সাম্প্রদায়িক সহিংসতার আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হলো রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার রামনাথপুর ইউনিয়নের মাঝিপাড়া, বটতলা ও হাতীবান্ধা গ্রামের হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের বাড়ি-ঘর। রাতের আঁধারে চলে লুটপাট ও নৈরাজ্য। দুর্গা পূজায় কুমিল্লার এক ম-পে দুর্বৃত্তের রাখা পবিত্র কুরআন অবমাননার জের ধরে ঘটে এ ঘটনা। কুমিল্লা ছাড়াও চাঁদপুর, নোয়াখালী, চট্টগ্রামসহ দেশের নানান জায়গায় মন্দিরে হামলার ঘটনা ঘটেছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মন্দিরে হামলার ঘটনা মোটেই সরলরৈখিক নয়। সাম্প্রদায়িকতায় বিশ্বাসী দল ও মানুষ এসব ঘটনায় অফলাইন ও অনলাইনে প্রতিনিয়ত উসকানি ও ইন্ধন দিয়েছে। ধর্মের নামে দেশে এ রকম পরিকল্পিত অপরাধ এই প্রথম নয়।
সকল ধর্মেই সহাবস্থান ও সম্প্রীতির কথা বলা হয়েছে। যারা সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়ায় তাদের অসৎ উদ্দেশ্য থাকে। এদের নির্মূল করা একান্ত প্রয়োজন। নয়তো সাম্প্রদায়িকতা সমাজের শিরায় শিরায় ছড়িয়ে পড়বে। জাতির অস্তিত্বকে বিপন্ন করবে। সেজন্য রাষ্ট্র ও সরকারকে আরও কঠোর হতে হবে। এমনটাই মত দিয়েছেন বিশিষ্টজনরা।
সাম্প্রদায়িকতার নিকৃষ্ঠতা এ থেকে পরিত্রাণের পথ নিয়ে আমরা আলাপ করছিলাম মন্ত্রী, রাজনীতিবিদ, শিক্ষকসহ দেশের বিশিষ্ট নাগরিকগণের সঙ্গে। সেই আলাপের ভিত্তিতিই আজকের প্রচ্ছদ প্রতিবেদন।
আসাদুজ্জামান খান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
সাম্প্রদায়িক নয়, বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর আক্রমণ আসলে একটি বড়ো ষড়যন্ত্র। এটি আদতে একটি ষড়যন্ত্র। কোনো সাম্প্রদায়িক হিংসার ঘটনা নয়। দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করার জন্যই এই ষড়যন্ত্র করা হয়েছে। তদন্ত চলছে এবং দ্রুত এই ষড়যন্ত্রের পর্দাফাঁস হবে। দেশের বিরুদ্ধে এই ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রে যারা লিপ্ত, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি নেবে সরকার।
সরকারকে দলনির্বিশেষেই অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে
রাশেদ খান মেনন
সংসদ সদস্য ও সভাপতি বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি।
সাম্প্রদায়িক হামলা ও মন্দির ভাঙচুরকে কেন্দ্র করে দোষারোপের রাজনীতি ওই সব ঘটনার সঙ্গে জড়িত ষড়যন্ত্রকারীদের প্রকৃত পরিচয়কেই আড়াল করবে। সরকারকে দলনির্বিশেষেই অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। এ ঘটনায় জড়িতদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার ও বিচার করতে হবে।
এটা সবার জানা যে, জামায়াত-হেফাজতিরা সাম্প্রতিক সময়েও ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল। সাম্প্রদায়িকতার ব্যাপারে যেকোনো শৈথিল্যে তারা সুযোগ নেবে। সাম্প্রদায়িক শক্তির সঙ্গে আপস করে চলার নীতি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের অবাধ প্রচার, ধর্মের অপব্যাখ্যা এবং সর্বোপরি অসাম্প্রদায়িক মূল্যবোধের অবক্ষয় দেশের মধ্যে যে সাম্প্রদায়িকতা ও সাম্প্রদায়িক মানসিকতার বিস্তার ঘটিয়েছে, তাতে কেউই দায়মুক্ত নয়।
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম
সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)।
