সপ্তাহের প্রথম দিন, সেই স্ত্রীলোকেরা খুব ভোরে ঐ সমাধিস্থলে এলেন। তাঁরা যে গন্ধদ্রব্য ও মসলা তৈরি করেছিলেন তা সঙ্গে আনলেন। তাঁরা দেখলেন সমাধিগুহার মুখ থেকে পাথর খানা একপাশে গড়িয়ে দেওয়া আছে; কিন্তু ভিতরে ঢুকে সেখানে প্রভু যীশুর দেহ দেখতে পেল না। তাঁরা তখন অবার বিস্ময়ে সেই কথা ভাবছেন, সেই সময় উজ্জ্বল পোশাক পরে দুজন ব্যক্তি হঠাৎ করে তাদের সামনে দাঁড়ালেন, ভয়ে তারা নিচু ও নতজানু হয়ে রইলেন। ঐ দুজন তাদের বললেন, তোমরা তাঁকে মৃতদের মাঝে খুঁজছ কেন? তিনি এখানে নেই তিনি পুনরুত্থিত হয়েছেন। তিনি যখন গালীলে ছিলেন তখন তোমাদের কী বলেছিলেন! মনে করে দেখ? তিনি বলেছিলেন, মানবপুত্রকে অবশ্যই পাপী মানুষদের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হবে; তাঁকে ক্রশবিদ্ধ হতে হবে; আর তিনদিনের দিন তিনি আবার মৃতদের থেকে জীবিত হয়ে উঠবেন। তখন যীশুর সব কথা তাদের মনে পড়ে গেল। তারপর তারা সমাধিগুহা থেকে ফিরে এসে সেই এগারোজন প্রেরিতদের ও তাঁর অনুগামীদের এই ঘটনার কথা জানালেন (লূক ২৪ : ১-১০) কারণ প্রভু যীশু পুনরুত্থিত হবেন তিনি তা পূর্বেই বলেছিলেন। তাঁর এই কথার পূর্ণতা পেল। প্রভু যীশুর জীবনে আর অনেক ঘটনার পূর্ণতা আমরা পাই—যেমন, ঈশ্বর প্রতিজ্ঞা করেছেন, স্ত্রীলোকের মধ্যে দিয়ে একজন ব্যক্তি আসবেন যিনি শয়তানের মস্তক পিষে দিবেন [তৌরত শরীফ (আদি) ৩ : ১৫]। তাহলে এখন প্রশ্ন! স্ত্রীলোকের মধ্যে দিয়ে এ পৃথিবীতে কে এসেছেন? প্রধান দুই ধর্মীয়গ্রন্থ বাইবেল ও কুরআন এক কথায় স্বীকার করে নেয় একমাত্র যীশু খ্রীষ্ট এই পৃথিবীতে পিতা ছাড়া মায়ের মধ্যে দিয়ে এসেছেন। এটা ঈশ্বরের অলৌকিক কাজ। পৃথিবীর ইতিহাসে এাঁই এক ও অদ্বিতীয়।
তারপর যদি আমরা দেখি তাহলে হয়রত মুসা নবীর মধ্যে দিয়ে ঈশ্বর বলেছেন, “তোমার ভাইদের থেকে তোমার মতো একজন দাঁড় করাব, যার কথায় তোমাদের চলতে হবে, তার মুখ দিয়ে আমি আমার কথা বলব, সে আমার বাধ্য থাকবে, তাঁর কথা যদি কেউ না শোনে তাকে দোষী বলে গণ্য করা হবে ” (তৌরত শরীফ, দ্বিতীয় বিবরণ ১৮ : ১৬-১৬) উক্ত পদ যদি আমরা বিশ্লেষণ করি তাহলে আমরা দেখি যে, কার মধ্যে দিয়ে ঈশ্বর তাঁর মুখের কথা বলেছেন? নিশ্চই যীশু খ্রীষ্টের মধ্যে দিয়ে।
