আজও টিফিনগুলো গায়েব। ব্যাপারটা জানা থাকলেও কিছু করার নেই। এদিকে টিফিন করা শেষ বাকিদের। এখন ক্লাসের বাইরে খেলতে যাচ্ছে সবাই। ক্লাসের টেবিলগুলো একটা একটা খালি হতে শুরু করেছে। টেবিল থেকে এবার নিজে উঠে বাকিদের সাথে যোগ দেয়ার একটা চেষ্টা চলছে। এখানেও তেমন পাত্তা নেই। অবশ্য সবাই যে সবার কাছে পাত্তা পাচ্ছে তা নয়। ছোটকুর মতো আরো কয়েকজন ছিল। খেলাধুলায় তেমন পাত্তা পাচ্ছে না।
গতকাল অর্ধেকটি ছিল, আজ পুরোটাই গায়েব। গতকাল বাংলা ক্লাস হচ্ছিল তখন, রোকন, ছোটকুর বেঞ্চের পিছনে রাখা ব্যাগেটির চেইন খুলে টিফিন বক্স হাতিয়ে খাওয়া শুরু করেছিল। ছোটকু পেছনে কুটকুট শব্দ খেয়াল করলে, রোকন অর্ধেকটা রেখে তাড়াতাড়ি করে ছোটকুর ব্যাগে ভরে রেখে দিয়েছিলো বক্সটি। এ নিয়ে ছোটকু পিছন ফিরে রোকনের দিকে তাকিয়ে কিছু বলার চেষ্টা করলে এদিকে টিচার সেটা খেয়াল করে ফেলে। তারপর মৃদু ধমক দিয়ে টিচার বললেন-
‘এই! পেছনে কি!’ ক্লাস শেষ হবার পর ছোটকু সরাসরি রোকনকে জিজ্ঞেস করে বসল-
‘আমার টিফিন খেলি কেন?’
রোকনও উত্তর দিলো-
‘তুই এতগুলো তো খেতে পারবি না’
অবশ্য যেদিন রোকন অন্য কারো পেছনে বসে তার কপালেও এমন ঘটনা ঘটে প্রায়। একবার রনির টিফিনও এভাবে গায়েব হয়ে গিয়েছিল। রনি অবশ্য প্রথমে টের পায়নি। পাশে হেনা বসে ব্যাপারটা অনেক্ষণ ধরে খেয়াল করেছিল। ক্লাস শেষে রনিকে হেনা ব্যাপারটা জানালে রনিও কিছু করতে পারেনি। রোকনকে কেন জানি ভয় পায় রনিও। এরপর আরো বেশ কজনের টিফিন গায়েবের ঘটনা ঘটলে সেটা নিয়ে সতর্ক থাকত ক্লাসের অনেকে, ঠিক এভাবে-
কেউ কেউ ব্যাগের পেছনের পকেটে টিফিন বক্স রাখা বন্ধ করে। আর এমন জায়গায় রাখে সেটা যেন গোপন থাকে।
কেউ কেউ টিফিন বক্স এমনভাবে ব্যাগের ভেতরে রাখত যাতে ব্যাগ হাতরে বক্সটি বার করা না যায়।
কেউ কেউ ব্যাগ বসার বেঞ্চের পেছনে না রেখে সামনে টেবিলের ওপর রাখত টিফিন ছুটির আগ পর্যন্ত।
ছোটকুর অবশ্য এইটুকু বুদ্ধি ছিল না আর তাই ছোটকুর ভোগান্তিটাও বেশি। ছোটকু একটু দেখতে রোগা, চুপচাপ, কারো সাথে কথা বলতে গেলে ভয় পেয়ে যায়।
সেদিন ছোটকুর কপাল দোষে রোকনের পাশেই বসতে হয়েছিল ক্লাসে। ক্লাস শুরুর আগে বাড়ির কাজ ব্যাগ থেকে বের করতে গেলে রোকন খেয়াল করে তার ব্যাগের পিঙ্ক কালারের টিফিন বক্সটা। এরপর রোকন ছোটকুকে বলল-
‘তোর টিফিন বক্সটা বার কর। কী এনেছিস দেখি?’
