সব মানুষকে নিয়ে লেখার যোগ্যতা সবার থাকে না, তাই কখনো কোনো মহান মানুষকে নিয়ে লিখতে বসিনি, তবে আজ মনের অনুভূতিগুলো লেখার মাধ্যমে প্রকাশ করার ধৃষ্টতা প্রকাশ করছি। আমার জন্ম যে সময়ে হয়েছে তখন বঙ্গবন্ধুর সম্পর্কে জানার সুযোগ হয়নি, পত্রিকাতেও তেমন কোনো লেখা প্রকাশিত হতো না অথবা তখন বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনীও প্রকাশিত হয়নি, যেটুকু জেনেছি মা-বাবা অথবা দাদুর মুখে গল্প শুনে, তবে এটা বুঝতাম যে, স্বাধীনতার কথা আসলেই বঙ্গবন্ধুর নামটা আসত । ১৯৯৬ এর পর থেকে বিভিন্ন বই, পত্র-পত্রিকা আর বেতার-টেলিভিশনের মাধ্যমে আস্তে আস্তে বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে অনেক অজানা তথ্য জানতে পারি—একজন মানুষের জাতির পিতা হয়ে ওঠার গল্পটা বুঝতে পারি। বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে জানার পর থেকে মনের মধ্যে একটাই আক্ষেপ জন্ম নিতে থাকে যে আমি কতটা অভাগা তাঁর মতো একজন মহান মানুষকে একবার চোখে দেখার সুযোগ আমার হয়নি। ১৫ আগস্টের ভয়াবহ স্মৃতির কথা কল্পনা করতে গা শিউরে ওঠে আর যাদের সাথে তা ঘটেছিল, বিশেষ করে সেই মানুষটা, যার কাছে তাঁর দেশ ছিল প্রাণের চেয়েও অনেক প্রিয়। ১৫ আগস্ট এলে প্রতি বছর মনে হয় মানুষ হিসেবে আমি কত অভাগা ! তাই সমগ্র জাতির মতো ১৫ ই আগস্ট এলে আমার চোখে অশ্রু অঝোরে ঝরে, হায়রে অভাগা আমার দেশ, হায় দুর্ভাগা জাতি!
প্রাচীনকাল থেকেই উপমহাদেশ কৃষি দ্বারা চালিত । এখানে কৃষিকাজ অপেক্ষাকৃত সহজ ছিল এবং কৃষির ওপর জনসংখ্যার চাপ ছিল অত্যধিক। ব্রিটিশ শাসনামলের গোড়ার দিকে শিল্পকর্ম, বিশেষত সুতিবস্ত্র উৎপাদন হ্রাসের ফলে এ চাপ আরও বৃদ্ধি পায়। বস্তুত ১৯২১ সালের মধ্যে মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় চার-পঞ্চমাংশ (৭৭.৩%) কৃষি নির্ভর হয়ে পড়ে,যা তৎকালীন সমগ্র ভারতে ছিল ৬৯.৮%। ব্রিটিশ আমলে জনসাধারণ বিভিন্ন সামাজিক শ্রেণিভুক্ত ছিল । একদিকে বিভিন্ন পর্যায়ের খাজনা আদায়কারী ভূমিমালিক (জমিদার) ও নানা ধরনের মধ্যস্বত্বভোগী মহাজন , অন্যদিকে রায়ত, বর্গাদার ও ক্ষেতমজুর। তবে রায়তরাই চাষাবাদে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিল। বাংলার দু অংশের মধ্যে বর্তমান বাংলাদেশ হিসেবে পরিচিত ভূখণ্ডেই কৃষির ওপর জনসংখ্যার চাপ ছিল প্রকট ৷
বঙ্গবন্ধু তাঁর স্বপ্নের বাংলাদেশকে বাস্তবের সোনার দেশে পরিণত করতে চেয়েছিলেন। চোখ বন্ধ করে একবার যদি কৃষিতে যে বিপ্লব ঘটে গেছে তা চিন্তা করা যায় তাহলেই বুঝতে পারবো এটা আলাদীনের চেরাগ নয় বরং এখন আমাদের কৃষি নির্ভর বাংলাদেশ বহুগুণে সমৃদ্ধ৷ এই স্বপ্নকে বাস্তবরূপে চিহ্নিত করার পেছনে যে মহান মানুষের অবদান তিনিই আমাদের জাতির পিতা। জাতির পিতার কৃষিবান্ধব নীতি,পরিকল্পনা এগুলোকে বাস্তবে