পূর্ব প্রকাশের পর
খোদা আমাদের জীবনে সেই দৃঢ় নিশ্চয়তা দেয় যে, তিনি আমাদেরকে ভালোবাসেন। এখানে আমরা নিশ্চয়তা সম্পর্কে তিনটি বিষয় দেখেছি। এর সবগুলো মিলিয়ে আমরা বলতে পারি যে, আমাদের জীবনে নাজাতের নিশ্চয়তা আছে। সুতরাং খোদার প্রতিজ্ঞা, আমাদের জীবনের পরিবর্তন এবং পবিত্র আত্মার সাক্ষ্য ইত্যাদি আমাদের অন্তরে এই কথা বলে যে, আমরা খোদার সন্তান। রোমীয় ৫ : ৫ আয়াতে বলা হয়েছে, খোদা যে আমাদেরকে ভালোবাসেন তা আমরা বুঝতে পারি, কারণ তাঁর ভালোবাসা আমাদের অন্তরে সেচন করা হয়। সেজন্য আমাদের জীবনে নিজেকে প্রশ্ন করতে হয়-খোদার ভালোবাসা যে আমার অন্তরে আছে তা কি আমি উপলদ্ধি করতে পারি? আমি জানি, অনেক ঈসায়ী ভাই-বোন আছেন,তাদেরকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয় যে, খোদা আপনাকে যে ভালোবাসেন তা আপনি কীভাবে বুঝতে পারেন? তখন তারা তাড়াতাড়ি উত্তরে বলবেন কিতাবে ইউহোন্না ৩ : ১৬ আয়াতে লেখা আছে, খোদা আমাদেরকে ভালোবাসেন। হ্যাঁ, তা সত্য, সেই কথা কিতাবে লেখা আছে কিন্তু ইহাই সম্পূর্ণ উত্তর নয়। কিতাবে লেখা আছে বলে যে তা শুধু বিশ্বাস করলে হবে তা নয়, কিন্তু নিজের জীবনে সে ভালোবাসা উপলদ্ধিও করতে হবে। আমাদের জীবনে অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে আমাদেরকে জানতে হবে যে, খোদা আমাকে ভালোবাসেন। তবে এই উপলদ্ধি বা অভিজ্ঞতা যে আমাদের জীবনে সব সময় থাকবে তা না-ও হতে পারে। তবে আমরা অন্ততঃপক্ষে মাঝে মধ্যে হলেও উপলদ্ধি করতে পারি যে, হ্যাঁ-সত্যিই খোদা আমাকে তাঁর ভালোবাসা দান করেছেন। এটা যদি আমরা অন্তরে বুঝতে পারি, সেটাই হবে নাজাতের সবচেয়ে দৃঢ় নিশ্চয়তা।
আপনি এমন অনেককে পাবেন, যারা বলে থাকে যে, আমি জানি আমার মৃত্যুর পর আমি বেহেস্তে যাব। আপনি যদি তাকে জিজ্ঞাসা করেন, সত্যিই কি আপনি বেহেস্তে যাবেন? তখন সে উত্তর দিবে, হ্যাঁ-আমি জানি আমি মৃত্যুর পরে বেহেস্তে যাব। যখন দ্বিতীয়বার প্রশ্ন করবেন যে, আপনি কীভাবে জানেন ও নিশ্চায়তা পেয়েছেন? তখন হয়ত সে উত্তর দিবে, আমি নিয়মিত ম-লীতে যাই, প্রার্থনা করি, ভালো কাজ করতে চেষ্টা করি, খারাপ কোনো কিছু করিনা ইত্যাদি। তাই বলে, এটা নাজাতের জন্য সত্যিকারের নিশ্চয়তার উপাদান নয়। এটা আমার মিথ্যা বা আত্ম-সান্ত¦নার নিশ্চয়তা বলতে পারি। এর অর্থ হলো আমরা নিজেরা এখনও পাপের গোলামীতে আছি।
কিতাব এ কথা বলে, “তুমি বলতেছ, ‘আমি ধনী; আমি বড়ো লোক হয়েছি, তাই আমার কিছুরই অভাব নেই।’ খুব ভালো, কিন্তু তুমি ত জান না যে, তুমি দুঃখী,দয়ার পাত্র,গরীব,অন্ধ ও উলঙ্গ” (প্রকাশিত কালাম ৩ : ১৭ আয়াত)। তাই যারা মনে করে,আমার সব কিছু আছে, আমি ভালোভাবে চলি, আমি ভালোভাবে জীবনযাপন করছি সেটা হলো ভুল নিশ্চয়তা। সুতরাং আমি বেহেস্তে যেতে পারব, এরকম ভুল চিন্তা যেন আমরা আমাদের জীবনে না করি এবং যারা করে তাদেরকে যেন আমরা আসল নিগূঢ়তত্ত্ব বুঝাতে চেষ্টা করি। সম্পূর্ণ নিশ্চয়তা সম্পর্কে বুঝতে হলে পূর্বের আলোচ্য তিনটি বিষয় অনুসারে আমাদের জীবন চালাতে হবে। আর তা হলো-খোদার প্রতিজ্ঞায় বিশ্বাস করা, আমাদের জীবনে পরিবর্তন দেখা এবং পবিত্র আত্মা আমাদের জীবনে যে সাক্ষ্য দেয় অর্থাৎ আমরা খোদার সন্তান তা অন্তরে উপলদ্ধি করা।
