রাজাদের রাজা, প্রভুদের প্রভু, দেবতাদের শ্রেষ্ঠ দেবতা এবং বাহিনীগণের সদাপ্রভুর জন্মদিন বড়দিন। প্রভু যীশুর জন্ম সম্পর্কে মহর্ষী যিশাইয় ঘোষণা করেছিলেন, ‘…তাঁহার নাম হইবে― আশ্চর্য্য মন্ত্রী, বিক্রমশালী ঈশ্বর, সনাতন পিতা, শান্তিরাজ।’ তাঁর জন্মে আকাশ-পাতাল-স্বর্গ আন্দোলিত হয়েছিলো। স্বর্গের দূত, মাঠের রাখাল, পূর্বদেশীয় পণ্ডিতগণ আনন্দিত হয়েছিলেন, নিরানন্দে আতঙ্কিত হয়ে উঠেছিলেন রাজ্যের রাজা হেরোদ। তাঁর জন্মের মধ্যে দিয়ে পৃথিবীতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল, নতুন আদর্শ ও ভাববাণীর পূর্ণতা সম্পন্ন হয়েছে। আর এজন্যেই প্রভু যীশু খ্রিষ্ট নিজেকে বিকশিত করেছেন, প্রকাশ করেছেন এবং নিজের আত্ম পরিচয় তুলে ধরেছেন―
১. আমি শারণের গোলাপ, উপত্যকার শোশন পুষ্প (পরমগীত ২:১);
২. আমিই উত্তম মেষপালক (যোহন ১১: ১১, ১৪);
৩. আমিই মেষদের দ্বার (যোহন ১০:৭, ৯);
৪. আমিই পুনরুত্থান ও জীবন (যোহন ১১:২৫);
৫. আমিই সেই জীবন খাদ্য (যোহন ৬:৩৫,৪৮);
৬. আমি প্রকৃত দ্রাক্ষালতা, আমাকে থাক (যোহন ১৫:১,৪);
৭. আমি পথ ও সত্য ও জীবন (যোহন ১৪:৬);
৮. আমি দায়ুদের মূল ও বংশ, উজ্জ্বল প্রভাতীয় নক্ষত্র (প্রকাশিত বাক্য ২২:১৬);
৯. আমি আলফা এবং ওমিগা, প্রথম ও শেষ, আদি এবং অন্ত (প্রকাশিত বাক্য ২২:১৩);
১০. আমিই যুগান্ত পর্যন্ত প্রতিদিন তোমাদের সঙ্গে সঙ্গে আছি (মথি ২৮:২০);
১১. আমি মহান রাজা (মালাখি ১:১৪);
১২. আমিই সদাপ্রভু ইহাই আমার নাম (যিশাইয় ৪২:৮);
১৩. আমিই তিনি, আমার পূর্বে কোনো ঈশ্বর নির্মিত হয় নাই এবং আমার পরেও হইবে না। আমি, আমিই সদাপ্রভু; আমি ভিন্ন আর ত্রাণকর্তা নাই। …আর আমিই ঈশ্বর (যিশাইয় ৪৩:১১-১২);
১৪. আমিই আদি, আমিই অন্ত, আমি ভিন্ন আর কোনো ঈশ্বর নাই (যিশাইয় ৪৪:৬);
১৫. আমিই ঈশ্বর, আর কেহ নয়, আমি ঈশ্বর, আমার তুল্য কেহ নাই (যিশাইয় ৪৬:৯);
১৬. আমিই সদাপ্রভু, আর কেহ নয়; আমি ব্যতীত অন্য ঈশ্বর নাই। আমি দীপ্তির রচনাকারী ও অন্ধকারের সৃষ্টিকর্তা, আমি শান্তির রচনাকারী ও অনিষ্টের সৃষ্টিকর্তা, আমি সদাপ্রভু এই সকলের সাধনকর্তা (যিশাইয় ৪৫:৫-৬);
১৭. আমি প্রথম ও শেষ ও জীবন্ত (প্রকাশিত বাক্য ১:১৭);
১৮. আমি মরিয়াছিলাম, আর দেখ আমি যুগ পর্যায়ের যুগে যুগে জীবন্ত; আর মৃত্যুর ও পাতালের চাবি আমার হস্তে আছে (প্রকাশিত বাক্য ১:১৮)