ছোটকুও বার করে দেখিয়ে বলে, ‘এই দেখ!’ টিফিন দেখিয়েই কেমন যেন আনন্দ হচ্ছিল তার।
রোকন দেখে বলল , ‘ দাঁড়া একটু’, এই বলে ছোটকুর টিফিনে দেয়া রুটির রোলটির অর্ধেকটি তুলে নিল।
ছোটকু বলে উঠলো, ‘এইইই… এগুলো আমার!’ একটু হাত এগিয়ে টিফিনটুকু রক্ষা করতে চেষ্টা করল। কিন্তু ব্যর্থ ।
রোকন মুখে পুড়ে চোখ বন্ধ করে চিবুতে চিবুতে বলল, ‘এতগুলো তুই খেতে পারবি না।’
ছোটকুর মুখ গোমড়া হয়ে গিয়েছিল। আর কিছু একটা বলবে এসময় টিচার ক্লাসে ঢুকে পড়েছিল। একেবারে সরাসরিই খেয়ে নিল। ছোটকু তার মাকে ব্যাপারটা জানালে মা পরামর্শ দিয়েছিল ওই ছেলেকে এড়িয়ে যেতে। অন্য কোনো টেবিলে বসতে। ছোটকু এড়িয়ে যেতে চেষ্টা করে। দুয়েকবার বেঁচে গেলেও রোকন পেছনে বসে এমন কাণ্ড যে রীতিমতো ঘটাচ্ছে।
এই যে আজ, পুরোটাইতো গায়েব। এতক্ষণে ক্ষুধাও লেগেছে। ক্লাস শুরু হতে এখনো বেশ কিছু সময় বাকি। তার আগেই ছোটকু ক্লাসে ফিরে আসে। পুরো ক্লাস খালি। সে একা। টিফিন ছুটি শেষ হলে আর কিছু খেতেও পারবে না। ক্লাসের টেবিলগুলোতে রাখা কত রং-বেরঙের ব্যাগ। কারো কারো টেফিন বক্সও টেবিলের ওপর। টিফিন ছুটি নাকি খেলার ছুটি! অনেকে টিফিন ছুটির সময়টায় খেলার জন্য অস্থির হয়ে যায়। খাওয়া শেষ না করেই খেলার জন্য দৌড়। খাওয়া, আধ খাওয়া এরকম খোলা টিফিন বক্সও টেবিলে দেখা যায় অনেক সময়। ছোটকুর কৌতূহল টিফিন বক্সগুলোতে কী আছে আজ! এতক্ষণ ক্লাসে বসে থেকে কী হবে! খোলা টিফিন বক্সগুলোর কয়েকটি টেবিলের ওপর দেখা যাচ্ছে। কিন্তু সেখানে কিছুই নেই। বাকিদের বন্ধ টেফিন বক্সাগুলো তাদের টেবিলে রাখা ব্যাগের সাথে দেখা যাচ্ছে, সেখানে কী আছে তা দেখতে শুরু করে ছোটকু এভাবে-
প্রথমে ছোটকু ক্লাসের প্রথম সারির টেবিলের ওপর একজনের টিফিন বক্স দেখে । আর সেটি খুলে দেখে ভেতরে কিছু নেই।
তারপর দ্বিতীয় সারির টেবিলের দিকে যায়। অন্যান্য টিফিনবক্সের চেয়ে তুলনামূলকভাবে এখানে একটি বড়ো টিফিন বক্স দেখা যাচ্ছে। নীল রঙের টিফিন বক্স। সেটি খুলে দেখে একটা কলার খোসা। একই টেবিলের পাশের জনের ব্যাগের কাছে রাখা আরেকটি হলুদ রঙের টিফিন বক্স। সেটিও খালি।
এবার পেছনের সারির কমলা রঙের প্লাস্টিকের বক্সটি চোখে পড়লো। আর সেটিই আগ্রহের সাথে খুলে দেখে-একটা এগটোস্ট।
যাক, এটিই হোক আজকের খাবার। কিন্তু খাবার মুখে তুলতেই টিফিন ছুটির শেষের ঘণ্টা বেজে ওঠে। এদিকে অর্ধেকটাও যে শেষ করতে পারলো না। মুখটাও যে ছোটো! কি করে শেষ করে! এই সময় ছাত্ররা ঢুকতে শুরু করছে। এমন কপাল! দুয়েকজন ঢুকতে ঢুকতে শেষমেষ টিফিনবক্সটির মালিক এসেই হাজির। আর কি! হট্টগোল!
