সাম্প্রতিকালে মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা ঢাকেশ্বরী মন্দির পরিদর্শন শেষে ধর্মানুরাগী হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, ‘‘নিরাপত্তা বাহিনীর বেষ্টনীর মধ্যে নয়, আমরা এমন একটি রাষ্ট্র চাই, যেখানে সবাই স্বাধীনভাবে নিজের ধর্ম পালন করতে পারবে।’’ প্রধান উপদেষ্টা মহোদয়, সত্যি কথাটিই বলেছেন, আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতিতে ধর্মীয় রীতি রেওয়াজ, আচার-অনুষ্ঠান পালন করা অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। ধর্ম বিশ্বাসের ব্যাপার যৌক্তিতার বিষয় নয়, কারো বিশ্বাসকে অবদমন করতে পারি না। কারো পছন্দ-অপছন্দের উপর ভিত্তি করে ধর্মীয় অনুশাসন পালন করা যায় না। পূজো-অর্চনা মান্য না করতে পারি কিন্তু পায়ে মাড়িয়ে যেতে পারি না। বিগত দশক থেকে দেখে আসছি, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান কিংবা আদিবাসীদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলোতে প্রশাসনের লোকদের সাদা পোশাক কিংবা পোশাকে উপস্থিতি দৃশ্যমান। সময়ের প্রেক্ষিতে আমরা একে-অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছি, পারস্পারিক অবিশ্বাস, শ্রদ্ধাবোধ এবং প্রতিবেশী ধর্মকে ভালোবাসার মনোভাব যেন দিন দিন উবে গেছে। ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির পাশাপাশি উগ্রবাদের প্রসারতা আমাদের উদারতাকে ছাপিয়ে গেছে। আমাদের সুকুমারবৃত্তিগুলো ক্ষয়ে ক্ষয়ে নিঃশেষিত প্রায় আর সম্প্রদায়িকতার রোপিত বীজ যেন উঁকি দিতে শুরু করেছে। যার জন্যে নিরাপত্তার অজুহাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সরব উপস্থিতি প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে। অতীতে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুরা স্বপ্ন দেখেছিলো—স্বাধীনভাবে সর্বত্রই চলাফেরা করবেন, ব্যবসায় ইনভেস্ট ও মনোনিবেশ, প্রজন্মদের দেশপ্রেম জাগ্রত এবং মুক্ত বাতাসে নিজ নিজ ধর্ম পালনের স্বাধীনতা। একে-অপরের ধর্মকে সম্মানিত করলে নিজে এবং রাষ্ট্রও সম্মানিতবোধ করে, বহির্বিশ্বের মর্যাদা উন্নীত হয়। একজন নাগরিক হিসেবে যোগ্য সম্মান প্রত্যাশা তো বাড়তি নয়, এটি সরকারের নিত্য নৈমিত্তিক কাজের অংশ। রাষ্ট্রের সব ধর্মকে সমান মর্যাদা ও অধিকার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি তো পবিত্র সংবিধানেই স্পষ্ট বিদ্যমান। রাষ্ট্র কর্তৃক কোনো ধর্মের ধর্মীয় পালনের স্বাধীনতা বিঘ্নিত করা অধিকারকে ক্ষুন্ন করে। স্বাধীনভাবে ধর্ম পালনের পরিবেশ সৃষ্টি করা সরকারের রাষ্ট্রীয় ও নৈতিক দায়িত্ব, এটিকে কখনোই অবজ্ঞার সুযোগ নেই।