প্রভু যীশু খ্রিষ্ট একমাত্র ব্যক্তি যিনি পৃথিবীর মানুষকে অনন্ত জীবনের বাণী শুনিয়েছেন, স্বর্গীয় পিতার বাড়িতে বসবাসের সুযোগের কথা জানিয়েছেন। পৃথিবীর রাজারা দেশ জয় করেছেন, রাজ্যের পর রাজ্য করায়ত্ব করে প্রাধান্য বিস্তার করেছেন, রাজার ধর্মকে রাজ্যের ধর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন কিন্তু প্রভু যীশু খ্রিষ্ট প্রেমের বাণী, ভালোবাসার কথা এবং পরাক্রমী কাজ দেখিয়ে শান্তির রাজ্য প্রতিষ্ঠার অনুঘটক হয়েছেন। প্রভু যীশুর অহিংস পথ ধরেই মহাত্মা গান্ধী, মার্টিন লুথার কিং, নেলসন ম্যান্ডেলা বিশ্বনন্দিত হয়েছেন।
কৈসরিয়া-ফিলিপীয় অঞ্চলে শিষ্যদের শিক্ষা দেওয়ার প্রাক্কালে, তিনি তাদের জিজ্ঞাসা করলেন―মনুষ্যপুত্র কে, এ বিষয়ে লোকে কী বলে? শিষ্য শিমোন পিতর উত্তর দিয়ে বললেন― ক. আপনি সেই খ্রিষ্ট, জীবন্ত ঈশ্বরের পুত্র (মথি ১৬:১৬)। যীশু যোহন বাপ্তাইজকের নিকট উপস্থিত হয়েছেন যর্দন নদীর তীরে, সে সময় যোহন বাপ্তাইজক পবিত্র আত্মায় অভিষিক্ত হয়ে ঘোষণা করলেন― খ. ঐ দেখ ঈশ্বরেরর মেষশাবক যিনি জগতের পাপভার লইয়া যান (যোহন ১:২৯)। গ. কফরনহূমে যীশু বিশ্রামবারে সমাজগৃহে উপদেশ দিচ্ছিলেন, তখন অসুচি আত্মায় পাওয়া ব্যক্তির সাক্ষ্য― হে নাসরতীয় যীশু, আমি জানি আপনি কে, ঈশ্বরের সেই পবিত্র ব্যক্তি (মার্ক ১:২৫)। ঘ. যীশুর বিষয়ে শমরীয় নারীর কি সাক্ষ্য ছিল তা দেখি― মহাশয়, আমি দেখছি যে, আপনি ভাববাদী। আর সে আত্মায় উত্তপ্ত হয়ে নিজ নগরে গিয়ে লোকদের বলল, আসো, একজন মানুষকে দেখ, আমি যা কিছু করেছি, তিনি সকলই আমাকে বলে দিয়েছেন। তিনিই কি সেই খ্রিষ্ট নহেন? সেই শমরীয় নগরের শমরীয়েরা বলল, আমরা নিজেরা শুনেছি ও জানতে পেরেছি যে, ইনি সত্যই জগতের ত্রাণকর্তা (যোহন ৪:১৯,৪২)। ঙ. শিষ্য নথনিয়েল বলেছিলেন, আপনিই ঈশ্বরের পুত্র, আপনিই ইস্রায়েলের রাজা (যোহন ১:৪৯)। চ. লাসারের বোন মার্থার সাক্ষ্য ছিল, হ্যাঁ, প্রভু আমি বিশ্বাস করিয়াছি যে, আপনি সেই খ্রিষ্ট, ঈশ্বরের পুত্র (যোহন ১১:২৭)। আমরা সাধু পৌলের সম্পর্কে জানি, তিনি রূপান্তরিত শৌল থেকে পৌল। তিনি দম্মেশকে শিষ্যদের সঙ্গে সমাজ গৃহে গিয়া যীশুকে এই বলিয়া সাক্ষ্য দিতে লাগিলেন, তিনিই ঈশ্বরের পুত্র। তিনি দম্মেশক নিবাসী যিহুদীদিগকে প্রমাণ দিতে লাগিলেন যে, ইনিই সেই খ্রিষ্ট (প্রেরিত ৯: ২০,২২)।
