ঢাকার রাস্তায় ‘পুলিশী হয়রানি’র প্রতিবাদ জানিয়ে শওকত আলী নামের এক ব্যক্তির ঢাকার বাড্ডা লিংক রোডে নিজের মোটর বাইকে আগুন ধরিয়ে দেয়ার ঘটনায় নগরীর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে আবারও আলোচনা হচ্ছে। নগরীতে অসহনীয় যানজটের কারণে রাইড শেয়ারিং অ্যাপে মোটর বাইকের ব্যবহার অনেক বেড়েছে। একদিকে রাস্তার পরিস্থিতি আরও বিশৃঙ্খল হয়ে উঠার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশের বিরুদ্ধে নানা রকম দুর্নীতি, অদক্ষতার অভিযোগ রয়েছে। যানবাহনের চালকদের অদক্ষতার এবং মানুষের আইন ভাঙার প্রবণতা তো আছেই।
সড়কে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির জন্য কোন কারণগুলো অগ্রগণ্য, এসব থেকে মুক্তির উপায়ই বা কী, বিশেষজ্ঞগণের মতামতের ভিত্তিতে আজেকর প্রচ্ছদ মপ্রতিবেদন।
মোড়ে মোড়ে বাইক
অফিস শুরুর সকালে কিংবা ছুটির সময় ঢাকার শাহবাগ কিংবা মিরপুর দশে গিয়ে দেখা যায়, এসব এলাকার সবকটি রাস্তার মুখেই রাইড শেয়ারিংয়ের অসংখ্য মোটর বাইক দাঁড়িয়ে আছে যাত্রীর অপেক্ষায়। অথচ রাস্তাগুলোতে তখন যানবাহনের ব্যাপক চাপে সৃষ্টি হয়েছে যানজট। এমন পরিস্থিতিতে রাইডিং শেয়ারের মোটর বাইক চালকের সঙ্গে কথা বলে যা জানতে পারি।
কামাল হোসেন, রাইড শেয়ারিংয়ের মোটরবাইক চালক
আমাদের বাইক রাখার কোনো স্ট্যান্ড নাই। আমরা যাত্রী নেব কোথা থেকে সেজন্য আমরা রাস্তায় দাঁড়িয়েছি। আমরা যখন রাস্তায় দাঁড়াই দেখা যায়, পুলিশ আইসা দৌড়ানি দেয়, কেউ পালায়া যাইতে পারে আবার কেউ যাইতে পারে না। তখন পুলিশ চাবি নিয়া কাগজপত্র চাইবে। আর কাগজপত্র দিলেই মেশিন টিইপা মামলা দিয়া ফালায়।
শুভ্র, রাইড শেয়ারিংয়ের মোটরবাইক চালক
আমাদের ধরলেই পুলিশ কাগজপত্র নিয়া আমাদের এক ঘণ্টা সময় নষ্ট করবে। কাগজপত্র চাইলেই বলবে মামলা দেবো। আর মামলা না দেয়ার অনুরোধ করলেই বলবে, পাঁচশো টাকা দেও-না হলে মামলা হবে। নানা ভোগান্তি হয়।
পুলিশের বিরুদ্ধে ঢালাও অভিযোগ ঠিক নয়
আনোয়ার কবির
ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা পুলিশ ইন্সপেক্টর।
পুলিশের বিরুদ্ধে ঢালাও অভিযোগ ঠিক নয়। বাইকসহ যানবাহনের চালকদের বিরুদ্ধে পাল্টা অভিযোগ করেন আইন অমান্য করার। বাস-ট্রাক এবং প্রাইভেট কার থেকে মোটর সাইকেল পর্যন্ত সব ধরনের গাড়ির চালকরা একটু অসচেতন। রাইড শেয়ারিংয়ের সাথে এখন যারা আছে, তারা কিন্তু আগে কোনো না কোনো পেশায় ছিল। যেকোনো কারণেই হোক তারা আগের পেশা ছেড়ে রাইড শেয়ারিংয়ে এসেছে। ফলে অদক্ষ চালক যেমন আছে, একইসাথে তারা অনেক সময় ট্রাফিক আইনকে আমান্য করে। তাদের ব্যাপারে আমরা যখন ব্যবস্থা নিতে যাই, তখনই এই অভিযোগগুলো আসে।
আইন ভেঙে উল্টোদিক দিয়ে যানবাহন চলার প্রবণতা বেড়েছে
