয়েছে।
এ ব্যাপারে সাবেক ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘মনোনয়ন বাণিজ্য এভাবেই পরাজিত হোক জয় বাংলা। ধন্যবাদ তাদের যারা আজীবন আওয়ামীলীগ করা ত্যাগী জনপ্রিয় প্রার্থীকে জয়ী করেছেন। আপনারাদের দ্বারাই বন্ধ হবে মনোনয়ন বাণিজ্য। কিছু নেতার বাণিজ্য আপনার আদর্শকে ভূ-লুন্ঠিত করেছে। আপনার সেই দলকে বিব্রত করেছে। দলকে ভালোবাসি, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ লালন করি মনে-প্রাণে তাই চুপ থাকতে পারি না। দেখেও না দেখার ভান করতে পারি না। আপনারা, যারা এভাবে দলকে অপমান করলেন, তাদের ক্ষমা নেই। অর্থের কাছে বিক্রি করলেন প্রার্থীতা! দলের জয় পরাজয়! আপনারা আর যাই হোনÑকখনো দলকে ও বঙ্গবন্ধুকে ভালোবেসেছেন এ কথা বলবেন না। ’
এখানেই শেষ নয় এ নির্বাচনের বাকি যে কয়টি ধাপ রয়েছে সেখানেও স্থানীয় পর্যায়ে আওয়ামীলীগ আওয়ামী লীগে মারদাঙ্গা, হামলা-মামলা, দলাদলি রেষারেষি পুরোনো বিভেদ মাথাচারা দিয়ে ওঠেছে। এরই মধ্যে অনেক আহত নিহতের খবরও আছে।
দেশের সর্ববৃহৎ প্রাচীন দল আওয়ালীগে ইউপি নির্বাচন নিয়ে যে আত্মঘাতীখেলা শুরু হয়েছে, এ নিয়ে দলটিতে যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়ে তা নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারলে তা বর্তমান শাসকদল আওয়ামী লীগের জন্য কতটা সংকট বয়ে আনবে তা বলা খুব কঠিন কিছু নয়। তাই বলতে হচ্ছে ‘সাধু সাবধান’!
মাহবুবুল আলম : সাহিত্যিক, কলামিস্ট ও গবেষক।





Users Today : 16
Views Today : 16
Total views : 177658
