আমার মা-বাবা মেজো বোন মরিয়ম মুরমুর ধর্ষণ ও হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেখে যেতে পারেননি। দীর্ঘ ১০টি বছর অতিক্রান্ত হতে চলেছে কোথায়, কেন এবং কীসের দাপটে আদালত কর্তৃক ঘোষিত রায় কার্যকর থমকে রয়েছে! আমরা কখনও কখনও হতাশা, নির্বাক ও ক্ষুব্ধ হয়ে পড়ি। আমরা বিশ্বাস করি, মরিয়ম মুরমু বর্বরতম ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের রায় কার্যকর দৃষ্টান্ত আদিবাসী নারীদের ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের নজির স্থাপন করতে সমর্থ হবে; আশার আলো দেখাতে পারবে আদিবাসী নারীদের ধর্ষণ ও হত্যার বিচারের।
বৈশ্বিক মহামারির মধ্যেও আদিবাসীদের প্রতি বিশেষত নারীদের শ্লীলতাহানী, ধর্ষণ, হত্যার কোনো কমতি নেই। মানুষের মধ্যে মহামারি থেকে বাঁচার আত্মশুদ্ধিতা, আত্মোপলব্ধি, আত্মবিশ্লেষিত হওয়ার প্রবণতা একেবারেই অনুপস্থিত। অপরাধবোধ, পাপ ও অন্যায়বোধ মানব সভ্যতাকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যায়। বিশেষত ব্যভিচার, অনাচার, অচাজার সমাজে বৃদ্ধি পেতে থাকলে বৈশিষ্ট্যের আলোকে আমাদের বেঁচে থাকা একমাত্র স্রষ্টার কৃপায় হতে পারে। আইনের শাসনের দুর্বলতা সরাসরি স্পষ্টতর হয়ে যায়। ২০২০ খ্রিষ্টাব্দের আদিবাসী নারী ও কন্যা শিশুর প্রতি সহিংসতার চিত্র তুলে ধরেছে ‘আদিবাসী নারী ও কল্যাণ সংস্থা’। শুধুমাত্র রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের (জানুয়ারি-ডিসেম্বর, ২০২০ খ্রি) উপস্থাপিত চিত্রে দেখানো হয়েছে—

১৯ অক্টোবর, ২০২০ খ্রিষ্টাব্দে এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, বিগত এক মাসে অর্থাৎ সেপ্টেম্বর মাসে পার্বত্য চট্টগ্রামে ধর্ষণের শিকার হন আটজন আদিবাসী নারী। বাংলাদেশের মানবাধিকার সংস্থা ‘আইন ও সালিশ কেন্দ্র’র মতে ২০২০ খ্রিষ্টাব্দের প্রথম নয় মাসে ৯৭৫ জন নারী ও মেয়ে ধর্ষিত হয়েছিলো এবং ২৩৫ জন মহিলাকে তাদের স্বামী বা তার পরিবার হত্যা করেছে।
২০২১ খ্রিষ্টাব্দের এখন পর্যন্ত পত্রপত্রিকায় আদিবাসী নারী, কন্যা শিশুর ধর্ষণের সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে। ব্যাপক ধর্ষণ, হত্যা, নির্যাতন, শ্লীলতাহানীর ঘটনা ঘটছে যা অবশ্যই চিন্তনীয় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধুমাত্র জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে প্রায় ৮ জন আদিবাসী নারী ও শিশু বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার শিকার হয়েছে। এখনই অপরাধীদের আইনের আওতায় সোপর্দ করতে ব্যর্থ হলে আদিবাসী সমাজে বিপর্যয় এবং দেশের ভাবমূর্তি প্রশ্নের সম্মুখীন হতে বাধ্য! আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে প্রতিদিন গড়ে ৮৭টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে থাকে। ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দে মোট ৩২ হাজার ৩৩ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এ রিপোর্ট প্রকাশ করেছে ‘ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো’ বা এনসিআরবি। এই সরকারি সংস্থা ভারতের সব ধরণের অপরাধের হিসেব রাখে, সেই রিপোর্ট থেকে উঠে এসেছে ভারতে ধর্ষণ ও অপরাধের ভয়াবহ চিত্র। আমার দেশে এ বছরে প্রকাশিত আদিবাসী ধর্ষণ ও হত্যা, শ্লীলতাহানীর তথ্যাদি অগ্রসরমান পাঠকদের উদ্দেশ্যে পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত শিরোনাম ও তারিখ পর্যায়ক্রমে উল্লেখ করা হলো—
