বাবাকে দেখেনি রিজু। তার জন্মের দুই মাস পরেই বাবা সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়। বাবা নাকি দেখতে ছিল ফর্সা, লম্বা একেবারে সাহেবদের মতো। যদিও রিজুর বাবা সাহেব ছিল না, ছিল গ্রামের বাজারের মুদি দোকানদার।
একদিন গৌরীপুর মোকামে তার বাবা গিয়েছিল দোকানের মালামাল কিনতে, ফেরার পথে তার বাবা যে সিএনজি অটোরিক্সাতে ছিল সেটিকে পেছন থেকে ধাক্কা দেয় চট্টগ্রামগামী একটা ট্রাক। সাথে সাথেই একটা বড়ো গাছের সাথে গিয়ে আঘাত লেগে চিড়েচেপ্টা হয়ে গিয়েছিল অটোরিক্সাটি। অটোতে যারা ছিল একজনও বাঁচেনি। বাঁচেনি রিজুর বাবা মোহাম্মদ আলীও।
রিজু এসব কথা শুনেছে মায়ের কাছ থেকে। একটু বড়ো হওয়ার পর সে যখন কিছুটা বুঝতে শিখেছে তখন থেকেই সে তীব্রভাবে বাবার অভাব অনুভব করতে থাকে। সে দেখে অন্য সবার বাবা আছে, তার শুধু বাবা নেই। সেই থেকেই রিজু ভীষণ মিস করতে থাকে তার বাবাকে। ছোট্ট রিজু মনে মনে বাবার একটা কল্পিত ছবি আঁকতে থাকে। একবার আঁকে তো আর একবার মুছে ফেলে। এভাবে গেছে অনেক দিন।
একদিন রিজু তার মাকে বলেছিল—
: মা তোমার কাছে বাবার কোনো ছবি নাই?
: আছিলরে মা, কিন্তু সেইবার যে বড়ো বন্যা অইলো হেই বন্যার সময় ঘরের সব কিছুর সাথে তর বাফের ফটোডাও কই যে ভাইস্যা গেল কইতে পারি না।
মায়ের এ কথা শোনে রিজু অভিমান করে মাকে বলেছিল—
: তুমি যে কি! বাবার ছবিডা আলগাইয়া রাখতে পারলা না! ছবি থাকলেঅত স্কুলের বান্ধবীদের দেখাইয়া কইতে পারতাম দেখ আমার আব্বা দেখতে সুন্দর আছিল। এ অভিমান জড়ানো কথা বলেই মায়ের গলা জড়িয়ে ধরেছিল রিজু।
রিজুর নানু রিজুকে বলেছে—শুধু তর জন্য তর বাবা মারা যাওয়ার পর রাহেলা আর বিয়ে করে নাই। বাবা মারা যাওয়ার পর, দাদাদের বাড়িতে বেশিদিন থাকতে পারেনি তর মা রাহেলা। তর বাফ মারা যাওয়নের পরে রাহেলা ভাবছিল, তরে লইয়া মাটি কামড়াইয়া হইলেও স্বামীর ভিটাতে পইরা থাকব। কিন্তু তর দাদী, ফুফু ও ছোটো চাচার অত্যাচারে আর বেশিদিন থাকতে পারে নাই রাহেলা। তর বাবা মারা যাওনের তিন মাসের মাথায় তরে লইয়া রাহেলা আমাগো বাড়িত চইল্যা আাইছে। তরা চইল্যা আওয়নের পরে তর ছোড চাচা তর বাফের দোকানডা নিজের নামে লেইখ্যা লইছে। তর বাপের সম্পত্তির কানাকড়িও দেয় নাই তর মারে।
দুই
নানার বাড়িতেও যে রিজুরা খুব সুখে আছে তা কিন্তু নয়। নানা-নানীর তরফ থেকে সমস্যা না হলেও মামা-মামীরা রিজুদেরকে বাড়তি বোঝা বলেই মনে করে এসেছে সবসময়। তাই এ পরিস্থতি থেকে মান-সম্মান নিয়ে বাঁচার জন্য রিজুর মা রাহেলা বেগমকে অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছে।
