সবাইকে শুভ বড়দিনের শুভেচ্ছা। জন্ম ও মৃত্যুর মাঝখানে সামান্য জীবনের সময়। আশা-আকাঙ্ক্ষা, সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা তাই তো এই সময়ের মধ্যেই প্রবাহিত। আশার কথা ভাবতে ভাবতে জীবনের বসন্তগুলো পার হয়ে যাচ্ছে। তবুও নিরাশ নই আমি। আসলেই নৈরাশ্যের কথা ভেবে ভেবে অযথা সময় নষ্ট করে কি লাভ। আমরা সবাই চাই উন্নত জীবনে বাস করতে। স্বপ্ন দেখি উন্নত জীবনের। মৃত্যুর পরে যাওয়ার সাধ স্বর্গে। আসলে প্রতিটা স্বপ্নই যুগের সাথে তাল মিলিয়ে ভিন্ন আকারে প্রবাহিত হতে থাকে আমাদের জীবনে। তাই তো কারো চোখেই সেটা পুরোপুরি অর্জন করা সম্ভব হয় না, তাই বলে তো নতুন করে স্বপ্ন রচনা করা বন্ধ থাকতে পারে না কারোরই। সামনের দিকে চলাও বন্ধ থাকতে পারে না আমাদের। একটা সমৃদ্ধ জীবনের আশায় পথ চলার যে স্বপ্ন সেটাও থেমে যেতে পারে না। তবে কোনো স্বপ্নের সমৃদ্ধ জীবন, অতি সহজেই ধরা দেয় না কারো কাছেই, আবার তার পরিপূর্ণতাও আসে না ছোট্ট এই জীবনে। পৃথিবী সৃষ্টির সময়ে তাঁর স্বপ্নের বীজ বুনেছিলেন ঈশ্বর। মানুষ নামের সেই বীজ বুনো জঙ্গলে পরিণত হয়ে তাঁর স্বপ্নকে ধুলিস্যাৎ করেছে অদৃশ্য শয়তান নামক আমাদের ভেতরের লোভ লালসার দ্বারা। ঠিক তেমনই স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার যে স্বপ্ন, তার বীজ অনেক বছর আগে রোপন করা হয়েছিল এই বাংলার মানুষের মনে। তার পরে ক্রমান্বয়ে তার পরিচর্যার ফলে চারা গজানো, গাছ হওয়া, আগাছা সরিয়ে সেই গাছেকে পরিপূর্ণভাবে তৈরি করা, তার পরে ফল পাওয়ার স্বপ্ন। সেই স্বপ্নের বাস্তবায়ন এই দেশে কোনো দিন হবে বলে আমার মনে হয় না। তবে আজ যেটা স্বাধীন বাংলাদেশ, যেখানে আমার জন্ম, যেটা নিয়ে আমি গর্ব করি, যেটার সুরক্ষার জন্য সর্বাত্মক চেষ্ট করি। তার মানে এটা নয় যে আমার আগে এই দেশ নিয়ে কেউই কোনো স্বপ্ন দেখেনি বা ভাবেনি কখনো।
আমার বুঝতে আসলে খুবই কষ্ট হয় যে, স্বর্গ, উন্নত যুগ, উন্নত দেশ বা উন্নত জীবন বলতে কী কী বুঝতে হবে আমাকে। মহান বা মহৎ বলতেই বা সত্যিকার অর্থে কী বুঝায়। তবে বর্তমানে অর্থ-সম্পদ খরচ করে ক্যামেরার সামনে নিজেকে দাঁড় করিয়ে প্রকাশ করা, না কি সুন্দর চেতনার আলো দিয়ে সমাজের সকল মানুষের জন্য স্বর্গীয় সুখের আলোকময় সমাজ গড়ে তোলার চেতনাকে লালন করা ও তা বিকশিত করা। সেটা ভাবি মাঝে মাঝেই। নিজেকে বিকশিত করতে কেউই ইতিহাসের সাঁকো কে লাফ দিয়ে পার হয়ে আসেনি। তাহলে প্রভু যীশু খ্রীষ্টকে তাহলে ক্রুশে জীবন দিতে হতো না। চেতনার আলো ক্রমান্বয়ে অন্ধকারকে সরিয়ে দিয়ে, তার চলার রাস্তাকে আলোকিত করেই চলেছে ধীর গতিতে। কারো জীবনের কোনো সময়ই যেমন সুসময় নয়, তেমনই দুঃসময়ও নয়। একজন লেখক, কবি, সাহিত্যিক, গীতিকার, যারা তাদের চেতনাগুলোকে লিখে রেখে গেছেন বা যাচ্ছেন, তারা তো সকল সময়ই সকল পরিস্থিতি অনুভব করতেন ও করেন। তাদের মধ্যে অনেকে সামনের সারিতে বা অনেকই পেছনের সারিতে থাকতেই পারেন। তাতে কি। কারো সাথে কি কারোর তুলনা হয় কখনো। সু-সময়ের আকাক্সক্ষা তাদের মনেও বাসা বেঁধেছিল বা বাঁধে কিন্তু পরিস্থিতি সেখানে চীনের মহা প্রাচীরের মতো ভাগ করে ফেলে আমাদের। তাই তো মাত্র ১২ জন প্রিয় শিষ্যের মধ্যেও যীশুকে মেরে ফেলার চক্রান্তে শয়তানের সাথে হাত মিলিয়েছিল