প্রভু যীশু খ্রিষ্ট যে রাজাদের রাজা, মহান রাজা সেটি পবিত্র বাইবেলে প্রমাণিত হয়েছে। আমি, আমরা যদি খ্রিষ্টের অনুসারী হয়ে থাকি, তাহলে বিশ্বাস করতে হবে যে, আমাদের প্রভু যীশু খ্রিষ্ট তাঁর দ্বিতীয় আগমনের পর এই পৃথিবীর উপর রাজা হবেন। তাঁর রাজত্ব সম্পর্কে পবিত্র বাইবেলে পাওয়া যায়―
স্বর্গদূত গাব্রিয়েল― তিনি মহান হইবেন, আর তাঁহাকে পরাৎপরের পুত্র বলা যাইবে; আর প্রভু ঈশ্বর তাঁহার পিতা দায়ূদের সিংহাসন তাঁহাকে দিবেন; তিনি যাকোব কূলের উপরে যুগে যুগে রাজত্ব করিবেন, ও তাঁহার রাজ্যের শেষ হইবে না (লূক ১: ৩২-৩৩)।
যীশু― … কোনো দিব্যই করিও না…আর যিরূশালেমের দিব্য করিও না, কেননা তাহা মহান রাজার নগরী (মথি ৫:৩৪-৩৫)।
যিরমিয়― সদাপ্রভু বলেন, দেখ, এমন সময় আসছে, যে সময়ে আমি দায়ুদের বংশে এক ধার্মিক পল্লব উৎপন্ন করব; তিনি রাজা হয়ে রাজত্ব করবেন, বুদ্ধিপূর্বক চলবেন এবং দেশে ন্যায়বিচার ও ধার্মিকতার অনুষ্ঠান করবেন। তাঁর সময়ে যিহুদা পরিত্রাণ পাবে, ও ইস্রায়েল নির্ভয়ে বাস করবে, আর তিনি এই নামে আখ্যাত হবেন, ‘সদাপ্রভু আমাদের ধার্মিকতা’ (যিরমিয় ২৩:৫-৬)।
সখরিয়― আর সেদিন তাঁর চরণ সেই জৈতুন পর্বতের উপরে দাঁড়াবে…আর সদাপ্রভু সমস্ত দেশের উপরে রাজা হবেন; সেদিন সদাপ্রভু অদ্বিতীয় হবেন, এবং তাঁর নামও অদ্বিতীয় হবে (সখরিয় ১৪: ৪, ৯)।
পৌল― কেননা তিনি (ঈশ্বর) একটি দিন স্থির করেছেন, যে দিনে আপনার নিরূপিত ব্যক্তি দ্বারা ন্যায়ে জগৎ সংসারের বিচার করবেন; এই বিষয়ে সকলের বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ দিয়েছেন, ফলতঃ মৃতগণের মধ্য হতে তাঁকে উঠিয়েছেন (প্রেরিত ১৭: ৩১)।
মহান রাজার জন্মের সংবাদ সমাজের নিম্নস্তর থেকে রাজপ্রাসাদ পর্যন্ত পৃথিবী থেকে স্বর্গ পর্যন্ত পৌঁছেছিল। সমাজের অবহেলিতদের সারিতে জন্মিয়ে কুলীনদেরও আকৃষ্ট করেছেন, তাঁর আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়েই পৃথিবীর জ্ঞানী-গুণীরা খুঁজে পেয়েছেন সত্যিকার শান্তির মোক্ষম অধ্যায়। প্রভু যীশু খ্রিষ্ট শহরের বড়ো রাস্তায় লোকজনের ভিড়ের সঙ্গে চলাফেরা করতেন, লোকদের বাড়ি বাড়ি খেতেন, অসংখ্য লোকদের শিক্ষা দিতেন এবং আরোগ্য করতেন, শিশুদেরকে আনন্দ দিতেন। তাঁর প্রতিটি শিক্ষায় মানুষজন আশ্চার্যজ্ঞান করত। তাঁর পরাক্রমী শিক্ষার মধ্যে দিয়ে জনসাধারণের মধ্যে একটি পরিবর্তন, চেতনা, আদর্শ ও বিশ্বাসের জন্ম দিয়েছিলেন। অধ্যাপকেরা, শাস্ত্রজ্ঞরাও ধারণা করেছিলেন এই ব্যক্তি সাধারণ কোনো ব্যক্তি