নীরবে নিভৃতে কাঁদে গুণী মানুষের জন্ম-মৃত্যু। যাঁর জন্ম হয়েছিল ১৯২৫ সালের ৫ই মে, আর মৃত্যু ১লা জুলাই ১৯৮৯ সালে । পাবনা জেলার ঈশ্বরদী থানার লক্ষ্মীকুন্ডা ইউনিয়নের প্রত্যন্ত গ্রামে যাঁর জন্ম। শিক্ষা জীবনে হাতেখড়ি তাঁর জন্ম ভিটায় অর্থাৎ লক্ষ্মীকুন্ডা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। সেখান থেকে পাকুড়িয়া মাইনর ইংলিশ স্কুল যা বর্তমানে হয়তো পাকুড়িয়া স্কুল এন্ড কলেজে রূপ নিয়েছে। তারপরে বাংলাদেশ রেলওয়ের ঐতিহ্যবাহী সুনামধন্য স্কুল চন্দ্রপ্রভা বিদ্যাপীঠ পাকশীতে। এখান থেকে ১৯৪৫ সালে তিনি ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন। পরে সরকারি এডওয়ার্ড কলেজে, পরিশেষে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় এম এ। আমার জীবনের সৌভাগ্য হয়েছিল এই স্কুলে পড়ার যেখানে শুধু তাঁর মতো একজন লেখকই নয় উপমহাদেশের বরেণ্য কবি সদ্য প্রয়াত শঙ্খ ঘোষ এই স্কুলে পড়েছেন। গর্বে বুকটা ফুলে ওঠে। আবার তা চুপসে যায় যখন সেই সব সম্মানী গুণীজনগণ তাঁদের প্রাপ্য সম্মান থেকে বঞ্চিত হন। আমার বাড়িতে আমার জ্যেঠা মহাশয় অমল মজুমদারের কাছে আসতেন জন্য খুব কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল।
যাই হোক এই মানুষটা ছেলেবেলা থেকেই সমাজতান্ত্রিক রাজনীতির বিশ্বাসে বিশ্বাসী ছিলেন তাই তো ১৯৩৯ সালে মাত্র ১৪ বছর বয়সে কৃষক সম্মেলনে যোগ দেন ও বাম রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ১৯৪৮ সালে ভাষা আন্দোলনের সাথে যুক্ত হন ও কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য পদ লাভ করেন। তাঁর রাজনৈতিক জীবনে কয়েকবার জেল খেটেছেন, জেলের বাইরে ও ভেতরে অনেক অত্যাচারিত হয়েছেন যা তাঁর লেখনিতে প্রকাশ পেয়েছে। ১৯৫৩ সালে জেল থেকে বেরিয়ে তাঁর লেখা বইতে উল্লেখ করা ভাষ্যমতে বেরিয়ে এসেছে যে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের তা স্থায়ী হতে পারেননি তিনি। তবে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কমিউনিস্ট আদর্শের প্রতি আস্থা হারাননি। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রথম থেকেই পাকিস্তানী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ছিল তাঁর অবস্থান। বিভিন্ন লেখনীর মাধ্যমে ছদ্মনামে তিনি চালিয়ে গেছেন তাঁর সংগ্রাম। তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে কারা ভোগ করেছেন। বঙ্গবন্ধু তাঁকে জেলমিতা বলে ডাকতেন। এই মানুষটির সাথে ছিল কমরেড মুজাফফর আহমদ, জ্যোতি বসুর খুবই ঘনিষ্ঠতা।
আমাদেরকে লক্ষ্মীকুন্ডা ইউনিয়নবাসীর জন্য যে মানুষটি এত বড়ো সম্মান বইয়ে এনেছে আমরা কি তাঁর প্রতি কোনো কৃতজ্ঞতা দেখিয়েছি। বেঁচে থাকতে পারিনি। পারিনি তাঁর জন্মদিন স্মরণে রাখতে। ১ লা জুলাই তাঁর মৃত্যু দিবস কারো মনে থাকবে কিনা তাও জানি না। বর্তমান এক সময়ে সবার জীবনেই অতীত হবে আর ভবিষ্যতের রাস্তায় এগিয়ে দেবে। আজ তিনি অতীত কিন্তু বাস্তবতার নিরিখে ভবিষ্যতের রাস্তায় চলার জন্য কুসংস্কারের আঁধারের মধ্যে একটা অন্তত মোমবাতি জ্বালিয়ে আমাদের জন্য রেখে গেছেন তাঁর লেখনীর মধ্যে। আজ আমার কেন যেন মনে হচ্ছে, তাঁর এই ছোটো আলোয় আমরা আলোকিত হতে পারিনি। আর তিনি হলেন আমার খুব কাছ থেকে দেখা, শ্রদ্ধায় মাথা নত হয় এখনো যার সম্বন্ধে অন্যের সমালোচনা পড়ি সেই মজিবর রহমান বিশ্বাস / ভবঘুরে মজিবর/ মজিবর পাগল।