ঢাকার অনেক রাস্তায় উল্টো দিক দিয়ে রিকশা চলার বিষয়টিই যেন এক ধরনের নিয়মে পরিণত হয়েছে। কারওয়ান বাজার মোড় থেকে পান্থপথের দিকে যাওয়ার রাস্তায় দেখা যায় তীব্র যানজটের মধ্যে একটি রিকশা উল্টোদিক থেকে আসতে গিয়ে সেখানে পরিস্থিতি আরও জটিল করে ফেলেছে। এমনটা ঢাকার অনেক জায়গাতেই দেখা যায়। ব্যস্ত রাস্তাগুলোতে বিভিন্ন সময়ই প্রাইভেট কারসহ যন্ত্র চালিত ছোটো অন্য যানবাহনেরও উল্টোপথে চলার চিত্র পাওয়া যায়। যানজট এড়িয়ে দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছাতে মোটর বাইক চালিয়ে দেয়ার ঘটনাতো অহরহ ঘটে থাকে।
সিগন্যাল না পড়লেও মানুষেরও চলন্ত গাড়ির সামনে দিয়ে দৌড়িয়ে রাস্তা পার হওয়ার দৃশ্য নতুন কিছু নয়।
একই সাথে অল্পগতি থেকে দ্রুত গতি যানবাহন একই রাস্তায় চলায় ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা কাজ করছে না
অন্বেষা এনাম, শিক্ষক, বুয়েট
রাস্তায় নিয়ম না মানার সংস্কৃতি যেমন তৈরি হয়েছে একই সাথে অল্পগতি থেকে দ্রুত গতির সব ধরনের যানবাহন একই রাস্তায় চলার কারণে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা কাজ করছে না। রাস্তাগুলোর ডিজাইন খুব সরল। এর মানে একই রাস্তায় রিকশা থেকে শুরু করে সব গাড়ি, বাস-সব ধরনের যানবাহন চলছে। সব চেয়ে বড়ো কথা হচ্ছে মানুষের নিয়ম ভাঙা প্রবণতা বেড়েছে। যানহানের চালকরাও ভাবে নিয়ম মেনে কী লাভ আর সমাজের অস্থিরতাও রাস্তায় প্রকাশ পাচ্ছে।
রাস্তা ব্যবহাকারীদের আইন অমান্যের প্রবণতা, অন্যদিকে পুলিশের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ; শুধু এই দুই পক্ষের আচরণই কী রাস্তায় বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির কারণ-এই প্রশ্ন বিশেষজ্ঞদের। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় যথাযথ পরিকল্পনা না নেয়ায় রাস্তায় পুলিশের হয়রানি এবং চালকদের নিয়ম না মানার প্রবণতা বেড়েই চলেছে বলে বিশেষজ্ঞগণ মত দিচ্ছেন। এ থেকে বেরতে চাইলে বড়ো ধরনের সংস্কার প্রয়োজন।
ব্যবস্থাপনায় বড়ো ধরনের সংস্কার ছাড়া রাস্তায় শৃঙ্খলা আসবে না
অধ্যাপক শামসুল আলম, শিক্ষক, বুয়েট।
ব্যবস্থাপনায় বড়ো ধরনের সংস্কার ছাড়া রাস্তায় শৃঙ্খলা আসবে না। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় বিজ্ঞানের কোনো ছোঁয়া নাই। আমাদের রাস্তার ধারণ ক্ষমতা কতটা আছে, কত সংখ্যক যানবাহন চলতে পারবে অথবা ভারি যানবাহন চালানোর মতো চালক আছে কিনা, এসব না দেখেই সব অনুমতি দেয়া হচ্ছে। যার ফলে সিস্টেমটা ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছে এবং এখানে অরাজকতা বা নৈরাজ্য এমন পর্যায়ে চলে গেছে, যা আর ম্যানেজ করা সম্ভব হচ্ছে না। আমার একটি গবেষণা থেকে দেখেছি, যানজটের জন্য গত কয়েক বছরে মানুষ মোটর বাইকের দিকে ঝুঁঁকেছে। এখন নগরীতে যানবাহনে ৫৬ শতাংশই মোটরসাইকেল। একারণে শুধু শাসন করে, চাপ দিয়ে বা বড়ো আইন করে রাস্তায় শৃঙ্খলা ফেরানো যাবে না। ঢাকার রাস্তাগুলোতে ডিজিটাল সিগন্যাল বসানো হয়েছিল ২০১৩ সালে। কিন্তু সেগুলো কোনো কাজে আসেনি। পুলিশ ম্যানুয়ালি সিগন্যাল নিয়ন্ত্রণ করছে। ঢাকার রাস্তার বাস্তবতা অনুযায়ী সেই উদ্যোগ ছিল না। সেকারণে তা ব্যর্থ হয়েছে।
মোহাম্মদ মুনিবুর রহমান
ট্রাফিক পুলিশের দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার।