সাম্প্রদায়িকতা কোনো ধর্মীয় মতবাদ নয়। একাত্তরের পরাজিত শক্তি সমাজে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়াচ্ছে। তাদের লক্ষ্য লুটের মাধ্যমে সংখ্যালঘুদের মালামাল হস্তগত করা, তাদের সম্পত্তি দখল করা। অবিলম্বে এই সাম্প্রদায়িক শক্তিকে কঠোর হস্তে দমন করতে হবে। বাংলাদেশ একটি অসাম্প্রদায়িক দেশ। এই দেশে যারা সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা করে, তাদের বাড়িঘর, সহায় সম্বল দখল করতে চায় তাদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। ধর্মকে ব্যবহার করা হয় বিভাজনের জন্য। এ ধরনের ব্যবহার রোধ করতে হবে। সরকারকে এ জন্য হার্ডলাইনে যেতে হবে।
সাম্প্রদায়িকতার বিষদাঁত ভাঙতে সরকার সম্ভাব্য সর্বাত্মক কঠোরতার পরিচয় দেবে
নাসির আহমেদ, কবি ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক।
যারা দেশপ্রেমিক এবং অসাম্প্রদায়িক মানবিক মূল্যবোধে বিশ্বাস করেন, নিজের ধর্মের মতো অন্যের ধর্মের প্রতিও শ্রদ্ধাশীল, তারা আর যা-ই হোক এই ধরনের সহিংস ধর্মান্ধতার উন্মাদনা সমর্থন করতে পারেন না। ফেসবুকে ছড়িয়ে দেয়া প্রচারণায় বিভ্রান্ত হয়ে কুমিল্লার পূজাম-পে হামলার ঘটনার পরবর্তী কয়েকদিন চট্টগ্রাম, লক্ষ্মীপুর-নোয়াখালী এবং রংপুরসহ বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘুদের বাড়িঘরে যেভাবে উগ্রবাদীরা হামলা চালিয়েছে, তা চরম দুঃখজনক বললেও সবটুকু বলা হয় না।
রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মের নামে এমন সন্ত্রাস এভাবে চলতে দেয়া যায় না। এ ধরনের সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস রুখে দেয়ার জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মীদের যে প্রস্তুতি এবং প্রতিরোধ থাকা দরকার ছিল, তা যথাযথভাবে ছিল কি না সে প্রশ্নও ইতিমধ্যেই উঠেছে। ঘটনা যেভাবেই ঘটুক, আর যারাই ঘটিয়ে থাকুক, নিশ্চয়ই এর হদিশ মিলবে। তবে তার জন্য প্রয়োজন হবে সরকারের সর্বোচ্চ মহলের যে আন্তরিক সদিচ্ছা সেই সদিচ্ছা বাস্তবায়নকারীদের নিষ্ঠা এবং সৎ প্রচেষ্টা। শান্তিপ্রিয় দেশবাসীর প্রত্যাশা সাম্প্রদায়িকতার বিষদাঁত ভেঙে দিতে সরকার সম্ভাব্য সর্বাত্মক কঠোরতার পরিচয় দেবে।
শান্তিপ্রিয় দেশবাসীর প্রত্যাশা সাম্প্রদায়িকতার বিষদাঁত ভেঙে দিতে সরকার সম্ভাব্য সর্বাত্মক কঠোরতার পরিচয় দেবে। দেশে আজ যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে তাতে হিন্দু সম্প্রদায়ের মনে এই আস্থার বোধ জাগিয়ে তুলতেই হবে যে, এদেশে তারা অসহায় নন। বাংলাদেশ তাদেরও মাতৃভূমি।
আসিফ নজরুল
শিক্ষক আইন বিভাগ, ঢাবি।
পৃথিবীতে সব দেশে সম্প্রদায় আছে। ধর্ম আর জাতি শুধু নয়; ক্ষমতা, বিত্ত এমনকি যৌনাভ্যাসের সম্প্রদায়ও রয়েছে। কিন্তু ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার মতো প্রকট, বোধশক্তি লোপকারী এবং নিষ্ঠুর আর কিছুই হয় না। কারণ, দুই দুনিয়ার স্টেক থাকে এখানে মানুষের মনোজগতে।
আমাদের এখানে সাম্প্রদায়িকতার ঘটনা ঘটলে আমরা তা দেখি সংকীর্ণ চোখে, সংকীর্ণ স্বার্থেও। আমরা কেউ ধর্মের দোষ খুঁজি, রাষ্ট্রের দোষ খুঁজি না, আমরা সংবিধানের কথা বলি, আইনের শাসনের কথা বলি না। আবার কেউ কেউ বৈষম্যের ভিকটিম হিসেবে শুধু ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের দেখি, কেউ শুধু মুসল্লিদের। আমরা কয়েক পর্বে (উসকানি, প্রতিক্রিয়া, পুলিশি হামলা আরও তীব্র প্রতিক্রিয়া) অপরাধ ঘটলে, পুরোটার বিচার না চেয়ে পছন্দমতো পর্বের বিচারের দাবি করি।
