সবাইকে বড় দিনের শুভেচ্ছা। শুভ বড়দিন। আসলে কেন এই বড় দিন। কার জন্যে এই বড়দিন। খাও দাও ফুর্তি করো এর জন্যেই কি এই বড়দিন, নাকি আমাদের মুক্তিদাতাকে এই পৃথিবীতে পাঠানোর জন্যে পিতার কাছে বিশ্বাসে ক্ষমা লাভের আনন্দে প্রার্থনা করার জন্য বড় দিন?
এই যে আগমনী বার্তা যুগ যুগ ধরে আমরা বিভিন্ন ধর্ম গ্রন্থে দেখতে পাই। আজ সেই আগমনী বার্তার পূর্ণতার দিন, সেই জন্যই বিশ্বাসীদের জন্য এই বড়দিন। আমাদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো ঈশ্বরের ক্ষমা লাভ করা। কেননা তাঁর ক্ষমার মধ্যে দিয়েই আমাদের জীবনে নেমে আসে অপরিসীম আশীর্বাদ। পবিত্র বাইবেল বলে, যে নম্র হয়ে প্রার্থনা করে, আমার মুখের অনুসন্ধান করে ও কুপথ হইত ফেরে, আমি তার কথা স্বর্গ থেকে শুনবো ও তার পাপ ক্ষমা করব ও তার দেশ আরোগ্য করব। আজ সেই কাক্সিক্ষত অন্বেষণের সফল দর্শনের দিন তা তো আমার কাছে আজ বড় দিন।
জীবনে এই অদৃশ্য সত্য বিশ্বাসের পর্যায়ে আসতে প্রত্যেকের জীবনেই অনেক বাধা পেরুতে হয়। মনের বাধা, পরিবারের বাধা, সামাজিক বাধা, রাষ্ট্রীয় বাধা। আবার জন্মগতভাবে পাওয়া ধর্মীয় বাধা। এত কিছু মোকাবেলা করে ঐ মুখ অন্বেষণের জন্য জাগতিকতা আমাদেরকে অনেক কষ্ট দেয় কিন্তুএখানেই পাই পূর্ণ আস্থা যখন দেখি যে সেই লেখা, “ধন্য সেই ব্যক্তি যে পরীক্ষা সহ্য করে, কেননা পরীক্ষা সিদ্ধ হলে সে জীবন মুকুট পাবে”।
সাধারণত দুটো জিনিস নিয়ে আমাদের চিন্তা চেতনা। জন্ম নিয়েছি এই পৃথিবীতে তাই এই পৃথিবীর সব কিছুর সাথে তাল মিলিয়ে আমৃত্যু কাটানো, আর মৃত্যুর পরেই স্বর্গে যাওয়া কিন্তু দুটো দুই রকম জায়গা। একটা হলো কাল্পনিক সত্য, আর একটা জাগতিক সত্য। কাল্পনিক সত্যের জায়গায় বাস করেন ঈশ্বর ,আর জাগতিক সত্যের জায়গায় আমাদের বাস করতে সুযোগ দান করেছেন তিনিই, যেন শত কাজের মধ্যেও তাঁর জন্য একটু সময় বের করে তাঁর এই দানের স্মরণে তাঁকে স্মরণ করি, প্রশংসা করি ও ধন্যবাদ জানাই। কেননা তিনি যেকোনো সময় তাঁর দান আমাদের কাছ থেকে কেড়ে নিতেই পারেন। এখানে আমাদের কোনই কর্তৃত্ব নেই।
এন্ড্রু কিশোর একটা গান গেয়েছিলেন, “হায় রে মানুষ রঙিন ফানুস রং ফুরালেই ঠুস”। যিনি লিখেছিলেন তিনি ঠিকই অনুভব করেছিলেন যে মানুষ শুধুই রং করা ফানুস। তাহলে আমরা কেন ঈশ্বরের কর্তৃত্ব স্বীকার করতে চাই না। আমরা যেন বেঁচে থেকেও আজ মৃত। সেই অদৃশ্য সত্যের সন্ধানে নিজের অবস্থান কোথায় লুকানো আছে। গীতে লেখা আছে, “মৃতরা সদাপ্রভুর প্রশংসা করে না, যারা নিঃশব্দ স্থানে আছে তারাও তাঁর প্রশংসা করে না”। তাহলে আমরা যারা সশব্দ স্থানে আছি তারাই কি তাঁর প্রার্থনা করছি। করলেও তা লোক দেখানো সংস্কৃতি নয় তো। নিজের কাজ আর নিজের প্রচারের জন্য নিজেকে নিয়ে এতই ব্যস্ত রয়েছি যে, কোনো কিছু ভাববার সময় কোথায় আমাদের। যিনি আমাকে তাঁর প্রচারের জন্য ও তাঁর প্রশংসা করার জন্য এই পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন, তার কতটুকু আমরা পালন করতে পারছি আমরা। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঠিকই বুঝেছিলেন সেটা, তাই তিনি লিখেছিলেন, “নিজেরে না যেন করি প্রচার আমার আপন কাজে”। তিনি জানতেন যে নিজেকে নিয়ে প্রচারের কিছু নেই। ধুলির তৈরি আমি এক সময় ধুলিতে মিশে যাবে। ছাই এক সময় ছাইয়ে মিশে মাটিতেই মিশে যাব। আমাদের কাজ শুধু কাল্পনিক সত্যের দিকে দুইহাত তুলে নিজের জীবন ও কর্মের সুজোগ দানেরজন্য ধন্যবাদ ও প্রশংসা করে যাওয়া।
