লোকটির কাঁধে ব্যাগ। হেঁটে যাচ্ছে হোটেলের রিসিপশনের দিকে। ডেস্ক থেকে রুমের চাবি নিয়ে লিফটের বাটন টিপল। তারপর তাকিয়ে থাকল বাটনের ওপর লাল ডিজিটের দিকে। ডিজিট এক এক করে কমছে। ৫.৪.৩.২.১। লিফটের দরজা খুলে গেলে তার ভেতর ঢুকে পড়ল লোকটি। লিফটের দরজা বন্ধ হয়ে গেল।
পাঁচ তলায় এসে লিফটের দরজা খুলে গেল। লোকটি বের হয়ে এসে রুমের দরজার সামনে দাঁড়াল। চোখ গেল নিচের দিকে। দেখতে পেল বাসি খাবারের প্লেট একটির ওপর আরেকটি স্তূপ করে রাখা। নাক কুঁচকালো লোকটি। তারপর চাবি দিয়ে রুমের দরজা খুলল। ভেতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল লোকটি।
অন্ধকার। রুমের ভেতর লোকটি বাতি জ্বেলে দিল। তারপর সোফার ওপর ব্যাগ রেখে লোকটি জুতো খুলল, মোজা খুলল। তারপর ভেতরের রুমের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল, বাতি জ্বেলে দিল, ফ্যান ছাড়ল। জানালার পর্দা খুলে দিল। বারান্দার দরজা খুলে বারান্দায় গেল, রেলিঙে হাত রেখে একবার ডানদিকে একবার বামদিকে তাকাল। আবার ফিরে এলো রুমের ভেতর। বারান্দার দরজা বন্ধ করে দিল। শার্ট খুলে হ্যাঙ্গারে রাখল। তারপর হ্যাঙ্গারটি ঝুলিয়ে দিল জানালার শিকে। শার্টটি ফ্যানের বাতাসে দুলছে।
একটি পোকা ফ্লোরে ঘুরছে। তারপর বৃত্তের মতো করে চক্কর খাচ্ছে।
লোকটি বাতি জ্বালানোর জন্য সুইচ টিপলে লাল লাইট জ্বলে উঠল। হঠাৎ করেই সে শুনতে পেল কেউ একজন তার নাম ধরে ডাকছে।
—সাদিক!
ডাক শুনে লোকটি শব্দের উৎস খুঁজতে থাকল, কিন্তু কিছুই দেখল না।
এবার সে একটি মেয়েকে দেখতে পেল। মেয়েটি তার দিকে এগিয়ে এল, বলল,
—সাদিক তুমি আমাকে চিনতে পারছো না! মনে আছে তুমি আমাকে প্রথম স্পর্শ করেছিলে? আসো।
—না। আমি তোমাকে চিনতে পারছি না।
এবার একটি পুরুষ কণ্ঠ শুনতে পেল সে। তার নাম ধরে ডাকছে।
—সাদিক!
সে এগিয়ে গেল ডাকের উৎসের দিকে। মুখের দিকে তাকালো।
—সাদিক! চল্ মাছ মারতে যাই। বিলে মাছ উঠছে। দেখ্ ট্যাটা নিয়ে আইছি।
লোকটি তাকিয়ে দেখে তার হাতে মাছ মারার ট্যাটা, পরনে লুঙ্গি।
আবার তাকাতেই তাকে আর দেখতে পায় না।
লোকটিকে উদ্ভ্রান্তের মতো লাগছে। সে আরো এগিয়ে গেল। আরেকটি কণ্ঠ শুনতে পেল।
—সাদিক!
—সাদিক! আমি তোর বন্ধু আজমল। মনে পড়ে! সুনীল দা’র ডেরা। কোথায় হারিয়ে গেলিরে তুই! তোর লেখা কোথাও আর দেখলাম না।
—কে আজমল ? আমার কোনো বন্ধু নেই। আমি তোমাকে চিনি না।
আরেকটি নারী কণ্ঠের ডাক শুনতে পেল,
—সাদিক!
—আমি তমা। তমা গো, তোমার তমা। তুমি প্রথম আমাকেই চিঠি লিখেছিলে। মনে পড়ে! এই যে দেখ সেই চিঠি, আমি এখনো সঙ্গে রাখি।
—নানা। এ আমার চিঠি নয়!
তারা চারজন একসঙ্গে লোকটিকে ঘিরে বৃত্তাবদ্ধ হয়ে ঘুরতে থাকে। তাদের তিনজনের কোমরে ছুরি গোঁজা রয়েছে। একজনের হাতে ট্যাটা। এবার তারা তাদের ছুরিগুলো কোমর থেকে হাতে নিয়ে লোকটির চারদিকে ঘুরতে থাকে।
লোকটি তাদের হাত গলে বিছানায় আসে। তারা তার বিছানার চারদিকে ঘিরে ধরে। তারপর ছুরি দিয়ে লোকটির বিছানা-বালিশ কাটতে থাকে।
লোকটি স্বপ্নে দেখে ধীরে ধীরে সে জলে ডুবে যাচ্ছে।
ঢেউয়ের শোঁ শোঁ শব্দ হচ্ছে। ঢেউগুলো আছড়ে পড়ছে তীরে।
সাগরপাড়ে চেতনাহীন শুয়ে আছে লোকটি। সাগরের জলে ভিজে যাচ্ছে পা। জল গড়িয়ে কোমর অব্দি এসে পড়ছে।
লোকটির কানে ভেসে আসছে একটি শিশুর কণ্ঠ।
—বাবা ফড়িংটি ধরে দাও। বাবা ফড়িংটি ধরে দাও।
সাগরতীরে পড়ে থাকা লোকটির ডানহাত মুঠো করে কিছু একটা ধরার চেষ্টা করছে। ঢেউ এসে ভিজিয়ে দিয়ে গেল হাত। চরাচর জুড়ে ঢেউয়ের শোঁ শোঁ শব্দ।





Users Today : 166
Views Today : 211
Total views : 182059