রূপায়িত করেছেন তাঁরই সুযোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বেঁচে থাকার আদিম প্রবৃত্তি অর্থাৎ ক্ষুধা নিবারণের প্রয়োজনেই হাঁটি হাঁটি পা পা করে বেড়ে উঠেছে কৃষি নামক শিল্পটি৷ কৃষি নামক যে আধুনিক প্রযুক্তি-নির্ভর শিল্প আমরা অবাক হয়ে দেখি সেই শিল্পকে আমাদের কাছে পরিচিত করে তোলার পেছনে বঙ্গবন্ধুর অবদান অনস্বীকার্য । স্বাধীনতা পরবর্তী সময় থেকে বঙ্গবন্ধু তাঁর স্বপ্নের বাংলাদেশকে সাজিয়ে তুলতে চেয়েছিলেন। তাঁর শৈল্পিক ছোঁয়ায় আজ বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের দেশ বাস্তবতার দৌড়গোড়ায় আছে। পৃথিবীতে একজন বা দুইজন মানুষ শতাব্দীতে জন্মগ্রহণ করেন যারা সারাজীবন শুধু অন্যের সুখের কথা চিন্তা করেন। তাদের হাতের ছোঁয়ায় সকল মানুষের জীবনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটে। স্বাধীনতা পরবর্তী বিধ্বস্ত বাংলার নিরন্ন মানুষকে দেখে সেই মহান মানুষের অন্তর সেদিন হু হু করে কেঁদে উঠেছিল। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন একটি দেশের মানুষকে উন্নতির দৌড়গোড়ায় পৌঁছাতে হলে সেই দেশের মানুষের কৃষিতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতেই হবে। বঙ্গবন্ধু কৃষি এবং কৃষকের ভাবনা ভেবেছিলেন বলেই আজ এই করোনাকালীন দুর্যোগের সময় আমাদের দেশের মানুষকে খাদ্য সঙ্কটে পড়তে হয়নি।
“এ স্বাধীনতা আমার ব্যর্থ হয়ে যাবে যদি বাংলার মানুষ পেট ভরে ভাত না পায়”—বঙ্গবন্ধুর এই উক্তি থেকেই আমরা উপলব্ধি করতে পারি যে কৃষি নিয়ে কতটা চিন্তা তিনি করতেন। বঙ্গবন্ধু যে শুধু কৃষি এবং কৃষক নিয়ে চিন্তা করতে সেটা নয় , তাঁর চিন্তা ছিল সুদূরপ্রসারী । তিনি জানতেন যে বিজ্ঞানভিত্তিক এই কৃষি সেক্টরকে সামনে এগিয়ে নিতে হলে প্রয়োজন মেধাবী কৃষিবিদ এবং কৃষি বিজ্ঞানী। কৃষি সেক্টরকে আকর্ষণীয় করে তোলার জন্য বঙ্গবন্ধু ১৯৭৩ সালের ১৩ ফেব্রুযারি সরকারি চাকরিতে কৃষিবিদদের প্রথম শ্রেণীর মর্যাদা দেন। এরপর থেকেই মেধাবী কৃষিবিদদের পদচারণায় মুখর হতে থাকে কৃষি সেক্টর। বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশ পুনর্গঠনে ১৯৭২-৭৩ সালে ৫০০ টাকার উন্নয়ন বাজেটের মধ্যে কৃষি উন্নয়নের জন্য ১০১ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছিলেন। কৃষিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ফলে ১৯৭৩ সালের মধ্যেই ধ্বংসপ্রাপ্ত কৃষি অবকাঠামো পুন: নির্মাণ করা সম্ভব হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু প্রণীত প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় সামাজিক ন্যায়বিচার ও দারিদ্র্য বিমোচনের তাগিদে কৃষি উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। স্বল্প মেয়াদে উন্নত পদ্ধতিতে চাষাবাদ, উন্নত বীজ, সেচ ও অন্যান্য কৃষিউপকরণ সরবরাহ করে এবং কৃষিঋণ মওকুফ, সার্টিফিকেট মামলা প্রত্যাহার ও খাসজমি বিতরণ করে কৃষিক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতা ও উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে খাদ্যে স্বনির্ভরতা অর্জনের চেষ্টা করা হয়।