স্বামীর বাড়ি ছেড়ে বাবার বাড়িতে চূড়ান্তভাবে এসে যাওয়ার পর, রাহেলা বেগমের নিজের জমানো কিছু টাকা দিয়ে একটি সেলাই মেশিন কিনে গ্রামের মহিলা ও স্কুল কলেজের মেয়েদের পেটিকোট, ব্লাউজ, ড্রেস বানানো শুরু করে। রিজুর বয়স পাঁচ হতেই স্থানীয় কেজি স্কুল ভর্তি করে দেয়। একদিকে রিজু বড়ো হতে থাকে অন্যদিকে তার মায়ের কাজের ব্যস্ততাও বাড়তে থাকে। কয়েক বৎসরের মধ্যেই গ্রামের বেড়িবাঁধ বাজারে ‘রিজু লেডিস টেইলার্স’ নামে একটা টেইলারিং শপ খুলে বসে রাহেলা বেগম। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই দোকানে ভিড় কেবল বাড়তেই থাকে। এক সেলাই মেশিনের জায়গায় চার মেশিনে প্রয়োজন হয়। এক দোকান কোঠার জায়গায় দুই দোকান কোঠা। তখন রাহেলা বেগমের একার পক্ষে দোকান সমলানো অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। সাথে সাথে জেন্টস পোশাক তৈরির চাহিদাও দেখা দেয়। তাই অনেকটা বাধ্য হয়েই লেখাপড়া জানা একজন কাটিং মাস্টার রাখতে হয় রাহেলা বেগমকে। এভাবেই চক্রকারে ঘুরতে থাকে ঘড়ির কাটা। ডেংডেঙ্গিয়ে বাড়তে থাকে রিজুর বয়স। প্রাইমারির পড়া শেষ করে স্থানীয় হাই স্কুলে ভর্তি হয় রিজু।
রাতে মায়ের গলা জড়িয়ে ঘুমাতে ঘুমাতে রিজু মায়ের কাছ থেকে অনেক স্বপ্নের কথা শুনে। মা রিজুকে বলে—
: মারে তরে নিয়াই তো আমার সব স্বপ্ন। তুই লেখাপড়া কইরা অনেক অনেক বড়ো হবি। মানুষের মত মানুষ হবি, চাকুরি করবি তারপর সুন্দর একটা ছেলে দেইখ্যা তর বিয়া দিমু।
বিয়ের কথা উঠলেই রিজু অভিমানের সুরে বলে—
মা তুমি না কি! খালি বিয়ার কথা। আমি বিয়া করবো না। বিয়া করলেইতো শ্বশুর বাড়ি চইল্যা যাইতে হয়। আমি তোমারে ছাইড়া কোথাও যামুনা। আবার যদি বিয়ার কথা কও এই তোমার লগে আড়ি আড়ি। বলেই রিজু কপট অভিমানে মায়ের গলা ছেড়ে পিছন ফিরে শুতো।
রাহেলা বেগমও পরম আদরে বুকে টেনে নিয়ে বলত—
: যা যা তরে কোনু দিন বিয়া দিমু না। আর অভিমার করা লাগবোনা। আয় আয় মায়ের বুকে আয়।
রিজুটা হয়েছে বাবার মতো লম্বা, সুন্দর একহারা গড়নের। ক্লাস সেভেনে ওঠতে না ওঠতেই তাই বিয়ের আলাপ আসতে শুরু করে। স্কুলের ছেলে-ছোকড়ারা পিছু নেয়। কিন্তু রাহেলা বেগম প্রতিবারই বিনয়ের সাথে বলেছে—
: না, আমার মাইয়ারে এখন বিয়া দিমু না। আগে লেখাপড়া শেষ করুক তার পরে বিয়া।