তাঁর ছদ্মনাম ভবঘুরে, এক সময় তাঁর জীবনে সত্য হয়ে দেখা দিয়েছিল এই নামটা। তাঁর জন্মভূমি লক্ষ্মীকুন্ডার কতজন তাঁকে আমরা ভালো করে জানি। কতজন তাঁর পরিচয় পরবর্তী প্রজন্মের কাছে রেখে যাচ্ছি। বুকে হাত দিয়ে বলি কতজন তাঁকে সম্মানিত করছি বা সম্মানের চোখে দেখছি। যাকে আমরা ভবঘুরে বা পাগল নামে চিনতাম তাঁর নিজের লেখা ও নিজের কষ্টার্জিত অর্থে প্রকাশিত বই প্রায় ৫৩ টা। বাকি আরো বই মৃত্যুর পরে প্রকাশিত হয়েছে। কয়টা বই সম্বন্ধে আমরা জানি? কবি, সাহিত্যিকরা সহজাতভাবেই আত্মভোলা হয়ে থাকেন। জগৎ তাঁকে আটকাতে পারে না। নিজের মানুষের শত কষ্টের কথা উঠে এসেছে তাঁর লেখনীতে। হয়ত ইচ্ছে পূরণ সবার এক হয় না। রসের যুগে তাঁর লেখায় হয়তো রস কম থাকতেই পারে। আবার পাঠক তো কে কোন রসে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলবে সেটা লেখকের ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য। বাস্তব তো বাস্তবতার নিরিখে চলে। তাঁর লেখায় বাস্তবতার নিরিখে পরিমার্জনহীন মনে করে একজন সমালোচক লিখেছেন পরিমার্জনহীন অকপট প্রকাশ ভঙ্গি হয়ত-বা তাঁর রচনাগুণ খাটো করেছে কখনো কখনো। তবুও সত্য প্রকাশে তিনি ছিলেন আকুণ্ঠচিত্ত।
আত্মাভোলা এই মানুষটি দাম্পত্য জীবনটাও স্থায়ী করতে পারেননি। অনেকের জীবনেই সেটা হয়েছে। শিক্ষকতাকেই তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ কিছু মনে করেছেন তাই নিজ জন্মস্থানের লক্ষ্মীকুন্ডা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তাঁর শিক্ষক কর্মজীবন শুরু করেন। এর পরে দাশুড়িয়া এম এস উচ্চ বিদ্যালয়, ষোলদাগ উচ্চ বিদ্যালয়, কামালপুর উচ্চ বিদ্যালয়, জুনিদগ উচ্চ বিদ্যালয়, জামতৈল ধোপাকান্দি বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়, বাঁশেরবাদা কলেজেও শিক্ষকতা করেছেন। যেখানেই যেতেন পাজামা-পাঞ্জাবী আর চটের বা কাপড়ের কবি ব্যাগ তাঁর কাঁধে থাকত। আর তার ভেতরে থাকত বই খাতা কলম। তিনি কোন স্থানেই নিজের পেশা আনন্দের সাথে করতে পারেননি কারণ কিছু শিক্ষক নামধারী অশিক্ষক আর ম্যানেজিং কমিটির অযাচিত নিয়ন্ত্রণ তাঁকে কষ্ট দিয়েছে বলে তিনি তাঁর লেখনীতে উল্লেখ করেছেন। শিক্ষক হিসাবে তাঁর গুণ গাইতে গিয়ে তাঁর গুণগ্রাহী একজন ছাত্র যিনি একাধারে কবি, লেখক, ভাষাবিদ ও বাংলাদেশ সরকারের একজন ঊর্ধ্বতন আমলা বলেছেন, স্যার যে দিন আমাদের এই স্কুলে এলেন, পরিচয় হওয়ার পরে মনে হলো ভিন্ন গ্রহের অধিবাসীদের একজন চিত্রকেতু আগন্তুক এলো নতুন নতুন বিষয় জানান দেওয়ার জন্য।
উশকো-খুশকো চুল দাড়ি আর বেশি পরিষ্কার নয় এমন পোশাক অনেকের জন্য সেদিন হাসির খোরাক হয়েছিল। অথচ যার অদ্ভুত ঐন্দ্রজালিক জীবন চিত্রে আমি মোহমুগ্ধ ও মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। অপার রহস্যে ভরা এই আত্মভোলা খাপছাড়া অগ্নি দীপক কবি ও লেখক তিনি। মানুষের জন্য যিনি স্বর্গ থেকে চুরি করেছিলেন আগুন সম মেধা। আর ঐ মেধা চুরির অপরাধে যিনি হয়েছিলেন অন্য অনেকের কাছে দণ্ডিত। তাঁকে পাগল বলেও অনেকে জানে অথচ তাঁর মেধার কাছে আমার মতো মানুষ এখনো নগণ্য। এমন দুর্লভ অতুল্য শিক্ষকের জন্য শত শত বছর অপেক্ষা করতে হয়। অথচ আমরা তাঁকে জানি না, চিনি না, তাঁর মেধার সম্মান জানাই না। গাঁয়ের ফকির ভিক্ষা পায় না এই উক্তিটি এখন যেন তাঁর ক্ষেত্রে মৃত্যুর পরেও প্রতিফলিত হচ্ছে।
যারা তাঁকে নিয়ে লিখেছেন , সমালোচনা করেছেন, এখনো তাঁর শিক্ষা লালন করছেন সবাইকে আমার প্রাণঢালা অভিনন্দন। আসুন আমরা সবাই আন্তরিকতার সাথে এই মহান মানুষটির জীবন স্মরণার্থে তাঁর জন্ম বা মৃত্যু দিবসে অন্তত কিছু একটা করি যা আমাদের বিশুদ্ধ দায়বদ্ধতা একটু হলেও শোধ করি।
অলোক মজুমদার : চিকিৎসক ও লেখক।





Users Today : 13
Views Today : 15
Total views : 175519