খাও দাও ফুর্তি করো এর মধ্যে কিছুই নেই, যা আছে তা বাথরুম পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। আজ যীশু খ্রীষ্টের জন্মদিন। আচ্ছা তিনি যদি এই পৃথিবীতে না আসতেন। যদি বাইবেল বা অন্য কোনো ধর্ম গ্রন্থে তার আগমনী ভবিষ্যৎ বাণী না থাকত। যদি ঈশ্বরের ক্ষমার বাণীর পূর্ণতার জন্ম না হতো কোনোদিন তাহলে কি হতো আমাদের। যেমন লেখা আছে, “তখনকার লোকেরা মৃত্যু ছায়ার দেশে উপত্যকা দিয়ে গমনাগমন করত”। হয়ত সেখানে থাকতো নৈতিক অবক্ষয়, হতাশা, অশান্তি, আশা ভঙ্গ, বন্যা, মহামারি, দুর্নীতি, অত্যাচারসহ আরো অনেক কিছুই। যেখানে কোনো প্রত্যাশার আলো ছিল না আমাদের মৃত্যু পরবর্তী জীবনের জন্য। আর সেই সময়ে যীশুর আগমনের আনন্দের বারতা ঘোষণা করেছিলেন স্বর্গদূত। আর যারা বিশ্বাস করেছিলেন তারা সকলেই আনন্দে উল্লাসিত হয়েছিলেন। নেচে ছিলেন, গান করেছিলেন, একে অন্যকে ভালো বাসতে শিখেছিলেন, একে অন্যকে ক্ষমা করতে শিখেছিলেন, সবার মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধের সহানুভূতির প্রকাশ দেখা দিয়েছিল। আর সেখানে ছিল অপার শান্তি ।
মথি ১ : ২১ পদে লেখা আছে “আর তিনি (মরিয়ম) এক পুত্র প্রসব করবেন, আর তাহার নাম যীশু রাখবে”। আর এই কথাটা যীশুর জন্মের অনেক বছর আগেই যিশাইয় ভাববাদী লিখে গেছেন। যীশাইয় ৯ : ৬ পদ। সেখানে লেখা আছে, “কারণ একটি বালক আমাদের জন্য জন্মেয়ছেন, একটি পুত্র আমাদের দত্ত হয়েছে, আর তারই স্কন্ধের উপর কতৃত্ব ভার থাকবে। তার নাম হবে আশ্চর্য মন্ত্রী, বিক্রমশালী ঈশ্বর, সনাতন পিতা, শান্তিরাজ”। আবার যিশাইয় ১৪ : ২৪ পদে বলেছেন, ‘‘অবশ্যই আমি যেরূপ সংকল্প করেছি তদ্রূপ ঘটবে। আমি যে মন্ত্রণা করেছি তা স্থির থাকবে। সমস্ত পৃথিবীর বিষয়ে এই মন্ত্রণা স্থির হয়েছে। সমস্ত জাতির উপরে এই হস্ত বিস্তারিত আছে”। আজ সেই সন্তানের জন্মদিন। এটা শুধু কারো একার জন্যে নয়। সমস্ত পৃথিবীর সমস্ত মানুষের প্রতি ঈশ্বরের আহ্বান। আমাদের এখন কাজ হলো এই আহ্বানে শুধু বিশ্বাস করা। আজকের এই বড়দিনের আমার আহ্বান থাকবে, আমরা যেকোনো জাতি বা গোষ্ঠীর মানুষ হই না কেন শান্তির জন্য, পাপের মুক্তির জন্য তাঁর বিস্তারিত হাতের নীচে আসি। তাঁর বাক্যের কাছে এসে নিজেকে সমর্পণ করি। প্রভু আমাদের সকলকেই আর্শীবাদ দান করুন। আগামী নতুন বছর ২০২৩ সাল আমাদের সবার জীবনেই বয়ে আনুক ঈশ্বরের অফুরোন্ত আর্শীবাদ। সবাইকে নতুন বছরের শুভেচ্ছা।
ডা. অলোক মজুমদার : চিকিৎসক ও লেখক; বিশেষ প্রতিনিধি সাপ্তাহিক সময়ের বিবর্তন।





Users Today : 24
Views Today : 30
Total views : 175442