একজন। আমরা তো সাধাণর মানুষ। আচ্ছা বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন কেন হয়েছিল। বৃটিশদের অত্যাচার আর নির্যাতন থেকে নিজেকে, সমাজকে ও দেশকে রক্ষা করার জন্যই তো। আবার তা হয়েছিল বলেই তো আমরা অনেক গুণী মানুষ, মেধাবী নেতা ও বড়ো বড়ো মনের মানুষগুলোর নাম ইতিহাসের পাতায় দেখতে পাই। আজও তারা বেঁচে আছে ও থাকবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ধরে। তাদেরও কোনো কোনো সময় সামনে, আবার পেছনে যেতে হয়েছিল পরিস্থিতিতে কিস্তু তাদের চেতনা থেকে তারা সরে যাননি কখনো। উত্থান ও পতনের মধ্যে দিয়েই সবাইকে সামনে চলতে হয়। এইভাবে চেতনার বিকাশের ফলে একদিন তার সফলতা আসে। নদীর এক কূল না ভাঙলে তো অন্য কূল গড়তে পারে না। আজ যেটা অনেক বড়ো ভেবে আকড়ে ধরছি, এক সময় সেটা যুগের প্রয়োজনে সবথেকে ছোটো হয়ে যাবে। ছোটোটাই হবে বড়ো। আগেও তাই হয়েছে, ভবিষ্যতেও হবে। নইলে যার কোনো দোষ খুঁজে পাওয়া যায়নি তাকে কেন মৃত্যুর কঠিন স্বাদ গ্রহণ করতে হলো। এটাই ইতিহাসের শিক্ষা।
ইতিহাস দেখলে দেখা যায় যে, আগেও ছিল ব্যাক্তিগত দখলদারিত্ব, ক্ষমতার অপব্যবহার। ধর্মীয় কুসংস্কার, আর তা এখনো আছে, আবার ভবিষ্যতেও থাকবে। তবে সেটার ভিন্নতা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রূপ ধরে এসেছে বা আসে। ইতিহাসের দেখায় অগের চেয়ে বোধ হয় ভালোই আছি। কেননা ইতিপূর্বে যে সকল যুদ্ধ ও মৃত্যুর মিছিল ছিল যেমন, হিরোশিমা, নাগাসাকিতে প্রায় আড়াই লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল, আবার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ৭/৮ কোটি মানুষ নাকি মারা গিয়েছিল। অনেক ধর্মযুদ্ধে অনেক মানুষ মারা গেছে। আর বর্তমানে কোনো প্রাকৃকিত বিপর্যয় বা যুদ্ধে এত মানুষ মারা যায় না। তবে এটা বিশ্বাস করি যে, যখন মানুষ হয়ে জন্ম নিয়েছি, তখন শত প্রতিকূলতার মধ্যে নিজেকে নিয়োজিত রেখেই সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। আমাদের শরীরের সকল অঙ্গের মুভমেন্ট যখন সামনে, তখন সমস্ত অস্তিত্বের লড়াই হবে সামনে যাওয়া কেন্দ্রীক। সত্যের পক্ষে। আর এটাই নিয়ম ও ইতিহাসের শিক্ষা। এত কিছুর পরেও অসহায়ত্বের চিন্তা মন থেকে বাদ দিতে পারি না। যখন আমরা আমাদের শিক্ষা খরচকে বিনিয়োগের সাথে তুলনা করি। রাজনীতিকে বিনিয়োগের সাথে তুলনা করি। ধর্মকে নিজের স্বার্থে বিনিয়োগে চেষ্টা করি। আমরা তো জানিই যে, কোনো বিনিয়োগ অর্থই হলো নিজেকে লাভবান করা। যদি এই লাভবান ব্যক্তিগত চেতনার মধ্যে আবৃত রাখি, তাহলে সেই শিক্ষা দিয়ে কি হবে। সেই রাজনীতি দিয়ে কি হবে। সেই ধর্ম দিয়েই বা কি হবে। আজ কত ছেলে-মেয়েই না উচ্চ শিক্ষা অর্জন করে নিজেকে কোনো কর্মের মধ্যে নিয়োজিত করতে পরেনি, আর তা হয়েছে হয়ত শিক্ষা শেষে ঘুষের টাকা জোগান দিতে না পারার জন্যে। কত শিক্ষিত জন আছে তারা কোনো গতি না পেয়ে আত্ম-কর্মশীলতার পথে গিয়ে মানবেতর জীবনযাপনে বাধ্য হয়েছে। আর রাজনৈতিক চিত্র তো বিপরিত। কে রাখে কার খবর। আজকের সমাজে একটা সন্তানকে সু-শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে, একটা মধ্যবিত্ত পরিবারের কি যে নাজেহাল ও কষ্ট করতে হয়, তা অনুভব করবে কে। দায়িত্ব কি রাষ্ট্রের উপর