তিন
রিজুর নানা রিজুর মাকে চার শতক জায়গা ঘর বানানোর জন্য রেজিষ্ট্রি করে দিয়েছে। সেই জায়গায় রাহেলা বেগম সেমি পাকা ঘর তুলেছে একটা। গাছ-গাছালী লাগিয়ে চমৎকার করে সাজিয়েছে নিজেদের বাড়িটাকে। কিন্তু এত সুখের মাঝেও অশান্তির এক কালো ছায়া ছড়িয়ে দিয়েছে গ্রামের কুচক্রিমহল। রাহেলা বেগম ও তার দোকানের কাটিং মাস্টার জসিমকে নিয়ে কুৎসা রটাচ্ছে। ছয় সন্তানের জনক গ্রামের লিল মিয়া রাহেলা বেগমকে বিয়ে করার জন্য প্রস্তাব দিয়ে ব্যর্থ হয়ে জসিম ও রাহেলাকে নিয়ে আজেবাজে কথা রটাচ্ছে গ্রামে। রিজুদের স্কুলেও এ নিয়ে নানা মুখরোচক কথা ছিড়িয়ে দিয়েছে। এতে রিজু বেশ বিব্রত।
এমন অসহনীয় অবস্থা থেকে রাহেলা বেগমকে রক্ষার জন্য অবিবাহিত যুবক জসিম রাহেলা বেগমকে বিয়ের প্রস্তাব দিলে, সাথে সাথেই রাহেলা বেগম তা প্রত্যাখ্যান করে, জসিমকে দোকানের চাকুরি থেকে বিদায় করে দেয়।
কিন্তু তবুও জসিম, হাল না ছেড়ে রাহেলা বেগমের বাবার কাছে সরাসরি বিয়ের প্রস্তাব পাঠায়। সব দিক বিবেচনা করে রাহেলাবেগমের পরিবার এ বিয়েতে মত দেয়। ঘোর আপত্তি থাকা সত্ত্বেও অভিভাবকদের চাপে শেষ পর্যন্ত বিয়েতে মত দেয় রাহেলা বেগম।
এরপর থেকে কিশোরী রিজুর মনেও মাকে নিয়ে অবিশ্বাসের ডালপালা গজাতে শুরু করে। রিজু তার বাবাকে না দেখলেও কল্পনায় নিজের মনের গহনে তার বাবার যে ছবি এঁকেছে সেখানে বাবার বদলে অন্য কাউকে বসাতে পারছে না রিজু। তাই ভেতরে ভেতরে মায়ের ওপর বেশ বিরক্ত সে।
তাই কিছুদিন থেকেই রিজুর চলাফেরা, আচার আচরণে কেমন বৈপরিত্ব লক্ষ করছে রাহেলা বেগম। খাওয়া-দাওয়ায় মন নেই। নিজের মাঝেই সে যেন কেমন মগ্ন থাকে। ঠিকমতো গোছল করে না, চুল আচড়ায় না, যতক্ষণ ঘরে থাকে কেমন গুটিয়ে থাকে। আগে প্রায়ই নানুর সাথে আড্ডা দিত, হাসি-তামাশা করত। লেখাপড়া অন্তপ্রাণ যে মেয়ে, কয়েক দিন ধরে সে মেয়ে তার স্বভাবের উল্টো পথে হাঁটতে শুরু করেছে। ক’দিন যাবত স্কুলে যায় না। একা একা হাসে, কখনো বা কাঁদে। নিজে নিজে গান গায়।
গ্রামের মানুষ, পাড়া-প্রতিবেশীরা রিজুর এ অস্বাভাবিক আচরণকে জিনে ধরেছে বলে রিজুর মাকে বলে—
: রিজুর মা তোমার মাইয়ারে খুব খারাপ জিনে ধরছে, মাইয়ারে বাঁচাইতে অইলে তাড়াতাড়ি ভালা কবিরাজ, নাইলে তান্ত্রিক আইন্যা মাইয়াডারে দেহাও নাইলে সুন্দর মাইয়াডারে আরাইবা।
আবার কেউ এসে বলে—