ধর্ম পালনের স্বাধীনতা মানে গ্রামে হোক কিংবা শহরে কেউই বিগ্রহ ভাঙবে না, বিগ্রহের প্রতি বিরূপ মন্তব্য করবে না। মসজিদের আজানের প্রাক্কালে পূজোর ঢাক বাজবে না, এরূপ পারস্পারিক বোঝাপড়া থাকবে। আর এটি সম্ভবপর হয় কেবল সম্প্রীতিতে, ধর্মীয় উদারতায়, একে-অপরকে ভালোবাসায়। কেউ বড় গাছের গোড়ায় সিঁদুর-ধুপ দিয়ে পূজো করবে, সেটিও তার অধিকার। চার্চের জন্য ক্রয়কৃত জায়গায় চার্চ নির্মাণে বাধাগ্রস্ত করা ধর্মীয় অধিকারকে সংকুচিত করে তোলে। সংবিধান অনুযায়ী, ধর্ম বিশ্বাস গ্রহণের সুযোগ রয়েছে, যে কোনো নাগরিক তার পছন্দ মতো ধর্ম পালনের স্বাধীনতা রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে দেখা যাচ্ছে যে, যারা ধর্মীয় অনুশাসন পালনে উদ্যোগী হয়, আর তখনই বিপত্তি ঘটে। শারীরিক ও মানসিকভাবে অপদস্ত হতে হয়, মৃত্যু হুমকিতে তটস্ত হতে হয়। ধর্মীয় স্বাধীনতাকে আমরা যেন হাস্যকর করে না তুলি। কাগজে লেখা সংবিধানের প্রতিফলন হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করতে হয়।
বৈচিত্র্যময় বাংলাদেশে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর বৈচিত্র্যতা যেমন রয়েছে, ধর্মের ভিন্নতাও অভিসম্ভাবী। পূর্ব পুরুষেরা শত-সহস্র বছর থেকেই এ ভূখণ্ডে শান্তি, সম্প্রীতিতে, পারস্পারিক দায়িত্ববোধ থেকেই সামাজিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয় কিংবা অর্থনৈতিক প্রতিকূল পরিস্থিতিতে একে-অপরের পাশে থেকেছে। ধর্ম বিশ্বাসের আঁকরকে কেউই টোকা দেয়নি, বরং শ্রদ্ধা ও সম্মান করেছে। ধর্মের ভিন্নতা সামাজিক দায়বদ্ধতাকে উপেক্ষা করেনি। আর এটি সম্ভবপর হয়েছিলো, মানবতাবোধ, হৃদয়ের উদারতা, প্রতিবেশীর প্রতি ধর্মীয় নির্দেশতা থেকে। এতো ঐশ্বর্যময় ও সমৃদ্ধশালী ঐতিহ্য এবং সম্প্রীতির ধারাকে উগ্রবাদীদের দ্বারা ভুলুণ্ঠিত হবে, এটি কারোরই কাম্য নয়। আমরা ধারণ করেছি, ‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার’, ‘ধর্ম যার যার উৎসব সবার’। ১৬ সেপ্টেম্বর মন্দির পরিদর্শনে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, ‘আমরা সবাই একই পরিবারের সদস্য। পুরো জাতি একটি পরিবার। পরিবারের ভেতরে মতভেদ থাকতে পারে, ব্যবহারের পার্থক্য থাকতে পারে। কিন্তু পরিবার একটি অটুট জিনিস, এটাকে কেউ ভাঙতে পারবে না। আমরা যেন জাতি হিসেবে এই অটুট পরিবার হয়ে দাঁড়াতে পারি, সেটাই আমাদের লক্ষ্য।’ দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে ধর্মীয় সম্প্রীতির বন্ধনকে বিকশিত করতে সরকারকেই দায়িত্ব গ্রহণ করা আবশ্যিক।
একাবিংশ শতাব্দীতেও ধর্ম পালনের স্বাধীনতার নিশ্চিতকরণের জন্যে সরকার প্রধানকে সতর্কবাণী উচ্চারণ করতে হয়। এটি আমাদের দৈন্যতার বহিঃপ্রকাশ। হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান কিংবা আদিবাসীদের নিজস্ব ধর্ম পালনে প্রত্যেকেই রাষ্ট্রনায়ক, দেশের ঊর্ধ্বতন ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের এবং রাষ্ট্রের মঙ্গল কামনা করা হয়। রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিক যেন ধর্মীয় অধিকার নিয়ে বেঁচে থাকতে পারে, সেটি নিশ্চিতকরণের দায়িত্ব সরকারের। বাংলার বাউল কবি আব্দুল করিম লিখেছিলেন—
‘গ্রামের নওজোয়ান হিন্দু মুসলমান
মিলিয়া বাওলা গাান আর মুর্শিদী গাইতাম
আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম।’
এটিই হোক প্রতিটি নাগরিকের স্বপ্ন, প্রত্যাশা, দর্শন ও আকাঙ্ক্ষা।





Users Today : 13
Views Today : 15
Total views : 175519
