……………………………………………………………………….
মতামত
ঢাকা মহানগরীকে আদিবাসী-অন্ত্যজ বান্ধবও করুন
মিথুশিলাক মুরমু
……………………………………………………………………….
রাজধানী ঢাকা, মায়াবী ঢাকা, জৌলুসের নগরী ঢাকা। ঢাকার ঐতিহ্য জগতজোড়া রয়েছে। উপমহাদেশে ঢাকার গুরুত্ব সব সময়ই ছিল এবং এখনও বিদ্যমান। দেশের হৃৎপিণ্ড ঢাকাতে চতুর্দিক থেকে শত-সহস্র লোক স্রোতের মতো করেই ধেয়ে আসে শিক্ষা, চিকিৎসা, চাকুরি, বহুধা লবিং কিংবা জীবনের চাকাকে সচল রাখতে। কারণ সমস্ত অফিস-আদালতের প্রধান অফিস ও কর্মকর্তাগণ রাজধানীকেন্দ্রিক করে তুলেছে। ঢাকার এই প্রবাসীদের সংখ্যা নেহাত কম নয়; অজস্র মানুষ আবার ঢাকাতে টিকতে না পেরে প্রত্যাবর্তনও করেছে। এই যাওয়া-আসার তালিকায় বিশেষ করে আদিবাসী-অন্ত্যজ শ্রেণীর মানুষের দশাগুলো একেবারে তলানীতে। ইতিমধ্যেই নব নির্বাচিত মেয়রদ্বয়ের নির্বাচনী ইশতেহার আমাদেরকে আশান্বিত করলেও চিন্তামুক্ত করতে পারেনি। দক্ষিণের মেয়র ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস এবং উত্তরের মেয়র আতিকুল ইসলামের ইশতেহারে বৈচিত্র্য থাকলেও মূলকথাগুলো প্রায়শই এক। ব্যারিষ্টার তাপসের ‘ঐতিহ্যের ঢাকা, সচল ঢাকা, সুন্দর ঢাকা, সুশাসিত ঢাকা এবং উন্নত ঢাকা’ শ্লোগান আমাদেরকে চমৎকৃত করেছে। অপরদিকে ৩৮টি ধারা সম্বলিত ইশতেহারও সত্যিই সম্ভাবনার দিকসমূহকে উম্মোচন করবে। আমাদের নগর পিতাদের আকাক্সক্ষা ও প্রত্যাশার পরীক্ষায় আদিবাসী ও অন্ত্যজ শ্রেণীর বিষয়টিও সংযুক্ত করার প্রয়াস পেয়েছি।
ন্যায় বিচারের নিশ্চয়তা—আর দশটি মানুষের মতো আদিবাসী ও অন্ত্যজ শ্রেণীর মানুষও ঢাকা অভিমুখে যাত্রা করে অর্থ উপার্জনের আশায়। নারী-পুরুষ, ছেলে-মেয়ে, পৌঢ়সহ কখনো কখনো; আর অনেক ক্ষেত্রেই পরিবার পরিজন ছাড়াই অপরিচিত জায়গায় উপস্থিত হন। খেয়ে না খেয়ে যদি পরিবারের জন্যে সামান্য অর্থ পাঠাতে পারে! কিন্তু আমরা লক্ষ করছি, ঢাকায় উপস্থিত হয়ে দালান-কোঠা নির্মাণ শ্রমিক, গার্মেন্টস্ শ্রমিক, বাসা বাড়িতে গার্ড, দারোয়ান, কাজের সাহায্যকারী হিসেবে যোগদানের পর বিভিন্নভাবে তাদের হয়রানির শিকার হতে হয়। অনেক অভিযোগ শ্রবণ করেছি, টাকা পরিশোধ না করেই অনেককে চোখের জল ফেলতে ফেলতে অন্যত্র অপেক্ষাকৃত ভালো জায়গায় কাজের প্রত্যাশায় রাজধানীর রাস্তাতে নেমেছে। একজন প্রবাসী আদিবাসী-অন্ত্যজ মানুষের পক্ষে রুখে দাঁড়ানো, ন্যায় বিচারের জন্য সোচ্চার হওয়া খুবই দুরূহ কাজ। সত্যিই লক্ষ-কোটি মানুষের মহানগরের কোলাহলে এদের কথা শোনার মানুষের বড়োই অভাব। নারী শ্রমিকদের জন্য বিষয়গুলো খুবই কষ্টজনক। আদিবাসী-অন্ত্যজ নারীদের শারীরিক শ্লীলতাহানী