একটা দেশে সরকার থাকলে, সাম্প্রদায়িক ঘটনা রোখার মূল দায়িত্ব তার। এসব ঘটলে তা বিচার করার দায়িত্বও তার। যেদিন আমরা এসবের ঊর্ধ্বে উঠতে পারব, বিপদটা থামবে তখন।
প্রয়োজন সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ
প্রভাষ আমিন, সাংবাদিক, কলাম লেখক।
ইসলাম কিছুতেই মন্দিরে হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট সমর্থন করে না। এটা ভয়ংকর শাস্তিযোগ্য অপরাধ এবং কঠোর শাস্তির মতো পাপ। কুমিল্লার ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তির শাস্তি আমরা সবাই চাই। কিন্তু কুমিল্লার ঘটনায় পীরগঞ্জে আগুন, নোয়াখালীতে লুটাপাট হবে কেন
এ ধরনের ঘটনায় চেনা বাংলাদেশ মুহূর্তেই অচেনা হয়ে যায়। পারস্পরিক সন্দেহ, অবিশ্বাস, দোষারোপ চলতে থাকে। কিন্তু এসব কিছু নয়, প্রয়োজন সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ।
বেদনাদায়ক হলো-ইসলামের লেবাসধারী কিছু কাঠমোল্লা ধর্মের আসল চেতনাকে পাশ কাটিয়ে ঘৃণা ছড়ায়, বিদ্বেষ ছড়ায়; তাতে সহিংসতা আরও বাড়ে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ইসলাম তো নয়ই কোনো ধর্মই ভিন্নধর্মের মানুষের ওপর হামলাকে সমর্থন করে না। সাম্প্রতিক সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা ইসলাম ধর্মের অবমাননা, বাংলাদেশের মূল চেতনার ওপর আঘাত।
তৌহিদি জনতা’র নামে বারবার এই যে অমুসলিমদের ওপর শারীরিক আক্রমণ, পূজাম-প, উপাসনালয়, ঘরবাড়ি, ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানে হামলা-ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট চালানো হয়, তা কি ইসলাম সমর্থন করে? অবশ্যই করে না। এই যে অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়া, এটাই তাদের পরবর্তী অপরাধে সাহস সঞ্চয় করে।
সব মানুষের রাষ্ট্র নির্মাণের স্বপ্ন নিয়ে নয় মাসের যুদ্ধ, এক নদী রক্ত পেরিয়ে স্বাধীনতা-কিন্তু ৫০ বছরেও সেই কাক্সিক্ষত রাষ্ট্র পেলাম না। এ দেশে অতীতেও নানান সময় ধর্মীয় ইস্যুকে ঘোলা জলে মাছ শিকারের মতো রাজনীতি করার মোক্ষম হাতিয়ার করা হয়েছে, ভবিষ্যতেও হবে। ততদিন হবে যতদিন পর্যন্ত না মানুষ শিক্ষিত হওয়ার পাশাপাশি চিন্তা চেতনায়ও যৌক্তিক আচরণ করার মতো বোধ-বুদ্ধির অধিকারী হবে।
শক্তি আর অস্ত্র দিয়ে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জয়ী হওয়া যাবে না। মনের অন্ধকার দূর করাটাই সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে বড়ো হাতিয়ার। সম্প্রীতির ঐতিহ্য ও ধর্মের প্রকৃত বাণী ছড়িয়ে দিতে হবে। এমন শিক্ষা ও মননের চর্চা করতে হবে, যা মনের সংকীর্ণতাকে দূর করে। শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তন করে প্রকৃত শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে, যা মনের সংকীর্ণতাকে দূর করে এমন মানুষ তৈরি করবে, যার মধ্যে উগ্রতা, সাম্প্রদায়িকতা থাকবে না। আর এজন্য আনুষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি অনানুষ্ঠানিক উদ্যোগও গ্রহণ করতে হবে। সবার আগে ধর্মীয় সহিংসতাকারীদের চিহ্নিত করে কঠোর বিচারের আওতায় আনতে হবে। যা পরবর্তীতে দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
নাজিম উদ্দীন, বিশেষ প্রতিবেদক।





Users Today : 0
Views Today :
Total views : 184554