‘আমার টিফিন! আমার টিফিন!’ বলে চেঁচামেচি শুরু করে দিলো
ছোটকু ভরকে যায়। বাকিরা জটপাকালো পেছনের সারির সেই টেবিলের চারপাশে। ছোটকু টেবিলের এক পাশে গিয়ে বের হতে গেলে পথ আটকে দেয় কয়েকজন, তারপর আরেকপাশে গিয়ে বেরোতে চেষ্টা করলে পথ আটকে দেয় বাকিরা। কেউ বলে,
‘ফারহান ওদিকে যা আমি ধরব’
আবার কেউ বলে,
‘আমি আর বাবু এদিকে আছি। এদিক থেকে ধরবো।’
এভাবে ছোটকুর এপাশ ওপাশ আটকে ফেলে সবাই। তারপর টেনে বার করে নিয়ে যায় হেডমিস্ট্রেসের কাছে। কয়েকটা ক্লাস রুমের পাশেই হেড মিস্ট্রেসের রুম।
‘কি হয়েছে?‘ হেডমিস্ট্রেস জিজ্ঞেস করে।
ফারহান বলে, ‘টিফিন চুরি করেছে আমার’
বাকিরাও নালিশ দেয়, ‘ফারহানের টিফিন চুরি করেছে।’
এরপর, হেডমিস্ট্রেস একটা স্কেল হাতে নিয়ে ছোটকুকে হাত পাততে বলে আর জিজ্ঞেস করে
‘কেন করেছ? আর হবে এরকম? ’
ছোটকুর কাছ থকে উত্তর পাবার আগেই হেডমিস্ট্রেসের স্কেলের ঘা বসছে।
‘আর হবে? আর হবে?’ হেডমিস্ট্রেস প্রশ্নের তালে তালে স্কেলের ঘা ঠাস ঠাস করে পড়ে ডান হাতে তালুর ওপর । ডানহাত শেষ হলে বামহাতের তালুর ওপর পড়ে আর সেই এক কথা ‘আর হবে? আর হবে?’
দুহাতে জ্বলছে। ব্যথা কমাতে হাত দুখানি পাছায় মুছে ছোটকু। আবার হেডমিস্ট্রেস স্কেল নেড়ে হাত সামনে আনতে বলে ‘আর হবে এমন? ’
হেডমিস্ট্রেস কী বলছে কানেই ঢুকছে না। মার খাবে নাকি প্রশ্ন শুনে উত্তর দেবে কিছুই বুঝে না। হেডমিস্ট্রেসের মারামারি শেষ হলো একপর্যায়ে। এরই মধ্যে ক্লাসে ঢুকে গেছে অনেকে। কেউ কেউ শেষ পর্যন্ত এই মার খাওয়া দেখছিল। সবার ক্লাসে ঢোকার পর ছোটকু কাঁদতে কাঁদতে ক্লাসে ঢুকল। ক্লাস শুরু হচ্ছে একটু পরে। পুরো ক্লাসটার মধ্যে ছোটকুর ভয়। আর যেন কাউকেই চেনে না। সেই রোকনকেও না। আজ রনিও স্কুলে আসেনি। কিছুক্ষণ কান্নাকাটি করে ক্লাসে বসে। এরপর রতনা টিচার এসে পড়লে চোখ মুখ মুছে চুপ হয়ে যায়। রতনা টিচারের ইংরেজি শ্রুতিলিপির ক্লাস। গত ক্লাসে ছোটকুর খাতা দেখে রতনা টিচার এতই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে ক্লাসের সবাইকে ছোটকুর খাতা দেখিয়ে খুব প্রশংসা করেছিলেন।
তাই রতনা টিচার ছোটকুর এত প্রিয়।
একেকটা ক্লাসের চাপে আজকের মতো এই দুঃখ ভুলে গেল।