এবং ধর্ষণ ঘটনার বিচার প্রাপ্তির আশা আমাদের বাকরুদ্ধ করে। কুড়িল ফ্লাইওভারে আদিবাসী নারীর ধর্ষণের পরবর্তীতে নিস্তব্ধতা পরিস্থিতি এবং বিচারহীনতা আমাদেরকে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগায়। সংখ্যাধিক্য আদিবাসী মেয়েরা বিউটি পার্লারে কর্মরত রয়েছেন। তাদের নিয়ে বিগত কয়েক বছরে পরামর্শ সভা করে যেটি উপলব্ধি করেছি, আমাদের মেয়ের একান্ত যখন সহ্য ক্ষমতার বাইরে চলে যায়; সে সময়গুলোতে তাদের অসুবিধা, অসম্মান কিংবা ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য সহযোগিতার প্রত্যাশা করে।
ঢাকা মহানগরীতে বোধকরি নটরডেম কলেজ, হলিক্রস কলেজ, মার্টিন লুথার কলেজ ছাড়া অন্য কলেজগুলোতে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের সাথে মেলামেশার সুযোগ খুবই কম। সরকারি-বেসরকারি প্রাথমিক-মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কলেজ ও সম পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানগুলোতে ঢাকায় প্রবাসী আদিবাসী-অন্ত্যজ শ্রেণীর ছেলেমেয়েরা লেখাপড়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত থাকে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে আদিবাসী-অন্ত্যজ শ্রেণীর জন্য বিশেষ কোটা ব্যবস্থা থাকলেও প্রাথমিক পর্যায়ে একেবারেই নেই। আমরা বিশ্বাস করি—‘সঙ্গ দোষে লোহা ভাসে’। উচ্চ শ্রেণীর ছেলেমেয়েদের সাথে এইসব আদিবাসী-অন্ত্যজ শ্রেণীর ছেলেমেয়েদের সংস্পর্শ, যোগাযোগ, কথাবার্তা এবং পড়াশোনার আদান-প্রদান; তাদেরকেও চিন্তা-চেতনায়-ভাবনায় উন্নত করবে। সেটি ময়মনসিংহের কলসিঁদুর ও বান্দরবানের আদিবাসী ফুটবলার মেয়েদের মতো, রাজশাহীর এ্যাথেলেটিক—শেফালী সরেন, সিলেটের কিংবদন্তি হকি খেলোয়াড় জুম্মন লুসাই, রাঙ্গামাটির ফুটবলার বিপ্লব মারমা কিংবা ঢাকা জজ কোটে প্রথম সাঁওতাল অ্যাডভোকেট প্রভাত টুডুর মতো। আমাদের সন্তানেরা স্কুল-কলেজে পরিচয় দিতে গিয়ে সহপাঠিরা অবিশ্বাসের প্রশ্ন ছুঁড়ে থাকে। সত্যিই তো শিক্ষার্থীরা দেশের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী সম্পর্কেও তেমন ওয়াকিবহাল হওয়ার সুযোগ পান না! আদিবাসী-অন্ত্যজ শ্রেণীর জন্য বিশেষ সুযোগ প্রদান করলে বৈচিত্র্যের সৌন্দর্য যেমন বাড়ে, তেমনিই প্রতিভা বিকাশের অপূর্ব সম্ভাবনার দ্বার উম্মোচিত হয়।