ঐীশুর জন্মেও প্রায় ৭০০ বছর পূর্বে ঈশ্বর ইশাইয়া নবীর মধ্যে দিয়ে ভবিষদ্বাণী করেছিলেন খ্রীষ্ট একজন সতী অবিবাহীত কুমারীর গর্ভে জন্মীবেন তাঁর নাম রাখা হবে ইম্মানুয়েল (ইশাইয়া নবীর কিতাব ৭:২) আর সেই ভবিষ্যদ্বাণীর পূর্ণতা আমরা দেখতে পাই ( মথি ১ : ১৮-২৫) মিকাহ নবীর মধ্যে দিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, “এহুদিয়া দেশের বেথেলহেম এহুদিয়ার মধ্যে তুমি কোনোমতেই ছোটো নও, কারণ তোমার মধ্যে থেকেই এমন একজন শাসনকর্তা আসবেন, যিনি আমার ইসরাইল জাতিকে পরিচালনা করবেন এই ভবিষ্যদ্বাণীটি করেছিলেন ঈশ্বর মিকাহ নবীর মধ্যে দিয়ে মিকাহ ২ : ৫ আর এর পূর্ণতা আমরা দেখতে পাই (মথি ২ : ১)
যীশু এসেছিলেন তবে রাজা বেশে নয় দারিদ্রবেশে পাপীদের মুক্তি দিতে। প্রভু যীশুর জন্ম বা মৃত্যু কোনো ঐতিহাসিক পটভূমিতে লেখা নয় বরং আধ্যাত্মিক, যখন আমরা তাঁকে হৃদয়ে ধারণ করি তখন তিনি আমাদের জীবনে বাস্তব হয়ে উঠেন। যখন আমরা ভালোবেসে মানুষের মাঝে অকাতরে বিলিয়ে দেই তখন তিনি আমাদের হৃদয়ে জন্মগ্রহণ করেন।
প্রভু যীশু ক্রুশবিদ্ধ হয়ে মারা যাওয়ার তিনদিন পর পুনরুত্থিত হয়ে এই ধরাতে আবার আগমন করেন। যীশু খ্রীষ্টের এই পুনরাগমনের দিনটিকে খ্রীষ্ট বিশ্বাসীগণ ইস্টার সানডে হিসাবে পালন করে। বাংলাদেশে ইস্টার সানডে উপলক্ষে বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজন করেন খ্রীষ্টভক্তগণ। ইস্টার সানডে হলো ৪০ দিন উপবাসের শেষ দিন। গুড ফ্রাইডে পালনের পরই আসে ইস্টার সানডে। এ সময়ে উপবাসসহ প্রার্থনা করা হয়, কারণ এই দিনে সবকিছুর উপর বিজয় লাভ করে যীশু পুনরুত্থিত হয়েছেন।
রবিবার পবিত্র ইস্টার সানডে। এই দিনে দুই হাজার বছর পূর্বে যীশু খ্রীষ্ট সমাধি থেকে পুনরুত্থিত হয়েছিলে, পবিত্র বাইবেল মতে ঈশ্বরের দক্ষিণ পাশে বসে আছেন এবং শেষ বিচার করতে আসবেন। খ্রীষ্টের এই পুনরুত্থানের সংবাদ খ্রীষ্ট সমাজের জন্য খুবেই আনন্দের এবং তাৎপর্যপূর্ণ। এই দিনটি সকল খ্রীষ্ট-অনুসারীরা ইস্টার সানডে হিসাবে পালন করে। এই দিনটি সকল পাপীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তাদের স্বর্গে যেতে আর কোনো বাধা রইল না।

দিনটির তাৎপর্য
সাধু পৌল বলেন, হে আমার প্রিয় ভ্রাতৃগণ সুস্থির হও, নিশ্চল হও, প্রভুর কার্য সর্বদা উপচিয়া পড়ে, কেননা তোমরা জান যে,, প্রভুতে তোমাদের পরিশ্রম নিষ্ফল নয়” ( ১ম করি ১৫ : ৫৮)