বর্তায় না। লজ্জা পাই, যখন দেখি চাকরি না পেয়ে দেশের একজন সুশিক্ষিত ছেলে তার সনদগুলো সব আগুনে পুড়িয়ে ফেলছে। আর অল্প শিক্ষিত বা স্বশিক্ষিত একজন কোনো দলের নেতা হয়ে, মুহূর্তের মধ্যে বাড়ি গাড়ির মালিক হতে দেখা যায়। তাই তো ভাবনা শেষ হয় না। প্রভু যীশু বলেছিলেন, যে শিয়ালের থাকবার জায়গা আছে কিন্তু মনুষ্যপুত্রের তা নেই। যিনি এই পৃথিবীর সকল কিছুর বিচারকর্তা হয়ে আসবেন তারই কিছু নেই অথচ আমরা কত কিছুর জন্য লালায়িত।আর কি আসবে কখনো আমাদের দেশে স্বাধীন সর্বজনবান্ধব প্রতিষ্ঠান বা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো বা প্রক্রিয়া। না কি ব্যক্তি কেন্দ্রীকতা পূর্ণ রূপেই চলতে থাকবে সেটাই বিষয়। কতই নামসর্বস্ব মেরুদ-হীন, নখদন্তহীন কমিশন আছে আমাদের দেশে। নির্বাচন কমিশন, মানবাধিকার কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, বিশ্ববিদ্যালয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংক, বিচার বিভাগ, আদালত। কোনটা আজ তার স্বাধীনতায় কাজ করে যেতে পারছে, সেটা অনুবীক্ষণ যন্ত্র দিযে খুঁজলেও তাদের নিরপেক্ষ কাজ পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ। তাহলে এদের নিজস্ব স্বত্তায় কি আর কুশি বেরোবে না। সজীব গাছ হয়ে তারা কি আর ফল দিতে পারবে না কখনো। আজ জবাবদিহির কোনো ব্যবস্থা না থাকার কারণেই তো কাঠামোগত এত পরিবর্তন হচ্ছে। আর এটার প্রতিফল তো সবাইকেই ভোগ করতেই হবে কোনো না কোনো সময়। শুধু সময়ের অপেক্ষা। দেখলাম নির্বাচন মাঠে একই দলের পোস্টার, একই দলের লোক, একই দলের মনোগ্রাম মেরে ঘুরছে। কারো মধ্যে কোনো আমেজ নেই। মাঠে খেলোয়াড় না থাকলে খেলা দেখাবে কাকে। মঞ্চের সামনে দর্শক না থাকলে কি অভিনেতার অভিনয়ে মন ভরে কখনো। সামনে আরেকটা নির্বাচনের জন্য অপেক্ষায় আছি। হয়ত সামনের দিনে প্রশ্ন করা বা বিশ্লেষণ করা বা মত প্রকাশের মানুষগুলো নিশ্চুপ অনুসারীতে বাধ্য হবে। হয়ত ভারত, চীন ,রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্র তাদের আধিপত্য বিস্তারের কৌশুলিক ছকে ফেলবে বাংলাদেশ নামক এই সুন্দর রাষ্ট্রকে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ঢাক ঢোল পেটানো মানুষগুলো এক সময় আর থাকবে না কিন্তু এই দেশের মানুষগুলোর জন্য তারা কি রেখে যাচ্ছে, কেমন বাংলাদেশ রেখে যাচ্ছে সেটা তাদের বিবেকের কাছে একটা প্রশ্ন করলেই সেই উত্তর তারা পেয়ে যাবে। আজ লোভে ও লাভে যারা তাল দিচ্ছে, তারা কি এর দায় থেকে কোনোদিন মুক্তি পাবে। কেমন যেন মনে হচ্ছে এই যুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষে বা বিপক্ষে নয়, এটা হচ্ছে কর্তৃত্বতন্ত্র ও গণতন্ত্রের মধ্যে। পবিত্র বাইবেলের ১২৭:১ পদে লেখা আছে, যদি সদা প্রভু গৃহ নির্মাণ না করেন, তবে নির্মাতারা বৃথাই পরিশ্রম করে। যদি সদা প্রভু নগর রক্ষা না করেন, রক্ষক বৃথাই জাগরণ করে। ঈশ্বর আমাদের সকলকেই আশীর্বাদ দান করুন। এই গৃহ হলো একটা মানুষ, একটা পরিবার, একটা সমাজ, একটা দেশ। আজকের এই বড়দিনে আমার বাসনা এই যে আমরা যেন সবাই ঈশ্বরের গড়া সেই দেশে বাস করতে পারি।
ডা. অলোক মজুমদার: চিকিৎসক ও লেখক;
বিশেষ প্রতিনিধি, সাপ্তাহিক সময়ের বিবর্তন।





Users Today : 15
Views Today : 17
Total views : 175703
