রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন আদিবাসী ছাত্রছাত্রী এবং বর্তমানে অধ্যয়নরত ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে পুনর্মিলনী অনুষ্ঠিত হতে চলেছে আজ মে ২৬, ২০২৩ খ্রিষ্টাব্দে। আদিবাসী স্টুডেন্টস্ এ্যাসোসিয়েশন অব রাজশাহী ইউনির্ভাসিটি’র (আসারু) উদ্যোগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে দিনব্যাপী আয়োজন করা হয়েছে গ্র্যান্ড রি-ইউনিয়ন। আশা করি, এ দিনে কয়েক শতাধিক আদিবাসী নারী-পুরুষ পৌঁছাবেন, যারা দীর্ঘ ৬/৭টি বছর বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ চত্বর মাড়িয়েছে; একটু হলেও স্মৃতিকাতর হয়ে উঠবেন। আসারুর বর্তমান সভাপতি সিলভেস্টার রুবেল মুরমু আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করছেন, রয়েছে উচ্ছ্বলতা ও সংস্কৃতি বৈচিত্র্যে ভরা অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা। নবীন-প্রবীণের সম্মিলনে বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙ্গিনা রঙিন হয়ে উঠবে; শিক্ষকদের ছোঁয়ায় ধন্য হয়ে উঠবেন এক সময়ের শিক্ষার্থীরা। অনেকের সাথে ফোনে কথা হয়েছে, কেউ যোগদানের রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করেছে, আবার কেউ কিছুই জানেন না। তবে হ্যাঁ, এটি একটি শুভ উদ্যোগ, ভুল-ভ্রান্তির মধ্যেই এগিয়ে যাওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় ও নতুন প্রজন্মের জন্যে দ্বার উন্মুক্তের সূচনা হতে পারে।
স্বাধীনতার পরবর্তী সময় থেকে এযাবৎকালের সমস্ত শিক্ষার্থীদের একত্র করে আদিবাসীদের কল্যাণকর ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণের উপযুক্ত প্ল্যাটফর্ম বিনির্মাণে আসারু’র প্রচেস্টা অবশ্যই প্রশংসনীয়। জেনেছি, অনেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস ছাড়ার পর আর দ্বিতীয়বার দেখা-সাক্ষাৎ হয়নি; দূর থেকেই কথাবার্তার বিনিময় হয়েছে কিন্তু স্বশরীরে আবার বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখার অপূর্ব অনুভূতি তাদের রোমাঞ্চিত করে তুলেছে। প্রাণের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেলে আসা দিনগুলো রোমন্থনের সুযোগ করে দেওয়ার জন্য অশেষ ধন্যবাদ আসারু’র কর্তৃপক্ষকে।

দেশের উত্তরবঙ্গের ঊষর ভূমিতে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। একদা সমগ্র উত্তরবঙ্গের শিক্ষার্থীরা উচ্চ শিক্ষা গ্রহণার্থে ভিড় জমাতেন রাজশাহীতে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, মেডিক্যাল কলেজ, শাহমুখদুম কলেজসহ অসংখ্য প্রাচীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এখানে রয়েছে। শিক্ষানগরী হিসেবে খ্যাত রাজশাহীতে পরবর্তীকালে গড়ে উঠেছে রুয়েট, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, পলিটেকনিক্যাল কলেজ, টিচার্স ট্রেনিং কলেজ অর্থাৎ বর্তমানে শিক্ষার যাবতীয় প্রতিষ্ঠান বিদ্যমান এই পদ্মার তীরের নগরীতে। শিক্ষা গ্রহণের লক্ষ্যেই আদিবাসী ছেলেমেয়েরাও পাড়ি জমিয়েছে রাজশাহীতে, সূদুর ঠাকুরগাঁও থেকে শুরু করে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার গহীন গ্রাম থেকেও। শিক্ষার দৌড়ে পিছিয়ে থেকেও সত্তর দশকেই পৌঁছিছে বিশ্ববিদ্যালয়ের দোর