আমাদের চলমান জীবনের গতিধারায় বারবার চলে আসে নানা পর্ব, নানা আচার-অনুষ্ঠান। ধর্মীয় অনেক পর্ব বা অনুষ্ঠান রয়েছে, তাদের মধ্যে যেমন ইস্টার সানডে পর্ব। যীশু খ্রীষ্টের পুনরুত্থাণের অন্যতম প্রমাণটি হচ্ছে তাঁর বিশ্বাসী ম-লীর খ্রীষ্টিয় সমাজের অস্তিত্ব। যীশুর পুনরুত্থান ব্যতিরেকে খ্রীষ্ট বিশ্বাসীর বিশ্বাস ও জীবন নিরর্থক ও প্রশ্নবোধক। খ্রীষ্ট যদি পুনরুত্থিত না হয়ে থাকেন তাহলে মিথ্যাই তোমাদের বিশ্বাস; তোমরা আজও তোমাদের সেই পাপী অবস্থাতেই পড়ে আছ! যীশুর পুনরুত্থান সকল পাপ ও মন্দতার ওপর সুনিশ্চিত বিজয়। যীশু খ্রীষ্টের পুনরুত্থান উৎসবের ঐকান্তিক কামনা হোক মৃত্যুঞ্জয়ী খ্রীষ্টের সাথে সমাধি থেকে উঠে পুনরুত্থিত জীবন শুরু করা। পুনরুত্থিত খ্রীষ্টের জ্যোতিতে উদ্ভাসিত হয়ে নতুন মানুষে রূপান্তরিত হওয়া।
খ্রীষ্ট আমাদের নিস্তার পর্বের মেষশাবক যিনি, তিনি কি বলিরূপে উৎসর্গকৃত হননি? সুতরাং এসো অমরা এই উদ্যাপন করি পুরোনো খামির দিয়ে নয়, ধৃষ্টতাও অধর্মের খামি নিয়ে নয় বরং আন্তরিকতা ও সত্যনিষ্ঠার খামি বিহীন রুটি নিয়ে ( ১ম করি ৭-৮ ) খ্রীষ্টিয় জীবন তো নেতিয়ে পড়া, ঝিমিয়ে পড়া জীবন নয় বরং অন্ধকারের পথ পরিহার কর আলোর পথে এগিয়ে চলা। মৃতদের মধ্যে থেকে খ্রীষ্ট যেমন পিতার মহিমাশক্তিতে পুনরুত্থিত হয়েছেন, তেমনি আমরাও যেন এক নব জীবনের পথে চলতে পারি; ( রোমীয় ৫ : ৩-৭) এই বাণীর বাস্তবায়নই প্রতিদিন আমাদের ব্যক্তি জীবনে পুনরুত্থান ঘটায়। যেখানে অন্যায়-অন্যায্যতা ও পাপ ঘটছে, সেখানেই যীশু ক্রুশবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। মৃত্যুর বাস্তবতা খুবই প্রকটভাবে অনুভূত হচ্ছে। দেশের মধ্যে চলমান প্রতিহিংসা, ধ্বংসযজ্ঞ, জীবন বিনাশ অত্যন্ত নির্মমভাবে মৃত্যুর সত্যতা ব্যক্ত করেছে। পুনরুত্থান আমাদের ক্ষমাশীল ব্যক্তি ও আলোকিত মানুষ হওয়ার প্রেরণা দান করে। কেননা প্রভু যীশু সব কিছুর উপর বিজয়ী হয়েছে, তাই আমরা ও বিজয়ী, পুনরুত্থানের বারতা তো স্বাধীন ও মুক্ত হওয়ার আহ্বান। কথা ও আচরণের ছুরি দিয়ে ভাই বোনদের আহত করব না। আলোর পথেই চলব। আমাদের জীবনে খ্রীষ্টের পুনরুত্থান কী আবেদন সৃষ্টি করে? এটাই আমাদের অনুধ্যানের বিষয়। পুনরুত্থানের চেতনা আমাদের প্রত্যাহিক জীবনে কর্মপ্রেরণা হয়ে উঠুক। পুনরুত্থান উৎসব পালনের মধ্যে দিয়ে সকলের হৃদয়-মনে মনে এই প্রতিজ্ঞা বদ্ধপরিপর হোক সমাজের কলুষতা দূরীভূত করে, দুর্নীতির সকল শৃঙ্খলা ভেঙে ঘটাবো শুভ শক্তির উদ্ভব কুরুচিপূর্ণ সাংস্কৃতিক অগ্রাসন বদ্ধ হোক। পুনরুত্থান আমাদের ক্ষমাশীল ব্যক্তি ও আলোকিত মানুষ হওয়ার প্রেরণা জাগাক। পৃথিবী হোক শান্তিময়।
নাহিদ বাবু : লেখক ও খ্রীষ্টিয় ধর্মতত্ত্ব বিষয়ে অধ্যয়নরত।





Users Today : 67
Views Today : 68
Total views : 177471