জ) খোদার ইচ্ছা জানা
আমি বিশ্বাস করি, আমাদের মধ্যে অনেকে আছেন, যারা তাদের জীবনে কোনো বিষয়ে খোদার ইচ্ছা কীভাবে বুঝবে তা নিয়ে সমস্যায় ভোগে থাকে। আমাদের জীবনে অনেক প্রশ্ন এ নিয়ে থাকে। যেমন-আমার জীবনকে কীভাবে চালাব? আমি কখন বিবাহ করব? আমি কাকে বিবাহ করব? আমি কি আরও পড়াশুনা করব নাকি চাকরি করব? আমি কি প্রচারক বা ইমামের দায়িত্ব পালন করব? এ সমস্ত বিষয়ে খোদার ইচ্ছা কী তা আমরা কীভাবে বুঝব? আমাদের জীবনে এরকম বিষয়ে খোদার ইচ্ছা জানা খুব সহজ নয়। বর্তমানে যেভাবে খোদার ইচ্ছা বুঝা কঠিন, একইভাবে আগামীতেও আমাদের জন্য তেমনিভাবে খোদার ইচ্ছা বুঝা কঠিন হবে। সুতরাং খোদার ইচ্ছা জানাকে সহজ কিছু মনে করা উচিত নয়।
তবে আমরা জানি, আমাদের প্রত্যেকের জন্য খোদার ইচ্ছা হলো-আমরা যেন পবিত্র হই। আমাদের জীবনের জন্য খোদার ইচ্ছা ও পরিকল্পনা হলো- আমরা যেন দিন দিন মসীহের মতো হই। আমি কাকে বিয়ে করব বা করব না, বা আমি অবিবাহিত থাকব কি না, এসব খোদার মূল ইচ্ছা নয়। আমরা প্রচার কাজে জড়িত থাকব কি না বা জাগতিক অন্য কোনো কাজে জড়িত থাকব, এসবও খোদার মূল ইচ্ছা নয়। আমরা যেকোনো অবস্থায়, যেকোনো জায়গায় থাকি না কেন, আমরা পবিত্রভাবেও জীবনযাপন করতে পারি, আবার খারাপভাবেও জীবন চালাতে পারি। তবে যদি আমরা খারাপভাবে জীবনযাপন করি তাহলে আমরা খোদার সন্তান বা তাঁর লোক নই।
হযরত পৌল বলেছেন, “খোদার ইচ্ছা এই-তোমরা পবিত্র হও, অর্থাৎ সমস্ত রকম ব্যভিচার হতে দূরে থাক, আর যারা খোদাকে জানে না সেই অ-ইহুদীদের মতো দেহের কামনার বশে না চলে তোমরা প্রত্যেকে নিজের দেহকে পবিত্রভাবে সম্মানের সহিত দমনে রাখতে শিখ। এই ব্যাপারে অন্যায় করে কেউ যেন কোনো ভাইকে না ঠকায়। আমরা আগেই তোমাদের বলেছি এবং সাবধান করে দিয়েছি যে, এই সমস্ত অন্যায়ের জন্য প্রভুই শাস্তি দিবেন, কারণ খোদা অবিত্র হয়ে চলবার জন্য আমাদের ডাকেননি, পবিত্রভাবে চলবার জন্যই ডেকেছেন। সেজন্য, এই শিক্ষা যে অগ্রাহ্য করে সে মানুষকে অগ্রাহ্য করে না, বরং যিনি তাঁর পবিত্র আত্মাকে তোমাদের দান করেন সেই খোদাকেই অগ্রাহ্য করে” ( ১ থিষলনীকীয় ৪ : ৩-৮ আয়াত)।
সুতরাং যখনই আপনি কোনো বিষয়ে খোদার ইচ্ছা জানতে চাইবেন, তখনই প্রথমে মনে রাখতে হবে যে, খোদার ইচ্ছা যেন আপনি পবিত্র হউন। আর আমরা যদি অন্যান্য বিষয়ে বেশি ব্যস্ত হয়ে যাই তাহলে আমাদের জীবনের জন্য খোদার মূল যে উদ্দেশ্য তা থেকে দূরে সরে যাব। আমরা কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি ভুল করে থাকি। তাই খোদা চান যেন আমরা তাঁর জন্য পবিত্র জীবনযাপন করার সিদ্ধান্ত নিই। তবে কখন বিবাহ করবেন, কাকে করবেন, কী কাজ করবেন, কীভাবে করবেন, এ সমস্ত বিষয়ে আমরা কীভাবে সিদ্ধান্ত নিব, সেই বিষয়ে নিম্নে আলোচনা করা হলো।