ঢাকার রাস্তার চরিত্র পর্যবেক্ষণ করে ট্রাফিক সিগনালের ব্যবস্থা করা উচিত। ঢাকার রাস্তায় ট্রাফিকের চরিত্র একেক জায়গায় একেক রকম। গাড়ির ধরন একেক জায়গায় একেক রকম। কোথাও যন্ত্র ছাড়া আবার কোথাও যন্ত্র ছালিত গাড়ি চলে। ফলে এক অঞ্চলের স্যিগনাল সিস্টেম আরেক অঞ্চলে কাজ করবে না। সেজন্য ঐ পদ্ধতিটা ইউনিক ছিল না। এখন সমন্বয় করে রাস্তার চরিত্র বিশ্লেষণ করে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
রাস্তা বাড়ানো কোনো সমাধান নয়
ড. সারওয়ার জাহান
পরিচালক, পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট।

আমরা যেভাবে সমস্যার সমাধান করছি সেটা অনেকটা সরলীকরণের মতো। রাস্তা কম, রাস্তা বাড়াও। গাড়ি বেশি এসে গেছে, রাস্তা হবে। এ ধরনের সহজ ধারণা নিয়ে আমরা কিন্তু সমস্যার সমাধান করতে পারব না। কারণ হচ্ছে, একটি শহর একটি মানুষের মতোই বহমান। এর জন্ম হয়, বেড়ে ওঠে; অনেক শহর আছে যেগুলো মরেও গেছে। কাজেই শহরটা যখন বেড়ে ওঠে, তখন পরিকল্পনা নিতে হয়। তখন যদি ডিসপ্রপোরশনেট হয়ে যায় সঠিকভাবে কাজ করতে পারে না। অর্থাৎ শহরের লোকসংখ্যা বাড়লে সেই অনুপাতে রাস্তাঘাট বাড়াতে হবে, যানবাহন বাড়াতে হবে। প্রথম থেকেই যদি সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে না বাড়ে তাহলে শহরটা অকার্যকর হয়ে পড়বে। এ জন্য আমাদের একটি ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়ন দরকার। ঢাকার জনসংখ্যা বেড়েই চলেছে। সেই ক্ষেত্রে এখানকার যানজটের সমস্যা সমাধান কঠিনই বলা যায়।
আসলে রাস্তা বাড়ানো কোনো সমাধান নয়। এই ধারণা থেকে আমাদের বের হতে হবে। অপরিকল্পিতভাবে ভবন নির্মাণের কারণে বিভিন্ন এলাকায় জনবসতি বাড়তে থাকে। ওই এলাকার লোকজন গাড়ি নিয়ে বের হলে যানজট হবেই। বরং রাস্তার হায়ারারকি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রাইমারি রাস্তা খুবই কম। সেকেন্ডারি রাস্তা এবং এক্সেস রোড বেশি। বাসা থেকে বের হয়েই সবাই সেকেন্ডারি সড়কে উঠে পড়ে। এ কারণে সড়কে অনেক বেশি ‘ইন্টারসেকশন’ তৈরি হয়ে যাচ্ছে। এটা যানজটের বড়ো কারণ।
আরেকটি বিষয় হলো পুরো শহরের যানজট নিরসনের চেষ্টা করতে হবে। আমরা যদি একটি-দুটি রাস্তার যানজট কমানোর চেষ্টা করি, অন্য রাস্তাগুলোয় যানজট থেকে যায়, তাহলে সমস্যার সমাধান হবে না। কারণ কোথাও না কোথাও আমাকে জ্যামে আটকে থাকতে হবে।
বাসভিত্তিক গণপরিবহণ ব্যবস্থার উন্নয়ন করতে হবে
কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজ
শিক্ষক, দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউট (এআরআই)।

যানজটের প্রধান কারণ মূলত ইন্টারসেকশন। যে গাড়িগুলো বাঁ দিকে মোড় নেয় তারা কারো ক্ষতি করে না। যেগুলো সোজা যায় সেগুলো মাঝারি ধরনের ক্ষতি করে। কিন্তু যে গাড়িগুলো ডানে মোড় নেয় সেগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে। কেননা একটি গাড়ি ডান দিকে মোড় নিতে গেলে বাকি তিন দিকের গাড়িকে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। বাইরের অনেক দেশে একটি ডান দিকের মোড় ঘোরা