আজ সকাল থেকেই মৌলির মনটা খারাপ। প্রতীকও কেমন খিঁচড়ে আছে। কাল ছেলেটার রেজাল্ট বেরিয়েছে। মার্কশিট দেখেই মেজাজ বিগড়ে গেছে। কোনোটাই সত্তরের ঘর পেরোয়নি। কিন্তু সেজন্য বাবির কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। কবে যে ছেলেটার একটু ম্যাচুরিটি আসবে! পেরেন্টস টিচার মিটিংয়ে কত কথা শুনতে হলো।
প্রতীক তো এমনভাব করছে, যেন পুরো দোষটা মৌলির। ছেলেটা খালি খেলা নিয়ে মেতে থাকে। সেটা মৌলির খারাপ লাগে না। এইবয়সে ছেলেপুলেরা তো খেলাধূলো করবেই।
তাই মৌলি রোজ বিকেলে সাই কমপ্লেক্সে বাবিকে খেলতে নিয়ে যায়।
: বাবি যখন নীল আকাশের নীচে সবুজ মখমলের মতো মাঠটায় ফুটবল নিয়ে দৌড়োয়, ভারি ভালো লাগে। অন্য পাঁচজন মায়ের সাথে আড্ডাটাও ভালো জমে। সন্ধে হয়ে এলে ঘাসমাখা গায়ে মা’র হাত ধরে বাবি ঘরে ফেরে। একটু ফ্রেস হয়ে পড়তে বসেই রাজ্যের ঘুম নেমে আসে দুচোখ বেয়ে। আর অংক করতে গেলেই একের পর এক হাই ওঠে। বরং ইতিহাস পড়তে ভালোবাসে ও। এবার একমাত্র ইতিহাসেই নব্বই ছুঁইছুঁই নাম্বার পেয়েছে। সায়েন্স সাবজেক্টগুলোতে সব সত্তরের ঘরে নাম্বার। প্রতীক ক্ষেপে যায়। নিজে বরাবর ফার্স্ট হয়ে এসেছে, ছেলের ওপর সেই এক্সপেক্টেশনটা চাপাতে চায়। আজই একচোট হয়ে গেছে মৌলির সাথে—বাড়িতে করোটা কি? ছেলেটাকে আরেকটু মন দিয়ে পড়াতে পারো না?—এই আর এক কথা। বাড়িতে থাকা, চাকরি না করা মানে কি তার কোনো নিজস্ব কাজ নেই! এই তো সেদিন মৌলির এক পিসতুতো ননদ শর্মিলি অফ ডে দুপুরে এসে হাজির, আড্ডা মারার জন্য, বলল—যাই বৌমনি তো সবসময় ফ্রি, একটু আড্ডা মেরে আসি। বোঝো—মৌলির নিজস্ব কোনো সময় নেই।
আজ একটু টেনশন আছে, প্রতীক বিগড়ে থাকবে। অসহ্য লাগে এই গুমোট পরিস্থিতিটা। আজও ছেলেটা বকা খাবে। বিকেল হলে একটু পরিপাটি হয়ে ছেলের হাত ধরে সাই কমপ্লেক্সে চলে যায় মৌলি। বড়ো বড়ো গাছ কমপ্লেক্সের ভেতরে। সল্টলেকের এই চওড়া রাস্তাগুলোর পাশে পাশেও অনেক গাছ আছে। মৌলির অনেক হাল্কা লাগে সাইয়ের মাঠের কাছে এসে। বাবি তো বলটা নিয়ে জার্সি পরে দৌড় বন্ধুদের সাথে। অন্য মায়েদের সাথে চা খেতে খেতে আড্ডায়, মৌলি ভুলে যায় বাবির আশানুরূপ রেজাল্ট না হওয়ার দুঃখ। সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরেই, হাত মুখ ধুয়ে বাবি পড়তে বসেছে—হলোটা কি! আজ প্রতীকও তাড়াতাড়ি ফিরেছে। হাল্কা টিফিন আর প্রতীকের কফি বানিয়ে ছেলের কাছে বসে মৌলি। আড়চোখে বাবি মাঝেমাঝে বাপির দিকে তাকাচ্ছে আর খুব মনোযোগ দিয়ে অংক করার ভান করছে।
হাসিও পায় মাঝে মাঝে। বেচারির কি শাস্তি। বেশি পড়তে ওর ভালো লাগে না—তা কি করবে ও?