সিদ্ধান্ত নিবার জন্য আমাদেরকে কিছু নীতি অনুসরণ করতে হবে
প্রথমে আমাদের অন্তরে দৃঢ় প্রত্যয় থাকতে হবে যে, খোদা আমাদেরকে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করেন। আমরা যেন বিশ্বাসে নির্ভর করি যে, খোদা আমাকে পরিচালনা করেন। শুধু চিন্তা করতে করতে ব্যস্ত হয়ে যাওয়া নয়, কিন্তু তাঁর ওপর নির্ভর রাখতে হবে যে, তিনি আমাকে পরিচালনা করেন। এ বিষয়ে কিতাবে লেখা আছে, “তোমার সমস্ত অন্তর দিয়ে খোদার ওপর ভরসা কর, তোমার নিজের বিচার বুদ্ধির ওপর ভরসা করো না। তোমার সমস্ত চলার পথে তাঁকে সামনে রাখ; তিনিই তোমার সব পথ সহজ করে দিবেন” (মেসাল হিতোপদেশ ৩ : ৫-৬ আয়াত)। প্রার্থনায় বিষয়ে আমরা ইতিপূর্বে জেনেছি যে, যদি আমরা বিশ্বাসে খোদার কাছে কোন বিষয়ে প্রার্থনা করি তবে তিনি আমাদেরকে তা দিয়ে থাকেন। যখন আমরা ভবিষ্যতের বিষয়ে চিন্তা করি, তখন খোদার ওপর সেই নির্ভরতা রাখতে হবে যে, খোদা আমাকে পরিচালনা দিবেন। অনেক সময় আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ হলো, আমি কী করব, এরচেয়ে কী করা উচিত নয় তা জানা। সেভাবে চিন্তা না করলে অনেক সময় আমরা ভুলভাবে পরিচালিত হতে পারি। কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার অর্থ সেই বিষয়ে প্রথমে ভালো করে বুঝা ও জানা। তাই কোন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে আমরা যেন তাড়াহুড়া না করি। আমাদের জীবনে একটা বড়ো রকমের ভুল হয়ে যায়, তা হলো-যখন আমরা কোনো কাজের বিষয়ে চিন্তা করি তখন ভুলভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি। আবার অনেকে আছে, সিদ্ধান্ত নিয়ে খোদাকে পরীক্ষা করতে চায়। কিতাবে স্পষ্ট বলা আছে, যেন আমরা খোদাকে পরীক্ষা না করি।
অনেকে আছে যারা খোদার কালাম দ্বারা খোদাকে পরীক্ষা করে। তারা বলে যে, খোদা তোমার কালামের মধ্য দিয়ে আমাকে সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য কর। অনেকটা ভাগ্য গণনার মতো তারা চিন্তা করে যে, আমি প্রথমে কিতাব খুলে যে অংশটি পাব সে অনুসারে সিদ্ধান্ত নিব। এভাবে আমরা কিতাব থেকে খোদার ইচ্ছা জানতে পারি না। এটা ভুলভাবে খোদাকে পরীক্ষা করা । কারণ এভাবে খোদার ইচ্ছা জানা যায় না। সেজন্য খোদা কিতাবের মধ্য দিয়ে আমাদেরকে অনেক শিক্ষা দিয়েছেন, যেন আমরা এভাবে ভুল সিদ্ধান্ত না নিই। খোদার ইচ্ছা জানার জন্য আমাদের কীভাবে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত সে বিষয়ে হযরত গিদিয়োন নবীর জীবন থেকে আমরা শিক্ষা লাভ করতে পারি।





Users Today : 13
Views Today : 15
Total views : 184063