: রিজুরে ভূতে ধরছে, এই ভূত তাড়াইতে তান্ত্রিক আইন্যা, শুকনা মরিচ আর গোল মরিচ একসাথে পোড়াইয়া নাকে নাছ দিতে অইবো। নাছ দিলেই বাপ বাপ কইরা ভূত ভাগব। রাহেলা বেগম কার কথা শুনবে এখন ভেবে পাচ্ছে না।
মেয়ের এঅবস্থা নিয়ে রাহেলা বেগমের দুশ্চিন্তার অন্ত নেই। মেয়েকে বোঝাতে গেলে, মায়ের দিকে তেড়ে আসছে যা নয় তা গালমন্দ করছে।
চার
গ্রামবাসী, পাড়া-প্রতিবেশীর কথায় একজন তান্ত্রিক আনা হয়েছে। গেঁড়ুয়া পোশাক পরিহত, হালকা জটাধারী, গলায় রঙ-বেরঙের নানাজাতের মালা ঝোলানো বয়স্ক সে তান্ত্রিককে দেখলেই যেন কেমন ভয়ভয় লাগে। আসর ও মাগরিবের নামাজের মধ্যবর্তী সময়ে উঠোনের মধ্যখানে জিন তাড়ানোর আসর বসানো হয়েছে। আগেই বলে দেয়া কথামতো তেঁতুল ও শেওড়াগাছের লাকড়ি দিয়ে আগুন জ্বালানো হয়েছে।
রিজুকে দুইজনে ধরাধরি করে এনে বসানো হয়েছে তান্ত্রিকের কাছাকাছি একটি জলচৌকিতে। সারা গ্রামের মানুষ এসে যেন হাজির হয়েছে তান্ত্রিকের জিন বা ভূত তাড়ানোর কেরামতি দেখার জন্য। রিজুর চোখ দুটি লাল হয়ে আছে। লাল চোখ বড়ো বড়ো করে সে চেয়ে আছে তান্ত্রিকের দিকে। তান্ত্রিক রিজুকে উদ্দেশ্য করে বলে—
: ভালায় ভালায় চইল্যা যা কইলাম। না হইলে আমি তর এমন দশা করমু…
তান্ত্রিকের এ কথা শুনে, হি, হি, করে হেসে রিজু বলে—
: তর মাথা। বলেই এবার উচ্চস্বরে হাসতে থাকে।
তান্ত্রিক চোখ রাঙ্গিয়ে বলে—
: হাসলে কাম হইব না, তাড়াতাড়ি বল, তুই কই থাইক্যা আইছস, কী নাম তর? যদি না বলছ আর এই মাইয়ার শরীল ছাইরা না যাছ, তাইলে একশন শুরু হইয়া যাইব।
রিজু তান্ত্রিকের চোখে চোখ রেখে সুর করে তালে তালে বলে—
ভণ্ড ভণ্ড ভণ্ড, ভণ্ড ফকির ভণ্ড। হা হা হা।
রিজুর এই কথায় বোঝি তান্ত্রিকের ইজ্জত পাংচার হয়ে গেল, তাই সে উচ্চস্বরে চিৎকার করে বলে—
: দুর! বেয়াদপ জিন। দেখ আমি তর কি হাল করি।
তারপর রিজুর মার দিকে তাকিয়ে বলে—
: এক্ষনি এক নম্বর সরিষার তেল, কিছু ছিটিং মরিচ, কিছু গোল মরিচ, একটা ছোটো মাটির পাতিলে কিছু তুস দিয়া নিয়া আইয়েন। সবাই দেখেন আমি জিনেরে কেমনে বাপ ডাকাইতাছি। তান্ত্রিক নিজে নিজেই তর্জন-গর্জন করতে থাকে।
কাঁদতে কাঁদতে ঘরের ভেতর চলে যায় রাহেলা বেগম। রাহেলার সৎবাবা দূরে দাঁড়িয়ে তান্ত্রিকের সব কথা শুনছে। জসিম কখনো তান্ত্রিক-ফান্ত্রিকে বিশ্বাস করে না। এসব না করে সে রাহেলাকে বলেছিল একজন ভাল মনোরোগের ডাক্তার দেখাতে। কিন্তু সবার কথা শোনে রাহেলা বলেছিল—