: নটা বাজে—কিচেনে যেতে হবে, মৌলি উঠে পড়ে—রবীন্দ্রসংগীত বেজে ওঠে মোবাইলের রিংটোনে—‘‘সখী ভাবনা কাহারে বলে’’—প্রতীকের ফোন। ওর গলা তার সপ্তক ছুঁয়েছে—বেলামাসি, হ্যাঁ বলো—শুনতে পাচ্ছি—কবে? হ্যাঁ, আচ্ছা ; অবশ্যই যাবো—দাদুভাই তো যাবেই, আমরা সবাই ভালো আছি—আচ্ছা।’’
ফোন রেখে গম্ভীর গলায় প্রতীক বলে—বেলামাসির নাতির পৈতে সোমবার। শনিবার পলাশপুর যেতে হবে। বাবি লাফিয়ে উঠেছে—মানে? সেই ইচ্ছামতীর ধারে? হুররে। বইপত্র ছেড়ে লাফ দিয়ে ওঠে বাবি—মা, তার মানে ওই টুপাই, পুটকী, শোনু, বাবাই—ওদের বাড়ি? আর রিমঝিম, গুনগুনরাও তো যাবে? মৌলি বলে—হ্যাঁ বাবা, কিন্তু তোমাকে তো অ্যাপ্লিকেশন দিতে হবে স্কুলে। প্রতীকের কড়া নির্দেশ এই চারদিনের মধ্যে আগামী সপ্তাহের পড়াগুলো অ্যাডভান্স করে নাও আর অংকের তিনটে চ্যাপ্টার করে রাখো। আর এই চারটে দিন—নো খেলতে যাওয়া।
ব্যাজার মুখে অংক বইয়ের সামনে বসে পড়ে বাবি। বইয়ের খোলাপাতায় টুপাই, পুটকী দিদি, শোনু, বাবাইদের মুখগুলো ভেসে ওঠে।
আর মাত্র চারটে দিন। আজ মঙ্গলবার।
আজও প্রতীক অফিসে যাবার সময় কড়া গলায় বলে গেছে—একটু দয়া করে দেখো ছেলেটা অংকগুলো ঠিকমতো করছে কিনা। অসহ্য একটা গুমোট পরিস্থিতি বাড়িতে। মৌলির যেন দমবন্ধ হয়ে আসে। প্রতীকের সব ভালো, কিন্তু রেগে গেলে ঐ যে গুম মেরে যায়, আর ঐ পড়াশোনা আর পড়াশোনা। যাক বাবা কটা দিন পলাশপুরে খুব আনন্দে কাটানো যাবে। মনে মনে হেসে ফেলে মৌলি—সেও তো বাবির মতো দিন গুনছে।
রাত্তিরে মা’র কাছে শুয়ে, বাবি বলে—মা, আমি কিন্তু টুপাই, পুটকি দিদিদের জন্য গিফট নিয়ে যাবো—আর ওপাড়ার ওসমান, ফতেমাদের জন্যও। ওরাও তো খেলতে আসবে তাই না?
মৌলির মনটায় কোথায় যেন আনন্দের ছোঁয়া লাগে—যাক ও তো ওদের জন্য একটু ভেবেছে, করুক খারাপ রেজাল্ট একটু। সস্নহে ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে বলে—এখন ঘুমিয়ে পড় বাবা, আর তো মোটে তিনটে দিন।
শুক্রবার থেকে তোড়জোড় শুরু হয়ে গেল। ব্যাগ, সুটকেস—মাত্র পাঁচটা দিন তো পলাশপুরে থাকা, তাতেই বিশাল লাগেজ। আর বাবিও নিজের ক্রিকেট ব্যাট, বল, ওদের গিফট নিয়েছে ঠেসে। প্রতীক এখনও গম্ভীর। শুধু ফরমান জারি করেছে—একটা অংক বই আর খাতা পেন সঙ্গে নিয়ে নাও। সময় পেলে দশটা করে অংক রোজ করে নেবে।
অবশেষে কাঙ্ক্ষিত দিন চলে এলো।
শনিবার ভোর ভোর উঠে পড়েছে বাবি। মৌলি কেক, কলা, মিষ্টি প্যাক করে নিয়েছে। হাসনাবাদ লোকালেই যাওয়া। ট্যাক্সিও পাওয়া গেল সময়মতো। কত্তোদিন পর লোকাল ট্রেনে উঠছে বাবি। কি আনন্দ ওর। ট্রেনটা ফাঁকাই আছে। মনটা বেশ হাল্কা লাগছে মৌলির—প্রতীকের গম্ভীর ভাবটাও কি একটু কমেছে? হবে হয়ত।