পরদিন ফার্স্ট পিরিয়ডের ক্লাস শুরুর আগে রোকনের সাথে অভির হাতাহাতি চলছে। সে একই ঘটনা টিফিন চুরি। এদিকে অভির টিফিন চুরির সময় রোকন ফেঁসে যাওয়ায় আজকে রনিও অভির সাথে তাল মিলাচ্ছে। ক্লাস টিচার এলে ব্যাপারটা আরো জানাজানি হয়ে যায়। এবার ক্লাস টিচারই হেডমিস্ট্রেসের কাছে রোকনকে নিয়ে গেল। সাথে রনি আর অভিও গেল। ছোটকু চুপচাপ বসে আছে। এই বিষয়ে ছোটকুর আজ আর কিছুই বলার নেই। গতকাল রোকন কি করছিল যখন ছোটকু মার খাচ্ছিল, ভাবে ছোটকু। আরো ভাবে টিফিন ছুটিতে সে যখন ফারহানের টিফিন খাচ্ছিল সেটা কি রোকন দেখেছিল! বাকিদের মতো রোকনও কি তাকে টানাটনি করে হেডমিস্ট্রেসের কাছে নিয়ে গেছিল! না মনে আসছে না কিছুতেই।
মিনিট দশেক পরে ফিরে এলো রোকন, অভি, রনি আর ক্লাস টিচার। আজ রোকনও কাঁদছে। একটু বেশি কাঁদছে। ছোটকুর চেয়ে বেশি কাঁদছে। হেডমিস্ট্রেস বোধহয় বেশি মেরেছে। ক্লাস টিচার রোকনকে পিছন থেকে একটু সামনে এসে বসতে বলে। একেবারে সামনের সারির বেঞ্চে বসার জায়গা নেই। দ্বিতীয় সারির বেঞ্চে ছোটকু যেখানে বসেছিল তার মাঝখানে রোকনকে বসতে বলল ক্লাস টিচার। ছোটকু আবার একটু ভরকে গেল। কিন্তু রোকনের কান্না তো থামে না। ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদে। এদিকে রোল কল চলছে ক্লাস টিচারের। কোনোভাবে প্রেজেন্ট দিয়ে শেষ করেছে কিন্তু কান্না থামে না। ছোটকু প্রেজেন্ট দিয়ে রোকনের দিকে তাকায়। না কান্না থামে না। এদিকে ক্লাস টিচার কী পড়াচ্ছে মনোযোগ দিতে পারে না ছোটকু, রোকন দুজনই। ছোটকুর মা আজ টিফিনের সাথে একটা কমলালেবু দিয়েছে। ছোটকু ব্যাগ হাতিয়ে কমলাটি বার করে টেবিলে রাখলো। আশা করছিল রোকন নিবে। না, ও কাঁদছে এখনো। টিচার ব্লাকবোর্ডের দিকে ফিরতেই-
ছোটকু হাত বাড়িয়ে রোকনের টেবিলের দিকে কমলাটা ঠেলে দেয়। আর রোকন ঠেলে কমলাটি ছোটকুর কাছে ফিরিয়ে দেয়।
টিচার ব্লাকবোর্ডের দিকে ফিরলে আবার ছোটকু কমলাটা ঠেলে দেয় রোকনের দিকে আর রোকন কমলাটি ঠেলে দেয় ছোটকুর দিকে।
এইভাবে কমলা দেয়ার চেষ্টা চললো আরো একবার। না এবারো রোকন ফিরিয়ে দিল। তবে রোকনের কান্নাটা বোধহয় থেমে আসছে। অনেকক্ষণ এহাত থেকে ওহাতে যেতে যেতে কমলাটি যেন নরম হয়ে যাচ্ছে। ছোটকু কমলাটি আবার একবার রোকনের কাছে ঠেলে পাঠালো। রোকন এবার কমলাটির দিকে আস্তে আস্তে আরচোখে তাকায়। অবশেষে হাতে নেয়। টেবিলে মাথা রাখে রোকন, তারপর কোলের ওপর কমলাটির খোসা ছিলতে থাকে। দুইটি ঘণ্টা বাজে। সেকেন্ড পিরিয়ডের ক্লাস শুরু হবে একটু পর। ফার্স্ট পিরিয়ডের ক্লাস শেষ, ক্লাস টিচার বিদায় নেয়।





Users Today : 32
Views Today : 43
Total views : 175547