১৯৭২ সালে দেশে তুলার চাষ সম্প্রসারণ করার জন্য কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে তুলা উন্নয়ন বোর্ড গঠিত হয়। পুনর্গঠন করা হয় হটিকালচার বোর্ড, সিড সার্টিফিকেশন এজেন্সি ও রাবার উন্নয়ন কার্যক্রম। সোনালি আঁশের সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করতে প্রতিষ্ঠা করা হয় পাট মন্ত্রণালয়। বঙ্গবন্ধু কৃষি সেচব্যবস্থার উন্নয়ন, বীজ ও সার সরবরাহের প্রতিষ্ঠান বিএডিসিকে পুনর্গঠন এবং সারাদেশে এর বীজকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন ১৯৭৫ সালে। কৃষিতে প্রয়োজনীয় অর্থায়নের জন্য তিনি কার্যকর কৃষি ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেন।১৯৭৩ সালেই কৃষিতে গবেষণা সমন্বয়ের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান হিসেবে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল। ১৯৭৩ সালে ১০নং অ্যাক্টের মাধ্যমে নতুন নামে পুনর্গঠন করেন বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট। তখনই ঢাকার আণবিক গবেষণাকেন্দ্রে কৃষি পারমাণবিক গবেষণা ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার অ্যাগ্রিকালচার (ইনা) প্রতিষ্ঠা করার নির্দেশ দেন, যা ১৯৭৫ সালের গোড়ার দিকে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার অ্যাগ্রিকালচার (বিনা) হিসেবে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে স্থানান্তরিত হয়।
শুধু স্বাধীনতা অর্জন করা নয়, বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন আবহমানকালের জীবন সংগ্রামে পর্যুদস্ত, আকণ্ঠ ঋণে দিশেহারা সম্বলহীন বাঙালি জাতির জন্য ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত, ভেদবুদ্ধিহীন সমাজের প্রতিষ্ঠা । তাঁর স্বপ্ন ছিল স্বয়ংসম্পূর্ণ বিকাশশীল অর্থনীতির। ছারখার হওয়া দেশের সার্বিক সর্বনাশ থেকে সবল উত্তরণের লক্ষ্যে তিনি কৃষির উন্নয়ন করার বাস্তবমুখী পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। কৃষিতে ভর্তুকি। রাসায়নিক সারের ক্ষতি কমাতে জৈব সারের ব্যবহার বাড়ানোর চেষ্টা করে তাঁর সরকার। বঙ্গবন্ধুর বিচক্ষণ নেতৃত্বে এগিয়ে চলা দেশ হঠাৎ থমকে গেলেও বর্তমান সরকারের প্রণোদনা ও পরিকল্পনা আমাদের কৃষিক্ষেত্রে যুগান্তকারী সুফল আনছে।
● কুন্তলা ঘোষ : কৃষিবিদ, কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা, পাবনা সদর, পাবনা।





Users Today : 5
Views Today : 6
Total views : 175510
