বিগত ১৪ জুলাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী একনেক সভায় বলেছেন, ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জমি সুরক্ষায় উদ্যোগ নিতে হবে। মোটকথা ভূমি ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে হবে’ (ঢাকা ট্রিবিউন)। বিশ্বাস করি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের দেশত্যাগ, স্থানান্তরিত, হত্যা-ধর্ষণ ও শারীরিক-মানসিক নির্যাতনের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে সহায়-সম্পত্তিকেই চিহ্নিত করেছেন। অপরদিকে বেসরকারি সংস্থা কিংবা গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোও জমি-জিরাতের বিষয়টিকেই বার বার প্রধান কারণ হিসেবে উপস্থাপন করে চলেছেন। বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড এ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) এর প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি ব্যারিস্টার এম. আমীরু-উল ইসলাম স্বাক্ষরিত ২৯ আগস্ট ২০১৭ খ্রিষ্টাব্দে আইন বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী জনাব আনিসুল হক এমপি’র কাছে স্মারকলিপি প্রেরণ করেছিলেন। স্মারকলিপিতে একটি ইউনিয়নের ( রাজশাহী গোদাগাড়ী থানার গ্রোগ্রাম ইউনিয়ন) অভিজ্ঞতা উল্লেখ করে লিখেন, ‘…ভারত বিভাজন, পাক-ভারত যুদ্ধ, বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ ছাড়াও বিভিন্ন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় গ্রোগ্রামের আদিবাসীরা ১৯৪৭, ১৯৬৫, ১৯৭১ সালে এবং এমনকি মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে দেশ স্বাধীনের পরও রাজনৈতিক অস্থিরতা, নির্বাচনী সহিংসতায় ২০০১ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত কখনো স্বেচ্ছায়, কখনো ভয়-ভীতির কারণে জীবন বাঁচাতে নিজ জন্মভূমি ছেড়ে আদিবাসীরা নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। পরে অনুকূল পরিস্থিতিতে দেশে প্রত্যাবর্তণ করে তাঁরা আর ভিটে মাটি ফিরে পাননি। গোগ্রাম-এর পূজাতলায় বসবাসকারী ৭৫টি আদিবাসী পরিবারের মধ্যে ৭৫%ই ভূমিহীন অবস্থায় গোচারণে বসবাস করছেন। স্থানীয়দের ভাষ্য মতে, ১নং খতিয়ানের ৩১৬ নং দাগে মাত্র ৮২ বিঘা খাস জমি ‘গোচারণ’ হিসেবে পরিচিত। বর্তমানে এই জমিতে আদিবাসী ও বাঙ্গালী উভয় জাতিগোষ্ঠীর সদস্যরা বসবাস করলে আদিবাসীদের উচ্ছেদ করার লক্ষ্যে একটি দল সক্রিয় রয়েছে। অথচ, ১৯৫০ সালের আইন অনুযায়ী এই জমির মালিকানা আদিবাসীদের। আইন অনুযায়ী গোচারণের ৮২ বিঘাই স্থানীয় আদিবাসীদের নামে খাস বরাদ্দ করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও স্থানীয় প্রশাসন অজ্ঞাত কারণে ভূমিহীন আদিবাসীদের বরাবরে খাস জমি বণ্টন করছেন না। একইভাবে আমরা দিনাজপুর, রাজশাহী ও ময়মনসিংহ জেলা থেকে এ মর্মে তথ্য পেয়েছি যে, উক্ত জেলাসমূহে রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ত্ব আইন, ১৯৫০—এর (৯৭) ৮ ধারা মোতাবেক স্থানীয় প্রশাসন আদিবাসীদের জমি উদ্ধার ও প্রত্যপর্ণের বিষয়ে আবেদন পাওয়া সত্ত্বেও কোনো পদক্ষপ গ্রহণ করছেন না।’
আদিবাসী গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো আদিবাসীরা কী কী কারণে ভূমি হারাচ্ছে, তার একটি সম্ভাব্য তালিকা তৈরি করেছেন—