গ্রাম-গ্রামান্তর থেকে আসা আদিবাসী-অন্ত্যজ শ্রেণীর লোকেরা ঢাকায় উপাসনা, পূজা-পার্বণের সুযোগের প্রত্যাশা করে। বিশেষ করে খ্রিষ্ট ধর্মে দীক্ষিত আদিবাসী-অন্ত্যজদের উপাসনা/প্রার্থনা অনেক ক্ষেত্রে ভাড়া বাসাতেই সম্পন্ন করতে হয়। আর এটি করতে গিয়েই অনেক বাধা-বিপত্তি সম্মুখীন হয়ে থাকে। বাড়ির মালিকগণ জেনে-না জেনে ভাড়া দিলেও উপাসনা/প্রার্থনা করার ক্ষেত্রে বাধ সাধে। বাধ সাধে সহ-ভাড়াটিয়াদের অসুবিধার কথা বলে। উপসনাস্থল দূরত্ব, যোগাযোগের সমস্যা কিংবা পরিবার-পরিজন নিয়ে সময়মতো পৌঁছানো ইত্যাদির কারণে ভাড়া বাসাতেই উপাসনা/প্রার্থনা সম্পন্ন করতে উদ্যোগী হয়ে থাকে। এটি খুবই কষ্টদায়ক যে, খ্রিষ্ট বিশ্বাসীরা জাতি-ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে, দেশ-জাতি-সরকার, প্রতিবেশী, অসুস্থ মানুষজনসহ বিশ্বব্যাপীর শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য আকুলভাবে স্রষ্টার কাছে বিনতী করেন; তারপরও বাড়ির মালিকদের আচরণ যেন সৌহার্দ্যমূলক না হয়ে অসৌজন্যমূলক হচ্ছে দিন দিন। ‘দ্যা মেট্রোপলিটান খ্রিষ্টিয়ান কো-অপারেটিভ হাউজিং সোসাইটি লি. ঢাকা’ শহরের বিভিন্ন এলাকায় হাউজিং ব্যবস্থা গড়ে তুললেও, সেটির অপ্রতুলতা রয়েছে। আর আদিবাসী-অন্ত্যজ শ্রেণীর লোকদের কর্ম এরিয়া এবং অবস্থানও ভিন্নতা হওয়ায় ব্যাটে-বলে সম্ভব হচ্ছে না।
আদিবাসী-অন্ত্যজরা যাতে করে সহজে আন্তঃযোগোযোগ, অভিযোগ কিংবা প্রশাসনের সহযোগিতা নিতে পারে, এই লক্ষ্যে অ্যাপস্ করা সম্ভব কিনা যাচাই করা যেতে পারে। আপনি বলবেন, কেন তাদের জন্য আলাদা দরকার। এইজন্য দরকার কারণ এইসব জনগোষ্ঠী নিঃসঙ্কোচে, ভাবনাহীনভাবে যেন মনের কথা ব্যক্ত করতে পারে। অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায়, সাধারণত আমাদের দায়িত্ববান কর্মকর্তাগণ কে আদিবাসী, কে অন্ত্যজ জনগোষ্ঠী এই সম্পর্কেও ধারণার বেশ অভাব রয়েছে। রাস্তা-ঘাট, মার্কেট কিংবা মলগুলোকে ভিন্ন ভাষায় কথা বলতে শুনলেই চমকে ওঠে জিজ্ঞাসা করেন, আপনি কি বিদেশি! কোন দেশের লোক আপনি ইত্যাদি? আদিবাসী-অন্ত্যজ জনগোষ্ঠীর জন্য নির্দিষ্ট অ্যাপস্ থাকলে তখন সহজেই চিহ্নিত এবং ব্যবস্থা গ্রহণে তড়িৎ হতে পারবেন। এতে করে প্রশাসনের প্রতি প্রবাসী আদিবাসী-অন্ত্যজ জনগোষ্ঠীর আস্থা, ভালোবাসা ও দায়িত্বও বর্তাবে।
মাননীয় মেয়রদ্বয়ের কাছে আমাদের প্রত্যাশা, প্রাণের ঢাকাকে ঢেলে সাজানোর সাথে সাথে দূর-দূরান্ত থেকে আসা প্রবাসী জীবনযাপনকারী আদিবাসী-অন্ত্যজ শ্রেণীর মানুষের জন্যও যদি একটু সময় ব্যয় করেন; তাহলে আমরা কৃতার্থ হবো। মহান স্রষ্টার কাছে প্রার্থনা করি, আপনাদের পরিকল্পনা, ইচ্ছা-আকাক্সক্ষা এবং স্বপ্নকে বাস্তবে রূপায়ন করতে যেন বুদ্ধিমত্তা, শক্তি ও সাহস দেন।
● মিথুশিলাক মুরমু : আদিবাসী বিষয়ক গবেষক ও লেখক।





Users Today : 17
Views Today : 20
Total views : 175524