১. আটক ৩- আদিবাসী কিশোরীকে রাতভর সংঘবদ্ধ ধর্ষণ—০১.২.২০২১; কালের কণ্ঠ
২. ঘোড়াঘাটে আদিবাসী কিশোরীকে পালাক্রমে ধর্ষণ: গ্রেফতার ৩; গ্রামীণ নিউজ২৪; ০১.০২.২০২১
৩. বীরগঞ্জে ৮ম শ্রেণীর আদিবাসী ছাত্রীকে শ্লীলতাহানীর চেষ্টায় আটক- ২; আদিবাসী নিউজ ১৫.০২.২০২১
৪. রাজশাহীতে সাঁওতাল গৃহবধূর লাশ উদ্ধার—১৭.০২.২০২১; আদিবাসী নিউজ
৫. দিনাজপুরে সাঁওতাল নারীর মৃত্যু নিয়ে গঞ্জন—০২.০৩.২০২১; আদিবাসী নিউজ
৬. আদিবাসী কলেজ ছাত্রীকে ধর্ষণ, গণপিটুনিতে আহত শিক্ষক হাসপাতালে গ্রেফতার—২০.০৩.২০২১; কালের কণ্ঠ
৭. শেরপুরে আদিবাসী ধর্ষণের অভিযোগ যুবক গ্রেফতার—২০. ০৪. ২০২১; বাংলাদেশ প্রতিদিন
৮. পাঁচবিবিতে ওরাঁও নারীকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ—২০.০৪.২০২১; আদিবাসী নিউজ
৯. জীবননগরে ধর্ষণ (আদিবাসী) চেষ্টায় ৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা—২৭.০৫.২০২১; নয়া দিগন্ত
১০. আদিবাসী নারীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ—১২.০৬.২০২১; সময়নিউজটিভি
১১. কোচ নারী ধর্ষণের ঘটনায় গ্রেপ্তার ২, শাস্তির দাবিতে টাঙ্গাইলে মানববন্ধন—১৫.০৬.২০২১; দ্য ডেইলি স্টার
১২. শাহজাদপুরে আনসার সদস্যের বিরুদ্ধে আদিবাসী নারীকে ধর্ষণ চেষ্টার অভিযোগ— ২৪.০৬.২০২১; এমএন বাংলা
১৩. খাগড়াছড়ি বাস টার্মিনালে আদিবাসী কিশোরীকে বাসে তুলে ধর্ষণ, আটক-২; থকবিরিম বার্তা, ০৩.০৭.২০২১
মরিয়ম মুরমু আমার মেজ বোন। আজ থেকে ১০ বছর পূর্বে ২০১১ খ্রিষ্টাব্দের জুলাই ৯ তারিখ দিবাগত রাতে মি. যোহন মারান্ডী, শওকত ইকবাল, অমর কিস্কু ও আন্দ্রিয়াস মুরমু’রা আমার গ্রামের নিজস্ব বাসায় অনুপ্রবেশ করে প্রায় ষাটোর্ধ বয়স্ক বোনকে ধর্ষণ ও বাড়ির পার্শ্ববর্তী গাছে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা নিশ্চিত করেছে। বৃদ্ধ মা-বাবাকে দেখাশোনার দায়িত্ব নিয়েছিলেন বিধবা বোন মরিয়ম মুরমু। দু’সন্তানের জননী মরিয়ম পুত্র সন্তান উইলসন এবং কন্যা সন্তান কল্পনা মারান্ডীকে বিয়ে দেওয়ার পর মা-বাবার দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছিলো। বাবার বাড়িতে থাকাকালীন সময়ই পূর্ব শত্রুতার জের ধরে হত্যাকা- সংঘটিত হয়েছে বলে পুলিশের তথ্যে বেরিয়ে এসেছে। ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিতে যোহন মারান্ডী স্বীকার করেছে, ‘ঘটনার দিন রাতে তারা চুরির উদ্দেশে আদিবাসী নারী মরিয়ম মরিমু’র ঘরে ঢোকেন। প্রথম ওমর কিস্কু পেছন দিয়ে বাড়িতে ঢুকে দরজা খুলে দেন। তারা ঘরে ঢুকেই মরিয়মের মুখ চেপে ধরেন এবং বাড়ির পাশে নিয়ে যান। এ সময় যোহন ও ইকবাল তাকে ভয়ভীতি প্রদর্শন ও নির্যাতনের পর ধর্ষণ করে। এরপরে বড়ইগাছের সঙ্গে বেঁধে রেখে তাকে শাসায় এবং ঘরে কী কী আছে, জানতে চায়। আতঙ্কিত মরিয়মের কথা অনুযায়ী তারা আবার ঘরে গিয়ে আলমারিতে রাখা ১৬ হাজার টাকা চুরি করে এবং বাড়ির জিনিসপত্র তছনছ করে। যাওয়ার সময় তারা মরিয়মকে শ্বাসরোধ করে হত্যার পর গলায় ফাঁস দেওয়া অবস্থায় বিবস্ত্র করে গাছের সঙ্গে বেঁধে রেখেই পালিয়ে যান।’ এ ঘটনায় তার ছেলে উইলসন মারান্ডী বাদী হয়ে গোদাগাড়ী থানায় মামলা দায়ের করেন। পরবর্তীকালে আদালতে মামলা উত্থিত হলে বিজ্ঞ বিচারক মি. যোহন মারান্ডী, শওকত ইকবাল ও আন্দ্রিয়াস মুরমু’কে মৃত্যুদণ্ড এবং অমর কিস্কুকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেন। তৎকালীন সময়ে ঘৃণিত ঘটনাটি আদিবাসীদের মধ্যে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে কিন্তু আজও পর্যন্ত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি সরকার নিশ্চিত করতে পারেনি। আলোচিত ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডে রায় কার্যকারী হলে—
১. কেউ-ই আদিবাসী নারীদের প্রতি শ্লীলতাহানী, ধর্ষণ ও হত্যার মতো ঘটনা সংঘটিত করতে সাহসিত হবে না;
২. জাতিগত সংখ্যালঘু আদিবাসীরা নিজেদেরকে বিচার বিভাগের দৃষ্টিতে অপাঙক্তেয় মনে করবে না;
৩. স্থানীয় প্রশাসনের বিশেষ করে পুলিশ প্রশাসনের প্রতি আস্থা ও নির্ভরতার জায়গাটি ক্রমশই উন্নীত হবে;
৪. প্রতিবেশী বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর নারী-পুরুষ অচ্ছুৎ, পিছিয়েপড়া, অনগ্রসর কিংবা বুনো জাতি হিসেবে অবহেলা করার সাহস পাবে না;
৫. অন্যায়-অন্যায্য ও অপরাধের শাস্তি যে নিশ্চিত, সেটি ধর্মীয় দৃষ্টিতে হোক কিংবা আইনের দৃষ্টিতেও অপরাধী প্রাপ্তিযোগ্য;
৬. আদিবাসীরা সংবিধান ও আইনের প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধাবনত হবে;
৭. সর্বোপরি সরকারের প্রতি ভালোবাসা, সমর্থন ও সহযোগিতা প্রদানে উদ্বুদ্ধ হবে।
ধর্ষকের পরিচয় শুধু-ই কী ধষর্ক! একটি জীবন, একটি পরিবার, একটি সমাজ, একটি দেশকে কলঙ্কিত, ধ্বংস এবং উন্নয়নের সড়ক থেকে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। ধর্ষকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের প্রতিটি ডিপার্টমেন্টকেই উদ্যোগী হতে হবে। শাস্ত্রে প্রাপ্ত হই, ব্যভিচারের গুরুদণ্ডে ধ্বংসিত হয়েছিলো সদোমও ঘমোরা’র মতো প্রাচীন সভ্যতার শহর। স্রষ্টার নিকট সবচেয়ে ঘৃণিতের শীর্ষে রয়েছে ব্যভিচার বা নারীদের প্রতি অসম্মান প্রদর্শন।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলীয় নেত্রী, স্পিকার, সাংসদসহ অসংখ্য মা-বোনেরা রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে, আর্থ-সামাজিক প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার হিসেবে নারীরা দায়িত্ব পালন করছেন; সেদেশে গ্রাম-গ্রামান্তরের নারীরা এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হবে, এটি কখনোই কাম্য নয়; অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি! মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা’র দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলতে চাই, দয়া করে আদিবাসীসহ সকল নারীদের প্রতি মানসিক-শারীরিক নির্যাতনকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান নিশ্চিত করলে দেশ শাপমুক্ত হবে; শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে। স্রষ্টা আমাদের প্রত্যেককে আশির্বাদ করবেন।
মিথুশিলাক মুরমু : আদিবাসী অধিকার কর্মী, গবেষক ও লেখক।





Users Today : 13
Views Today : 15
Total views : 175519