নন; সদ্দুকী-ফরিশীরা তাঁর কথায় হতজ্ঞান হতেন। তাঁর জ্ঞান ও বিচক্ষণতার কাছে পরাজিত হয়ে স্বীকার করেছেন সত্যিই তিনি অসাধারণ। তিনি যে শিক্ষা দিয়েছেন তা মানবজাতির জন্য, তিনি যে আদর্শ দেখিয়েছেন সেটি সমগ্র পৃথিবীর জন্যে এবং তিনি যে শান্তির পথের সূচনা করেছেন সেটি আমাদের অনুকরণীয়ের জন্যেই। তাই তো তিনি রাজা, তাই তো তিনি মন্ত্রী, পিতা ও ঈশ্বর। এ সম্পর্কে একটি চমৎকার গল্প রয়েছে― একজন রাজা চিন্তা করলেন, রাজ্যের নাগরিকরা সুখে-শান্তিতে কিংবা দুঃখ-বেদনায় রয়েছেন, সেটি দেখতে হবে। ছদ্মবেশী রাজা রাজ্যের সাধারণ প্রজাদের সাথে মেলামেশা করতেন, বিভিন্ন জায়গায় পরিদর্শন করতে যেতেন। এক সন্ধ্যায় তিনি একজন শ্রমিকের সঙ্গে কথা বলার জন্য থামলেন, যিনি একটা চুলার পরিচর্যা করছিলেন শ্রমিকটা ছিল সুখী; তাই সে তার স্ত্রী-পুত্র পরিবার সম্পর্কে খোলামেলা আলোচনা করে যাচ্ছিলেন, কারণ সে মনে করছিল যে তার পরিদর্শনকারী একজন সাধারণ দরিদ্র লোক এবং চুলাটা গরম হলে হয়তবা একটুখানি বিশ্রাম নেবে। পরদিন রাতে রাজা আবার এলেন এবং তার পরের দিন এবং তার পরের দিনও। রাতে এবং তারপরের দিনও। শ্রমিকটা তার প্রতি এতটা বন্ধুভাবাপন্ন ও সদয় হয়ে পড়ল যে, কিছুদিন পর তারা পরস্পর এত ভালো বন্ধু হলো যে, রাজা অবশেষে বলেই ফেললেন, আমি মনে করি যে এখন আমার কথাটা বলার সময় হয়েছে যে, আমি একজন দরিদ্র লোক এই যে কিনা শুধু তোমার গরম জায়গায় বিশ্রাম নিতে আসে অথবা তোমার আনন্দময় সাহচর্যেরই প্রত্যাশী। আমি তোমার ছদ্মবেশী রাজা। শ্রমিকটা এক কথায় সাংঘাতিক আশ্চর্য হয়ে গেল। এরপর রাজা আরো বললেন, এখন তুমি বুঝতে পেরেছো যে আমি কে? আমি মনে করি তোমার প্রতি উদারতা ও সাম্যতা দেখানোর জন্য আমার কাছে তোমার কোনো অনুরোধ আছে? কিন্তু শ্রমিকটা উত্তর দিল, না, না হুজুর আপনার কাছে আমার আর কিছু চাওয়ার নেই। আমার রাজা আমার কাছে বেড়াতে এসেছেন, কথা বলেছেন, আমার গরিবখানার ভাগ নিয়েছেন―এটাই সবচেয়ে মূল্যবান উপহার যা আপনি আমাকে দিতে পারেন। আপনার সঙ্গে আমার বন্ধুত্বের স্মৃতি চিরকাল আমার কাছে অম্লান হয়ে থাকবে।
প্রভু যীশু খ্রিষ্টের জন্মদিন বড়দিন আমাদের জীবনে নিয়ে আসুক অনাবিল আনন্দ, ভালোবাসা, সাম্য-সম্প্রীতি ও শান্তি-সৌহার্দ আর ক্ষমা। শুভ বড়দিন।
মিথুশিলাক মুরমু: আদিবাসী গবেষক, লেখক ও কলামিস্ট।





Users Today : 15
Views Today : 16
Total views : 175702
