নিশি বেড়ে উঠেছে নিকুঞ্জপুর নামের ছোট্ট শহরে। নিশির বাবা জোনাব আলী সরকারি ব্যাংকে চাকরি করেন। মা তনিমা গৃহিণী। একমাত্র মেয়েকে নিয়ে তাদের অনেক স্বপ্ন। মেয়ে জন্ম নেওয়ার পর থেকেই খুব যতেœ তাকে বড়ো করেছেন। নিশি ছোটো থেকেই খুব চুপচাপ, কিন্তু চোখের সামনে অপরাধ দেখলে সহ্য করতে পারে না। মুখের ওপর প্রতিবাদ করে বলেই বান্ধবীদের মধ্যে কেউ কেউ তাকে খুব পছন্দ করত। বিশেষত সহপাঠীদের মধ্যে যারা নিরীহ প্রকৃতির তারা নিশির ভক্ত ছিল। কারণ তারা ক্লাসে সচরাচর নিজেদের দাবি আদায়ের জন্য নিশির দ্বারস্থ হতো। নিশি অকপটে তাদেরকে সাহায্য করত। এমনিতেই মেধাবী হওয়ায় শিক্ষকদের খুব প্রিয় ছিল নিশি। এসএসসি এবং এইচএসসিতে এ+ পাওয়ার পর ওর বাবা-মা ঠিক করলেন মেয়েকে মেডিক্যাল কোচিংয়ে ভর্তি করাবেন। বাবার স্বপ্ন ছিল মেয়ে ডাক্তার হবে। কিন্তু নিকুঞ্জপুরে ভালো কোচিং সেন্টার নেই, তাই নিশির বাবা ঠিক করলেন মেয়েকে ওর মামার বাড়িতে রেখে কোচিং করাবেন। প্রথমে যখন নিশি শোনে তাকে বাবা-মা র থেকে দূরে যেতে হবে, সে রাজি ছিল না। কিন্তু যখন মামাবাড়ির কথা শুনেছে তখন সে রাজি হয়েছে। কারণ মামার বাড়িতে যাওয়ার আগ্রহ তার বরাবরই ছিল। সোহেল নিশির মামাতো ভাই। নিশির থেকে বয়সে আট বছরের বড়ো। সোহেলকে নিশি ছোটোবেলা থেকেই মনেমনে পছন্দ করত। কিন্তু সোহেল তাকে কখনোই সেভাবে দেখেনি। তবে নিশির মনে হতো সোহেলও তাকে পছন্দ করে, হয়ত পারিবারিক কারণে মুখে বলতে পারে না। সোহেলরা দুই ভাই। বোন না থাকার কারণে নিশিকে তারা নিজের ছোটো বোন হিসেবেই দেখেছে। সোহেলের পরীক্ষা শেষে ছুটিতে নিশিদের বাসায় আসত। নিশিকে নিয়ে অঙ্ক করাতে বসত, নিশি ইচ্ছা করেই বারবার অঙ্কে ভুল করত, কারণ ভুল করলেই সোহেল নিশিকে কানমলা দিত। সোহেলের হাতের স্পর্শে নিশি পুলকিত হতো। মাঝেমাঝে সোহেল বিরক্ত হয়ে নিশির মাথায় বাড়ি দিত। ইদানীং অবশ্য সোহেল আর নিশিদের বাড়ি যেতে পারে না, কারণ বুয়েট থেকে পাস করে সে এখন চাকরি করছে। সেই সোহেলের বাসায় গিয়েই নিশি তিন মাস থাকবে এটা ভাবলেই একটা চাপা আনন্দ ওর মনে জাগছে। নিশির বাবা গিয়ে ওকে তার মামার বাড়িতে রেখে আসে। প্রতিদিন অফিসে যাওয়ার সময় নিশিকে সোহেল কোচিংয়ে দিয়ে আসত। সেদিন শুক্রবার। ছুটির দিন। সোহেল ড্রয়িং রুমে বসে। নিশি ভাবলো যে সে আজ সকালে চা করবে। সোহেলের মা বলেছেন, আজ নিশি আমাদের চা করে খাওয়াবে। এটা শুনে সোহেল হেসে বলে, কি যে বলো না মা তুমি? পুচকি আবার চা করতে পারে নাকি? নিশিকে সোহেল পুচকি বলেই ডাকত। নিশির মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। কারণ সে সব সময় ভাবত সোহেল তাকে একটু বড়ো ভাববে কবে ? সেদিন নিশির মামী বললেন, সোহেল তুই তো বন্ধুদের সাথে মুভি দেখতে যাবি, নিশিকেও সাথে নিয়ে যা। এটা শুনে সোহেল হেসে বলল, পুচকি না ছোটো, ওর সাথে গেলে তো আমার এনিমেশন দেখতে হবে। এসব শুনে নিশির মুখটা লজ্জায় লাল হয়ে গেল। হঠাৎ একদিন বিকেলে সোহেল অফিস থেকে তাড়াতাড়ি ফিরে আসে, এসেই নিশিকে নিয়ে বাইরে বেড়াতে যায়। প্রথমেই তারা যায় সিনেমা দেখতে, হঠাৎ একটা ভয়ংকর দৃশ্য সিনেমায় দেখে নিশি ভয়ে সোহেলের হাত চেপে ধরে। সোহেলও হাতটা ধরে থাকে। সিনেমা হল থেকে বের হয়ে তারা দুজন শপিং করতে যায়। সোহেল নিশিকে বেশ কয়েকটা বই আর দুটো কাজল কিনে দেয়। একটা কালো ও নীল রংয়ের কাজল। তারপর তারা বাড়ি ফিরে আসে। নিশির মনে হতে থাকে নিশ্চয়ই সোহেল তাকে ভালোবাসে। হয়তো লজ্জায় সে কিছু বলতে পারছে না। এরপর থেকে নিশি সবসময়ই চোখে কাজল দিত। সে কখনোই সোহেলকে তার মনের কথা বলতে পারেনি। মেডিক্যালে ভর্তি হতে না পরে খুব কষ্ট পেয়েছিল নিশি।