ট্রেনটা শিয়ালদা স্টেশন ছাড়িয়ে একটু একটু করে এগোতে থাকল। আস্তে আস্তে দমদম ছাড়িয়ে গেল। বারাসাত ছাড়ানোর পরেই দুপাশে কচি ধানক্ষেত। আহা চোখ জুড়িয়ে যায়। প্রায় বারোটা নাগাদ ওরা নেমে পড়লো হাসনাবাদ স্টেশনে। এখান থেকে টোটো। প্রায় দু কিলোমিটার ধানক্ষেতের মধ্যে দিয়ে গিয়ে, পলাশপুর গ্রাম। হু হু করে হাওয়া দিচ্ছে টোটোর ভেতরে।
বেলামাসিদের বিশাল বাড়ি। বাড়ির পেছনে পুকুর। প্রচুর চাষবাস হয় ওদের। মৌলিরা পৌঁছতেই সব হৈ হৈ করে উঠলো। প্রচুর আত্মীয়-স্বজন এসেছে। বাবি তো ছেলেপুলেদের সাথে কোথায় মিশে গেল, টিকিও দেখা গেল না আর। প্রতীকও তুতোদাদাদের সাথে আড্ডায় মশগুল। মৌলির অনেক হাল্কা লাগছে এখন। তারপর রাত্তিরে সকলে বসে কুটনো কোটা। পৈতে তো সেই সোমবার। কিন্তু রবিবার সকালেই একপশলা বৃষ্টি হয়ে গেল। ইচ্ছামতীর ধারেই এই পলাশপুর। নদীতে ঝমঝম বৃষ্টি পড়ছে, ভারি ভালো লাগছে। বাড়ির জা, ননদদের সাথে দিব্যি আড্ডায় সময় কেটে যাচ্ছে।
ওমা দুপুর থেকেই তো আকাশ পরিষ্কার। বাড়ির সামনে সবুজ মাঠটার ওপাশেই ইচ্ছামতী। দুপুরে সবাই বোধহয় ভাতঘুম লাগিয়েছে। মৌলি—একটা চেয়ার পেতে বসে নীল আকাশের আর ওই সবুজ মাঠটার ওপর রোদের ঝিলিমিলি খেলা দেখতে থাকে।
প্রতীকটা কোথায় কে জানে! চারটে বেজে গেল। ওমা—বাবি—বাবাই, পুটকি, শোনু, ওপাড়ার ওসমান, ফতেমাদের সাথে বল নিয়ে দৌড়চ্ছে মাঠে। রঙিন বল নিয়ে খোলা মাঠের ঝিলমিলে রোদে বাচ্চাগুলো দৌড়চ্ছে—মনে হচ্ছে যেন একগুচ্ছ ফুল হাওয়ায় মাথা দোলাচ্ছে। বেশ লাগছে ওদের খেলা দেখতে।
কিন্তু ওটা কে?—মৌলি যেন নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না। প্রতীক—বুলুদা, ঋতুদাকে সঙ্গে নিয়ে নেমে পড়েছে মাঠে। হৈ হৈ করে বল খেলছে বাচ্চাদের সাথে। স্তম্ভিত মৌলি। ঝিলমিলে রোদ খুশী হয়ে হয়ে ওদের গায়ে পিছলে পিছলে পড়ছে। তার ছোঁয়া এসে লাগছে মৌলির চোখে মুখেও।—আজ কত্তোদিন পর তোমার মুখে হাসি দেখলাম, প্রতীক।
সন্ধে নেমে এলো, ইচ্ছামতীর তীর থেকে ওরা কাদামেখে ঘরে এলো, আর, প্রতীক কত কত্তোদিন পর তুমি বললে, মৌ, তুমিই ঠিক দুটো বেশি মার্কস এমন কিছু ম্যাটার করে না জীবনে তার চেয়ে অনেক, অনেক দামী জীবনের এই ছোটো ছোটো মুহূর্তগুলো।
অঝোরধারায় কি বৃষ্টি নামলো, মৌলির দুচোখ বেয়ে…





Users Today : 67
Views Today : 68
Total views : 177471