: সবাই তো বলতাছে তান্ত্রিক দেখানোর কথা, তাই সবার কথা শুনলে এমন কী ক্ষতি হইবো। যদি তান্ত্রিক কিছু করতে না পারে তখন না হয় ডাক্তার দেখান যাইব নে।
উপস্থিত সব মানুষ পিনপতন নীরবতায় দাঁড়িয়ে তান্ত্রিকের মন্ত্র পড়া শুনছে। রাহেলা বেগম তান্ত্রিকের নির্দেশমতো সব জিনিস এনে তান্ত্রিকের হাতে দেয়।
তান্ত্রিক মাটির পাতিলের তুষে আগেই জ্বালিয়ে রাখা আগুন থেকে কিছু অঙ্গার এনে পাতিলে আগুন জ্বালিয়ে দুইজন শক্ত-সামর্থ পুরুষ ডেকে আনে। রিজুকে শক্ত করে ধরতে বলে। সরিষার তেলের শিশি থেকে তেল নিয়ে রিজুর চোখে মুখে মেখে দেয়। রিজু ছটফট করতে থাকে। তারপর পাতিলের আগুনে লম্বা ছিটিং মরিচ ও গোল মরিচ দিয়ে দিলে ঝাঁঝালো গ্যাসে উপস্থিত সবাই কাশতে শুরু করে। আর তান্ত্রিক সেই ধোঁয়ায় ভরা পাতিলটা রিজুর নাক-মুখের কাছে ধরে।
রিজুর চিৎকারে উপস্থিত সবার চোখেই কম বেশি জল এসে যায়! রিজু যতই চিৎকার করে ততই তান্ত্রিকের আস্ফালন আরো বেড়ে যায়। সে উত্তেজিতভাবে বলে—
: এইবার যাইবি কিনা বল। নাইলে আরও কঠিন শাস্তি দিব।
দুই জুয়ান মর্দ পুরুষও যেন রিজুকে ধরে রাখতে পারছে না। রিজু চিৎকার করে—
: আমারে বাঁচাও। কে আছ, আমারে বাঁচাও। আমি গেলাম, আমারে বাঁচাও। আমি গেলাম।
আমি গেলাম।
রিজুর এ অবস্থায় দৌড়ে আসে জসিম। সে জোর করে ওই দুইজন পুরুষের হাত থেকে রিজুকে কেড়ে নিয়ে, তান্ত্রিকের দিকে তেড়ে যায়। তান্ত্রিক তখন বলে—
: আপনারা শুনছেন না, জিনটা যে গেলাম গেলাম করছে। দেখবেন জিন চলে যাবে। বলতে না বলতেই রিজু বেহুঁশ হয়ে সৎ বাবা জসিমের কোলে ঢলে পড়ে।
পাঁচ
তান্ত্রিকের শারীরিক নির্যাতন দুই দিনেও কাটিয়ে ওঠতে পারেনি রিজু। চোখ দুটি রক্তলাল। সারামুখ ফুলে গেছে। তবে তার আগের অবস্থার কোন পরির্বতন হয়নি। আগের মতো কখনো নির্বাক, কখনো হাসে, আবার কখনো কাঁদে, মাকে দেখলে উত্তেজিত হয়ে গালাগাল করে। তাই রাহেলা ও জসিম দুজনে রিজুকে রবিবার গৌরীপুরে একজন মানসিক রোগের বিশেষজ্ঞ ডাক্তার দেখানোর সিদ্ধান্ত নেয়। জসিমই এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। সে একরকম রাগ করেই বলে—
: কোনো তান্ত্রিক ফান্ত্রিক বা ঝাড়ফুঁক করিয়ে আমি মেয়েটির জীবন নষ্ট করে দিতে রাজি নই। আমি রিজুকে একজন মানসিক রোগের ডাক্তার দেখাবোই। আমি আর কানো কথা শোনব না।
রবিবার সকাল সকালই রিজুকে নিয়ে গৌরীপুর মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার আনোয়ার হোসেনের চেম্বারে এসে উপস্থিত হয় রাহেলা, জসিম ও রিজুর নানা ও নানী। আগেই সিরিয়াল নম্বর নিয়ে রাখা হয়েছে। প্রায় আধঘণ্টা অপেক্ষার পর রিজুর ডাক পড়ে।
