ছেলেবেলা থেকেই সংগ্রাম করে নীলার জীবন কেটেছে । জীবনের প্রতি ক্ষেত্রে লড়াই করেই তাকে বড়ো হতে হয়েছে। সম্বলপুর গ্রামে তার জন্ম। বাবা ব্যবসা করেন এবং মা একটি এনজিওতে চাকরি করেন । পরিবারে তার ছোটো এক ভাই নিমেষ । নীলার মা রিক্তার ইচ্ছা সে তার দুই সন্তানকে শিক্ষিত করে গড়ে তুলবে। কিন্তু নীলার বাবা খুব অলস প্রকৃতির ছিলেন। সংসারের কোনো দায়িত্বই তিনি পালন করত না। নীলার মার কাছ থেকে টাকা নিয়ে ব্যবসা করত এবং প্রতি বছরই ব্যবসাতে লোকসান গুনতে হতো তাকে। নিজের একগুঁয়েমি এবং অলসতার ফলাফল ভোগ করতে হতো তার পরিবারকে। নীলার মা দুই সন্তানের মুখ চেয়ে সব সহ্য করত, ভাবত একদিন হয়ত পরিবর্তন হবে, নীলার বাবা দায়িত্বশীল ভালো মানুষ হবে।
নীলার গান শেখার খুব শখ ছিল। যদিও তার গানের গলা বিশেষ ভালো ছিল না। নীলার অন্য সব বান্ধবীর বাড়িতে গান শেখার জন্য শিক্ষক ছিলেন। পাশের বাড়ির টুম্পার গানের স্যার আসতেন প্রতি শুক্রবার করে। নীলা গিয়ে টুম্পার গান শেখার সময় বসে থাকত। এটা দেখে একদিন টুম্পার মা বলেছিল, তুই আর আমাদের বাড়িতে আসবি না। তুই আসলে আমার টুম্পা গান শিখতে পারে না । নীলা সেদিন বাড়িতে গিয়ে খুব কান্নাকাটি করেছিল। এর কয়েকমাস পর একদিন নীলার মা একটা হারমোনিয়াম কিনে আনে। অনেক কষ্ট করে একজন গানের মাস্টারও রেখে দেয়। কিন্তু তিন মাস যেতে না যেতেই মাস্টার ছাড়িয়ে দিতে হয় । নীলার বাবাকে ব্যবসা করার জন্য যে টাকা দিয়েছিল, সব টাকা লোকসান হয়। আর বিভিন্ন জায়গা থেকে নীলার বাবা অতিরিক্ত সুদে টাকা ধার করেছিল সেটা নীলার মা জানত না। অবশেষে নীলার মার সকল গহনা বিক্রি করে সেই টাকা শোধ করতে হয়। তখন নীলাদের সংসারে এমন একটা অবস্থা যে দুইবেলা খাবার জোটাও কষ্টকর। নীলার মামার বাড়ি ছিল একই গ্রামে। তাই নীলার মা তার বাবার বাড়ি গিয়ে ওঠে। নীলার মার চাকরির সামান্য বেতন থেকে যে টাকা তা দিয়ে দুই সন্তানের পড়ালেখার খরচ চলত।
মামার বাড়িতে নীলার নতুন জীবন শুরু হয়। নীলার মা চাকরি করত এবং ভাইদের সংসারের সমস্ত কাজ করে দিতেন। কিন্তু তবুও নীলার দুই মামী প্রতিনিয়ত তাদের কথা শোনাতো। নীলার ছোটো ভাইয়ের বয়স তখন সাত বছর। প্রতিদিন সন্ধ্যায় নীলার মামী তার ছেলেমেয়েদের এমনকি নিজেও এক গ্লাস দুধ খেত। কখনোই নীলাদের ভালো খাবার দিতে চাইত না। নীলা পড়াশুনাতে বেশ ভালো ছিল। মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিকে ভালো রেজাল্ট করার পর নীলা ভর্তি হয় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান ডিপার্টমেন্টে। ভর্তির পর থেকে টিউশনি করে নীলা পড়াশোনার খরচ চালাতো । বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়া শেষ করে নীলা ব্যাংকে চাকরি শুরু করে । পরিবারের সচ্ছলতা আনার জন্য নীলা চাকরি পাওয়ার পরও বিয়ে করে না। কারণ তার ছোটো ভাইয়ের পড়ার খরচ, তাদের সংসারের খরচ একা তার চালাতে হতো। হঠাৎ একদিন তমালের সাথে নীলার অফিসেই পরিচয় হয়। লোনের জন্য ব্যাংকে এসেছিল। এরপর থেকে দুজনের প্রায় নিয়মিতই ফোনে কথা হতো। তমালের সাথে কথা বলে নীলার মনে হয়, হয়ত তাদের সম্পর্কটা বিয়ে পর্যন্ত যেতে পারে। তমালের বাড়ি থেকে তমালের মা একদিন নীলাকে দেখতে আসে। মেয়ে বিয়ের পর তার সমস্ত টাকা বাবার বাড়িতে দিবে এটা শুনে তমালের মা বিয়েতে রাজি হয় না। নীলা তমালের সাথে দেখা করে। তমাল বলে আমি আমার বাবা-মার একমাত্র ছেলে তাই আমি আমার পরিবারের বিপক্ষে গিয়ে তোমাকে বিয়ে করতে পারবো না। এরপর থেকে আর কখনো নীলা বিয়ে নিয়ে চিন্তাও করেনি। ছোটো ভাই নিমেষ এমবিবিএস পাস চাকরি করছে। নিমেষের বিয়ে দিয়ে নীলা এখন তাদের সংসারেই থাকে। নিমেষের তিন বছরের মেয়ে অনামিকাকে নিয়েই তার দিন কেটে যায়।





Users Today : 20
Views Today : 25
Total views : 177910