গোড়ায়। এ সময়কালে রাজশাহী জেলার একঝাঁক তরুণ বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢোকার জন্যে কড়া নাড়িয়েছে, তাদের মধ্যে ছিলেন সূর্য হেমব্রম, রবীন্দ্রনাথ টুডু, বিশ্বনাথ টুডু, জেমস সেলিম সরেন, ষ্টিফেন সরেন, গণেশ সরেন, বিমল বেসরাসহ অনেকে। রাজশাহী জেলাটি আদিবাসী অধ্যুষিত হওয়ায় শিক্ষিত মহল কম-বেশি আদিবাসীদের সম্পর্কে অবগত ছিলেন, বিশেষ করে সাগরাম মাজহী (এমএলএ) যিনি ১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দে নির্বাচিত হয়েছিলেন; তিনি সর্বমহলেই বেশ পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন। যতদূর জেনেছি, স্বর্গীয় সূর্য হেমব্রম তৎকালীন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রারকে নিজ মাতৃলয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন, এটি ছিল রাজশাহীর পশ্চিম দিকে গোদাগাড়ীর হলদিবোনা গ্রাম। উদ্দেশ্য পুকুরে বড়শি দিয়ে মাছ শিকার হলেও মূলত আদিবাসী সাঁওতালসহ অত্র অঞ্চলের বসবাসরত আদিবাসী পাহাড়িয়া, উরাঁওদের আর্থ-সামাজিক অবস্থা নিজ চোখে দৃশ্যায়ন। স্বর্গত সূর্য হেমব্রম সফল হয়েছিলেন, রেজিস্ট্রার আদিবাসীদের শিক্ষায় সুযোগ দেওয়ার পক্ষে পরবর্তীকালে সোচ্চার হয়েছিলেন। সূর্য হেমব্রম তাঁকে এটি বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন যে, আদিবাসীরা অনগ্রসর, পিছিয়েপড়া, অবহেলিত এবং প্রান্তিক। আদিবাসীদেরকে উচ্চ শিক্ষার্থে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ করে দিলে অবশ্যই শিক্ষার প্রতিযোগিতার দৌড় সমাপ্ত করতে সক্ষম হবে। বলেছিলেন ঠিক এরূপ—‘‘বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ দিন, পাশ করার দায়িত্ব আমাদের’’। এই বক্তব্যের প্রামাণ্য সমর্থন পেয়েছি বরীন্দ্রনাথ টুডু’র বক্তব্যেও। বরীন্দ্রনাথ টুডু সাগরপাড়াস্থ ‘ভোলানাথ বিশ্বেশ্বর হিন্দু একাডেমিতে শিক্ষকতার পাশাপাশি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হয়েছিলেন। উল্লেখ্য যে, রবীন্দ্রনাথ টুডুই ছিলেন সাগরাম মাজহী আদিবাসী ছাত্রাবাসের প্রথম ছাত্র। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ক্রমশই উত্তরবঙ্গের আদিবাসীদের জন্য উচ্চ শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করে দিলেন, বছরান্তে আদিবাসী সাঁওতাল, উরাঁও, মাহালী, মুণ্ডা কোল, মালো, পাহাড়িয়া, পাহান, ছেলেমেয়েদের আনাগোণা ও পড়াশোনার জোয়ার দেখা গেল।
খোঁজ করে জানার চেষ্টা করেছি, বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের প্রথম প্রকাশনা বেরিয়েছিল ‘আদিবাসী দর্পণ’ নামে ১৯৮৯ খ্রিষ্টাব্দে। সম্পাদনা করেছিলেন প্রয়াত সুরেন মুরমু, সহযোগী হিসেবে ছিলেন যোগেন্দ্রনাথ সরকার, যতীন মারাণ্ডী, ডেনিস চাতুর বাস্কে ও সুদর্শন সরকার। সম্পাদকীয়তে বাংলা ডিপার্টমেন্টের স্টুডেন্ট সুরেন মুরমু উল্লেখ করেছিলেন, “পরনির্ভরশীল হয়ে থাকার মানসিকতা কোনো জাতি বা সম্প্রদায়কে আত্মনির্ভরশীল হতে সাহায্য করে না বরং ক্রমশই দুর্বল করে দেয়। সংখ্যালঘু সম্প্রদায় হিসাবে আত্মনির্ভরশীল সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে হলে নিজেদের উপর নির্ভরশীল হতে হবে। আদিবাসী ছাত্রছাত্রীদের জ্ঞান-জিজ্ঞাসা, সাহিত্য-সংস্কৃতি, প্রতিভার বিকাশ সর্বোপরি আত্মনির্ভরশীল সমাজ প্রতিষ্ঠায় ‘আদিবসী দর্পণ’ চেতনা যোগাতে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পারবে বলে আমাদের বিশ্বাস।’ ২৬ পৃষ্ঠার স্মরণিকাটি অনেক দিক থেকেই গুরুত্ব বহন করে। তৎকালীন ছাত্রছাত্রীরা আদিবাসীদের নিরেট সত্য অবস্থা ও অবস্থান তুলে ধরেছেন। মাত্র কয়েক দশক পূর্বেও যে আদিবাসী সমাজে আদি কুসংস্কার, শিক্ষার প্রতি অনীহা, অর্থের যথেচ্ছা ব্যবহার করে শূন্যহস্ত হয়েছেন। বৃহত্তর সমাজের প্রতিবেশীরা আদিবাসীদের নিরক্ষরতা, সরলতায় মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। আসারু’র পাতাতে দেখা যায় সেই যুগোত্তীর্ণ আহ্বান, “জনসংখ্যার অনুপাতে শিক্ষার হার আমাদের অতি নগণ্য। উচ্চ শিক্ষার হার তো আরো দুঃখজনক। তথাপি দমে গেলে চলবে না। এই ‘শিক্ষা চেতনাবোধ’কে গোটা আদিবাসী সমাজে প্লাবিত করে দেখা উচিত। এ ব্যাপারে অভিভাবক মহল ও যুব সমাজকে হয়ে উঠতে হবে সক্রিয়।”
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য প্রথম পা দিয়েছিলাম ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দে। ১৯৯০-৯১ সেশনে সেবার প্রায় ৩০/৩৫ ছাত্রছাত্রী বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টে ভর্তি হয়েছিলাম। ভর্তির জন্যে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছিলেন তৎকালীন আসারু’র সভাপতি এস.সি এলবার্ট সরেন। আমরা তিনজন রাইমন হাঁসদা, হাবিল বাবু বিশ্বাস ও আমি রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হলাম। বাকিরা কেউ ইতিহাস, সমাজকল্যাণ, সমাজকর্ম, ম্যানেজমেন্ট, কেমেস্ট্রি ইত্যাদিতে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মতিহার চত্বরে অবস্থিত কেন্দ্রীয় ক্যাফেটরিয়াতে কতবার যে আসারু’র সভাতে উপস্থিত হয়েছি, হিসেবে নেই; তবে মনে আছে কয়েকবার এখানেই আসারু’র নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিগত ২০২১ খ্রিষ্টাব্দে আমার মেয়ে সুদীপ্তা পুন্নিনা’র ভর্তি পরীক্ষার জন্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছিলাম, সবকিছুতেই পরিবর্তন এসেছে—বিল্ডিং, ডিপার্টমেন্ট ভবন, পরিবেশ সবকিছুই; এ যেন অপরিচিত জায়গা। রাজশাহী আমার পিতৃভূমি হলেও কর্মসূত্রে রাজধানীতে অবস্থান করায় অনেকের সাথে সম্পর্কের ছেদ ঘটেছে কিন্তু বিচ্ছেদ নয়।
আসারু’র পুনর্মিলনী উদ্যোগ হয়ত আগামীর স্বপ্নের সারথী হবে। প্রথম প্রকাশনায় আসারু’র চেতনা ছিল—‘তোমাদের স্বপ্ন, তোমাদের কর্ম সফল হোক হে নবীন’। আদিবাসী শিক্ষার্থীদের স্বপ্নপূরণে আসারু’র প্রচেষ্টার অগ্রযাত্রা সফলতা কামনা করি। আদিবাসী দর্পণে প্রকাশিত গণেশ মাঝি’র ‘আমি আদিবাসী’ কবিতাটি আজো আমাকে উজ্জীবিত করে—
“আমি আদিবাসী ছেলে
তারা কতই কিনা বলে,
এ ধরণীর বুকে আছি
জীবন যুদ্ধের বলে।
পথের পাড়ে নদীর ধরে
যেখানে আমি যাই,
শুধুই তাদের কথার ছলে
গাল মন্দই পাই।
বলার কিছু থাকে না কথা
তাদের মাঝে যত,
হৃদয় ছিঁড়ে চোখের পাড়ে
বিধছে শত শত।
মানুষ নামের আদিবাসী
মানুষ নাহি কয়,
আত্মা তাদের তুচ্ছে ভরা
জ্যান্ত মানুষ নয়।
আদিবাসী আদি হয়েই
থাকতে আমি চাই,
এই কামনা করছি ইতি
ভেবে দেখো তাই।”
মিথুশিলাক মুরমু : গবেষক ও লেখক।





Users Today : 10
Views Today : 10
Total views : 177261