এড়াতে বাঁ দিকে দুটি মোড় নিয়ে একটি গাড়ি গন্তব্যে পৌঁছে। এটা আমাদের দেশে সম্ভব নয়। আমাদের ঢাকা শহর এভাবে পরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠেনি। তা ছাড়া ডান দিকে মোড় নেওয়ার গাড়ি বেড়ে গেলে এটা দিয়ে সমস্যার সমাধান করা যায় না। ইন্টারসেকশনের এই প্রতিবন্ধকতা দূর করার একটি বড়ো উপায় হলো ফ্লাইওভার বা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে।
তবে এটিকে সাধারণভাবে বলা হয় একটি ‘প্রয়োজনীয় শত্রু’। কারণ হলো, যেখানে আমার প্রয়োজন হচ্ছে ফ্লাইওভার করা সেখানে করতে হবে। তবে এটা যত কম করা যায় ততই ভালো।
আরেকটি বিষয় হলো দীর্ঘ আকারের ফ্লাইওভার করা। আমাদের অনেক সময় বড়ো দূরত্ব পার করতে হয়। এখানে যে সমস্যাটি হলো, কোনো না কোনো জায়গায় এই গাড়িগুলো নামাতে হয়। নামাতে গেলেই একটি ইন্টারসেকশন লাগবে। কিন্তু সেই ইন্টারসেকশনের ব্যবস্থাপনা যদি যথাযথভাবে না করা হয়, এই যানজট ফ্লাইওভারের ওপর চলে আসবে। যে কারণে অনেক দেশ এখন ফ্লাইওভার ভেঙে ফেলছে। যানজট কমিয়ে আনতে বড়ো একটি প্রচেষ্টা হওয়া উচিত বাসভিত্তিক গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন করা, যাতে একসঙ্গে অনেক মানুষ এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতে পারে।
মুনিবুর রহমান, অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার
রাস্তা কম থাকা, পার্কিং সুবিধা না থাকাসহ সব সীমাবদ্ধতা বিবেচনা করেই পুলিশ রাস্তায় ব্যবস্থা নেয়। পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ এলে তাও তদন্ত করা হয়। আমরা যানবাহনের চালকদের আর্থিক বিষয়ও বিবেচনা করি ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষেত্রে। কারণ তারা বেশির ভাগই স্বচ্ছল নয়। ফলে উদ্দেশ্যমূলক অপরাধ না হলে বা গুরুতর না হলে তাদের শুধু সতর্ক করা হয়।
রাস্তায় গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা না থাকাসহ অব্যবস্থাপনার নানা অভিযোগ নিয়ে বিভিন্ন সময়ই আলোচনা হয়েছে।

আতিকুল ইসলাম, মেয়র, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন
ঢাকার বাসটার্মিনালগুলো সরিয়ে নিয়ে সেখানে নগরীর ভেতরের যানবাহনের জন্য ব্যবহারের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। মেট্রোরেল হলে সমস্যা থাকবে না। আর এলিভেটেট রেলের কাজ শুরু হয়েছে। এছাড়া নগরীর দুই সিটি করপোরেশন মিলে মহাখালির বাস টার্মিনাল সরিয়ে নিয়ে আব্দুল্লাহপুরে ৪০ একর জমি নেয়া হচ্ছে। গাবতলীর বাসটার্মিনাল সরানো হচ্ছে হেমায়েতপুরে। এগুলো হলে অনেক সুবিধা হবে।
তবে এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হবে কবে তার কোনো সুনির্দিষ্ট সময়সীমা কর্তৃপক্ষ বলতে পারেছেন না।
দেশের সবকিছু যখন ডিজিটাল হচ্ছে, বা অন্তত ডিজিটাল করার কথা বলা হচ্ছে, তখন অটোমেটিক ট্রাফিক সিগন্যাল তো দূরের কথা, ট্রাফিক পুলিশকেও রাস্তার মাঝখানে হাত-পা ছড়িয়েও গাড়ি থামাতে বেগ পেতে হচ্ছে। ঢাকার তুলনায় মানুষ কম হলেও অন্যান্য শহরেও কমবেশি এই চিত্রই দেখা যায়।