ডাক্তার আনোয়ার হোসেন খুব আদর করে ডেকে রিজুকে নিয়ে তার পাশে বসায়। রিজুকে দেখে রাহেলা বেগমকে জিজ্ঞেস করেন—
আপনারা আগে আর কাকে দেখিয়েছন?
ডাক্তারের প্রশ্নে রাহেলা বেগম আমতা আমতা করে। রাহেলা বেগমের এ অবস্থা দেখে ডাক্তার আনোয়ার হোসেন বলেন—
আপনাকে আর বলতে হবে না, আমি রোগীর অবস্থা দেখেই বুঝতে পারছি, তান্ত্রিকের অপচিকিৎসায় মেয়েটির এ অবস্থা হয়েছে। আমাদের দেশের মানুষ সচেতন নয় বলেই ভ- তান্ত্রিক আর পীর-ফকিরের ঝাড়ফুঁক করিয়ে ব্যর্থ না হলে আর কেউ ডাক্তরের কাছে যেতে রাজি নয়। ততক্ষণে রোগীর শারীরিক বেশ ক্ষতি হয়ে যায়। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় রোগীর চোখ ও মনের। ডাক্তার বুঝতে পারেন রোগীর ওপর দিয়ে কতটা ধকল গেছে। রিজুর মাথায় হাত বুলিয়ে ডাক্তার সাহেব জিজ্ঞেস করে—
তোমার নাম কী মা? ডাক্তরের প্রশ্নে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই রিজুর, সে চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে কি যেন দেখে।
রোগীর কাছ থেকে কোনো জবাব না পেয়ে ডাক্তার সাহেব জসিমকে বলেন—
: ঠিক আছে। আপনিই খুলে বলুন পুরো বিষয়টা!
: না আমি না, মেয়ের মা-ই বলুক। জসিম বলে।
শেষে রাহেলা বেগমই সব কিছু খুলে বলে। তাকে মাঝেমাঝে সহযোগিতা করে রিজুর নানীও।
তাদের সবার কথা শুনে ডা. আনোয়ার হোসেন বলেন—
: রোগীকে দেখে, এবং আপনাদের কথা শোনে আমি নিশ্চিত, এটি হিস্টিরিয়া। এটি বয়োঃসন্ধিকালের একটি সমস্যা। বিস্তারিতভাবে বলতে গেলে হিস্টিরিয়া হলো, মানবমনের নিয়ন্ত্রণহীন আবেগের প্রবল্য। এটি মানুষের অবচেতন মনের অবদমিত মানসিক দ্বন্দ্ব থেকে সৃষ্টি হয়। এটির সঙ্গে মানুষের কোনো না কোনো ধরনের চাওয়া-পাওয়ার সম্পর্ক রয়েছে। এ চাওয়া-পাওয়াগুলোর সঙ্গে যে বাস্তবের সম্পর্ক থাকতে হবে এমন কোনো কথা নেই। হিস্টিরিয়া সম্পর্কে আমাদের সমাজে নানা ধরনের ভ্রান্ত ধারণা বিদ্যমান। অনেকেই একে অভিনয়, জিন ভূতে ধরা অথবা বাতাস লাগা হিসেবেও অভিহিত করে থাকে।
সাধারণত ভয়, দুশ্চিন্তা, হতাশা, মানসিক চাপ মানসিক আঘাত, দীর্ঘদিন যাবত নানা অসুখে ভোগা, মৃত্যুশোক বা প্রেমে প্রত্যাখান থেকে হিস্টিরিয়া সৃষ্টি হয়ে থাকে।
ডাক্তরের কথা শুনে কান্নাজড়ানো কণ্ঠে রাহেলা বেগম জানতে চান—
স্যার। আমার মাইয়্যাডা ভালা হইব ত?