১. রাজনৈতিক পপুলেশন ট্রান্সফার এবং বাধ্যতামূলক দেশান্তরকরভূণ প্রক্রিয়া; এটি একটি হীন সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক হাতিয়ার। কাপ্তাই বাঁধ, ন্যাশনাল পার্ক ঘোষণা, ইকো-পার্ক ও নানা নিপীড়নমূলক কাজ এর আন্তর্ভূক্ত। সর্বশেষ মধুপুর বন উজাড় করে অআদিবাসীদের বনের জমি লীজ দেয়া। এভাবে অসংখ্য আদিবাসী গ্রাম, বসতি বিলুপ্ত হয়ে গেছে;
২. আদিবাসীদের কোনো মতামত বা সম্মতি ছাড়াই আদিবাসীদের ভূমিতে ও এলাকায় জাতীয় উদ্যান, ইকো-পার্ক নির্মাণ, সামাজিক বনায়ন প্রকল্প গ্রহণ;
৩. আদিবাসীদের ঐতিহ্যগতভাবে অধিকৃত, ব্যবহৃত ভূমিকে আদিবাসীদের না জানিয়েই রিজার্ভ ফরেস্ট ঘোষণা বা খাস করে দেয়া;
৪. উচ্ছেদ নোটিশ এবং শত শত মিথ্যা মামলা দিয়ে আদিবাসীদের হয়রানি ও শেষ করে দেয়া;
৫. শত্রু সম্পত্তি বা অর্পিত সম্পত্তি আইন;
৬. ভূমিলোভী চক্রের জাল-দলিল, জোরপূর্বক জমি দখল;
৭. সরকারি ভূমি অফিসের দুর্নীতি ও আদিবাসীদের সাথে প্রতিপক্ষমূলক আচরণ;
৮.ভূমি জরিপের সময় দুর্নীতি ও ঘুষ দিতে বাধ্য করা; ঘুষ না দিলে জমি খাস করে দেয়া;
৯. আইনের আশ্রয় না পাওয়া, এমনকি মামলায় জয়ী হলেও জমির দখল বুঝে না পাওয়া;
১০. বছরের পর বছর, এমনকি যুগের পর যুগ মামলা চালাতে গিয়ে আরও জমিজমা হারানো, নিঃস্ব ও সর্বশান্ত হওয়া।
প্রাপ্ত তথ্য মতে, ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের প্রায় ৯ হাজার ৫০৭ একর ভূমি জবরদখল করা হয়েছে। জায়গা-জমি, ভূমি ও অন্যান্য বিষয়কে কেন্দ্র করে বিগত বছর ১০৮টি হত্যাকা-, ১১১টি হত্যার হুমকি, ৮৮ জনকে হত্যা চেষ্টা, নির্যাতনে ৪৮৪ জন আহত, ৭৬ জনকে অপহরণ, ৪২ জনকে ধর্ষণ, ১৮ জনকে গণধর্ষণ, ২৬ জন নিখোঁজ, ১৪৮জনকে জোরপূর্বক ধর্মান্তকরণ, ৩৮৭টি বসবতাড়িতে হামলা, ৯২টি অগ্নিসংযোগ, ৪৩৪টি পরিবারকে বসতবাড়ি থেকে উচ্ছেদ, ৬৪১টি পরিবারকে দেশত্যাগের হুমকি, ৩৭৯টি পরিবারকে দেশত্যাগে বাধ্যকরণ। তবে হ্যাঁ, ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের উপরিউক্ত ঘটনায় দোষীদের চিহ্নিত করা হলেও কাউকেই শাস্তির আওতায় নেয়া যায়নি।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনি দেশের ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু, নৃগোষ্ঠীর অব্যক্ত মনোবাসনা হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করেছেন, স্রষ্টা আপনাকে সেই প্রজ্ঞা ও বিজ্ঞতা দিয়েছেন। এবার নিশ্চয়ই বিশ্বাস করতে পারি, সংখ্যালঘুদের জমি যারা দখল করে, যারা সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা করে, কোনোভাবেই তাদের ছাড় দেবেন না। জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতি-ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সবাইকে নিয়েই সোনার বাংলার স্বপ্ন দেখেছিলেন। জাতিগত বৈচিত্র্যময় বাংলাদেশকে বঙ্গবন্ধু অসাম্প্রদায়িক, সৌহার্দ্য ও ধর্মনিরপেক্ষতার বৈচিত্র্যের যে আলোকচ্ছটা দিয়েছিলেন, তা যেন কোনোক্রমেই বিবর্ণ না হয়। সংখ্যালঘুদের প্রতি রাষ্ট্রের আচরণ এমন যেন না হয়—তোরা দেশ ছেড়ে চলে যা। বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের সহচর্যের এবং আদর্শ লালন ও প্রতিষ্ঠার যে দৃঢ়তা আবশ্যিক; রাজনৈতিক ধ্যান ধারণা ক্রমশই সেটি ক্ষীণ হয়ে আসছে। রাজনৈতিক আকাশে কোনোক্রমেই কালো মেঘ জমতে দেবেন না। পবিত্র শাস্ত্রে বলা হয়েছে, ‘যে রাজা সত্যভাবে দীনহীনের বিচার করেন, তাঁহার সিংহাসন নিত্য স্থির থাকিবে’(হিতোপদেশ ২৯:১৪)।
● মিথুশিলাক মুরমু : আদিবাসী বিষয়ক গবেষক ও লেখক।





Users Today : 200
Views Today : 216
Total views : 177619