তবে দুই দিক থেকেই এই দুরবস্থার কারণ চিহ্নিত করতে হবে। প্রথমত পরিকল্পনার অভাব, যাচ্ছেতাইভাবে নগরায়ণ, দ্বিতীয়ত মনে মনে ইউরোপ-আমেরিকার জীবনমান প্রত্যাশা করলেও, রাস্তায় নেমে যতভাবে পারা যায় আইন ভঙ্গ করা।
বুয়েট’র এক গবেষণা বলছে, ১৯৫৯ সালের মাস্টারপ্ল্যানের ভিত্তিতে এ শহর গড়ে উঠলেও সঠিক নিয়ন্ত্রণ না থাকায় তা মানা হয়নি। বিক্ষিপ্তভাবে গড়ে ওঠা এই নগরীর ৭৩ শতাংশই অপরিকল্পিত বলে তথ্য দেয়া হয়েছে এই গবেষণায়। এর প্রভাব স্বভাবতই পড়ছে নাগরিক সেবার ওপর, যানচলাচল যার মধ্যে অন্যতম।
যানজট কমাতে ফ্লাইওভারের মতো দ্বিতল যানচলাচল ব্যবস্থা হাতে নেয়া হয়েছে। কিন্তু সেগুলোতেও রয়েছে নানা পরিকল্পনাহীনতার ছাপ। এর প্রকৃষ্ঠ উদাহরণ মহাখালী এবং বিজয় সরণি ফ্লাইওভার। একই রাস্তা থেকে উঠে, ট্রাফিক ডাইভার্শন ছাড়াই ঐ রাস্তাতেই নেমে যায়, এমন ফ্লাইওভারের উদাহরণ এখনকার পৃথিবীতে বিরল।
অপরদিকে বাংলাদেশের ট্রাফিক আইনকে শিথিল বললেও কম বলা হয়। মাঝে মাঝে মোড়ে মোড়ে সার্জেন্টকে দেখা গেলেও, তাদের কাজ মূলত লাইসেন্স পরীক্ষা করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কিছু কিছু ক্ষেত্রে রাস্তার ওপর পার্কিংয়ের জন্য জরিমানা করা হয় ঠিকই। কিন্তু উলটো পথে গাড়ি চলাচল, ট্রাফিক সিগন্যাল না মানা, পথচারীদের যেখানে সেখানে ইউটার্ন নেয়ার মতো বড়ো ধরনের আইনভঙ্গকেও কঠোর হাতে দমনে অনেক সময়ই শিথিলতা চোখে পড়ে। এজন্য আমাদের ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বাড়ানোরও জরুরি। জনবল এবং যন্ত্রপাতির সীমাবদ্ধতা, এবং ক্ষমতাধরদের রাস্তায় অবাধ চলাচলকে অধিকার মনে করা ট্রাফিক পুলিশকে করেছে আরো অসহায়।
দরকার সচেতনতা, মানসিকতার বদল
সিগন্যাল থাকুক বা নাই থাকুক, রাস্তা পেরোতে হবে, ওভারব্রিজ, আন্ডারপাস থাকলেও সেগুলোতে কোনোভাবেই চড়া যাবে না, নিজেকে ১ সেকেন্ড হলেও আগে যেতে হবে, তাতে অন্য কেউ মারা পড়লেও সমস্যা নেই। গাড়িতে থাকলে দোষ দিচ্ছি পথচারীকে, হাঁটার সময় গালমন্দ করছি গাড়ির চালককে। এ ধরনের মানসিকতার কারণেই আমরা পিছিয়ে আছি ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাতে। পরিকল্পনার অভাব থাকলেও চলাচল এতটা দুর্বিষহ হয়ত হতো না, যদি দেশের প্রচলিত ট্রাফিক আইন আমরা নিজেরা মেনে চলতাম, অন্যকেও উৎসাহিত করতাম। একই সাথে সরকারকে যেমন ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় দুর্নীতি দমনে ও আইন বাস্তবায়নে কঠোর হতে হবে, গবেষকদের এগিয়ে আসতে হবে অতিরিক্ত জনসংখ্যার দেশে নতুন উদ্ভাবনী চিন্তা নিয়ে, তেমনি নাগরিকদেরও সচেতনতার দিক দিয়ে অগ্রসর ভূমিকা রাখতে হবে। যত দিন যাচ্ছে তত কঠিন হয়ে উঠছে রাস্তার পরিস্থিতি, কেবল বড়ো বড়ো বক্তৃতা বা সেমিনার নয় ঢাকার যানজট নিরসনে কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে হবে। না-হয় একদিন আমাদের প্রিয় রাজধানী ঢাকা বসবাসের একোরেই অনুপযোগী হয়ে উঠবে।
নাজিম উদদীন, বিশেষ প্রতিবেদক।





Users Today : 11
Views Today : 12
Total views : 177263