: চিকৎসায় তা ভাল হয়ে যায়। তবে এখনই আপনাকে সব বলা সম্ভব নয়। এর আগে এব্যপারে রোগীর সাথে একান্তে কথা বলা জরুরি। রোগীর সাথে কথা বলে তার কথার ওপর ভিত্তি করেই তথ্য বিশ্লেষণ করে এ রোগের চিকিৎসা করতে হয়। আপনারা সবাই এখন বাইরে যান আমি রোগীর সাথে একান্তে কিছু কথা বলতে চাই।
ডাক্তারের কথামতো সবাই চেম্বার থেকে বেরিয়ে ওয়াটিং রুমে গিয়ে বসে।
সবাই বেরিয়ে গেলে ডাক্তার আনোয়ার রিজুর মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন—
: মা বলো তো তুমি কাকে বেশি ভালোবাস।
রিজু কোনো কথা বলে না। সে মাথা নুইয়ে বসে থাকে। ডাক্তার আবার বলেন—
: নিশ্চয় মাকে বেশি ভালোবাস তাই না।
একথা বলতেই বেশ রিএ্যাক্ট করে রিজু বলে—
: না, আমি মাকে ভালবাসি না।
: কেন, মাকে ভালোবাসনা কেন? ডাক্তার বলেন।
: ক্যান আবার। মা আমারে ভালোবাসে না।
: তোমার এমনটি মনে হয় কেন? ডাক্তারের কথা।
: ক্যান আবার। মা আমারে ভালোবাসলে কি ঐ লোকটারে বিয়া করতে পারত।
: কোন লোকটকে?
: কোনটা আবার। যে লোকটা মায়ের পাশে বসা আছিল সে আর কি।
: আচ্ছা। বেশ। আর কাউকে ভালোবাসনা? মানে স্কুলে তোমার কোনো ছেলে বন্ধু! ডাক্তারের এমন প্রশ্নে রিজু মাথা নিচু করে থাকে। ডাক্তার আবার বলেন—
: আমাকে সব খুলে বলো। তবেই তো আমি তোমাকে সাহায্য করতে পারি।
ডাক্তারের এ কথায় রিজুর যেন মন গলে। সে মাথা নুইয়েই বলে—
: আমি আমাদের স্কুলের হেড স্যারের ছেলেকে ভালোবাসি, খুব ভালোবাসি ওকে। কিন্তু সে আমারে পাত্তা দেয় না।
: তুমি তাকে তোমার এই ভালোবাসার কথা বলোনি? সে কি তোমার ক্লাসে পড়ে?
: হ্যা, অনেক বলেছি তবুও পাত্তা দেয় নাই। আমরা এক ক্লাসেই পড়ি।
: এ জন্য কী তোমার খুব খারাপ লাগে তাই না? ঠিক আছে। আমি যে ঔষধগুলো লিখে দিব তা ঠিকমতো খাবে। সব ঠিক হয়ে যাবে।
রিজু মাথা নাড়ায়।
ডাক্তার আবার সবাইকে ডেকে চেম্বারে আনেন।





Users Today : 145
Views Today : 186
Total views : 182034