এরপর বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ ফ্যাকাল্টিতে ভর্তি হয়। বাকৃবিতে ভর্তি হওয়ার পর নতুন করে সে তার জীবন শুরু করে। সোহেলকে নিয়ে তার মনের মধ্যে ভালোবাসা থাকার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে কখনোই কোনো ছেলের সাথে সম্পর্কে জড়াতে পারেনি। নিশির ক্লাসমেট বিজয়ের সাথে প্রথম দিন থেকেই বন্ধুত্ব হয়। বিজয়ের সাথে নিশি অন্য বান্ধবীদের মতোই সবসময় মিশতো। এমনকি সোহেলের কথাও সে বিজয়ের কাছে গল্প করে। বিজয়কে নিশি প্রকৃত বন্ধুর মতোই মনে করত। সোহেলের কথা উঠলেই সে নিশিকে বলত, এটা কোনো ভালোবাসা না, তোর উচিত ভালো একটা ছেলেকে বেছে নেওয়া। রুমমেট রিমি সবসময় নিশিকে বলত, ছেলে-মেয়ে কখনো বন্ধু হতে পারে না, তুই বোকামি করছিস, নিশ্চয়ই বিজয় তোকে ভালোবাসে। নিশি প্রতিবাদ করত, বিজয় আমার ভালো বন্ধু। সেদিন ছিল ১৪ ফেব্রুয়ারি, বিজয় সকালের প্রাকটিক্যাল ক্লাস শেষে বের হয়ে নিশিকে নিয়ে নদীর পাড়ে ঘুরতে গেল। হঠাৎ পকেট থেকে একটা গোলাপ ফুল বের করে নিশিকে প্রপোজ করল। নিশি ঠাস করে বিজয়ের গালে চড় মেরে তাপসী রাবেয়া হলের দিকে হেঁটে চলে গেল।
এরপর থেকে নিশি এবং বিজয় কেউ কখনো কথা বলেনি। এরমধ্যে নিশি অনার্স শেষ করে মাস্টার্সে ভর্তি হয়েছে। একদিন করিম ভবনের সামনে নিশির সাথে বিজয়ের দেখা হয়। বিজয় নিশিকে বলে তোকে ছাড়া আমি কোনো মেয়েকে ভালোবাসিনি। আমি আমার বাকি জীবনটা তোর সাথেই কাটাতে চাই। তুই আমাদের সম্পর্কের কথা একবার ভেবে দেখ। এদিকে তিন বছর অগেই সোহেলের বিয়ে হয়ে গেছে। সোহেল পরিবার নিয়ে এখন আমেরিকাতে আছে। তাই নিশি সবকিছু নতুন করে চিন্তা করে। নিশি ভেবেছিল যেহেতু বিজয় তাকে সত্যিই ভালোবাসে তাহলে তার সাথে জীবন কাটানোই ঠিক হবে। কারণ পৃথিবীতে প্রকৃত ভালোবাসা বিরল, তাই এই ভালোবাসা পাওয়ার পর হারানো ঠিক হবে না। এজন্য নিশি ঠিক করেছিল, গরমের ছুটি থেকে ক্যাম্পাসে ফিরে এসেই সে বিজয়ের সাথে কথা বলবে। নিকিতা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। নিশির স্কুলফ্রেন্ড। নিকিতার সাথে দেখা করার জন্য রাজশাহী যায় নিশি। নিকিতার সাথে ওদের ক্যাম্পাসের মধ্যে হাঁটার সময় নিকিতা বলে, আমার রুমমেটের বয়ফ্রেন্ড তো বাকৃবিতে পড়ে, তুই দেখলেই চিনবি। গতকাল তো ছেলেটা এখানে এসেছে, ছুটি পেলেই আসে। তার বাড়ি তো রাজশাহীতে। হঠাৎই কলা ভবনের সামনে এসে নিশি থমকে দাঁড়ায়। সামনে দেখে একটা মেয়ের হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে বিজয়। নিশিকে দেখে সে মেয়েটার হাত ছেড়ে দেয়। এরপর আর নিশির কখনো বিজয়ের সাথে দেখা হয়নি।
নিশির সাথে সৌগতর পাঁচ বছর হলো বিয়ে হয়েছে। বিয়ের পর থেকেই ওরা কানাডাতে আছে। বেশ সুখেই আছে। কিন্তু এখনো রাতে ঘুম ভেঙে গেলে নিশির খুব ফাঁকা ফাঁকা লাগে। এত সুখের মধ্যেও মাঝে মাঝে সে বড়ো একা। আজও সোহেলের জন্য নিশির মনটা হাহাকার করে ওঠে। আজও তার নীল কাজল পরতে ভালো লাগে। হয়ত কেউ এসে আবার বলবে তোমার চোখে কাজল ভালো লাগে।





Users Today : 20
Views Today : 25
Total views : 177910
